Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

ইরানের আফগান শরণার্থীরা পালাবে কোথায়

afghan-refugees-in-iran-1
[publishpress_authors_box]

গত ১৩ জুন ইসরায়েলের যুদ্ধবিমানগুলো যখন তেহরানে গোলাবর্ষণ শুরু করল, শামসি আরও একবার বুঝতে পারলেন যে তিনি এবং তার পরিবার কতটা অনিরাপদ।

৩৪ বছর বয়সী দুই সন্তানের জননী এই আফগান নারী উত্তর তেহরানে তার সেলাইয়ের কাজ করছিলেন। বিমান হামলা শুরু হলে ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে তিনি দ্রুত বাড়ি ফিরে আসেন; দেখেন তার পাঁচ ও সাত বছর বয়সী দু্ই মেয়ে ভয়ে একটি টেবিলের নিচে জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে।

তালেবানের শাসন থেকে বাঁচতে শামসি এক বছর আগে পালিয়ে আসেন, ভাবছিলেন ইরানে নিরাপদ থাকবেন তিনি।

কিন্তু এখন নিজেকে আরও একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে আবিষ্কার করলেন তিনি। উপলব্ধি হলো, নথিপত্রহীন তার কোথাও পালানোর জায়গা নেই, নেই নিরাপদ আশ্রয়, নেই আইনি মর্যাদা।

উত্তর তেহরানে থাকা এই নারী বলেন, “আমি তালেবান থেকে পালিয়ে এসেছি, কিন্তু এখানে আমাদের মাথার উপর বোমা পড়ছিল। কোথাও যাব, বুঝতে পারছিলাম না। অথচ নিরাপত্তার জন্যই এখানে এসেছিলাম।”

শামসির স্বামী আফগানিস্তানের সৈনিক ছিলেন। ২০২১ সালে তালেবান ক্ষমতা নেওয়ার পর ভয়ে তারা ইরানের পালিয়ে আসেন। অস্থায়ী একটি ভিসা নিয়ে এসেছিলেন, সেটা নবায়নও করতে পারেননি, কারণ নিজ দেশে ফেরত গিয়ে তালেবানের প্রতিশোধের ঝুঁকিতে পড়তে হবে তাদের।

ইরানে তাদের জীবনও সহজ ছিল না। নথিপত্রবিহীন হওয়ায় শামসির কর্মক্ষেত্রে কোনও সুরক্ষা নেই, কোনও ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই এবং কোনো সাহায্য পাওয়ার সুযোগ নেই। তেহরানে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে দেশে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, “ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া আমরা চলাফেরা করতে পারি না। তেহরানের প্রতিটি মোড়ে পুলিশ কড়া তল্লাশি চালায়।”

ইসরায়েল বোমা হামলা শুরু করার আগে তারা বিধি-নিষেধ এড়িয়ে খাবার কিনতে পারছিলেন, কিন্তু এখন তাও কঠিন।

ইরানে ৩৫ লাখ শরণার্থী রয়েছে, যার মধ্যে সাড়ে ৭ লাখের মতো আফগান শরণার্থী নিবন্ধিত, বাকিদের কোনও কাগজপত্র নেই।

তালেবান ক্ষমতায় ফিরলে ২০২১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সেনারা আফগানিস্তান থেকে চলে আসার পর হাজার হাজার আফগান সাংবাদিক, সৈনিক আশ্রয় খুঁজতে ইরানে চলে আসে।

শুধু তেহরান প্রদেশেই ১৫ লাখ আফগান শরণার্থী রয়েছে, যাদের বেশিরভাগই কাগজপত্রবিহীন। ইসরায়েলি হামলার সময় তারা অরক্ষিত অবস্থায় পড়েছিল।

তেহরান থেকে অনেকে ইরানের উত্তরে পালিয়ে গিয়েছিল। তবে শামসি এবং তার পরিবারের মতো আফগান শরণার্থীদের কোথাও যাওয়ার জায়গা ছিল না।

২২ জুন রাতে এক বিস্ফোরণে শামসিদের পাড়া কেঁপে ওঠে, পরিবারের অ্যাপার্টমেন্টের জানালা ভেঙে যায়। শামসি বলেন, “আমি রাত ৩টা পর্যন্ত জেগে ছিলাম। একটু ঘুম এসেছিল, কিন্তু ঘণ্টাখানেকের মধ্যে আরেকটি বিস্ফোরণে ঘুম ভেঙে যায়।”

তার ভবনের কাছে একটি পুরো আবাসিক ভবন গোলায় ধূলিসাৎ হয়ে গিয়েছিল। তাতে ভয় ধরেছিল শামসিদেরও।

“আমাদের ভবনেও যদি হয়, সেজন্য বাচ্চাদের জিনিসপত্র দিয়ে একটি ব্যাগ গুছিয়ে ফেলেছিলাম।”

কাতার ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ২৩ জুনের যুদ্ধবিরতি এই আফগান শরণার্থীদের জন্য স্বস্তি বয়ে এসেছে। কিন্তু অনেক সমস্যা এখনও রয়েছে।

শামসির পরিবারের প্রায় সব টাকা শেষ। তার নিয়োগকর্তা শহর ছেড়ে চলে গেছেন, ফোনও ধরছেন না। “আগে যখন আমি আমার বকেয়া মজুরি চেয়েছিলাম, তখন তিনি শুধু বলেছিলেন- ‘তুমি একজন আফগান অভিবাসী, বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও, বেরিয়ে যাও,” বলেন শামসি।

ইরানে আশ্রয় নেওয়া আফগানদের মধ্যে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনের এই যুদ্ধে বাস্তুচ্যুতির অনুভূতি পুনরায় জেগে উঠেছে।

ইরানি স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় নিহত ৬১০ জনের মধ্যে তিনজন আফগান শরণার্থী রয়েছেন। তারা হলেন- হাফিজ বোস্তানি, আব্দুলওয়ালি ও হাবিবুল্লাহ জামশিদি।

১৮ বছর বয়সী আব্দুলওয়ালি তেহরানের তেহরানপার্স এলাকার তাদের নির্মাণস্থলে ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন গত ১৮ জুন।

ইসরায়েলি হামলার পর অনেক আফগান এখনও নিখোঁজ। আফগানিস্তানের তাখার প্রদেশের হাকিমি আল জাজিরাকে বলেন, তিনি চার দিন ধরে ইরানে থাকা তার তিন নাতির কোনও খবর পাননি।

তিনি বলেন, তারা তেহরানের একটি নির্মাণস্থলে বেসমেন্টে আটকা পড়েছিল। তারা বেঁচে থাকলেও তাদের কোনও কাগজপত্র নেই। যদি তারা বেরিয়েও আসে, পুলিশ তাদের ধরে ফেরত পাঠাবে।

এক বিপদ থেকে আরেক বিপদে

যুদ্ধের সময় জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিনিধি রিচার্ড বেনেট ইরানে আফগান শরণার্থীদের সুরক্ষার জন্য সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। ।

আফগান অধিকারকর্মী লায়লা ফরুঘ মোহাম্মদী (যিনি এখন প্রবাসী) ইরানে আফগানদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা সোশাল মিডিয়ায় তুলে ধরেছিলেন।

তিনি বলেন, “বেশিরভাগেরই কোনও কাগজপত্র নেই এবং এটি তাদের একটি বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে ফেলে দিয়েছে। তারা নিয়োগকর্তাদের কাছ থেকে বকেয়া মজুরিও আদায় করতে পারছে না।”

ইরান-ইসরায়েল সংঘাতের মধ্যে আফগানদের সুরক্ষা দেওয়ার মতো কেউ যে নেই, তাও বলেন তিনি।

শেষ পর্যন্ত যারা ইরানের সবচেয়ে বিপজ্জনক এলাকা থেকে সরে যেতে পেরেছিল, তাদের বেশিরভাগই তা করতে পেরেছিল কিছু সংস্থার সহযোগিতায়।

ইউরোপীয় অর্গানাইজেশন ফর ইন্টিগ্রেশনের সহযোগী ‘আফগান উইমেন অ্যাক্টিভিস্টস কোঅর্ডিনেটিং বডি (এডব্লিউএসিবি)’ কিছু নারীকে পালাতে সহায়তা করে। তারা তেহরান, ইম্পাহান এবং কোমের মতো ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে তাদের ইরানের উত্তর-পূর্বের মাশহাদের মতো নিরাপদ শহরগুলোতে সরিয়ে নেয়।

এই প্ল্যাটফর্মের প্রতিষ্ঠাতা ড. প্যাটনি টাইচম্যান আল জাজিরাকে বলেন, “আমাদের সক্ষমতা সীমিত। আমরা শুধু এডব্লিউএসিবির সদস্যদেরই সহায়তা করতে পেরেছি। আমাদের ৪৫০ জন সদস্যের মধ্যে ১০৩ জনকে আমরা সরিয়ে নিয়েছিলাম, যাদের বেশিরভাগই আফগান নারী অধিকার কর্মী।”

ইরান সম্প্রতি নথিপত্রবিহীন প্রায় ২০ লাখ আফগানকে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর পরিকল্পনা ঘোষণা করেছে।

এই যুদ্ধ যে কষ্টকর অভিজ্ঞতা দিয়েছে, তাতে বিপদ জেনেও অনেকে আফগানিস্তানে ফেরত যেতে চাইছে।

ওয়ার্ল্ড ভিশন আফগানিস্তান জানিয়েছে, ১২ দিনের যুদ্ধের মধ্যে প্রতিদিন প্রায় ৭ হাজার করে শরণার্থী ইরান থেকে হেরাতের ইসলাম কালা সীমান্ত দিয়ে আফগানিস্তানে গেছে।

সংস্থাটির মাঠকর্মী মার্ক ক্যাল বলেন, “মানুষ কেবল তাদের গায়ের কাপড়টুকু নিয়ে এসেছিল। স্বদেশমুখী এই মুখগুলো ছিল আঘাতপ্রাপ্ত, বিভ্রান্ত।”

জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয় ইরানে আফগানদের মানবিক পরিস্থিতির অবনতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

ইসরায়েলি হামলা বন্ধ হয়ে গেলেও উত্তেজনা এখনও থামেনি। তাতে ইরান থেকে পালিয়ে আসা আফগানদের সংখ্যা বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।

কিন্তু দেশে ফিরলেই নিরাপদ? শামসির মতো অনেকের জন্য তাও নয়।

শামসি তার মেয়ের পাশে বসে একটি টিভিতে খবর দেখার ফাঁকে বলছিলেন, “আমরা নিরাপত্তার জন্য এখানে এসেছি।”

পরিস্থিতি খারাপ হলে কী করবেন- প্রশ্নে তার দ্বিধাহীন উত্তর আসে, “আমি এখানেই থাকব, তালেবানের কাছে ফিরে যেতে পারব না।”

তথ্যসূত্র : আল জাজিরা

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found