Beta
বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
Beta
বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

নিউ ইয়র্কের নতুন মেয়র, কে এই জোহরান মামদানি

mamdani
[publishpress_authors_box]

যুক্তরাষ্ট্রে চলমান শাটডাউন পরিস্থিতির মধ্যেই নিউ ইয়র্ক সিটি এখন নতুন এক নির্বাচিত মেয়রের অপেক্ষায় রয়েছে। আর এই মেয়র হতে যাচ্ছেন ৩৪ বছর বয়সী জোহরান মামদানি।

তিনি কয়েক মাস আগেও নিউ ইয়র্ক রাজ্যের স্থানীয় রাজনীতির বাইরে খুব একটা পরিচিত ছিলেন না। মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম শহর নিউ ইয়র্কের মেয়র নির্বাচনে সাবেক গভর্নর অ্যান্ড্রু কুয়োমোকে পরাজিত করেছেন তিনি।

অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের পূর্বাভাস অনুযায়ী মামদানির এই জয় একটি ঐতিহাসিক মুহূর্ত তৈরি করেছে। এই নির্বাচনী প্রচারে রেকর্ডসংখ্যক ভোটার অংশ নিয়েছেন। বিভিন্ন পাড়া-মহল্লা ও সম্প্রদায় থেকে স্বেচ্ছাসেবীরা যোগ দিয়েছেন প্রচারে। আর এই শহরের নেতৃত্বের লড়াইয়ের বিষয়টি বিশ্বজুড়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

নিউ ইয়র্ক অঙ্গরাজ্যের আইনসভার নিম্নকক্ষের একজন সদস্য হিসেবে কাজ করা মামদানি এখন নিউ ইয়র্ক সিটির ইতিহাসে প্রথম মুসলমান ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত মেয়র হতে চলেছেন।

ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারিতে গত জুনে মামদানি কুয়োমোকে পরাজিত করেন। কুয়োমো ২০২১ সালে যৌন হয়রানির অভিযোগে গভর্নরের পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। প্রাইমারিতে হারার পরেও স্বাধীন প্রার্থী হিসেবে মেয়র নির্বাচনে অংশ নেন তিনি।

এরপর মামদানি নিরলস প্রচার চালান। দরজায় দরজায় গিয়ে ভোট চান, বহু ভাষায় প্রচার চালান এবং কমিউনিটিভিত্তিক জনসংযোগমূলক কার্যক্রম সংগঠিত করেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নিউ ইয়র্কে মামদানির এই জয় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জন্য বড় একটি শিক্ষা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট ও কংগ্রেস নির্বাচনে পরাজয়ের পর পার্টিটি যখন নিজেদের পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে।

কে এই জোহরান মামদানি

জোহরান কওমে মামদানি একজন ৩৪ বছর বয়সী সোশাল ডেমোক্র্যাটিক। তার বাবা উগান্ডার বিশিষ্ট একাডেমিক মাহমুদ মামদানি ও মা ভারতের বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা মীরা নায়ার।

উগান্ডার কাম্পালায় জন্ম নেওয়া মামদানি সাত বছর বয়সে নিউ ইয়র্কে চলে আসেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের মেইনের বোডউইন কলেজ থেকে আফ্রিকানা স্টাডিজে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। রাজনীতিতে প্রবেশের আগে তিনি একটি হাউজিং কাউন্সিলর হিসেবে কাজ করতেন। সেখানে তিনি নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে উচ্ছেদ রোধে সহায়তা করতেন।

২০২০ সালে তিনি নিউ ইয়র্ক স্টেট অ্যাসেম্বলি নির্বাচনে ৩৬তম জেলা থেকে নির্বাচিত হন। এটি কুইন্সের অ্যাস্টোরিয়া এলাকাকে প্রতিনিধিত্ব করে।

এই বছরের শুরুতে তিনি বিয়ে করেছেন ব্রুকলিনে বসবাসকারী ২৭ বছর বয়সী সিরিয়ান শিল্পী রামা দুওয়াজিকে। তার কাজ দ্য নিউ ইয়র্কার, দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এবং ভাইসের মতো প্রকাশনায় প্রকাশিত হয়েছে। তিনি অ্যানিমেশন ও সিরামিক শিল্পের সঙ্গেও যুক্ত।

গাজা যুদ্ধ নিয়ে তার অবস্থান

মামদানি গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধের অন্যতম কঠোর সমালোচক হিসেবে পরিচিত। ২০২৪ সালের ৩১ অক্টোবর সোশাল মিডিয়া এক্সে তিনি লিখেছিলেন, “আমি সবসময় তথ্য ও সত্যের ভিত্তিতে কথা বলব: ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে।”

তিনি বয়কট, ডাইভেস্টমেন্ট ও স্যাংশনস আন্দোলনেরও দৃঢ় সমর্থক। চলতি মাসে ম্যানহাটনে এক অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, এই আন্দোলনের প্রতি তার সমর্থন “আমার রাজনীতির মূল, অর্থাৎ অহিংসা।”

তার নির্বাচনী প্রচারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত আসে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে সাংবাদিক মাহদি হাসানের এক সাক্ষাৎকারে। সেখানে তাকে প্রশ্ন করা হয়, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু যদি নিউ ইয়র্কে আসেন, তিনি কী করবেন? মামদানি সরাসরি উত্তর দেন, “আমি যদি মেয়র হই, নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করব!”

তিনি আরও বলেন, “এই শহরের মূল্যবোধ আন্তর্জাতিক আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এখন আমাদের কার্যক্রমও যেন তা প্রতিফলিত করে।”

‘গ্লোবালাইজ দ্য ইন্তিফাদা’ স্লোগানটি থেকে দূরত্ব বজায় রাখার আহ্বানও তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। অনেক ইহুদি নেতা ও রক্ষণশীল বিশ্লেষক এই স্লোগানকে উস্কানিমূলক ও ইহুদি বিরোধী বলে সমালোচনা করেছেন।

তবে মামদানী দ্য বুলওয়ার্ক পডকাস্টে ২০২৫ সালের জুনে বলেন, “৯/১১ পরবর্তী আমলে বেড়ে ওঠা একজন মুসলমান হিসেবে আমি খুব ভালো জানি কীভাবে আরবি শব্দ বিকৃত করা যায়, তাদের অর্থ বদলে ফেলা যায়, এমনকি সহিংসতা ন্যায্য প্রমাণে ব্যবহার করা যায়।” তিনি যোগ করেন, “এই স্লোগানটি আসলে বিশ্বের নিপীড়িত মানুষের প্রতি সংহতির প্রতীক, সহিংসতার আহ্বান নয়।”

কুয়োমোর প্রচারণা মামদানির মুসলিম পরিচয় ও তার ফিলিস্তিনপন্থী অবস্থানকে টার্গেট করে তাকে ইহুদি বিরোধী হিসেবে আক্রমণ করে। নিউ ইয়র্ক সিটিতে জাতিসংঘের সদরদপ্তর অবস্থিত এবং এটি ইসরায়েলের বাইরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ইহুদি জনবসতির শহর।

গত জুনে এক সাক্ষাৎকারে ইসলামোফোবিক হুমকির বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে মামদানি বলেন, “এই শহর বা দেশে ইহুদি বিরোধিতার কোনও স্থান নেই।” তিনি বারবার স্পষ্ট করেছেন যে, তার সমালোচনা ইহুদি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি সরকারের নীতির বিরুদ্ধে।

মামদানির প্রচার পরিচালিত হয় প্রায় ২২ হাজার তৃণমূল স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে এবং প্রগতিশীল রাজনীতিবিদ বার্নি স্যান্ডার্স, আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্তেজ ও ওয়ার্কিং ফ্যামিলিস পার্টির মতো সংগঠনগুলোর সমর্থনে।

তার অন্যান্য প্রতিশ্রুতি

মামদানির নীতিমালা উচ্চাভিলাষী ও প্রগতিশীল। সেখানে সম্পদের পুনর্বণ্টন, সরকারি সেবা সম্প্রসারণ এবং নগর জীবনের আমূল রূপান্তরের মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে।

তার অন্যতম প্রধান প্রস্তাব হলো ২০২৭ সালের মধ্যে শহরের সব বাস ফ্রি করে দেওয়া। তিনি দাবি করেছেন, যেখানে পরীক্ষামূলকভাবে বাস ভাড়া মুক্ত করা হয়েছে, সেখানে যাত্রীসংখ্যা বেড়েছে এবং চালকদের ওপর হামলার ঘটনা কমেছে।

আবাসন ইস্যুতে তার পরিকল্পনা আরও স্পষ্ট। তিনি সব রেন্ট-স্ট্যাবিলাইজড অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া বৃদ্ধিতে স্থগিতাদেশ দিতে চান এবং একটি “সোশ্যাল হাউজিং ডেভেলপমেন্ট এজেন্সি” গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন, যা সরকারি মালিকানায় স্থায়ীভাবে সাশ্রয়ী বাসস্থান নির্মাণ করবে। ভাড়াটেদের সুরক্ষা জোরদার করা এবং শহরাঞ্চলে মালিকানাধীন ভবনে বাড়িভাড়া হ্রাস করার প্রস্তাবও রয়েছে তার পরিকল্পনায়।

মামদানি প্রতিটি বরোতে একটি করে পৌর-মালিকানাধীন মুদি দোকান চালুর পরিকল্পনাও করেছেন, যাতে বাণিজ্যিক চেইনের বাইরে থাকা এলাকাগুলোর মানুষও স্বাস্থ্যকর ও সাশ্রয়ী খাদ্য পেতে পারেন। তিনি বিনামূল্যে স্কুল মিল কর্মসূচি শহর-পর্যায়ে সম্প্রসারণ, শহরের কলেজগুলোতেও তা চালু করা, এবং সার্বজনীন শিশু যত্ন ও প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা চালুর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

এই সব বাস্তবায়নের অর্থ জোগাতে তিনি কর কাঠামোয় বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব দিয়েছেন। করপোরেট ট্যাক্স ৭ দশমিক ২৫ শতাংশ থেকে ১১ দশমিক ৫ শতাংশে বাড়ানো এবং বছরে এক মিলিয়নের বেশি উপার্জনকারীদের ওপর অতিরিক্ত ২ শতাংশ সারচার্জ আরোপ করার মতো বিষয় রয়েছে মামদানির পরিকল্পনায়। তার প্রচারের হিসাবে, এসব পদক্ষেপ বছরে প্রায় ৯ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার আয় বাড়াতে পারে।

জননিরাপত্তা প্রসঙ্গে মামদানি প্রস্তাব করেছেন, নিউ ইয়র্ক পুলিশ ডিপার্টমেন্টের তহবিলের একটি অংশ কমিয়ে নতুন একটি “ডিপার্টমেন্ট অব কমিউনিটি সেফটি” গঠন করা হবে। সেখানে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ক্রাইসিস রেসপন্ডার ও সমাজকর্মীরা কাজ করবেন।

কীভাবে তিনি এই অবস্থানে এলেন

জুনে মামদানি ডেমোক্র্যাটিক পার্টির প্রাইমারিতে কুয়োমোকে বিপুল ব্যবধানে পরাজিত করেন।

২০২৫ সালের ২৪ জুন নিউ ইয়র্ক সিটির ডেমোক্র্যাটিক মেয়র প্রাইমারির প্রথম পছন্দের ভোটে মামদানি কুয়োমোকে ১৩ পয়েন্টে হারিয়ে ৫৭৩,১৬৯ ভোট পান।

তবে তিনি ৫০ শতাংশের বেশি প্রথম পছন্দের ভোট না পাওয়ায়, শহরের র‍্যাঙ্কড-চয়েস ভোটিং পদ্ধতি সক্রিয় হয়। সেখানে সর্বনিম্ন ভোটপ্রাপ্ত প্রার্থীদের বাদ দিয়ে তাদের ভোট দ্বিতীয় পছন্দের প্রার্থীর মধ্যে বণ্টন করা হয়।

প্রাইমারিতে পরাজয় স্বীকার করার দুই সপ্তাহ পর কুয়োমো ঘোষণা করেন, তিনি স্বাধীন প্রার্থী হিসেবেই মেয়র নির্বাচনে লড়াই চালিয়ে যাবেন।

কুয়োমোর নাম নিউ ইয়র্কে অত্যন্ত পরিচিত। তার বাবা মারিও কুয়োমোও রাজ্যের গভর্নর ছিলেন। তার প্রচারে বিপুল অর্থ ব্যয় হয়েছে এবং শহরজুড়ে বিজ্ঞাপন ও প্রচারপত্র ছেয়ে গিয়েছিল।

কুয়োমো ও তার সমর্থকরা মামদানিকে প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাহীন বলে আখ্যা দেন। তাদের মতে, মামদানি শহরের জটিল আমলাতন্ত্র সামলাতে পারবেন না।

কিন্তু মঙ্গলবারের ভোটে দেখা গেল, সেই প্রচার ব্যর্থ হয়েছে।

মামদানির জয় কি প্রত্যাশিত ছিল

নির্বাচনের দিন মঙ্গলবার ভোটগ্রহণের আগে প্রকাশিত জরিপে মামদানি এগিয়ে ছিলেন ৪৬ শতাংশ সমর্থন নিয়ে। সেখানে কুয়োমোর সমর্থন ছিল ৩২ শতাংশ। রিপাবলিকান প্রার্থী কার্টিস স্লিওয়া ছিলেন তৃতীয় স্থানে ১৬ শতাংশ নিয়ে।

নির্বাচনের আগের দিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কুয়োমোকে প্রকাশ্যে সমর্থন জানিয়ে বলেন, রিপাবলিকান প্রার্থী স্লিওয়াকে ভোট দেওয়া মানে মামদানীকে জেতানো। তবে স্লিওয়া প্রতিযোগিতা থেকে সরে যাননি।

নিউ ইয়র্ক সিটির রাজনৈতিক বাস্তবতায়, সেখানে ডেমোক্র্যাট ভোটার রিপাবলিকানদের তুলনায় প্রায় ছয় গুণ বেশি। ফলে মামদানির জয় কার্যত নিশ্চিতই ছিল।

নিউ ইয়র্ক সিটিতে সর্বশেষ কোনও রিপাবলিকান মেয়র জয়ী হয়েছিলেন ২০০১ সালে। তিনি ছিলেন মাইকেল ব্লুমবার্গ। তিনি প্রথমে রিপাবলিকান হিসেবে জয়ী হলেও ২০০৭ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে গিয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়েছিলেন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found