ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা প্রতিদিনই বাড়ছে, প্রাণও হারাচ্ছে কেউ কেউ। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে এইডিস মশাবাহিত আরেক রোগ চিকুনগুনিয়া। পাশাপাশি চোখ রাঙাচ্ছে করোনা। আর আবহাওয়া বদলের এই সময়ে ঘরে ঘরে মৌসুমি জ্বরও আছে। সব মিলে এই চার ভাইরাসে কাহিল অনেক মানুষ।
এই মৌসুমে ডেঙ্গু রোগী বাড়বে, তেমন আশঙ্কা ছিল আগে থেকেই। কিন্তু করোনা এবং চিকুনগুনিয়াও যে এভাবে মাথাচাড়া দেবে তা ধারণা ছিল না। জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, এখন এই চার ভাইরাস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে দেশজুড়ে। তাতে দেশের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। যদিও সরকার তা মানতে নারাজ। এমন পরিস্থিতিতে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা উচিত বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, এসব ভাইরাসে রোগী যত বাড়বে, মৃত্যুও বাড়বে। রোগী বাড়লে হাসপাতালে সংকুলান হবে না। আর যেখানে স্বাস্থ্য বিভাগের টালমাটাল অবস্থা, সিটি করপোরেশনের কার্যক্রমের বেহাল দশা সেখানে এর ভোগান্তি পুরোটাই পোহাতে হবে দেশের মানুষকে।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর মহাখালীর বেসরকারি ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রোগী দেখছিলেন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ মাহবুব ময়ূখ রিশাদ। গত ২৬ জুন থেকে রোগীদের ক্লাসিফিকেশন করছিলেন তিনি। কতজন ডেঙ্গু, কতজন করোনা এবং কতজনের চিকুনগুনিয়া রয়েছে।
সকাল সন্ধ্যাকে তিনি বলেন, “জ্বরের রোগী দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে গেছি। এক সন্ধ্যায় ১০ জন রোগী দেখলে সাতজনই চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত।”
এক্ষেত্রে কিছু জটিলতার কথাও তুলে ধরেন তিনি, তার মধ্যে প্রধান হচ্ছে সরকারিভাবে কোথাও চিকুনগুনিয়া পরীক্ষা হচ্ছে না। বেসরকারিতে মূল্য অনেক, যা সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টসাধ্য।
মাহবুব ময়ূখ রিশাদ বলেন, “সরকারি হাসপাতালের অনেক জায়গায় আরটিপিসিআর টেস্ট হচ্ছে না আর বেসরকারিতে খরচ অনেক বেশি। তাই মানুষকে পরীক্ষার কথাও বলতে পারছি না। যার কারণে এখন ক্লিনিক্যাল চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছি।”
একই কথা আরেক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ রাশেদুল হাসান কনকের। সকালে তিনি বসেন বেসরকারি গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে, বিকালে ব্যক্তিগত চেম্বারে রোগী দেখেন।
ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, করোনা এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা রোগী কেমন পাচ্ছেন প্রশ্নে তিনি এক বাক্যে বলেন, “প্রচুর প্রচুর এবং প্রচুর।”
ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, করোনা এবং ইনফ্লুয়েঞ্জা এর সবকটির লক্ষণ ও উপসর্গ প্রায় একই। কিন্তু চিকুনগুনিয়া হলে শরীরে মারাত্মক ব্যথা হয়। এই চারের সঙ্গে তিনি আরও যোগ করেন টাইফয়েড ও নিউমোনিয়ার নাম।
এক সন্ধ্যায় ব্যক্তিগত চেম্বারে ১০ থেকে ১২ জনের মধ্যে সাত থেকে আটজনই চিকুনগুনিয়ার রোগী পেয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, বাকীদের মধ্যে ডেঙ্গু, নিউমোনিয়া এবং টাইফয়েডের রোগী রয়েছে।
রাশেদুল হাসান আরেক ধরনের জ্বরের কথাও জানালেন। গ্ল্যান্ডুলার জ্বর; এটিও একটি ভাইরাল সংক্রমণ। সাধারণত চিকিৎসা ছাড়াই এ জ্বর ভালো হয়ে যায়, তবে কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকলে তা অবশ্যই জটিলতা তৈরি করবে। আবার ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া একসঙ্গে হচ্ছে- এমন রোগীও পাওয়া যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
অনেকের আবার নিউমোনিয়া হয়ে যাচ্ছে শুরুতে জ্বরকে পাত্তা না দেওয়ায়। এক্সরে ছাড়া সেটা বোঝাও যাচ্ছে না। তাই জ্বর হলে এক্সরে করার পরামর্শ এই চিকিৎসকের। তারও আগে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। নইলে কোথা থেকে কী হয়ে যাচ্ছে সেটা বোঝা মুশকিল।

ডেঙ্গু-করোনার ২৪ ঘণ্টা
মঙ্গলবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ৪২৫ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে আরও তিনজনের।
এ নিয়ে সরকারি হিসাবে চলতি বছরে মোট রোগী সংখ্যা দাঁড়ালো ১৩ হাজার ১৮৮ জনে আর মৃত্যু হলো ৫১ জনের।
চলতি বছরে মূলত জুনের শেষ সপ্তাহে ডেঙ্গু রোগী বাড়তে শুরু হয়। অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছর জানুয়ারিতে ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয় ১০ জনের। ফেব্রুয়ারি ও মে মাসে মৃত্যু হয় ৩ জন করে। এপ্রিলে মারা গেছে সাতজন, জুনে ১৯ জন আর চলতি জুলাই মাসে এখন পর্যন্ত ছয়জন।
গত ২৪ ঘণ্টায় করোনাভাইরাস শনাক্ত হয়েছে আরও ৮ জনের, এ সময়ে মৃত্যু হয়েছে ১ জনের। গত ২৪ ঘণ্টায় করোনার নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ২৩৪টি। নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে রোগী শনাক্তের হার তিন দশমিক ৪২ শতাংশ। চলতি বছরে এখন পর্যন্ত করোনা শনাক্ত হয়েছে ৬৫১ জনের; এ ভাইরাসে মৃত্যু হয়েছে ২৫ জনের।
চলতি বছরের মে মাস থেকে দেশে করোনা সংক্রমণের হার উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে শুরু করে।
আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণাকেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) পরিচালিত সর্বশেষ কোভিড-১৯ সার্ভিলেন্স ‘ন্যাশনাল ইনফ্লুয়েঞ্জা সার্ভিলেন্স ও পিএইচওসি’ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, চলতি বছরের মে থেকে জুন মাসে দেশে ১ হাজার ৪০৯ জনের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ১৩৪ জন পজিটিভ শনাক্ত হন, যা পরীক্ষার ৯ দশমিক ৫১ শতাংশ।
এটি ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের মে সময়কালে সর্বোচ্চ হার। এর আগে ২০২৩ সালের মে-আগস্ট এবং ২০২৪ সালের জানুয়ারি-আগস্টে সংক্রমণের হার ছিল ১ দশমিক ৫ শতাংশের বেশি।
যদিও সর্বশেষ পাওয়া করোনাভাইরাসের নমুনাগুলোর জিনোম সিকুয়েন্সিং করে ‘ওমিক্রন বিএ ২.৮৬’ ভ্যারিয়েন্ট শনাক্ত হয়েছে, যা এর আগেও দেশে শনাক্ত হয়েছিল। কিন্তু সম্প্রতি এটি নতুন রূপ নিচ্ছে বলে ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞরা। আইসিডিডিআর,বি চলতি বছর সংক্রমণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে নতুন দুটি সাব-ভ্যারিয়েন্ট এক্সএফজি এবং এক্সএফসি বৃদ্ধির তথ্য তুলে ধরেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নমুনা পরীক্ষা বাড়ছে না, যার কারণে রোগী শনাক্ত হচ্ছে না। যদিও সরকার করোনাভাইরাস সংক্রমণ বাড়ায় নানা ধরনের নির্দেশনা দিয়েছে। কিন্তু তার বাস্তবায়ন কতোটা হয়েছে সে প্রশ্ন রয়েছে বিশেষজ্ঞদের।
গত ১১ জুন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রাথমিকভাবে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরের হাসপাতালগুলোয় পরীক্ষা চালু হবে বলে জানায়। ১০ দিনের মধ্যে এই পরীক্ষা ব্যবস্থা ফের চালু করা যাবে বলেন অধিদপ্তরের সংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক হালিমুর রশীদ।
কিন্তু ৭ জুলাই স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে পাঠানো করোনা বিষয়ক নিয়মিত সংবাদ বুলেটিনে দেখা যায়, রাজধানী ঢাকার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব ল্যাবরেটরি মেডিসিন এন্ড রেফারেল সেন্টার, রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর), চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ, খুলনা মেডিকেল কলেজ, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ, করোনার জন্য ডেডিকেটেড ডিএনসিসি হাসপাতালের কোথাও করোনার নমুনা পরীক্ষা হয়নি।
জানতে চাইলে হালিমুর রশীদ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, সরকারি অন্তত ৮০ টিরও বেশি হাসপাতালে করোনার নমুনা পরীক্ষা হচ্ছে। কিন্তু অধিদপ্তরের তালিকাতে সরকারি হাসপাতাল রয়েছে ২২টি।
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থমকে আছে
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমানে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা থমকে রয়েছে। দেশের মানুষ, দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক ও জনস্বাস্থ্যবিদ অধ্যাপক বে-নজির আহমেদ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “বর্তমানে দেশে একসঙ্গে চার থেকে পাঁচটি ভাইরাস দাপিয়ে বেড়াচ্ছে, অথচ থমকে আছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থা। মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তর সব স্টাক হয়ে আছে, কেউ কোথাও কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না।”
তিনি এ প্রতিবেদককে পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, “আপনার চোখে কি কোনও কার্যক্রম চোখে পড়েছে? আমার চোখেতো পড়েনি। কিছুই দেখছি না। বরগুনা হটস্পট হয়ে উঠলো; অনেক আগে থেকে তা নিয়ে সতর্ক করা হয়েছে, কিন্তু কোনও ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তার পরিণামে ভুগতে হচ্ছে মানুষকে, মৃত্যুও হচ্ছে।”
বরগুনা ডেঙ্গুর হটস্পট হয়ে ওঠার পর আইইডিসিআরের পরিচালিত জরিপ বিষয়ে বে-নজির আহমেদ বলেন, “বরগুনাতে জরিপ করা হলো গণমাধ্যমের খবরের পর, তার আগে কী করা হয়েছে? দেশের অন্য জেলাগুলোর কী অবস্থা, সেকথাও কেউ জানি না। বরগুনার মতো অবস্থা দেশের মফস্বলের। কিন্তু সব চিকিৎসা ব্যবস্থা ঢাকাকেন্দ্রিক।”
স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ‘হিমালয়ের মতো জমে আছে’ মন্তব্য করে এই জনস্বাস্থ্যবিদ বলেন, “তাকে নাড়ানোর সাধ্য কারও রয়েছে কিনা, তা নিয়ে আমি সন্দিহান। অথচ ডেঙ্গু-চিকুনগুনিয়া-করোনা-ইনফ্লুয়েঞ্জার কারণে মানুষ এক অসহনীয় পরিস্থিতির ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।”
মহামারী বিশেষজ্ঞ মুশতাক হোসেন মনে করেন এমন পরিস্থিতিতে দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা উচিত। তিনি বলেন, “একসঙ্গে এত ভাইরাসের আক্রমণ সাধারণত হয় না, কিন্তু এবার হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় একেবারেই মনে হয় না কিছু করছে। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার এখন যে অবস্থা তাতে করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করা উচিত।”



