ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানিতে আরেকটি ধাক্কা এসেছে। এবার বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কাপড় আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ভারত।
শুক্রবার ভারতের বাণিজ্য ও শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে দেশটির বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর (ডিজিএফটি) এক প্রজ্ঞাপনে এ ঘোষণা দিয়েছে। তাৎক্ষণিকভাবে এ ঘোষণা কার্যকর হবে বলে জানিয়েছে ভারত সরকার।
ভারতের এমন সিদ্ধান্তে প্রতিবেশী দেশটিতে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি কমবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এ খাতের রপ্তানিকারকরা।
তারা বলছেন, এমনিতেই পাট খাত থেকে রপ্তানি আয়ের অবস্থা ভালো না। প্রতি বছরই এ খাত থেকে আয় কমছে। পাট খাত থেকে আয়ের ২৫ শতাংশের বেশি আসত ভারত থেকে। এখন ভারতে রপ্তানি বন্ধ হয়ে গেলে এ খাতের অবস্থা আরও খারাপ হবে।
যদিও ডিজিএফটির প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে এসব পণ্য নবসেবা বা জওহরলাল নেহরু সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারতে ঢুকতে পারবে। বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভুটানে এসব পণ্য রপ্তানিতে কোনও বিধিনিষেধ নেই বলেও প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, “তবে, এসব পণ্য পুনরায় রপ্তানি করা যাবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের মধ্য দিয়ে যেসব নেপাল ও ভুটানে যাবে, সেসব নেপাল বা ভুটান থেকে ভারতে যেতে পারবে না।”
ডিজিএফটি মহাপরিচালক অজয় ভাদু স্বাক্ষরিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আমদানি নিষিদ্ধ করা বাংলাদেশি পণ্যের মধ্যে রয়েছে কাঁচা পাট, পাটের রোল, পাটের সুতা ও বিশেষ ধরনের কাপড়।
“বাংলাদেশ থেকে শুধু নবসেবা সমুদ্রবন্দর দিয়ে এসব পণ্য রপ্তানি করা যাবে। কোনও স্থলবন্দর দিয়ে করা যাবে না।”
এর আগে গত ১৭ মে স্থলপথে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাকসহ বেশ কিছু পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করে ভারত।
সেদিন ডিজিএফটি এক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছিল, শুধু ভারতের নবসেবা ও কলকাতা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে দেশটির আমদানিকারকেরা বাংলাদেশ থেকে এসব পণ্য আমদানি করতে পারবেন।
পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামে ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন (এলসিএস)/ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট (আইসিপি) দিয়ে ফল, ফলের স্বাদযুক্ত পানীয়, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য, সুতা, সুতার উপজাত, আসবাবপত্র রপ্তানি করা যাবে না।
পশ্চিমবঙ্গের চ্যাংড়াবান্ধা ও ফুলবাড়ী শুল্ক স্টেশন বা এলসিএসের জন্যও এ সিদ্ধান্ত প্রযোজ্য হবে।
ভারতের এমন সিদ্ধান্তে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি কমবে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন অর্থনীতিবিদ ও রপ্তানিকারকরা।
তারা বলেছিলেন, নানা বাধাবিপত্তির মধ্যেও ভারতে রপ্তানি মোটামুটি ভালোই বাড়ছিল। ভারতে তৈরি পোশাকসহ যেসব পণ্য রপ্তানি হতো, তার সিংহভাগই যেত স্থলপথে। এতে পরিবহন খরচ কম পড়ত। রপ্তানিকারকরা লাভবান হতেন। এখন আর সেটা হবে না। সামগ্রিকভাবে রপ্তানি কমে যাবে। যে সরবরাহ শৃঙ্খলা বহু বছর ধরে গড়ে উঠেছে, তা চাপের মুখে পড়বে।
বাংলাদেশ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধ করার এক মাস পর ওই পদক্ষেপ নিয়েছিল ভারত। সর্বশেষ পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কয়েকটি বিশেষ ধরনের কাপড় আমদানির ক্ষেত্রেও একই সিদ্ধান্ত নিল ভারত সরকার।
পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হাল
ভারতে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে বেশ ভালোই আয় করছিল বাংলাদেশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যে দেখা যায়, গত ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে মোট ১৫৬ কোটি ৯২ লাখ ৪০ হাজার (১.৫৭ বিলিয়ন) ডযলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদশ। এর মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে আসে ২২ কোটি ৪৬ লাখ ৮০ হাজার ডলার। আর কটন ও কটন প্রোডাক্টস থেকে (কাপড়) রপ্তানি থেকে আয় হয় ৩ কোটি ১৩ লাখ ৪০ হাজার ডলার।
৩০ জুন ২০২৪-২৫ অর্থ বছর শেষ হবে। এই আর্থিক বছরের ১১ মাসের (জুলাই-মে) তথ্য প্রকাশ করেছে ইপিবি। তাতে দেখা যায়, এই ১১ মাসে ভারতে ১৬৬ কোটি ৪৩ লাখ ২০ হাজার (১.৬৬ বিলিয়ন) ডলারের বিভিন্ন ধরনের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে আয় হয়েছে ১৯ কোটি ৭৮ লাখ ৯০ হাজার ডলার। আর কটন ও কটন প্রোডাক্টস (কাপড়) রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ২ কোটি ৭৬ লাখ ২০ হাজার ডলার।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে ৮৫ কোটি ৫২ লাখ ৩০ হাজার ডলার আয় হয়েছে, যা ছিল আগের অর্থ বছরের চেয়ে ৬ দশমিক ১৮ শতাংশ কম।
আর বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের ১১ মাসে অর্থাৎ জুলাই-মে সময়ে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে মোট ৭৬ কোটি ৯০ লাখ ১০ হাজার ডলার আয় হয়েছে, যা গত অর্থ বছরের একই সময়ের চেয়ে ৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ কম।
বাংলাদেশের সোনালি আঁশ পাটের ‘সোনালি দিন’ ফিরে আসার হাতছানি দেখা দিয়েছিল ২০২০-২১ অর্থ বছরে। ওই অর্থ বছরে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ১১৬ কোটি ১৫ লাখ (১.১৬ বিলিয়ন) ডলারের পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে রপ্তানি তালিকায় চামড়াকে পেছনে ফেলে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছিল এই খাত। আগের অর্থ বছরের (২০১৯-২০) চেয়ে রপ্তানি বেড়েছিল ৩১.৬৩ শতাংশ। এরপর প্রতি বছরই কমছে।
‘এখনও যেসব পাটকল আছে, সেগুলো পড়বে বিপদে’
বাংলাদেশ পাটপণ্য রপ্তানিকারক সমিতির (বিজেজিইএ) চেয়ারম্যান সাজ্জাদ হোসাইন সোহেল সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “এমনিতেই গত কয়েক বছর ধরে রপ্তানির হাল ভালো না। প্রতি বছরই পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে আয় কমছে। বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) পাটকলগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এক সময় এই কারখানাগুলোর পণ্য রপ্তানি করত বিজেএমসি। সার্বিকভাবে পাট খাতের অবস্থা খুবই খারাপ।”
তিনি বলেন, “পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে যে আয় তার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ কিন্তু আসে ভারত থেকে। এখন সেই রপ্তানি যদি বন্ধ হয়ে যায়, পাট খাত থেকে রপ্তানি আয় আরও কমে যাবে। নানা সঙ্কটের মধ্যে যে বেসরকারি পাটকলগুলো এখনও চালু আছে, সেগুলো বিপদে পড়বে।”
সাজ্জাদ সোহেল বলেন, “ভারতে বেশিরভাগ পণ্য বেনাপোলসহ কয়েকটি স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি হয়। পাট ও পাটজাত পণ্য সবই এসব স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি হয়। এতে পরিবহন খরচ কম পড়ে। নবসেবা সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারতে কখনোই কোনও পাট পণ্য রপ্তানি হয়নি। সে বিবেচনায় বলা যায়, ভারতে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল।”



