Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

মামদানি, যার সামনে নিউ ইয়র্কের প্রথম মুসলিম মেয়র হওয়ার হাতছানি

জোহরান মামদানি ডেমোক্রেটদের প্রাইমারিতে জয় পেয়ে নিউ ইয়র্কের মেয়র প্রার্থী হতে যাচ্ছেন।
জোহরান মামদানি ডেমোক্রেটদের প্রাইমারিতে জয় পেয়ে নিউ ইয়র্কের মেয়র প্রার্থী হতে যাচ্ছেন।
[publishpress_authors_box]

যুক্তরাষ্ট্রের ঝড় তুলেছেন জোহরান মামদানি। ৩৩ বছর বয়সী এই যুবক নিউ ইয়র্কে ডেমোক্রেটিক মেয়র প্রার্থী হতে যাচ্ছেন। যদি তিনি বিজয়ী হন, তবে তিনিই হবেন দেশটির সবচেয়ে বড় শহরের প্রথম মুসলিম মেয়র।

নিউ ইয়র্কের অভিবাসীদের আলোচনার কেন্দ্রে এখন মামদানি। রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকেও তাকে নিয়ে কথা বলতে হয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার মানুষ মামদানিকে এখন চিনতে শুরু করলেও তার মা এই অঞ্চলে অচেনা কেউ নন। তিনি হলেন চলচ্চিত্রকার মীরা নায়ার। সালাম বম্বে, মনসুন ওয়েডিং, কামসূত্রের মতো সিনেমা বানিয়ে খ্যাতিমান তিনি।

এই মীরা নায়ারের ছেলে বামঘেঁষা জোহরান মামদানি আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মেয়র নির্বাচনের ডেমোক্রেটিক পার্টির টিকেটের লড়াইয়ে নামেন।

মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত এই দলের প্রাইমারিতে সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুমোকে তিনি যে হারিয়ে দিচ্ছেন, তা এখন স্পষ্ট।

ভোট গণনা চলার মধ্যে বুধবার ভোরে মামদানি তার সোশাল মিডিয়া হ্যান্ডেলে লিখেছেন, “যে কোনও কিছু ততক্ষণ পর্যন্ত অসম্ভব বলা হয়, যতক্ষণ পর্যন্ত না তা করা হয়। আমার বন্ধুরা, আপনারা সেটা করে দেখিয়েছেন। নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র পদের জন্য আপনাদের প্রার্থী হতে পেরে আমি সম্মানিত।”

মামদানির কাছে হার স্বীকার করে নিয়েছেন তার প্রতিদ্বন্দ্বী নিউ ইয়র্ক রাজ্যের সাবেক গভর্নর কুমো। তিনি এক অনুষ্ঠানে বলেন, “রাতটি ছিল মামদানির। তিনি দুর্দান্ত প্রচারাভিযান চালিয়েছেন। তিনি তরুণদের হৃদয় স্পর্শ করেছেন, তাদের অনুপ্রাণিত করেছেন, তাদের উজ্জীবিত করেছেন।”

দলীয় প্রার্থিতায় মামদানির জয়ের আভাসে এখন তাকে নিয়ে চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। তিনি কে, তার মতাদর্শ কী, কোন পথ পেরিয়ে এই অবস্থানে এখন তিনি, তা জানতে চাইছেন সবাই।

প্রাইমারিতে ঘটেছে কী

নিউ ইয়র্ক সিটিতে মেয়র প্রার্থী নির্ধারণে গত ২৪ জুন ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রাইমারিতে মামদানি ৪৩.৫ শতাংশ ভোট পেয়ে এগিয়ে ছিলেন। তিনি পান ৪ লাখ ৩২ হাজার ভোট।

অন্যদিকে কুমো পান ৩ লাখ ৬১ হাজার ৮০০ ভোট, যা মোট ভোটের ৩৬.৪ শতাংশ। আরেক প্রতিযোগী ব্র্যাড ল্যান্ডার ১১.৩ শতাংশ ভোট পেয়ে তৃতীয় স্থান পান।

যেহেতু কোনও প্রার্থী ৫০ শতাংশের বেশি ভোট পাননি, তাই শীর্ষ দুই প্রার্থীর মধ্যে পুনরায় ভোটাভুটি হয়। তাতে ল্যান্ডারের সমর্থকরা মামদানিকে বেছে নিয়েছেন বলে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে।

চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা হতে কয়েক দিন বাকি থাকতেই কুমো হার স্বীকার করে নিয়েছেন। মামদানির প্রতিক্রিয়াও বলছে জয়ের সুবাস পাচ্ছেন তিনি।

এমন জয় কি প্রত্যাশিত ছিল

মামদানি জিতবেন, এমন ধারণা আগে পাওয়া যায়নি। কয়েক সপ্তাহ আগেও বেশিরভাগ জনমত জরিপে কুমোই এগিয়ে ছিলেন। তবে প্রাইমারির দিন যত ঘনিয়ে আসে, মামদানি সমর্থনও বাড়তে থাকে।

গত ১৮ জুন প্রাইমারির মাত্র ছয় দিন আগে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গিয়েছিল যে কুমো ৩৮ শতাংশ সমর্থন নিয়ে এগিয়ে রয়েছেন। মামদানির পক্ষে সমর্থন তখন ছিল ২৭ শতাংশ।

তার আগে মে মাসের শেষের দিকে করা একটি জরিপে দেখা গিয়েছিল যে কুমোর পক্ষে সমর্থন ৩৭ শতাংশ, যেখানে মামদানির পক্ষে ১৭ শতাংশ। এপ্রিলের জরিপে মামদানি আরও পিছিয়ে ছিলেন।

কুমো নিউ ইয়র্কে একটি পরিচিত নামই শুধু নয়, প্রভাবশালীও। তিনি নিজে গভর্নর ছিলেন। তার বাবা মারিও কুমোও রাজ্যের গভর্নর ছিলেন। তার প্রচারাভিযানও ছিল ব্যাপক।

শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বীর বিপক্ষে নেমে তৃণমূল পর্যায়ে গিয়ে নিজেকে প্রাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসেন মামদানি। তরুণ ভোটারদের পাশাপাশি কুইন্স, ব্রুকলিন ও ম্যানহাটনের কর্মজীবী মানুষদের আস্থা অর্জন করেন তিনি।

কুমোসহ অনেক ডেমোক্রেট মামদানিকে নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র পদের জন্য অযোগ্য বলে সমালোচনা করেছিলেন। তারা বলছিলেন, বিশাল এই শহরের জটিল আমলাতন্ত্র পরিচালনা এবং সঙ্কট কার্যকরভাবে মোকাবেলা করার জন্য প্রশাসনিক অভিজ্ঞতার ঘাটতি রয়েছে তার।

কিন্তু মঙ্গলবারের ভোটের ফল ইঙ্গিত দিচ্ছে, তাদের বক্তব্য কাজে আসেনি।

ডেমোক্রেটদের প্রাইমারিতে মামদানির জয়ের খবরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রতিক্রিয়াও ছিল প্রবীণদের মতোই। তিনি বলেন, “তাতে দেখতে তো জঘন্য লাগে, কণ্ঠস্বরও কর্কশ, খুব একটা বুদ্ধিমানও তো মনে হয় না।”

উগান্ডার বাবা, ভারতীয় মা, সিরীয় স্ত্রী

তার পুরো নাম জোহরান কওয়ামে মামদানি। তার বাবা উগান্ডার শিক্ষাবিদ মাহমুদ মামদানি, মা ভারতীয় চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার।

মীরা নায়ার দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের বাসিন্দা। তিনি ১৯৭৭ সালে বিয়ে করেছিলেন আলোকচিত্রী মিচ এপস্টাইনকে, ১০ বছর পর তাদের বিচ্ছেদ ঘটে।

১৯৮৮ সালে মিসিসিমি মাসালা সিনেমার জন্য গবেষণা কাজে উগান্ডায় গেলে তার সঙ্গে পরিচয় হয় আফ্রিকার দেশটির রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মাহমুদ মামদানির সঙ্গে। মাহমুদ একজন ভারতীয় বংশোদ্ভূত আফ্রিকান।

পরে তারা বিয়ে করেন। ১৯৯১ সালে উগান্ডার রাজধানী কাম্পালায় জোহরান মামদানির জন্ম। সাত বছর বয়সে তিনি বাবা-মার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন। মীরা ও মাহমুদ দুজনই কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেন।

মা, বাবা, স্ত্রীর সঙ্গে জোহরান মামদানি।

জোহরান মেইনের বোডইন কলেজ থেকে আফ্রিকান স্টাডিজে স্নাতক ডিগ্রি নেন। রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ার আগে তিনি আবাসন নির্মাণে পরামর্শদাতা হিসাবে কাজ করতেন।

২০২০ সালের নিউ ইয়র্ক রাজ্যসভার নির্বাচনে তিনি অ্যাস্টোরিয়া, কুইন্স থেকে প্রতিনিধি নির্বাচিত হন।

এই বছরের শুরুতে জোহরান রামা দুয়াজি নামে একজন ২৭ বছর বয়সী সিরীয় শিল্পীকে বিয়ে করেন। তারা ব্রুকলিনে থাকেন।

মতাদর্শিক অবস্থান

ইসরায়েলের গাজা অভিযানের সমালোচনাকারীদের মধ্যে সবচেয়ে সোচ্চার একজন মামদানি। তিনি গত ৩১ অক্টোবর এক একটি এক্স পোস্টে লেখেন যে ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে।

গত বছরের ডিসেম্বরে ভোটের প্রচার চালানোর সময় এক সাক্ষাৎকারে মামদানিকে প্রশ্ন করা হয়েছিল যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু নিউ ইয়র্ক সফরে এলে তিনি কী করবেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন, তিনি যদি মেয়র হন, তবে নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করবেন।

ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান যেমন ভোটের মাঠে মামদানিকে শক্তিশালী করেছে, তার জন্য আবার সমালোচনাও শুনতে হয়েছে তাকে। কুমোসহ দলীয় অনেক নেতা মামদানিতে ইহুদিবিরোধী কার্যকলাপের জন্য অভিযুক্ত করেন।

ইসরায়েলের বাইরে বিশ্বে একক শহর হিসাবে সবচেয়ে বেশি ইহুদি রয়েছে নিউ ইয়র্কে। এই বিষয়টি মাথায় রেখে পরে মামদানির সুরে কিছুটা পরিবর্তন দেখা যায়। এই মাসেই তিনি বলেন, “এই শহর বা দেশে ইহুদি-বিদ্বেষের কোনও স্থান নেই।”

তিনি এখন জোর দিয়ে বলেছেন যে তার সমালোচনা যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরায়েলি সরকারের নীতি নিয়ে, ইহুদিদের নিয়ে নয়।

ডেমোক্রেটদের মধ্যে বামঘেঁষারা মামদারি পক্ষে সক্রিয়। তার মধ্যে রয়েছেন বার্নি স্যান্ডার্স, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজের মতো নেতারা।

মামদানি সম্পদ বৈষম্য কমানোর কথা বলেছেন নির্বাচনী প্রচারে, বলছেন পরিষেবা সম্প্রসারণের কথা। ২০২৭ সালের মধ্যে শহরে বাস ভ্রমণ বিনা টিকেটে করার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন তিনি। বাসা ভাড়া কমিয়ে আনার কথা বলেছেন তিনি। আবাসন সঙ্কট সমাধানে নতুন ভবন নির্মাণের কথাও তিনি বলছেন।

প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মালিকানায় মুদি দোকান খোলার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন মামদানি, যেখানে কম দামে নিত্যপণ্য পাওয়া যাবে।

এসবের খরচ মেটাতে মামদানি কর সংস্কারের প্রস্তাব করেছেন, যেখানে কর্পোরেট করের হার ৭.২৫ শতাংশ থেকে ১১.৫ শতাংশে উন্নীত এবং ধনী ব্যক্তিদের আয়ের ওপর ২ শতাংশ সারচার্জ আরোপের কথা ভাবছেন তিনি।

মামদানি কি মেয়র পারবেন

নিউ ইয়র্ক সিটির মেয়র নির্বাচন হবে এই বছরের ৪ নভেম্বর।

ডেমোক্রেট প্রাইমারিতে জয় মামদানির জন্য একটি ধাপ অতিক্রম মাত্র। মুল লড়াইয়ে তাকে মুখোমুখি হতে হবে রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিউয়ারের।

তিনি ২০২১ সালেও রিপাবলিকান পার্টির মেয়র প্রার্থী ছিলেন। কিন্তু বিশাল ব্যবধানে হেরেছেন।

নিউ ইয়র্কে মেয়র নির্বাচনে রিপাবলিকানরা সর্বশেষ জয়ী হয়েছিল ২০০১ সালে। মাইকেল ব্লুমগার্গ সেবার জিতেছিলেন। সেবার তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী হয়ে জিতলেও পরের বার তিনি জেতেন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে।

নিউ ইয়র্কে ডেমোক্রেটদের শক্ত অবস্থান মামদানিতে বড় সুবিধা দেবে। তবে ইসরায়েলবিরোধী যে অবস্থান তার প্রচার অভিযানকে আলোকিত করেছে, তা ভোটের হিসাবে তাকে খরচের খাতায় ফেলে দেওয়ার ঝুঁকিও তৈরি করেছে। কারণ নিউ ইয়র্কের ইহুদি ভোটারদের অবস্থান নির্বাচনে বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

তথ্যসূত্র : আল জাজিরা

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found