Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

হঠাৎ কেন ফ্রান্সের গোলখরা

গোল যেন ফ্রান্সের কাছে সোনার হরিণ। ছবি: সংগৃহীত।
গোল যেন ফ্রান্সের কাছে সোনার হরিণ। ছবি: সংগৃহীত।
[publishpress_authors_box]

‘ওপেন প্লে’- তে ফ্রান্সের কোনও গোল নেই অথচ তারা পৌঁছে গেছে ইউরো’র সেমিফাইনালে। দিদিয়ের দেশমের দলের বিস্ময়কর পারফরম্যান্স নিয়ে এখন বেশ চর্চা হচ্ছে ফুটবল বিশ্বে। এই করে তারা ট্রফি জিতে গেলে শিরোপার কি মূল্য থাকে! তখন ২০০৪ সালের ইউরোজয়ী সীমিত সামর্থ্যের গ্রিসের চেয়েও নীচে থাকবে ফ্রান্স !

ফ্রান্সের চেয়ে সেই গ্রিস এগিয়ে। কারণ তাদের শিরোপায় অনেক গোল ছিল। বিপুল ফুটবলীয় সামর্থ্য না থাকলেও ‘ক্লিন শিট’ রাখার দক্ষতা ও সেট-পিস বিশেষজ্ঞদের কল্যাণে তারা ইউরো জিতে চমকে দিয়েছিল সবাইকে। তাদের চেয়ে পিছিয়ে এই ফ্রান্স, কারণ তারা গোলই করতে পারে না। সেমিফাইনালের আগ পর্যন্ত তাদের আছে মাত্র তিন গোল। দুটো আত্মঘাতী ও আরেকটি পেনাল্টি। অর্থাৎ ‘ওপেন প্লে’- তে একটি গোলও করতে পারেনি ফ্রান্সের ফুটবলাররা।

দেশমের ডিফেন্সিভ স্টাইল

২০১৪ বিশ্বকাপ থেকে দিদিয়ের দেশমের দলকে দেখলে এই কোচের ফুটবল স্টাইল সম্পর্কে আপনার ধারণা হয়ে যাওয়ার কথা। সেটা রস-কষহীন ডিফেন্সিভ ফুটবল। গত এক দশক ধরে ফ্রান্সে যে মানের অ্যাটাকিং ফুটবলারের সমারোহ, ফ্রান্স জাতীয় দল কখনও সেই ধারার ফুটবল খেলেনি। রক্ষণভাগ সুরক্ষিত রাখাটাই অতি গুরুত্বপূর্ণ দেশমের কাছে। এরপর ম্যাচ জয়ের চিন্তা। সাবেক এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাছে মাঠে দাপুটে ফুটবল খেলা মুখ্য নয়, জয়টাই আসল। গোল যেভাবেই আসুক, আত্মঘাতী গোল, স্পট কিক, অতিরিক্ত সময় বা পেনাল্টি শ্যুট-আউটে, জিতলেই হলো।

ফ্রান্সের এই কোচের ফুটবল দর্শন হলো, “যখন তুমি গোল পাবে না, গোল না খাওয়ার চেষ্টা করাই ভাল।” অ্যাটাকিং কোচ হলে গোল পাওয়ার কৌশলের কথা বলতেন। দেশম গোল না পেলেও ম্যাচ হেরে চূড়ান্ত সর্বনাশের পথে হাঁটতে রাজি নন। নিজের রক্ষণাত্মক স্টাইলের কথা ফ্রান্স কোচ নিজেই স্বীকার করেন, “ আমি প্রধান কোচ, আমি রক্ষণাত্মক। তাই আমার দল এমন ফুটবল খেলে।”

এমবাপ্পের পায়েও নেই গোল।

ফ্রান্সের মতো তারকা নেই এখন কোনও দলে। প্রতিটি পজিশনে বড় নাম, বড় তারকা। এরপরও তাদের মাঠের ফুটবল আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে না। দর্শক-সমর্থকদের সামনে তারা চিত্তাকর্ষক ফুটবল খেলতে পারছে না। এমনকি স্টেডিয়ামের বাইরে যারা টিভিতে খেলা দেখছে তারাও বিরক্ত ফ্রান্সের ম্যাচ দেখে। লিপজিগে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে গোলশূন্য ড্রয়ের পর এই প্রসঙ্গ তুলতেই দেশম বলে বসেন, “তারা (দর্শকরা) পছন্দ না করলে টিভি চ্যানেল বদলে অন্য কিছু দেখতে পারে। গোল না করাটাই হলো নেতিবাচক।” ফ্রান্সের বিশ্বজয়ী কোচ বুঝিয়ে দিয়েছেন, ফুটবল তার কাছে গোল ছাড়া আর কিছুই নয়। চিত্তাকর্ষক পারফরম্যান্স দিয়ে মানুষের হৃদয় জেতার খেলাটা একদমই নেই তার কোচিং বুকে।  

হঠাৎ গোলের হাহাকার

দেশম রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলালেও তার দলে কখনও এমন গোল খরা ছিল না। তিন বছর আগে গত ইউরোতেও ফ্রান্স ৪ ম্যাচে করেছিল ৭ গোল। দিদিয়ের দেশমের অধীনে তাদের প্রথম বড় টুর্নামেন্ট ২০১৪ বিশ্বকাপ। সেবার ব্রাজিলে ৫ ম্যাচে করে ১০ গোল। এক বছর বাদে ২০১৬ ইউরোতে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ১৩ গোল। এরপর ২০১৮ বিশ্বকাপ জেতে ফ্রান্স ১৪ গোল করে। ৪ বছর বাদে কাতারে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ট্রফি হারালেও তারা করেছিল ১৬ গোল। তিনটি টুর্নামেন্টে ফ্রাইনাল খেলা ফ্রান্সের কখনও গোল সঙ্কট হয়নি। প্রতি ম্যাচে গড়ে ২টি করে গোল করেছিল তারা।

সেই দলটি এবার ইউরোর সেমিতে পৌঁছে গোলেও ‘ওপেন প্লে’-তে কোনও গোল নেই। সবচেয়ে বড় সমস্যা বোধহয় ‘বিগ চান্স’ থেকে তাদের গোল করার হার কমে যাওয়া। এবং কমেছে বেশ আশঙ্কাজনকভাবে। চলমান ইউরোতে ১০টি ‘বিগ চান্স’ থেকে পেয়েছে মাত্র একটি গোল। অর্থাৎ ভাল ‍সুযোগ থেকে গোল করার হার মাত্র ১০ শতাংশ। ফ্রান্স গোলের সুযোগগুলো সবচেয়ে বেশি কাজে লাগিয়েছে ২০১৮ বিশ্বকাপে। ৯টি সুযোগ থেকে করে ৫ গোল, হার ৫৫.৬ শতাংশ। ২০২২ বিশ্বকাপেও ওরকম ২১টি সুযোগ থেকে ১০ গোল করেছিল তারা।

ওপেন প্লেতে কোনও গোল নেই ফ্রান্সের।

গ্রুপে নেদারল্যান্ডসের সঙ্গে ড্রয়ের পর ফ্রান্স কোচ আক্ষেপ করেছেন, “অনেক দিন হয়ে গেছে যখন আমরা ৫-৬ টি সুযোগ তৈরি করেছি। আমার একমাত্র আফসোস হলো যে আমরা ক্লিনিক্যাল নই।”

মধ্যমাঠের মধ্যমণি নেই

এখন ফ্রান্সের মধ্যমাঠে কি কোনও সৃষ্টিশীল ফুটবলার আছে? উত্তর হলো নেই। এই দলে খেলছেন চুয়ামেনি, অদ্রিয়ান রাবিও ও আবার দলে ডাক পাওয়া এনগোলা কান্তে। তারা বেশিরভাগ সময় প্রতিপক্ষের পা থেকে বলে কেড়ে নেওয়ার কাজ করেন এবং রক্ষণভাগকে ছায়া দেন। তারা কেউই পল পগবার মানের নয়। তার সৃষ্টিশীলতা ও গোল করার ক্ষমতার সঙ্গে ফ্রান্সের এখনকার কোনও মিডফিল্ডারের তুলনা হবে না। তাই ফ্রান্সের মধ্যমাঠ এখন একদল শ্রমিকের দখলে, যারা ম্যাচের গতি-প্রকৃতি বদলে দেওয়ার ক্ষমতা রাখেন না।

অথচ এই ফ্রান্সের ১৯৮৪ ইউরো জেতার পেছনে বড় অবদান ছিল তাদের মধ্যমাঠের। আপনি হয়তো বলবেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ গোলদাতা মিশেল প্লাতিনির কথা। কিন্তু তার ৯ গোলের পেছনে অবদান ছিল জেন টিগানা, অ্যালান জিহেস, লুইস ফার্নান্দেজের। স্কিল ও সৃষ্টিশীলতায় টিগানা ছিলেন আশির দশকে ইউরোপের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার। মাঝমাঠে তার সঙ্গী ছিলেন আরেক বিখ্যাত মিডফিল্ডার অ্যালান জিহেস আর ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফার্নান্দেজ। তাদের পায়ে মধ্যমাঠের সৃষ্টিশীলতায় খুলতো ফ্রান্সের খেলা। এই সৌন্দর্যকে গোলে রূপ দিতেন মিশেল প্লাতিনি। এই তিন জনের সঙ্গে মিশেল প্লাতিনির যোগে তৈরি হয়েছিল ফ্রান্সের বিখ্যাত ‘ম্যাজিক স্কয়ার’।

গোল না পেয়ে হতাশ ফ্রান্সের ফুটবলাররা। পর্তুগালের বিপক্ষে।

ফ্রান্সে গত এক দশকে যেরকম প্রতিভাবান ফুটবলারের সমারোহ, দেশম চাইলে এমন একটা ‘গোল ফোর্স’ তৈরি করতে পারতেন। নিজের রক্ষণাত্মক মানসিকতার কারণেই হয়তো সেই পথে হাঁটেননি।  

বক্স স্ট্রাইকারের অভাব

দেশমের খুব পছন্দের স্ট্রাইকার অলিভার জিরুদ। এখনও নাম্বার নাইন পজিশনে এই ৩৭ বছর বয়সীকে খেলান কোচ। বেশিরভাগ সময় কিলিয়ান এমবাপ্পের সঙ্গে নাম্বার নাইনে খেলাচ্ছেন থুরামকে। তাতে কাঙ্খিত ফল আসলে পাচ্ছে না দল। সমস্যা হচ্ছে, এমবাপ্পে যখন বাঁদিক দিয়ে ড্রিবল করে ঢোকেন বা বক্সে ক্রসে ফেলেন তখন গ্রিয়েজমান ছাড়া কেউ গোল করার জায়গায় থাকেন না। ওসমান দেম্বেলে ও থুরামের পজিশন ঠিক না থাকায় গোলের সুযোগগুলো কাজে লাগে না। ঠিক একই কারণে নিষ্ফলা হয়ে যাচ্ছে কুন্দে, হার্নান্দেজের ক্রসগুলো। অথচ ওপেন প্লে-তে এখন পর্যন্ত ফ্রান্সের হয়ে সর্বোচ্চ ১৩টি ক্রস ফেলেছেন রাইট ব্যাক কুন্দে।

গ্রিয়েজমানও গোলের দেখা পাচ্ছে না।

ফুটবলে গোলের বড় দুটো উৎস হলো ক্রস ও কাটব্যাক। আগের টুর্নামেন্টেগুলোতে এগুলোই ছিল ফ্রান্সের গোলের বড় অস্ত্র। কিন্তু জার্মানি ইউরোতে গিয়ে কাটব্যাকগুলো নিখুঁত হচ্ছে না, হলেও ভালো বক্স স্ট্রাইকারের অভাবে ফল মিলছে না। তাই গোলের জায়গায় বড় গন্ডগোল ফ্রান্সের।      

আরও পড়ুন

সর্বাধিক পঠিত