Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

রোগীর গোপনীয়তা ফাঁস অনৈতিক ও শাস্তিযোগ্য অপরাধ, নেই নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ

Dhaka medical college
[publishpress_authors_box]

২৪ মার্চ সকাল। সাভারের বিকেএসপিতে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের (ডিপিএল) অষ্টম রাউন্ডের ম্যাচ ছিল শাইনপুকুর আর মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের। ম্যাচের ঠিক আগে আগে টসেও অংশ নেন মোহামেডানের অধিনায়ক ও জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক ক্রিকেটার তামিম ইকবাল।

তখনই হার্ট অ্যাটাকের শিকার হন এই ওপেনার। দ্রুত তাকে বিকেএসপির কাছে কেপিজে স্পেশালাইজড হাসপাতালে পাঠানো হয়। পরিস্থিতি এতটাই নাজুক হয়ে পড়ে যে তাকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় আনারও অবস্থা ছিল না। নিতে হয় লাইফ সাপোর্টে। পরে এনজিওগ্রাম করে হার্টে ব্লক পাওয়ায় দ্রুত রিং পরানো হয় তামিমকে।

ধীরে ধীরে আবার সুস্থ হয়ে ওঠেন তামিম। তার সুস্থতার খবর স্বস্তি এনে দেয় ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে।

দ্রুতই তা ছড়িয়ে পড়ে সোশাল মিডিয়ায়, ঠিক যেভাবে তার অসুস্থ হওয়ার খবর ছড়িয়েছিল। সঙ্গে ছড়িয়েছিল হাসপাতালের ভেতরের একটি ছবি ও ভিডিও। ভিডিওতে দেখা যায় চিকিৎসক, নার্সরা দ্রুত হাতে কাজ করছেন অচেনতন তামিমকে নিয়ে।

এমনকি তামিমের জন্য দোয়া চেয়েও অনেককে এই ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করতে দেখা যায়। যদিও বিষয়টি একজন রোগীর কনফিডেনশিয়ালিটির (গোপনীয়তা) সম্পূর্ণ বিপরীত।

এবার আসা যাক মাগুরায় ধর্ষণের শিকার ওই ৮ বছর বয়সী শিশুটির প্রসঙ্গে। বোনের শ্বশুড় বাড়ি গিয়ে ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকে প্রথমে স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য স্থানান্তর করা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজের আইসিইউতে। এরপরে সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় প্রাণ হারায় শিশুটি।

তখনই একটি ছবি ঘুরে বেড়াতে দেখা যায় সোশাল মিডিয়ায়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে একটি রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা দল বেধে শিশুটিকে দেখতে গিয়েছেন।

ধর্ষণের শিকার শিশুটির মৃত্যুর পর বিক্ষোভ দেখা দেয় সারাদেশে।
ধর্ষণের শিকার শিশুটির মৃত্যুর পর বিক্ষোভ দেখা দেয় সারাদেশে।

সংকটাপন্ন এক শিশুকে এভাবে আইসিইউয়ের ভেতরে দেখতে যাওয়া কতটা যৌক্তিক, এমন প্রশ্নে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আইসিইউর এক কনসালটেন্ট সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “তখন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা শিশুটিকে দেখতে আসছিল। তাদেরকে ‘ট্যাকল’ করার ক্ষমতা আমাদের ছিল না। এসব নিয়ে কিছু অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে।”

চিত্রটি গত কয়েক বছরের। হাসপাতালের আইসিইউ, সিসিইউতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের দল বেঁধে গিয়ে ছবি তোলা, রোগীদের ব্যবস্থাপত্রের ছবি তোলা এবং সর্বশেষ তামিম ইকবালের ছবি এবং ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় প্রশ্ন উঠছে রোগীর গোপনীয়তা নিয়ে।

চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটা গর্হিত অপরাধ, নিয়ম বহির্ভূত এবং ব্যক্তিগত তথ্যের লঙ্ঘন। কিন্তু হাসপাতালসহ সংশ্লিষ্ট কেউ এ বিষয়ে সচেতন নয়। সাধারণ মানুষও বিষয়টি বোঝে না। সেইসঙ্গে বাংলাদেশে রয়েছে রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন ধরনের চাপ। যার কারণে এ ধরনের অপরাধে কোনও শাস্তিতো দূরে থাক, এসব নিয়ন্ত্রণে কোনও উদ্যোগও নেওয়া হয়নি।

উন্নত বিশ্বে রোগীদের গোপনীয়তা রক্ষায় আইন থাকলেও বাংলাদেশে তা নেই। তবে এ ধরনের সমস্যায় অভিযোগ করা যায় বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলে (বিএমডিসি)। কিন্তু দেশের মানুষ এ নিয়ে যেমন জানে না তেমনি সচেতনও নয়। তাই এ অপরাধে কোনও সাজার নজিরও নেই।

২০২৩ সালের ৯ জুন কুমিল্লার তিতাস উপজেলার অন্তঃসত্ত্বা মাহবুবা রহমান রাজধানীর সেন্ট্রাল হাসপাতালে ভর্তি হন স্বাভাবিক প্রসবের ইচ্ছা নিয়ে। তিনি ভর্তি হয়েছিলেন প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সংযুক্তা সাহার অধীনে। কিন্তু মাহবুবা যখন হাসপাতালে ভর্তি হন, তখন তিনি দেশে ছিলেন না। সে তথ্য ভর্তির সময় মাহবুবাকে জানানো হয়নি। অন্য একজন চিকিৎসক স্বাভাবিক প্রসব করাতে ব্যর্থ হয়ে অস্ত্রোপচার করেন। ১১ জুন নবজাতকের মৃত্যু হয় আর মাহবুবার মৃত্যু হয় ১৮ জুন।

পরবর্তীতে মাহবুবার স্বামী গণমাধ্যমকে জানান, সোশাল মিডিয়ায় সংযুক্তা সাহার স্বাভাবিক প্রসব নিয়ে দেওয়া পোস্ট দেখেই তারা এই চিকিৎসকের কাছে আসেন।

অস্ত্রোপচার নয়, স্বাভাবিক প্রসব উদ্বুদ্ধ করায় ফেইসবুকে সংযুক্তা সাহার অনুসারীর সংখ্যা ছিল পাঁচ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি। সেসময় তিনি নিয়মিত স্বাভাবিক গর্ভধারণ নিয়ে ভিডিও আপলোড করতেন, লাইভে আসতেন।

এমনকি কারও সন্তান প্রসবের পর সেই শিশুকে নিয়ে বের হয়েও লাইভ করেছেন। লাইভে দেখাতেন সেসব নারীদেরও।

অথচ বিএমডিসি কোড অব প্রফেশনাল কন্ডাক্টে (এটিকেট অ্যান্ড ইথিকস) ‘প্র্যাকটিস প্রমোশন’ অংশে বলা হয়েছে, কোনও চিকিৎসক তার পেশার প্রসারের জন্য প্রচারমূলক কার্যক্রম চালাতে পারবেন না।

বিএমডিসির কোড অব মেডিকেল ইথিকসে স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের বলতে হয়, “আমি রোগীদের স্বাতন্ত্র্য এবং মর্যাদার সম্মান রক্ষা করব এবং রোগীর মৃত্যু হলেও তার গোপন তথ্য কোনোভাবে প্রকাশ করব না।”

বলা প্রয়োজন, বিএমডিসির লাইসেন্স নিয়েই দেশে একজন চিকিৎসক প্র্যাকটিস করতে পারেন। নৈতিকতা বা ইথিকসের প্রশ্নে কোনও চিকিৎসকের লাইসেন্স বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে একমাত্র তাদের হাতে।

এই নৈতিকতা নিয়েই কথা হয় চিকিৎসক নেতা অধ্যাপক ইকবাল আর্সলানের সঙ্গে। সকাল সন্ধ্যাকে তিনি বলেন, “আমাদের দেশে বড় সমস্যা নৈতিকতা।

“রোগীর কোনও তথ্য, হাসপাতালে থাকাকালীন ছবি, ভিডিও কোনোভাবেই বাইরে আসার কোনও সুযোগ নেই। এটা আনইথিকাল এবং অনেক বড় অপরাধ। গোপনীয়তা একজন রোগীর অধিকার। একমাত্র দেশের আদালত ছাড়া আর কোথাও রোগীর কোনও তথ্য দেওয়ার এখতিয়ার কারও নেই।”

চিকিৎসক হিসেবে যখন কেউ শপথ নেন তখনই তিনি এগুলো জেনে নেন। তারপরও তার ব্যত্যয় হয় বলে জানান ইকবাল আর্সলান।

তিনি বলেন, “এমনকি চিকিৎসকের শপথে রয়েছে কোনও স্বামীর মেডিকেল হিস্ট্রি তার অনুমতি ছাড়া স্ত্রীকে এবং স্বামীকে অনুমতি ছাড়া স্ত্রীর চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনও কিছু দেওয়া যাবে না।”

কিন্তু এদেশে এসব মানা সম্ভব হয় না জানিয়ে তিনি বলেন, “রাজনৈতিক বিভিন্ন চাপেও থাকতে হয় চিকিৎসকদের। এনিয়ে দেশে কোনও আইন নেই, নেই সচেতনতাও। তাই এটা যে অপরাধ সেটা মানুষ জানেই না।”

তবে কেউ চাইলে বিএমডিসিতে অভিযোগ করতে পারে জানিয়ে অধ্যাপক ইকবাল আর্সলান বলেন, “সেখানে নিশ্চয়ই এটা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।”

বিএমডিসির শৃঙ্খলা কমিটির সাবেক চেয়ারম্যান ও আরেক চিকিৎসক নেতা অধ্যাপক এহতেশামুল হক চৌধুরীও একে ‘অনৈতিক’ এবং ‘অপরাধ’ হিসেবেই উল্লেখ করেন। তার মতে, “এটা আনইথিকাল এবং ফৌজদারী অপরাধ।”

এই অপরাধ শাস্তিযোগ্য, তবে মানুষ জানে না বলেই প্রায় ৫০ বছরের বিএমডিসিতে এ ধরনের অভিযোগ নিয়ে কেউ আসেনি। তিনি বলেন, “রোগীর সম্মতি ছাড়া তার ছবি তোলা, ভিডিও করা, কোনও তথ্য কাউকে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।

“পুরোপুরি ব্যক্তিগত তথ্য আমি ছড়িয়ে দিচ্ছি, এটা হয় নাকি। এটা হয় না। শুধুমাত্র যদি কেউ লিখিত অনুমতি দেয়, তবে হতে পারে।”

ফেইসবুক খুললেই ডাক্তার তার রোগীর ছবি দিচ্ছে, কীভাবে চিকিৎসা হয়েছে, চিকিৎসার পরে কতটা উন্নতি হয়েছে, সেগুলো দেখা যায়। এর অবসান হওয়া উচিত বলে মনে করেন এই চিকিৎসক নেতা।

ইহতেশামুল হক চৌধুরী বলেন, “নিজের প্রসারের জন্য আপনি কাউকে গিনিপিগ বানাতে পারেন না, আপনার শপথ সে অনুমতি আপনাকে দেয়নি।”

সংযুক্তা সাহার ঘটনার পর স্বপ্রণোদিত হয়ে ফেইসবুকে তার ভিডিও, লাইভের বিষয়টি আমলে নিয়েছিল বিএমডিসি।

বিএমডিসি সূত্রে জানা যায়, তারা সংযুক্তা সাহাকে ডেকেছিল, তদন্ত করেছিল, তার শাস্তির সুপারিশও করা হয়েছিল। চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার আগে বিএমডিসির এক্সিকিউটিভ কমিটি হাসপাতালেও যায় সরেজমিন তদন্তে। কিন্তু তারা রায় দিতে পারেনি, রায়ের বাস্তবায়নও হয়নি।

রোগীর ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণের কথা জানালেন জাতীয় স্বাস্থ্য আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক রশিদ ই- মাহবুব।

সকাল সন্ধ্যাকে তিনি বলেন, “রোগীর কোনও ব্যক্তিগত তথ্য চিকিৎসক, হাসপাতালতো নয়ই, গণমাধ্যমও প্রকাশ করতে পারে না। সেই অধিকার কারও নেই। যদি না রোগী অনুমতি দেয়। কিন্তু আমাদের দেশে এসব কেউ দেখেও না, আমলেও নেয় না।”

উন্নত দেশে হলে ডাক্তারের সনদ বাতিল হয়ে যেত বলে জানান অধ্যাপক রশিদ।

আন্তর্জাতিক রীতি কী বলছে

নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষায় জেনারেল ডেটা প্রোটেকশন রেগুলেশন বা জিডিপিআর আইন রয়েছে ইউরোপে। এ আইনে মানুষের গোপনীয়তা রক্ষাকে মৌলিক অধিকার হিসেবে বলা হয়েছে। ইউরোপের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোকে এই আইন মেনে চলতে হয়। কেবলমাত্র আইনি প্রয়োজন ছাড়া তারা কোনও তথ্য কাউকে দিতে পারে না।

২০২০ সাল থেকে জার্মানিতে রয়েছে পেশেন্ট ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট বা পিডিপিএ। এই আইনে বলা আছে, স্বাস্থ্য সম্পর্কিত নিজের সব তথ্য কেবলমাত্র রোগীর কাছে থাকবে। রোগী চাইলে তার চিকিৎসাতথ্য গবেষণার কাজে ব্যবহারের জন্য দিতে পারবেন সাংকেতিক ভাষায়।

তবে রোগী সুরক্ষা বা রোগীর চিকিৎসা বিষয়ক সুরক্ষায় সবচেয়ে পুরনো আইন যুক্তরাষ্ট্রের হেলথ কেয়ার ইনস্যুরেন্স পোর্টাবিলিটি অ্যান্ড একাউন্টিবিলিটি অ্যাক্ট বা হিপা। এ আইনে রোগীদের যাবতীয় তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার অধিকার দেওয়া হয়েছে।

ইনস্যুরেন্স বা হাসপাতাল এসব তথ্যের প্রবেশাধিকার চাইলে রোগীর থেকে অনুমতি নিতে হবে।

থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষায় যে আইন হয়েছে, সেখানে চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যের গোপনীয়তা রক্ষার কথাও বলা হয়েছে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত