Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

খামেনিকে কি এখন শেষের শুরু দেখতে হবে

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি।
[publishpress_authors_box]

তেহরানের আকাশ ভেঙে এখন আর গোলা পড়ছে না, মারাও পড়ছে না কেউ। যুদ্ধবিরতি এখন; গর্ত থেকে বেরিয়ে আসতে এটা সুযোগ হিসাবে নিতে পারেন ইরানের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি।

গত ১৩ জুন ইসরায়েল বিমান হামলা শুরুর পর বাংকারে চলে গিয়েছিলেন তিনি। কোথায় সেই বাংকার, তা খুব কম মানুষেরই জানা। মাটির নিচে যাওয়ার পর ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গেও যোগাযোগের আড়ালে ছিলেন তিনি।

যুদ্ধবিরতি কার্যকরের দুদিন পর বৃহস্পতিবার প্রথম তার খোঁজ পাওয়া গেল। তার এক্স একাউন্ট সক্রিয় হয়ে উঠল; জানানো হলো, তার ভিডিও ভাষণ ্আসছে।

ভাষণে ১২ দিনের যুদ্ধে বিজয়ের জন্য ইরানিদের অভিনন্দন জানালেন তিনি; সেই সঙ্গে বললেন, ইসরায়েলকে রক্ষা করতে এসে যুক্তরাষ্ট্রও চপেটাঘাত খেয়েছে।

সাড়া দিয়েছেন খামেনি, এবার হয়ত প্রকাশ্যে দেখাও দেবেন। কিন্তু মাটির নিচ থেকে ওঠার পর তিনি কি আগের ইরানকেই দেখতে পাবেন?

না, ১২ দিনে মাটির ওপরের ইরান অনেকটাই বদলে গেছে, মনে করছেন বিবিসির ফার্সির বিশেষ প্রতিনিধি কাসরা নাজি। তার মতে, ৮৬ বছর পেরিয়ে আসা খামেনিকে বাংকার থেকে উঠে নতুন এক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে, হয়ত নতুন একটি যুগেরও।

বছরব্যাপী উত্তেজনার পর গত ১৩ জুন ইরানে বিমান হামলা চালিয়ে বসে ইসরায়েল। যুক্তি দেখায়, ইরান পরমাণু বোমা প্রায় তৈরি করে ফেলেছে। ফলে ইসরায়েলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতেই এই হামলা।

যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফোরদো পারমাণবিক জ্বালানি কেন্দ্র।

ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় পাল্টা জবাব দেয় ইরান। তারপর পাল্টাপাল্টি হামলা চলতেই থাকে। এক সপ্তাহ পর যুক্তরাষ্ট্র আকস্মিকভাবে ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালায় বোমারু বিমান নিয়ে। ইরানের পারমাণবিক কার্যক্রম ধসিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়নে ট্রাম্পের দাবির অসারতা তুলে ধরে; তেহরানও দাবি করে, যুক্তরােষ্ট্রর বিমান হামলায় ক্ষতি সামান্যই হয়েছে।

জবাব দিতে ইরান কাতারে যুক্তরাষ্ট্রের বিমান ঘাঁটিতে হামলার পরপরই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে ট্রাম্পের কাছ থেকে। তিনি বলেন, ইরান-ইসরায়েল উভয়ের সম্মতিতেই এসেছে যুদ্ধবিরতি।

তারপর আর হামলা হয়নি। তবে ৬ শতাধিক ইরানি, আর অর্ধশত ইসরায়েলির প্রাণ কেড়ে নিয়েছে ১২ দিনের এই যুদ্ধ; তা ধ্বংসের ছাপ রেখে গেছে তেহরান, তেল আবিবসহ বিভিন্ন শহরে।  

যুদ্ধের শুরুতেই ট্রাম্প বলেছিলেন, খামেনি কোথায় লুকিয়ে রয়েছেন, তা তার জানা। তবে এখনই তাকে হত্যার নির্দেশ দিচ্ছেন না তিনি।

তিনজন শীর্ষ সামরিক কমান্ডার ও ছয়জন পরমাণু বিজ্ঞানীর সঙ্গে ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনিকেও ইসরায়েল মেরে ফেলতে চেয়েছিল বলে তখন খবর আসে, তবে ট্রাম্প তা েঠকিয়ে দেন।  

খামেনি এখন বেঁচে থাকলেও গত চার দশকে এই প্রথম যুদ্ধের আঁচে পোড়া ইরানিদের মুখোমুখি হতে হবে তাকে। সংগ্রাম করতে হবে ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের।

শীর্ষে মতভেদ

যুদ্ধের শুরুতেই ইসরায়েল খুব দ্রুত ইরানের আকাশের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সামরিক অবকাঠামোতে আক্রমণ করেছিল। প্রথম দিনেই হত্যা করে সেনাবাহিনীর শীর্ষ কমান্ডারদের।

ইরানের সামরিক ক্ষয়ক্ষতি কতটা হয়েছে, তা এখনও অস্পষ্ট। তবে সেনাবাহিনী এবং বিপ্লবী গার্ডের ঘাঁটি ও স্থাপনাগুলো যেভাবে বারবার বোমা হামলার শিকার হয়েছে, তাতে যথেষ্ট ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া যায়।

দুই দশক ধরে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগের কেন্দ্রে থাকা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও বেশ ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছে। তবে তার হিসাবও অজানা। এর পেছনে শত শত বিলিয়ন ডলার খরচ করে আসছে তেহরান।

এই যে ক্ষতির মুখে ইরান পড়ল, তা কীসের জন্য? অনেক ইরানিই এখন দায়ী করতে পারেন খামেনিকে, তার দম্ভকে, তার অনিয়ন্ত্রিত উচ্চাভিলাষকে।

ইরানের ইসলামি বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর ১৯৮৯ সালে খামেনি আসেন শীর্ষ নেতার আসনে। ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের সংবিধান তাকে দেয় প্রভূত ক্ষমতা।

তবে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশকে সংঘাতের পথে নিয়ে জনগণের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনার জন্য তাকেই দায়ী করতে চাইবে ইরানিরা।

তারা তাকে দায়ী করবে ইসরায়েলকে ধ্বংস করার অবস্থানের জন্য। তারা তাকে দায়ী করবে পারমাণবিক কর্মসূচি আঁকড়ে ধরে রাখার মতো একগুয়েমির জন্য।

পারমাণবিক কর্মসূচির কারণে একের পর নিষেধাজ্ঞায় ইরানের অর্থনীতিতে পঙ্গু করে দিয়েছে। শীর্ষ তেল রপ্তানিকারক দেশ ইরান এখন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করছে।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ভিজিটিং স্কলার অধ্যাপক লিনা খাতিব বলেন, “এই ধরনের ব্যাপক চাপের মধ্যে ইরানের ক্ষমতাসীনরা কতদিন টিকে থাকতে পারে, তা অনুমান করা কঠিন।

“তবে এটি শেষের শুরু বলে মনে হচ্ছে। আলি খামেনেই সম্ভবত ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের শেষ সর্বোচ্চ নেতা নেতা হতে যাচ্ছেন।”

রাষ্ট্রের শীর্ষে ভিন্নমতের গুঞ্জন উঠেছে। যুদ্ধ যখন তুঙ্গে, তখন ইরানের একটি আধা সরকারি সংবাদ সংস্থা খবর দিয়েছিল যে গুরুত্ব কয়েকজন ব্যক্তি কোম শহরের ধর্মীয় পণ্ডিতদের নেতৃত্ব পরিবর্তনের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

সেইন্ট অ্যান্ড্রুজ ইউনিভার্সিটির ইরানি স্টাডিজ ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক অধ্যাপক আলী আনসারি বলছেন, কিছু একটা হিসাব-নিকাশ হবে।

“এটা স্পষ্ট যে নেতৃত্বের মধ্যে বেশ মতভেদ রয়েছে এবং সাধারণ মানুষের মধ্যেও ব্যাপক অসন্তুষ্টি রয়েছে।।”

ক্রোধ ও হতাশা

গত দুই সপ্তাহে অনেক ইরানির মধ্যে যেমন দেশকে রক্ষা করার তাগিদ অনুভূত হয়েছে, তার সঙ্গে শাসকদের প্রতি গভীর ঘৃণার উদ্রেকও ঘটেছে।

তারা দেশের জন্য পথে নেমেছে, কিন্তু তা শাসকদের রক্ষা করার জন্য নয়।

এই যুদ্ধ ইরানিদের একাত্ম করেছে। গোলার ভয়ে শহর থেকে পালিয়ে আসা মানুষগুলোর জন্য শহরতলী কিংবা গ্রামের মানুষ দরজা খুলে দিয়েছে। দোকানিরা নিত্য পণ্যের দাম কমিয়ে দিয়েছে কিংবা বাকিতে বিক্রি করেছে। প্রতিবেশীরা একে অন্যের দরজায় কড়া নেড়ে জানতে চেয়েছে, কিছু লাগবে কি না।

অনেকে এটা ভাবছিলেন যে ইসরায়েল সম্ভবত ইরানের শাসন ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনতে চাইছে। অনেক ইরানি তা চাইছেনও। তবে বিদেশি শক্তি দ্বারা সেই পরিবর্তন তাদের কাম্য নয়।

প্রায় ৪০ বছরের শাসনকালে খামেনি দেশের ভেতরে তার সমস্ত বিরোধীদের দমন করেছেন কঠোর হাতে। বিরোধী রাজনৈতিক নেতারা হয় কারাগারে, নয়ত বিদেশে পালিয়ে আছেন।

বিদেশে যারা আছেন, তারা ইরানের গোঁড়া শাসকবিরোধী সবাইকে এক মঞ্চে আনার মতো কিছু করতে পারেননি।

১২ দিনের যুদ্ধ যখন ক্ষমতাসীনদের পতনের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলছিল, তখনও ইরানিরা এট ভাবতে পারেনি যে বিরোধীরা কিছু করতে পারবে। বরং তারা ভেবেছিল, শাসকদের পতনে ইরান বিশৃঙ্খল ও অরাজক এক পরিস্থিতির মধ্যে ডুবে যাবে।

অধ্যাপক খাতিব বলেন, “আভ্যন্তরীণ বিদ্রোহে ইরানি শাসকদের পতনের সম্ভাবনা কম। বরং শাসন গোষ্ঠী এখনও শক্তিশালী এবং তারা ভিন্নমত দলন বাড়িয়ে দেবে।”

তেহরানের সড়কে পাহরায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস সদস্য।
তেহরানের সড়কে পাহারায় ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস সদস্য।

ইরানিরা এখন আরও কঠোর দমন-পীড়নের ভয়ে আছে। যুদ্ধ শুরুর পর গত দুই সপ্তাহে ইসরায়েলের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে অন্তত ছয়জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছে। প্রায় ৭০০ জনকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে।

একজন ইরানি নারী বলেন, যুদ্ধের চেয়ে তিনি বেশি ভয় পাচ্ছেন এই শাসকদের, যারা ক্ষতবিক্ষত ও অপমানিত হয়ে তার ক্রোধ জনগণের ওপর ঢেলে দেবে।

অধ্যাপক আনসারি বলেন, “যদি সরকার মৌলিক চাহিদা মেটাতে না পারে, তাহলে জনগণের মধ্যে ক্রমবর্ধমান ক্রোধ ও হতাশা দেখা দেবে।”

ইরানে খুব কম মানুষই মনে করেন যে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হবে। তারা বিশ্বাস করেন, ইসরায়েল যা চাইছে, তার শেষ নিশ্চয়ই দেখে ছাড়বে। কেননা ইরানের আকাশের নিয়ন্ত্রণ যে নেওয়া যায়, তা তারা জেনে গেছে।

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের আক্রমণে একটি জিনিস ধ্বংস থেকে রক্ষা পেয়েছে বলে মনে হয়, তাহলো ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ। এগুলো পাহাড়ের সুড়ঙ্গে এভাবে লুকানো যে ইসরায়েলের পক্ষে তা খুঁজে বের করা কঠিন ছিল।

ইরানের কাছে ভূমি েথকে ভূমিতে নিক্ষেপণযোগ্য আড়াই হাজার ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে বলে ইসরায়েলের ধারণা। তার মধ্যে যেগুলো ছোড়া হয়েছিল, তা ইসরায়েলে যথেষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ ঘটায়।

এরপরও দেড় হাজারের মতো ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের হাতে এখনও আছে, যা উদ্বেগে রাখবে ইসরায়েলকে।

একই সঙ্গে তেল আবিব, ওয়াশিংটনের উদ্বেগ থাকবে যে ইরান এখনও একটি পারমাণবিক বোমা তৈরির জন্য মরিয়া হয়ে চেষ্টা চালাবে।

ইরান তার পারমাণবিক জ্বালানি কেন্দ্রে ৬০ শতাংশ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধে সফল হয়েছে বলে এআইইএর দাবি। তা ৯০ শতাংশে নেওয়া কঠিন নয় তেমন। আর তাহলে নয়টি পারমাণবিক বোমা তৈরি করে ফেলতে পারবে ইরান।

ইরানের কট্টরপন্থিরা পারমাণবিক বোমার অধিকারী হতে অভিলাষী, তারা খামেনিকে চাপ দেবেন পরমাণু আলোচনা থেকে বেরিয়ে আসতে।

খামেনি বেরিয়ে এসে এটা দেখে আত্মবিশ্বাসী হতে পারেন যে তার শাসন এখনও টিকে আছে। কিন্তু বয়স এখন ৮৬ বছর, রোগ-শোকও জেঁকে বসেছে শরীরে। তিনি জানেন যে তার দিনগুলো ফুরিয়ে আসছে।

তিনি এখন চাইবেন, ক্ষমতা হস্তান্তরটি যেন সুশৃঙ্খল হয়। তাদের শাশন ব্যবস্থা যেন অটুট থাকে।

তবে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর অবশিষ্ট শীর্ষ কমান্ডাররা, যারা সর্বোচ্চ নেতার প্রতি অনুগত ছিলেন, তারা পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতা প্রয়োগ করতে চাইতেই পারেন।

তথ্যসূত্র : বিবিসি

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found