আধুনিক সময়ে সফল ট্রেন ছিনতাইয়ের শেষ উদাহরণ ছিল ১৯৭৭ সালে নেদারল্যান্ডসে। ওই ঘটনার ৪৮ বছর পর ফের আরেকটি ট্রেন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটল, তা হলো পাকিস্তানে।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশটির বেলুচিস্তান প্রদেশে মঙ্গলবার জাফর এক্সপ্রেস নামে একটি যাত্রীবাহী ট্রেন ছিনতাই করা হয়। ট্রেনের চালক আহত হন এবং শতাধিক যাত্রীকে জিম্মি করা হয়।
ট্রেনটি ৪০০ যাত্রী নিয়ে কোয়েটা থেকে পেশোয়ার যাচ্ছিল। পথে গুড়ালার ও পিরু কুন্দি পাহাড়ি এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় একদল সশস্ত্র লোকজন ট্রেনটিকে একটি টানেলের ভেতর আটকে ফেলে।
কয়েক ঘণ্টা পর নিরাপত্তা বাহিনী ১০৪ জন যাত্রীকে উদ্ধার করে এবং সশস্ত্র দলের ১৬ জনকে হত্যা করে।
তবে বিএলএ দাবি করেছে, তারা ২০ জন সেনাকে হত্যা ও একটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে। তবে পাকিস্তান কর্তৃপক্ষ এই তথ্যটি নিশ্চিত করেনি।

বেলুচিস্তান লিবারেশন আর্মি (বিএলএ) বা বেলুচ লিবারেশন আর্মি পরবর্তীকালে এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করে।
এক বিবৃতিতে বিএলএ মুখপাত্র জিয়ান্দ বেলুচ জানান, পাকিস্তান সরকার তাদের সহযোদ্ধাদের মুক্তি দিলে তারা ট্রেনের সব যাত্রীদের মুক্তি দিতে প্রস্তুত। পাশাপাশি যাত্রীদের উদ্ধারের কোনও চেষ্টা হলে জিম্মিদের হত্যা করা হবে, এমন হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ট্রেন থেকে ১৮২ জনকে জিম্মি করা হয়েছে। এদের মধ্যে পাকিস্তানি সেনা সদস্য এবং ছুটিতে থাকা অন্যান্য নিরাপত্তা কর্মকর্তা ছিলেন। আর সাধারণ যাত্রীদের, বিশেষ করে নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং বেলুচ নাগরিকদের নিরাপদে মুক্তি দেওয়া হয়েছে।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহসিন নকভি এই হামলার নিন্দা করে বলেছেন, সরকার ‘নিরপরাধ যাত্রীদের ওপর গুলি চালানো পশুদের’ কোনও ছাড় দেওয়া হবে না।
পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে বিএলএ’র প্রস্তাব নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে কোনও মন্তব্য করা হয়নি। তবে অতীতে সরকারের পক্ষ থেকে এমন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।
বেলুচ জাতীয়তাবাদ ও বেলুচ লিবারেশন আর্মি
বিএলএ এর আদর্শিক ভিত্তি মূলত বেলুচ জাতীয়তাবাদ আন্দোলনে নিহিত। এই আন্দোলন বেলুচ জনগণের জন্য অধিক স্বায়ত্তশাসন এবং অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। আন্দোলন ১৯৪০ এর দশকে শুরু হয়। ১৯৪৮ সালে পাকিস্তানের সঙ্গে বেলুচিস্তানের যুক্ত হওয়ার বিষয়টি তখন থেকেই বিতর্কিত ছিল।
সময়ের সঙ্গে স্বায়ত্তশাসনের দাবি বাড়তে থাকে এবং অনেক সময় এটি সহিংস বিদ্রোহে পরিণত হয়। বিএলএ ২০০০ সালের শুরুর দিকে একটি আলাদা বিদ্রোহী গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে স্বাধীন বেলুচ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে সংগ্রামের ঘোষণা দেয়। তাদের দাবি, বেলুচিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ শোষণ এবং ইসলামাবাদের রাজনৈতিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে তারা লড়াই করছে।
বিএলএর অভ্যন্তরীণ কাঠামো সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না তাদের গোপনীয়তার চর্চার কারণে। তবে সমর বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকদের মতে, এটি সেলভিত্তিক ব্যবস্থা অনুসরণ করে, যেখানে বিভিন্ন কমান্ডার বেলুচিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলে অপারেশন পরিচালনা করেন।

সময়ের সঙ্গে সংগঠনটি বিভক্ত হয়েছে, যেমন ইউনাইটেড বেলুচ আর্মি (ইউবিএ) ও বেলুচ রিপাবলিকান আর্মি (বিআরএ) গঠন হয়েছে। কখনও কখনও তারা বিস্তৃত জোট যেমন বেলুচ রাজি আজোই সঙ্গারের (বিআরএএস) অধীনে সমন্বয় করে।
বিএলএর সঙ্গে সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে ছিল কমান্ডার আসলাম বেলুচ। তিনি ২০১৮ সালে আফগানিস্তানে এক আত্মঘাতী হামলায় নিহত হন। সংগঠনের নেতারা মূলত আফগানিস্তান ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশে অবস্থান করে দলের নেতৃত্ব দেয়।
বিএলএর চাওয়া
পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত, উত্তর দিকে আফগানিস্তান এবং পশ্চিমে ইরানের সীমানা নিয়ে বেলুচিস্তানের স্বাধীনতা চায় বিএলএ।
এটি একাধিক জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বড়। এরা কয়েক দশক ধরে কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে লড়াই করছে। কারণ তারা মনে করে সরকার বেলুচিস্তানের সমৃদ্ধ গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অবৈধভাবে শোষণ করছে।
তেল ও বিভিন্ন খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ বেলুচিস্তানের মানুষ পাকিস্তানের অন্য জনগণের তুলনায় মানবেতর জীবন যাপন করে। এই শোষণের জন্য বিএলএ দায়ী করছে পাকিস্তানের সরকারকে। এমনকি নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘন ও জোরপূর্বক গায়েব করার অভিযোগও উঠেছে।
মঙ্গলবারের বিবৃতিতে বিএলএ জানায়, “পাকিস্তানি সামরিক জেনারেলরা এবং তাদের পাঞ্জাবী এলিট এসব সম্পদ লুটছে নিজেদের বিলাসিতার জন্য। বেলুচিস্তানের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ বেলুচ জাতির।”
প্রদেশটিতে পাকিস্তানের কৌশলগত মিত্র চীনের অর্থায়নে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) শুরুর পর থেকে অশান্তি আরও বেড়েছে।
তাইতো মঙ্গলবারের বিবৃতিতে বিএলএ “যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের” শক্তিশালীভাবে সতর্ক করে দিয়েছে, যাতে তারা “বেলুচিস্তানের দখলকৃত সম্পদ শোষণে” অংশ না নেয়। অতীতে বিএলএ চীন-সমর্থিত অবকাঠামো প্রকল্প ও চীনা প্রকৌশলীকে আক্রমণ করেছে। এর ফলে পাকিস্তান এসব স্থাপনায় নিরাপত্তা বৃদ্ধি করেছে।

সংঘাতের চিত্র ও সক্ষমতা
২০২২ সালে বিএলএ পাকিস্তানের সেনা ও নৌ ঘাঁটিতে হামলা করে দেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে চমকে দেয়। হামলায় তারা নারী আত্মঘাতী বোমারু ব্যবহারও করে। করাচির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে চীনা নাগরিকদের ওপর হামরা ও দক্ষিণ-পশ্চিম বেলুচিস্তানে বিস্ফোরণের মতো ঘটনাও আছে।
বেলুচ জনগণের কয়েকটি জাতিগত গোষ্ঠীর একটি সম্মিলিত গ্রুপ গত সপ্তাহে ঘোষণা করেছে, তারা সব গোষ্ঠীকে একত্রিত করতে একটি ঐক্যবদ্ধ সামরিক কাঠামোর অধীনে সংগ্রাম শুরু করেছে।
জাতিগত গোষ্ঠীর সম্মিলিত গ্রুপের আহ্বান যে কাজে লেগেছে তার প্রমাণ জাফর এক্সপ্রেসে হামলা। ট্রেনটিতে হামলায় বিএলএ গেরিলা যুদ্ধের কৌশল নেয়। এসময় তারা আইইডি (বিস্ফোরক) ও হিট-এন্ড-রান হামলা কৌশল ব্যবহার করে, যা অতীতে দেখা যায়নি।
একটি চলন্ত ট্রেন দখল করতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় প্রয়োজন: সময়ের সঠিক হিসাব, রেলপথের নেটওয়ার্কের সম্পূর্ণ তথ্য এবং নিখুঁত লজিস্টিক সমন্বয়।
গত ২৫ বছরের বিদ্রোহী কার্যক্রমে বিএলএ এমন জটিল কমান্ড, নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বা প্রযুক্তিগত দক্ষতা দেখাতে পারেনি।
অনেকেই ধারণা করছেন, ট্রেন ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা ঘটাতে বিএলএকে বাইরে থেকে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে এটি সম্ভবত এমন কোনো রাষ্ট্র সহায়তা করেছে, যার উন্নত মিশন পরিকল্পনা, অনুসন্ধান ও বাস্তবায়নের ক্ষমতা আছে।
একটি ট্রেনের সঠিক অবস্থান, গতি ও দুর্বলতা চিহ্নিত করা — বিশেষ করে যখন তা সবচেয়ে কাছের সড়ক থেকে ২৫ মাইল দূরে এবং একটি সুড়ঙ্গে থাকে — তাৎক্ষণিক গোয়েন্দা তথ্যের প্রয়োজন। এসব বিএলএর পরিচিত পরিসরের বাইরে।

বেলুচিস্তানের গুরুত্ব
বেলুচিস্তান চীনের ৬৫ বিলিয়ন ডলারের চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর (সিপিইসি) প্রকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের একটি শাখা হলো সিপিইসি।
এই অঞ্চলটিতে গুরুত্বপূর্ণ খনিজ প্রকল্পগুলি অবস্থিত, যেমন রেকো দিক (পরিচালনা করে খনিজ কোম্পানি ব্যারিক গোল্ড) এবং এখানে বিশ্বের বৃহত্তম সোনা ও তামার খনি রয়েছে। চীনও এখানে একটি সোনার ও তামার খনি পরিচালনা করছে।
দশকব্যাপী বিদ্রোহের কারণে প্রায় দেড় কোটি মানুষের আবাসস্থর প্রদেশটি অস্থিতিশীল রয়ে গেছে এবং পাকিস্তানের অপ্রচলিত সম্পদগুলোতে প্রবেশের পরিকল্পনার জন্য নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি করেছে।
এটি পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় প্রদেশ এলাকা অনুযায়ী। কিন্তু জনসংখ্যা অনুযায়ী সবচেয়ে ছোট। বেলুচিস্তানের দীর্ঘ আরব সাগরের উপকূলরেখা রয়েছে, যা হরমুজ প্রণালীর তেল শিপিং পথ থেকে খুব দূরে নয়।
ভারত ও আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে বেলুচ বিদ্রোহীদের সমর্থন করার অভিযোগ অনেকদিন ধরেই করে আসছে ইসলামাবাদ। যদিও দেশ দুইটি এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
তথ্যসূত্র : দ্য গার্ডিয়ান, জিও টিভি, মিন্ট, এনডিটিভি



