Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

পোশাক রপ্তানি কমছে বড় দুই বাজারে

কারখানায় কর্মরত 
এক পোশাক শ্রমিক। ছবি : সকাল সন্ধ্যা
কারখানায় কর্মরত এক পোশাক শ্রমিক। ছবি : সকাল সন্ধ্যা
[publishpress_authors_box]

বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক। মোট আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি আসে এই খাত থেকে।

আর একক দেশ হিসেবে এই পোশাকের সবচেয়ে বড় বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। পোশাক রপ্তানি করে যে আয় হয়, তার ২০ শতাংশের মতো আসে এই দেশটি থেকে। দ্বিতীয় বৃহত্তম বাজার হচ্ছে জার্মানি; ১০ শতাংশের মতো আসে ইউরোপের এই দেশটি থেকে।

সামগ্রিক হিসাবে পোশাক রপ্তানি করে বাংলাদেশ যে বিদেশি মুদ্রা আয় করে, তার প্রায় এক-তৃতীয়াংশই আসে যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি থেকে।

কিন্তু উদ্বেগজনক তথ্য হচ্ছে, ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কায় এই দুই বড় বাজারেই পোশাক রপ্তানি কমছে; যা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে উদ্বেগের কারণ হয়ে দেখা দিয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) দেশভিত্তিক রপ্তানি আয়ের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানিতে বড় উল্লম্ফন নিয়ে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছর শুরু হয়। অর্থ বছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ৭৯ কোটি ৭২ লাখ ৬০ হাজার ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়, যা ছিল গত অর্থ বছরের একই মাসের চেয়ে ২৯ দশমিক শূন্য পাঁচ শতাংশ বেশি।

২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জুলাই মাসে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৬১ কোটি ৭৭ লাখ ৭০ হাজার ডলার।

কিন্তু দ্বিতীয় মাস আগস্টে এসেই ধাক্কা খায়; কমে যায় ৩ দশমিক শূন্য সাত শতাংশ । ওই মাসে ৬৫ কোটি ৩ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়। গত বছরের আগস্টে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬৭ কোটি ৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার।

তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে নামমাত্র প্রবৃদ্ধি হয়; দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ। রপ্তানি হয় ৫৬ কোটি ৪১ লাখ ডলারের পোশাক। গত বছরের আগস্টে হয়েছিল ৫৬ কোটি ৩৭ লাখ ৫০ হাজার ডলার।

চতুর্থ মাস অক্টোবরে এসে ফের ধাক্কা। রপ্তানি হয় ৫৭ কোটি ৫৪ লাখ ৪০ হাজার ডলারের পোশাক। গত বছরের অক্টোবরে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ৬০ কোটি ৮১ লাখ ৯০ হাজার ডলার।

হিসাব বলছে, গত বছরের অক্টোবরের চেয়ে এই বছরের অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৫ দশমিক ৩৮ শতাংশ।

তবে জুলাইয়ে উল্লম্ফনের কারণে অর্থ বছরের চার মাসের (জুলাই-অক্টোবর) হিসাবে এখনও ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি রয়েছে। এই চার মাসে দেশটিতে ২৫৮ কোটি ৭১ লাখ ৪০ হাজার (২.৫৯ বিলিয়ন) পোশাক রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানির পরিমাণ ছিল ২৪৬ কোটি ৬ লাখ ৭০ হাজার (২.৪৬ বিলিয়ন) ডলার।

দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক আমদানিকারক দেশ জার্মানির অবস্থা আরও খারাপ। এই চার মাসে দেশটিতে পোশাক রপ্তানি কমেছে ৬ দশমিক ৮১ শতাংশ। জুলাই-অক্টোবর সময়ে জার্মানিতে ১৪৩ কোটি ৮৫ লাখ ৭০ হাজার (১.৪৩ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। গত বছরের একই সময়ে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ১৫৪ কোটি ৩৭ লাখ ৩০ হাজার (১.৫৪ বিলিয়ন) ডলার।

বাংলাদেশের পোশাকের আরেকটি বড় বাজার ফ্রান্সেও রপ্তানি কমেছে। জুলাই-অক্টোবর সময়ে এই বাজারে ৬৬ কোটি ৩৩ লাখ ২০ ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ৫ শতাংশ কম।

যদিও শীর্ষ পাঁচ গন্তব্যের মধ্যে বাকি দুইটি দেশে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে এখনও প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বাংলাদেশ। দেশ দুটি টি হলো যুক্তরাজ্য ও স্পেন।

জুলাই-অক্টোবর সময়ে যুক্তরাজ্যে পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ২ দশমিক ৭২ শতাংশ; রপ্তানি হয়েছে ১৫৩ কোটি ৩৯ লাখ ২০ হাজার ডলারের পোশাক। অন্যদিকে স্পেনে রপ্তানির অঙ্ক ১২৭ কোটি ৭১ লাখ (১.২৭ বিলিয়ন) ডলার। প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৩০ শতাংশ।

ইপিবির তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, বড় দুই বাজারে (যুক্তরাষ্ট্র ও জার্মানি) হোঁচটের কারণেই সার্বিকভাবে পোশাক রপ্তানি বৃদ্ধির গতি কমেছে। জুলাই-অক্টোবর সময়ে পোশাক রপ্তানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ। অথচ গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে প্রবৃদ্ধির অঙ্ক ছিল প্রায় ৯ শতাংশ।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১ হাজার ২৯৯ কোটি ৩ লাখ ৬০ হাজার (প্রায় ১৩ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। গত অর্থ বছরের একই সময়ে রপ্তানি হয়েছিল ১ হাজার ২৮১ কোটি ১০ লাখ (১২.৮১ বিলিয়ন) ডলারের পোশাক।

দেশের আমদানি-রপ্তানির প্রাণবিন্দু চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর।

অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সূচক বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভের প্রধান দুই উৎস হচ্ছে রপ্তানি আয় ও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স। গত অর্থ বছরের ধারাবাহিকতায় চলতি অর্থ বছরেও এই দুই সূচকে ঊর্ধ্বমুখী ধারা নিয়ে ২০২৫-২৬ অর্থ বছর শুরু হয়েছিল।

এই আর্থিক বছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রেমিটেন্স বেড়েছিল ২৯ দশমিক ৫০ শতাংশ; দ্বিতীয় মাস আগস্টে বাড়ে ৯ শতাংশ। তৃতীয় মাস সেপ্টেম্বরে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১১ দশমিক ৭২ শতাংশ। অক্টোবরে বেড়েছে ৭ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ

কিন্তু রেমিটেন্সে ঊর্ধ্বমুখী ধারা বজায় থাকলেও রপ্তানি আয় কমছেই।

গত এপ্রিল থেকে ট্রাম্প শুল্ক নিয়ে একধরনের অস্থিরতা ছিল। ৩১ জুলাই বিভিন্ন দেশের ওপর পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার কথা ছিল। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে পাল্টা শুল্ক এড়াতে জুলাই মাসে অনেক পণ্য জাহাজীকরণ হয়েছে। স্থগিত থাকা অনেক পণ্যও রপ্তানি হয়। সে কারণে জুলাই মাসে রপ্তানি অনেক বেড়েছিল বলে মনে করেন পোশাক রপ্তানিকারকরা।

৭ আগস্ট থেকে ট্রাম্প শুল্ক কার্যকর হয়েছে বাংলাদেশে। পাল্টা শুল্ক কার্যকর হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ৩১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের জন্য শুল্ক ঘোষণা করেন। তাতে বাংলাদেশের শুল্ক ৩৫ শতাংশ থেকে কমে হয় ২০ শতাংশ।

প্রতিযোগী দেশের তুলনায় পাল্টা শুল্ক কাছাকাছি হওয়ায় দুশ্চিন্তামুক্ত হন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকেরা। কিন্তু এর পরও রপ্তানি আয় কমায় ফের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে রপ্তানিকারকদের।

কেন কমছে জানতে চাইলে দেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ চেম্বারের বর্তমান সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আমাদের প্রধান বাজার আমেরিকা ও জার্মানি। ওই দুই জায়গাতেই রপ্তানি ধাক্কা খেয়েছে। ট্রাম্প শুল্কের কারণে আমেরিকার বাজারে সব পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। সে কারণে ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতা কমে গেছে। এখন তারা তৈরি পোশাকসহ অন্যান্য পণ্য কম কিনছে। তার একটা প্রভাব পড়েছে আমাদের রপ্তানিতে।”

“অন্যদিকে বাড়তি শুল্ক আরোপ করায় আমাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও ভারত আমেরিকার বাজার থেকে মুখ ফিরিয়ে ইউরোপের বাজারে আগের চেয়ে বেশি বেশি পণ্য রপ্তানি করছে। অনেকে ক্ষেত্রে কম দামেও পোশাক রপ্তানি করছে তারা। সে কারণে জার্মানিতেও আমাদের রপ্তানি কমছে।”

একই কথা বলেছেন নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম। তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “অক্টোবর মাসে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক ধাক্কার প্রভাবে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয়েও প্রতিফলিত হয়েছে।”

বিকেএমইএ সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “তৈরি পোশাক খাতে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখা দিয়েছে, কারণ বেশিরভাগ ক্রেতাই নতুন করে কোনও অর্ডার দিচ্ছে না। তারা এখন অতিরিক্ত ২০ শতাংশ রেসিপ্রোক‍্যাল শুল্কের (পাল্টা শুল্ক) একটি অংশ বাংলাদেশি সরবরাহকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

“রপ্তানিকারকদের পক্ষে এই অতিরিক্ত চাপ বহন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়, কারণ তারা ইতোমধ্যেই প্রাথমিক শুল্ক সমন্বয় এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির প্রভাবসহ বিভিন্ন ধরনের চাপে রয়েছেন।”

তিনি বলেন, “এছাড়া, বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এবং অন্যান্য বাজারেও কঠিন প্রতিযোগিতার মুখে পড়েছেন। কারণ চীনা ও ভারতীয় প্রস্তুতকারকরা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এইসব বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছেন।

“আমরা আশঙ্কা করছি, এই ধীরগতি আগামী দুই থেকে তিন মাস অব্যাহত থাকতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক ক্রেতারা নতুন শুল্ক কাঠামোর সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারলে আমাদের রপ্তানি আবারও পুনরুদ্ধার হবে বলে আশা করছি।”

“এ সময়টায় রপ্তানিকারকদের ধৈর্য সহকারে ক্রেতাদের যেকোনো ধরনের চাপ মোকাবেলা করতে হবে,” বলেন মোহাম্মদ হাতেম।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found