টানা ৩ দিন পর কোভিডে মৃত্যুহীন দিন দেখলো দেশ। যদিও ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাসে আক্রান্ত শনাক্ত হওয়া রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।
মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত করোনাভাইরাসে আক্রান্ত শনাক্ত হয়েছেন আরও ২১ জন। তাদের নিয়ে চলতি মাসে এখন পর্যন্ত মোট শনাক্ত হলেন ৪৭৩ জন আর দেশে এখন পর্যন্ত করোনাভাইরাসে মোট আক্রান্ত শনাক্ত হলেন ২০ লাখ ৫২ হাজার ১৮ জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় করোনার নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৪৪১টি, তাতে করে রোগী শনাক্তের হার ৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ। দেশে মোট রোগী শনাক্তের হার ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ।
অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় এ ভাইরাসে আক্রান্ত কারও মৃত্যু হয়নি। আগের হিসাব অনুযায়ী, এ পর্যন্ত দেশে করোনাতে আক্রান্ত হয়ে মোট মৃত্যু হলো ২৯ হাজার ৫১৮ জনের। আর চলতি বছরে মৃত্যু হলো ১৯ জনের।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআর,বি) জানিয়েছে, বাংলাদেশে অমিক্রনের দুটি নতুন সাব ভ্যারিয়েন্ট এক্সএফজি ও এক্সএফসির আবির্ভাব হয়েছে, যা সম্প্রতি কোভিড-১৯ সংক্রমণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কোভিড সংক্রমণ প্রতিরোধে জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় সবাইকে মাস্ক পরার অনুরোধসহ ১১ দফা নির্দেশনা দিয়েছে। সব হাসপাতালে করোনার জন্য শয্যা প্রস্তুতের নির্দেশও দিয়েছে। প্রয়োজনে আইইডিসিআর-এর হটলাইন নম্বরে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে (০১৪০১-১৯৬২৯৩)।
২০১৯ সালের ডিসেম্বরে চীনে প্রথম করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরু হয়। ২০২০ সালের ৮ মার্চ দেশে তিনজন রোগী শনাক্ত হওয়ার কথা জানায় আইইডিসিআর। ১০ দিন পর ১৮ মার্চে প্রথম মৃত্যুর কথাও জানায় প্রতিষ্ঠানটি।
ফ্লু ও কোভিড মিলে হচ্ছে ‘ফ্লুরোনা’
বর্তমানে সাধারণ ফ্লু ও কোভিড-১৯ একসঙ্গে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যাকে ‘ফ্লুরোনা’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে বলে জানান বাংলাদেশ মেডিক্যাল ইউনিভার্সিটির (বিএমইউ) ইন্টারনাল মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফজলে রাব্বী চৌধুরী।
মঙ্গলবার বিএমইউতে ‘কোভিড-১৯ ট্রেন্ড ২০২৫ ইন বাংলাদেশ: এভিডেন্স বেইসড ইনফরমেশন’ শীর্ষক এক গবেষণাপ্রবন্ধ উপস্থাপন করে তিনি একথা বলেন।
গবেষণা প্রবন্ধে বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশে কোভিড-১৯ রোগীরা মূলত ওমিক্রন ভেরিয়েন্টের অন্তর্গত জেএন.১ সাব-ভেরিয়েন্টের দুটি শাখা এক্সএফজি ও এক্সএফসি দ্বারা আক্রান্ত হচ্ছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এই ভেরিয়েন্টগুলোকে ‘ভেরিয়েন্ট অফ কনসার্ন’ না বলে ‘ভেরিয়েন্ট অফ মনিটরিং’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। অর্থাৎ, এদের বিষয়ে নজরদারি প্রয়োজন হলেও এখন পর্যন্ত এগুলোর কারণে ভয়াবহ জটিলতা দেখা যাচ্ছে না।
ডা. ফজলে রাব্বী চৌধুরী বলেন, বিশ্বের কিছু উন্নত দেশে ফাইজার ও বায়োনটেক কোম্পানি জেএন.১ ভেরিয়েন্ট প্রতিরোধী মডিফায়েড টিকা বাজারে এনেছে, যদিও এই টিকা বাংলাদেশে এখনো সহজলভ্য নয়। তবে যেসব ব্যক্তি আগেই অন্তত তিন ডোজ টিকা নিয়েছেন, তাদের দেহে এই নতুন ভেরিয়েন্টের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট মাত্রায় প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে। তাদের আক্রান্ত হলেও তীব্র রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা তুলনামূলক কম।
তিনি বলেন, বর্তমানে সাধারণ ফ্লু ও কোভিড-১৯ একসঙ্গে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যাকে ‘ফ্লুরোনা’ নামে অভিহিত করা হচ্ছে। এই মিলিত সংক্রমণ বিশেষ করে তাদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ, যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল। যেমন অতিরিক্ত স্থূল ব্যক্তি, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিসে আক্রান্ত রোগী, হাঁপানি বা ব্রঙ্কাইটিসে ভোগা মানুষ, ক্যান্সার রোগী, কিডনি জটিলতায় আক্রান্ত এবং যারা ডায়ালাইসিস বা ট্রান্সপ্লান্ট চিকিৎসাধীন অবস্থায় রয়েছেন।
তাই সতর্কতা হিসেবে তিনি এই সময়ে উচ্চঝুঁকির এসব মানুষদের জন্য জনসমাগম এড়িয়ে চলা, বাইরে গেলে সার্জিক্যাল মাস্ক পরিধান, হাঁচি-কাশির শিষ্টাচার মেনে চলা, বারবার সাবান পানি দিয়ে হাত ধোয়া, সুষম খাবার খাওয়া এবং প্রচুর পানি পান করা জরুরি বলে মনে করেন।
প্রবন্ধে আরও বলা হয়, বর্তমানে কোভিড-১৯ এর কারণে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই, তবে সচেতনতা ও সতর্কতা অবলম্বন জরুরি। ভাইরাসটি পরিবর্তনশীল প্রকৃতির হওয়ায় এটি পুরোপুরি নির্মূল না হলেও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার মাধ্যমে এর তীব্রতা এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।

