Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

সড়কে দুর্ঘটনার মিছিল থামবে কীভাবে

সড়ক দুর্ঘটনা
বরিশালের গৌরনদীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে বাস পুকুরে। ফাইল ছবি।
[publishpress_authors_box]

২০১৮ সাল, ঢাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর পর নিরাপদ সড়কের দাবিতে ফুঁসে ওঠে গোটা দেশ। স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সে দাবির সঙ্গে একাত্ম হয়ে অভিভাবকরাও তাদের ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল রাস্তায়।

দাবি ছিল নিরাপদ হতে হবে সড়ক, থামাতে হবে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু। ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত চলা এই আন্দোলনের কারণে সে বছরেরই ২০ সেপ্টেম্বর নতুন সড়ক পরিবহন আইন পাস করে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার।

কিন্তু পরের বছরে নভেম্বরে আইনটি কার্যকর করতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয় সরকারকে; বাধা হয়ে দাঁড়ায় পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। তারা ধর্মঘট করে এর বিরুদ্ধে। তখন আইনের কিছু ধারা প্রয়োগ না করার সিদ্ধান্ত হয়, আইন সংশোধনের আশ্বাসের প্রক্ষিতে মালিক-শ্রমিকদের আন্দোলন বন্ধ হয়।

কিন্তু এত আন্দোলনের পর সে আইন পাস হয়, সেটিও আসলে সড়ক পরিবহনকেন্দ্রিক। এই আইনে সড়ক নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো যুক্ত হয়নি। বিশেষজ্ঞরা বলছে, প্রয়োজন সড়ক নিরাপত্তা আইন এবং এর বাস্তবায়ন।

বিভিন্ন গবেষণা থেকে জানা যায়, দেশে ২০১০ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির হার কম থাকলেও এরপর থেকে নিহতদের সংখ্যা ফের বাড়তে শুরু করে।

বিআরটিএ জানাচ্ছে, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাস অর্থাৎ জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ৩ হাজার ৩৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে অন্তত ২ হাজার ৯৪৩ জন। গত বছরে ৫ হাজার ৮৫৬টি দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছিল ৫ হাজার ৪৮০ জনের। ২০২০ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ৩৪ হাজার ৮৯৪টি সড়ক দুর্ঘটনায় মোট ৩৭ হাজার ৩৮২ জন নিহত এবং ৫৯ হাজার ৫৯৭ জন আহত হয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) হিসাবে, বাংলাদেশে বছরে ৩১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয় দুর্ঘটনায়। তবে এ সংখ্যাকে অতিরঞ্জিত বলেছে বিআরটিএ।

এদিকে, গত বছর সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ৮ হাজার ৫৪৩ জন বলে জানিয়েছে  যাত্রী কল্যাণ সমিতি। চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি যাত্রী কল্যাণ সমিতি জানায়,সড়ক দুর্ঘটনায় ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। গত বছর ৬ হাজার ৩৫৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৮ হাজার ৫৪৩ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ১২ হাজার ৬০৮ জন।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের তুলনায় ২০২৪ সালে সড়কে দুর্ঘটনা বেড়েছে ১ দশমিক ৫৪ শতাংশ, মৃত্যু বেড়েছে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ, আর আহতের সংখ্যা বেড়েছে ১৭ দশমিক ৭৩ শতাংশ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাবে, বাংলাদেশে মারা যান ২৫ হাজারের কাছাকাছি। আর সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, সড়কে প্রতিদিন ৬৪ জন মানুষের প্রাণহানি ঘটছে। সে হিসাবে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় ২৩ হাজার ৩৬০ জন মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনার সব খবরই পুলিশে রিপোর্ট করা হয় না। যার কারণে সরকারি এবং বেসরকারি হিসেবে সংখ্যা ভিন্ন।  

নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে ঢাকার উত্তরায় রাস্তা অবরোধ। ফাইল ছবি

যা বলছেন সড়ক আন্দোলনকারীরা

সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে কাজ করে যাত্রী কল্যাণ সমিতি। সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী বর্তমান আইনটি নিয়ে হতাশার কথা জানালেন।

“২০১৮ সালে দেশজুড়ে এত বড় আন্দোলন হওয়ার পরেও যে আইন হলো তাতে করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি, মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষার কোনও প্রতিফলন নতুন আইনে নেই। নতুন আইন জনবান্ধব নয়, বরং যানবাহন বান্ধব, শ্রমিক- মালিকবান্ধব।”

পুরনো এবং নতুন আইনের কোনও দৃশ্যমান পার্থক্য না দেখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এই আইনের মধ্যদিয়ে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়নি। আর এর অন্যতম কারণ আইন প্রণয়নের সঙ্গে মালিক- শ্রমিকরা যুক্ত ছিল। যার কারণে নতুন আইনে জনস্বার্থের প্রাধান্য দেখা যাচ্ছে না।

এটা একটা একপেশে আইন হয়েছে মন্তব্য করে মোজাম্মেল বলেন, “২০১৮ সালে সড়ক আন্দোলনের পর সরকার বলেছিল, শিক্ষার্থীরা আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে, তারা দেখিয়েছে কী করে সড়কে শৃঙ্খলা আনা যায়, আমরা আইন করে নতুন আইন প্রয়োগ করব। কিন্তু সেই আন্দোলনের পর নতুন আইন হয়েছে ঠিকই, অথচ সাত বছর পার হয়ে গেলেও আমরা দেখতে পাচ্ছি কিছুই হয়নি।”

আর এসব কারণেই নতুন আইনের ‘অডিট’ হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব।

তিনি বলেন, নতুন আইনের দুর্বলতা কোথায়, সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে কী কী করা দরকার, তা নিয়ে সরকারের কাজ করার দরকার। নতুন আইনের দুর্বলতা চিহ্নিত করে এর সমাধান ও সুরাহা হওয়া প্রয়োজন।

নিজের স্ত্রীকে সড়ক দুর্ঘটনায় হারিয়েছিলেন ইলিয়াস কাঞ্চন। সেই থেকে তিনি নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করে যাচ্ছেন তিনি।

ইলিয়াস কাঞ্চন বলেন, যে আইন রয়েছে সেটা সড়ক পরিবহন খাতের জন্য ভালো, কিন্তু সড়ক নিরাপত্তার বিষয়টি এখানে যথেষ্ট নয়।

গ্লোবাল হেলথ অ্যাডভোকেসি ইনকিউবেটরের কান্ট্রি কো-অর্ডিনেটর ড. শরিফুল আলম বলেছেন, বর্তমানে সড়ক নিরাপত্তা আইনটি পরিবহনকেন্দ্রিক হওয়ার কারণে আইনে সড়ক নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিষয়গুলো একেবারেই অনুপস্থিত। তাই প্রয়োজন একটি সড়ক নিরাপত্তা আইন ও এর বাস্তবায়ন।

তিনি বলেন, পাঁচটি পিলার তথা বহুমুখী যানবাহন ও ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, নিরাপদ যানবাহন, নিরাপদ সড়ক অবকাঠামো, নিরাপদ সড়ক ব্যবহার ও রোডক্র্যাশ পরবর্তী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিতকরণের ওপর গুরুত্বারোপ করতে হবে।

বর্তমানে যানবাহনের অবস্থা

বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে কয়েক লাখ পুরনো ও অনুপযুক্ত যানবাহন রয়েছে, লাইসেন্সবিহীন চালকও সড়কে যথাযথ আইনের অকার্যকরতার কারণ। এসব অনিবন্ধিত, পুরনো লক্করঝক্কর যানবাহনের কারণে সড়কে দুর্ঘটনা ও মৃত্যু বাড়ছে। বাড়ছে আহতের সংখ্যাও।

অধ্যাপক ড. এম শামসুল হক বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক এবং একজন পরিবহন বিশেষজ্ঞ।

তিনি বলেন, দুর্ঘটনা ঘটছেই দেশে। অথচ রমিজউদ্দিনের ( ২০১৮ সালে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী নিহত হয়) ঘটনার পর উচিৎ ছিল আইনের সঠিক প্রয়োগ হওয়া, সড়ক দুর্ঘটনা কেন ঘটছে, সেই কারণ খুঁজে বের করে তার সমাধান করা।

কিন্তু বিআরটিএ একটি অকার্যকর ও অপেশাদারি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্য, যে কেউ আবেদন করলেই সেখান থেকে নতুন যানবাহনের অনুমতি পেয়ে যাচ্ছে। অথচ কথা ছিল কোনও রুটে ‘মাল্টিপল অপারেটর’ চলবে না, যেমনটা হচ্ছে হাতিরঝিল এবং গুলশানে।

“অবৈধ গাড়ির বিষয়টি দেখার কথা বিআরটিএর। কিন্তু তারা রুট পারমিট দিয়ে দিচ্ছে। যার কারণে আইন যেটা রয়েছে, তার বাস্তবায়ন হয়নি। মনে রাখা দরকার, ‘রাইট অ্যান্ড রেসপনসিবিলিটি’ আইন করে হয় না, এরজন্য সদিচ্ছা এবং পরিকল্পনা দরকার। যেটা দেশে হয়নি এবং এত বড় আন্দোলনের পরেও সেটা হচ্ছে না,” বলেন অধ্যাপক শামসুল হক।

তিনি আরও বলেন, মোটরসাইকেল এবং তিন চাকার সংখ্যা বৃদ্ধি যোগ হয়েছে দেশের বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সঙ্গে। তাতে রাস্তাগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়েছে৷

তবে গত ২৬ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে ঢাকার যানজটের একটি বড় কারণ হিসাবে অকার্যকর রুটে বাস চলাচলকে চিহ্নিত করা হয়।

সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের সংখ্যা কমিয়ে আনতে একটি উপযোগী সড়ক নিরাপত্তা আইন বাস্তবায়ন জরুরি বলে মনে করেন সেন্টার ফর ইনজুরি প্রিভেনশন অ্যান্ড রিসার্চ, বাংলাদেশ (সিআইপিআরবি) হেলথ সিস্টেম রিসার্চ ডিভিশনের পরিচালক সেলিম মাহমুদ চৌধুরী।

তিনি বলেন, “দরকার একটা শক্তিশালী নীতি ও আইনি কাঠামো। বিদ্যমান পরিবহনকেন্দ্রিক আইন সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনায় তেমন কোনও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারছে না, যার কারণে সড়ক নিরাপত্তা ব্যবস্থার তেমন কোনও উন্নতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found