গত জুলাই মাসে ৪৪৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ৪১৮ জন আর আহত হয়েছে ৮৫৬ জন। এসব দুর্ঘটনায় সবচেয়ে বেশি প্রাণ হারিয়েছেন মোটরসাইকেল ও থ্রি-হুইলারের যাত্রী ও চালকরা।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশন গত আগস্টে এ তথ্য জানিয়েছে।
জুলাইয়ে দুর্ঘটনায় নিহতদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ১০৯ জনের মৃত্যু হয় মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়, আর থ্রি–হুইলার দুর্ঘটনায় ১০৮ জনের মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার ধরনের বিষয়ে ফাউন্ডেশন বলছে, সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে; ৪৮ দশমিক ৭৫ শতাংশ। আর মুখোমুখি সংঘর্ষের ফলে ঘটেছে ১৮ দশমিক ২৮ শতাংশ।
অন্যদিকে, যাত্রী কল্যাণ সমিতি একই মাসের পরিসংখ্যান জানিয়ে বলছে, জুলাইয়ে দেশের সড়ক, রেল ও নৌপথে ৫৫৪টি দুর্ঘটনায় ৫৬৮ জন নিহত ও এক হাজার ৪১১ জন আহত হয়েছে, তবে এর মধ্যে সড়ক পথে মৃত্যু হয়েছে সবচেয়ে বেশি।
যাত্রী কল্যাণের তথ্য অনুসারে, ৫০৬টি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ৫২০ জনের, আহত হয়েছে এক হাজার ৩৫৬ জন। এর মধ্যেও আবার সড়কপথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ছিল ১৬২টি, যাতে নিহত হয়েছে ১৬৯ জন, আহত হয়েছেন ১৪৪ জন। সড়ক দুর্ঘটনায় মোট নিহতের মধ্যে এই হার ৩২ দশমিক ৫০ শতাংশ।
তার আগের মাস অর্থাৎ জুনে ৬৮৯টি দুর্ঘটনার মধ্যে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ছিল ২৫৬টি। নিহত হয় ২৮৮ জন, যা মোট নিহতের ৩২ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
পরিসংখ্যান বলছে, মে মাসে সারা দেশে সড়ক দুর্ঘটনায় অন্তত ৬১৪ জনের মৃত্যু হয়, যাদের ৪২ শতাংশই মারা গেছে বাইক দুর্ঘটনায়। তথ্য বলছে, এই সময়ে ২৩৩টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় ২৫৬ জন নিহত হয়েছে, যা মোট দুর্ঘটনার ৩৯ দশমিক ০২ শতাংশ, নিহতের ৪১ দশমিক ৬৯ শতাংশ।
নিটোর (জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান) বলছে, ২০২৪ সালের জুন থেকে চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ২২ হাজার ৬৪৫ জন। এর মধ্যে কেবল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিৎসা নিয়েছে ৮ হাজার ১৫০ জন।
যাত্রী কল্যাণ সমিতি এসব দুর্ঘটনার কারণ হিসাবে বলেছে, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক, অবাধে মোটরসাইকেল ও ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল, সড়কে রোড মার্কিং ও আলোর অভাব, সড়ক বিভাজক না থাকা, অদক্ষ চালক ও ফিটনেসবিহীন যানবাহন।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলেছে, সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ মোটরসাইকেল; মোট সড়ক দুর্ঘটনার ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশই ছিল মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে দেশে ১ হাজার ১৮৯টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারায় ৯৪৫ জন। পরের বছরে অর্থাৎ ২০২০ সালে দুর্ঘটনা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৮১টি; তাতে নিহত হয় ১ হাজার ৪৬৩ জন। ২০২১ সালে দুর্ঘটনা আরও বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৭৮টি, মৃত্যু বেড়ে হয় দুই হাজার ২১৪ জনের।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্যে দেথা যায়, ২০২৪ সালে ২ হাজার ৭৬১টি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে ২ হাজার ৬০৯ জনের। তারও আগে ২০২০ সালে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা ঘটে ১ হাজার ৩৮১ টির, তাতে মৃত্যু হয় ১ হাজার ৪৬৩ জনের, ২০২১ সালে ২ হাজার ৭৮টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ২ হাজার ২১৪ জনের, ২০২২ সালে ২ হাজার ৯৭৩টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ৩ হাজার ৯১ জনের, ২০২৩ সালে ৩ হাজার ৫৩২টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয় ২ হাজার ৪৮৭ জনের।
রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত পাঁচ বছরে সারাদেশে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছে ৩০ হাজার ৭৭৩টি, যাতে মারা গেছে ৩৩ হাজার ২৪৬ জন আর আহত হয় আরও প্রায় ৫১ হাজার মানুষ।
ফাউন্ডেশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোটরসাইকেল এবং ছোট যানবাহনের অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি এবং নিয়ম ভঙ্গই দুর্ঘটনা বেড়ে যাওয়ার প্রধান কারণ।

বাংলাদেশ রোড ট্রান্সপোর্ট অথোরিটির (বিআরটিএ) গত ১৩ মাসের হিসাব বলছে, সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতের ৩২ দশমিক ১৪ শতাংশই মোটরসাইকেল আরোহী। আর রোড সেফটি ফাউন্ডেশন গত পাঁচ বছরের হিসেবে জানিয়েছে,দুর্ঘটনায় মৃত্যুর মধ্যে ৩৫ দশমিক ৬৭ শতাংশই মোটরসাইকেলের আরোহী। আর এসব দুর্ঘটনায় নিহতের মধ্যে বেশিরভাগই তরুণ, শিশুও রয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউট (এআরআই)। এআরআই ২০২২ সালে এক প্রতিবেদনে জানায়, দেশে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় মৃত্যুর হার অনেক বেশি। সেখানে জানানো হয়, প্রতি ১০ হাজার মোটরসাইকেলে ২৮ দশমিক চারজনের মৃত্যু হয় প্রতিবছর।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং পরিবহন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, বাংলাদেশে অর্ধেকের বেশি যানবাহন মোটরসাইকেল, যার কারণে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি।
“মোটরসাইকেল চালকরা ট্রাফিক আইন যে মানে না, এটা বাংলাদেশের যে কোনও রাস্তায় তাকালেই আপনি বুঝতে পারবেন। রাস্তায় চলা অন্যদের তুলনায় তাদের তাড়া বেশি, হর্ন দেয় বেশি, পথচারী রাস্তাতেও তাদের জন্য হাঁটা যায় না। এমনকি, সেটা আপনি তাদের বললেও তারাই উল্টো তর্ক জুড়ে দেয়।”
অধ্যাপক শামসুল হক বলেন, যে কোনও বিবেচনায় সাধারণ যানবাহনের চেয়ে মোটরসাইকেলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি ৩০ শতাংশ বেশি আর বাংলাদেশের মতো অনিয়ন্ত্রিত ও বিশৃঙ্খল পরিবেশে ঝুঁকিটা কয়েকগুণ বেশি। এটা রোধে তার পরামর্শ মোটরসাইকেল নিবন্ধন নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। সেইসঙ্গে এত এত মোটরসাইকেল আরোহীদের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা ও গণপরিবহনের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মোটরসাইকেলের চালক কিংবা আরোহীদের সুরক্ষা নেই। ফলে দুর্ঘটনায় এই যানের আরোহীদের বেশির ভাগেরই মৃত্যু হয়। আহত ব্যক্তিদের জীবনভর পঙ্গু কিংবা বিকলাঙ্গ হয়ে কাটাতে হয়। তারা মোটরসাইকেলের এত দুর্ঘটনার কারণ হিসেবে বলছেন, কড়া ব্রেক, অজানা এবং অপ্রত্যাাশিত ভাঙা রাস্তা, ওভার কনফিডেন্স, মোবাইল ফোনে কথা বলা, গান শোনা, ওভার স্পিড, ওভার টেকিংয়ের প্রবণতা এর অন্যতম কারণ।
সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ গতি। বিআরটিএ এজন্য মোটরযান গতিসীমা নির্দেশিকা, ২০২৪ জারি করে গাড়ির গতিসীমা নির্ধারণ করে দেয়।
সেখানে জাতীয় মহাসড়কে মোটরসাইকেলের জন্য ঘণ্টায় ৫০ কিলোমিটর, এক্সপ্রেসওয়েতে ৬০ কিলোমিটার, জেলাসড়ক, গ্রামীন রাস্তায়, উপজেলা মহাসড়ক ৩০ কিলোমিটার আর সংকীর্ণ রাস্তায় ২০ কিলোমিটার গতির নির্দেশ করা হয়েছে।
স্ট্যান্ডার্ড হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ সম্পর্কিত গাইডলাইনে সরকার বলেছে, স্ট্যান্ডার্ড হেলমেট ব্যবহার নিশ্চিত করতে হলে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণমূলক কার্যক্রম, নিয়ম-নীতি, সহজপ্রাপ্যতা, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং হেলমেটের মান ও ব্যবহারের স্বাচ্ছ্যন্দের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে। হেলমেট ব্যবহারকে সেফটি স্ট্যান্ডার্ডের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার জন্য সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। সেখানে হেলমেট পরার সঠিক নিয়ম, যথাযথ ফিটিং ও সামঞ্জস্যতার ব্যাপারে জনসাধারণকে প্রশিক্ষণ প্রদানের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
হেলমেটের মান ও সার্টিফিকেশন নিয়েও কথা বলা হয়েছে সেখানে। সরকার বলছে, হেলমেটের নিরাপত্তা মান নিশ্চিত করতে হবে, হেলমেটগুলোকে স্বীকৃত স্ট্যান্ডার্ড অনুসারে প্রস্তুত করতে হবে।

সেইসঙ্গে স্ট্যান্ডার্ড হেলমেটের সঠিক মাপ নির্ধারণ করতে সকলকে উৎসাহিত করা উচিত, যেন এটি নিরাপদভাবে মাথায় ফিট হয়। অনুপযুক্ত মাপের হেলমেট ব্যবহার অস্বস্তিকর এবং আঘাত প্রতিরোধে কম কার্যকর হয়।
সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) হেলথ সিস্টেম রিসার্চ ডিভিশনের পরিচালক সেলিম মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা রোধে হেলমেট বাধ্যতামূলক করতে হবে।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিয়মিত এটা মনিটর করা উচিত মন্তব্য করে তিনি বলেন,স্ট্যান্ডার্ড হেলমেট সঠিকভাবে আমদানি ও ক্রয়-বিক্রয় হচ্ছে কিনা, চালকরা সঠিকভাবে পরছেন কি না, তা সড়ক মহাসড়ক বিশেষ করে দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় কঠোর নজরদারি করা দরকার। এ আইন লঙ্ঘনে নির্ধারিত জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থাও শতভাগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
প্রায় ১৫ বছর ধরে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে মোটরসাইকেল নিয়মিত চালান নাট্যকার ও সাংবাদিক অপূর্ণ রুবেল। তিনি দীর্ঘ ১০ বছর ধরে হর্ন না বাজিয়ে চলছেন রাজধানীতে।
মোটরাসাইকেলের হর্নের যন্ত্রণায় যেখানে কান ঝালাপালা হয়, সেখানে হর্ন কেন বাজান না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “হর্ন বাজিয়ে আসলে কোনও লাভ হয় না, যে যার মতো করে গাড়ি চালাচ্ছে। আর হর্ন যেহেতু নিজে বাজাই না, তাই ভেতর থেকে আমি সাবধান থাকি, যেন কোনও দুর্ঘটনা না ঘটে।”
এখনও পর্যন্ত কোনও দুর্ঘটনায় না পড়া অপূর্ণ রুবেল বলেন, মোটরসাইকেল দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ ওভার স্পিড। যে রাস্তায় যতটুকু স্পিড থাকে, তারচাইতে কয়েকগুণ বেশি স্পিডে তরুণরা মোটরসাইকেল চালান। তারা মনে করেন এতে একটা ’হিরোইজম’ আছে। কিন্তু বাইকের গতি বাড়াতে গিয়ে তারা আসলে জীবনের গতিটাই থামিয়ে দেয়। আর তাতে করেই একটা তরুণ জীবনের করুণ পরিণতি হয়।
তবে মোটরসাইকেলে ওভারস্পিডের জন্য নাটক-সিনেমাও অনেকাংশে দায়ী বলে মনে করেন বুয়েটের শিক্ষার্থী মিনহাজ রহমান।
তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আপনি হিন্দি মুভি ধুম সিনেমার কথা মনে করে দেখেন, সেসময় শহর অথবা গ্রাম-সব জায়গায় ধুম স্টাইলে ধুলা উড়িয়ে মোটরসাইকেল চালাতো। আবার অনেকেই ওভারস্পিডে মোটরসাইকেল চালানোর সময় রোমান্টিসিজমে ভোগেন। কিন্তু নাটক সিনেমাতে মতো যে জীবনটা ‘স্ক্রিপ্টেড’ নয় এ বিষয়টা যত দ্রুত তরুণরা বুঝবেন ততই সবার জন্য মঙ্গল।”



