গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সরকারের উন্নয়ন কাজে যে ধাক্কা লেগেছিল, তা এখনও অব্যাহত আছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে (৩ মাস, জুলাই-সেপ্টেম্বর) সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ৫ দশমিক শূন্য নয় শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের শুরু থেকে আন্দোলন ও পরে অগাস্টে ক্ষমতার পালাবদলে সৃষ্টি হওয়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির পাশাপাশি প্রশাসনে রদবদলের ধাক্কায় সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে ধীরগতি দেখা দিয়েছে, তা এখনও চলছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তিন মাসের এডিপি বাস্তবায়নের তথ্য সে কথাই বলছে।
রবিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রকাশিত এডিপি বাস্তবায়নের সবশেষ পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে অর্থ ব্যয় হয়েছে ১২ হাজার ১৫৮ কোটি টাকা; যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ১৩ হাজার ২১৫ কোটি টাকা।
অর্থাৎ গত অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকের চেয়ে চলতি অর্থ বছরের একই সময়ে ১ হাজার ৫৭ কোটি টাকা কম ব্যয় হয়েছে।
অর্থ বছরের মোট বরাদ্দের হিসেবে জুলাই-সেপ্টেম্বর বাস্তবায়নের হার হয়েছে ৫ দশমিক শূন্য নয় শতাংশ। গত অর্থ বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
২০২৩-২৪ অর্থ বছরের প্রথম তিন মাসে ২০ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা খরচ করেছিল সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের জন্য সরকার এডিপির মাধ্যমে ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫.৬৪ কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।
আইএমইডির তথ্যে দেখা যায়, সবশেষ সেপ্টেম্বর মাসে ৬ হাজার ৪৪৩ কোটি টাকা খরচ করেছে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। গত বছরের সেপ্টেম্বরে করছের অঙ্ক ছিল ৬ হাজার ৭২ কোটি টাকা।
ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকার গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে এডিপিতে ২ লাখ ৭৮ হাজার ২৮৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখে বাজেট পাস করেছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার সেই এডিপি কমিয়ে ২ লাখ ২৬ হাজার ১৬৪ কোটি টাকায় নামিয়ে এনেছিল। যার মধ্যে খরচ করা হয় ১ লাখ ৫৩ হাজার ৪৫০ কোটি টাকা। যা মোট বরাদ্দের ৬৭ দশমিক ৮৫ শতাংশ। যা ছিল ২০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। তার আগের অর্থ বছরে (২০২৩-২৪) এই হার ছিল ৮০ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
মাঠ পর্যায়ের কাজে ঢিমেতালের পাশাপাশি ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দায়িত্বে আসা অন্তর্বর্তী সরকার অগ্রাধিকার প্রকল্প বাস্তবায়নে জোর দেয়।
এতে করে আগের সরকারের নেওয়া অনেক প্রকল্পে অর্থছাড় কমিয়ে দেওয়া হয়। ফলে চলমান অনেক প্রকল্পের কাজও স্থগিত হয়ে যায়। এসব মিলিয়ে এডিপির বরাদ্দ করা অর্থ ব্যয় কমে যায়।
সাধারণত অর্থ বছরের প্রথমদিকে এডিপির ব্যয়ের পরিমাণ কম থাকে। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর গত অর্থ বছরে তা আরও কমে বাস্তবায়ন হয়।
এর আগের ২০২১-২২, ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থ বছরের প্রথম তিন মাসে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) এডিপি বাস্তবায়নের হার ছিল যথাক্রমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশ, ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ এবং ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ।
আইএমইডির প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) সর্বোচ্চ বরাদ্দ প্রাপ্ত ১৫ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের গড় বাস্তবায়ন হয়েছে ৬ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ।
এই অর্থ বছরের জন্য সরকার ২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৯৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকার যে এডিপি অনুমোদন দিয়েছে, তাতে ৭৪ দশমিক ৫৬ শতাংশই বরাদ্দ পেয়েছে এসব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ।
এর মধ্যে শতাংশ হিসাবে সবচেয়ে বেশি ১৮ দশমিক ১৪ বাস্তবায়ন করেছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৯ দশমিক ৭৫ শতাংশ খরচ করেছে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। তৃতীয় সর্বোচ্চ ৭ দশমিক ৮১ শতাংশ ব্যয় করেছে স্থানীয় সরকার বিভাগ।
এছাড়া কৃষি মন্ত্রণালয় খরচ করেছে ৭ শতাংশ। ১ দশমিক ৭৬ শতাংশ বাস্তবায়ন করেছে সেতু বিভাগ। পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় খরচ করেছে ৭ দশমিক ৮৪ শতাংশ; বিদ্যুৎ বিভাগ বাস্তবায়ন করেছে ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ, গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ৬ দশমিক ৬৩ শতাংশ।
প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় ১ দশমিক ১৩ শতাংশ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ ৩ দশমিক ১০ শতাংশ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ ১ দশমিক ১৩ শতাংশ, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ৫ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় খরচ করেছে ৫ দশমিক ৫৭ শতাংশ অর্থ ব্যয় করেছে।


