Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

ভারতে রপ্তানি কমছে

বেনাপোল স্থলবন্দর : ফাইল ছবি
বেনাপোল স্থলবন্দর : ফাইল ছবি
[publishpress_authors_box]

গত বছর অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক বৈরিতার দিকে গড়ালেও বাণিজ্যে তার প্রভাব পড়ছিল না; বরং রপ্তানি বাড়ছিলই। তবে ভারত স্থলপথে পণ্য নেওয়া বন্ধ করে দেওয়ার পর এখন বেশ ভালোই প্রভাব দেখা যাচ্ছে; দিন যত যাচ্ছে, রপ্তানি ততই কমছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) বৃহস্পতিবার রপ্তানি আয়ের দেশভিত্তিক যে তথ্য প্রকাশ করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) পাশের দেশ ভারতে ৬৩ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে বাংলাদেশ, যা গত অর্থ বছরের একই সময়ের চেয়ে ২ দশমিক ৬০ শতাংশ কম।

এই চার মাসে দেশটিতে পোশাক রপ্তানি কমেছে অরও বেশি, ৫ দশমিক ২৬ শতাংশ। ভারতে পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ যে বিদেশি মুদ্রা আয় করে তার প্রায় অর্ধেকই আসে তৈরি পোশাক রপ্তানি করে।

জুলাই-অক্টোবর সময়ে ভারতে ২৭ কোটি ৯৮ লাখ ৭০ হাজার ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে; গত অর্থ বছরের একই সময়ে রপ্তানির অঙ্ক ছিল ২৬ কোটি ৫১ লাখ ৪০ হাজার ডলার।

ছয় মাস আগে প্রথমে স্থলপথে বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি নিষিদ্ধ করে ভারত। এরপর স্থলবন্দর দিয়ে পাট ও পাটজাত পণ্য আমদানিতেও নিষেধাজ্ঞা দেয়। সবশেষ স্থলপথে পাট ও পাটজাতীয় পণ্যের কাপড়, পাটের দড়ি বা রশি, পাটজাতীয় পণ্য দিয়ে তৈরি দড়ি বা রশি এবং পাটের বস্তা বা ব্যাগ আমদানিতেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে নরেন্দ্র মোদী সরকার।

এর ফলে এখন চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য ছাড়া আর কোনও পণ্য স্থলপথে ভারতে রপ্তানি করতে পারছে না বাংলাদেশ।

এমন পরিস্থিতিতে আশঙ্কা করা হয়েছিল, প্রতিবেশী দেশটির বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি কমে যাবে। কারণ, সমুদ্রপথ ব্যবহার করে ভারতে রপ্তানির ক্ষেত্রে সময় বেশি লাগে।

বাস্তবে এখন তাই হচ্ছে। এ সব নিষেধাজ্ঞার প্রভাবই রপ্তানিতে পড়ছে জানিয়ে ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই অবস্থা চলতে থাকলে সামনে রপ্তানি আরও কমবে।

অথচ এই বাজারে বেশ ভালো প্রবৃদ্ধি নিয়েই শেষ হয়েছিল ২০২৪-২৫ অর্থ বছর। ওই আর্থিক বছরে ভারতে ১৭৬ কোটি ৪২ লাখ (১.৭৬ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিল বাংলাদেশ, যা ছিল আগের অর্থ বছরের (২০২৩-২৪) চেয়ে ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি।

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরও শুরু হয় সেই ইতিবাচক ধারায়; প্রথম মাস জুলাইয়ে ভারতে ১৪ কোটি ৭১ লাখ ৯০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ, যা ছিল গত অর্থ বছরের একই সময়ের বেশি ১০ দশমিক ৭১ শতাংশ বেশি।

দুই মাসে অর্থাৎ জুলাই-আগস্টে প্রবৃদ্ধি হয় ৮ দশমিক শূন্য চার শতাংশ। ওই দুই মাসে ভারতে রপ্তানি হয় ৩১ কোটি ১৩ লাখ ৩০ হাজার ডলারের পণ্য।

কিন্তু তৃতীয় মাসে এসে হোঁচট খায়। অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে (তিন মাস, জুলাই-সেপ্টেম্বর) দেশটিতে ৪৮ কোটি ৩৭ লাখ ১০ হাজার ডলারের পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ, যা গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১ দশমিক ২৯ শতাংশ কম।

চার মাসে (জুলাই-অক্টোবর) কমেছে আরও বেশি, ২ দশমিক ৬০ শতাংশ।

ভারতে প্রধান রপ্তানি পণ্য হচ্ছে তৈরি পোশাক, পাট ও পাটজাতপণ্য, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য এবং প্লাস্টিক দ্রব্য। এছাড়া কিছু সুতা ও বস্ত্রজাত পণ্যও রপ্তানি হয়। প্রতিবেশী দেশটিতে মোট রপ্তানির প্রায় অর্ধেকই তৈরি পোশাক।

গত ১৭ মে ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্য অধিদপ্তর (ডিজিএফটি) ঘোষণা দেয়, শুধু ভারতের নবসেবা ও কলকাতা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে দেশটির আমদানিকারকেরা বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক আমদানি করতে পারবেন।

পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে ভারতের আসাম, মেঘালয়, ত্রিপুরা ও মিজোরামে ল্যান্ড কাস্টমস স্টেশন (এলসিএস)/ইন্টিগ্রেটেড চেকপোস্ট (আইসিপি) দিয়ে ফল, ফলের স্বাদযুক্ত পানীয়, কোমল পানীয়, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক পণ্য, সুতা, সুতার উপজাত, আসবাবপত্র রপ্তানি করা যাবে না।

কারখানায় কর্মরত এক পোশাক শ্রমিক। ছবি : সকাল সন্ধ্যা

পশ্চিমবঙ্গের চ্যাংড়াবান্ধা ও ফুলবাড়ী শুল্ক স্টেশন বা এলসিএসের জন্যও একই সিদ্ধান্ত জানানো হয়।

এর পর গত ২৭ জুন বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে পাট ও পাটজাত পণ্য এবং কাপড় আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা দেয় ভারত।

ভারতে প্রায় সব পণ্যই স্থলপথে রপ্তানি হয়। এর মধ্যে বেশিরভাগই যেত বেনোপোল স্থলবন্দর দিয়ে।

ভারতে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির তালিকায় পাট ও পাটজাত পণ্য অন্যতম প্রধান। দেশটিতে মোট রপ্তানি আয়ের ২৫ শতাংশের মতো আসে এই খাত থেকে।

১৭ মের প্রজ্ঞাপনে ডিজিএফটি জানায়, বাংলাদেশ থেকে এসব পণ্য নবসেবা বা জওহরলাল নেহরু সমুদ্রবন্দর দিয়ে ভারতে ঢুকতে পারবে। বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের মধ্য দিয়ে নেপাল ও ভুটানে এসব পণ্য রপ্তানিতে কোনও বিধিনিষেধ নেই।

তবে এসব পণ্য পুনরায় রপ্তানি করা যাবে না। অর্থাৎ বাংলাদেশ থেকে স্থলবন্দর দিয়ে ভারতের মধ্য দিয়ে যেসব পণ্য নেপাল ও ভুটানে যাবে, সেসব পণ্য নেপাল বা ভুটান থেকে ভারতে যেতে পারবে না।

ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, চলতি অর্থ বছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে ভারতে ৬৩ কোটি ৩৬ লাখ ৫০ হাজার ডলারের যে পণ্য রপ্তানি হয়েছে, তার মধ্যে ২৭ কোটি ৯৮ লাখ ৭০ হাজার ডলার এসেছে তৈরি পোশাক রপ্তানি থেকে। পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি থেকে এসেছে ৪ কোটি ২৬ লাখ ৫০ হাজার ডলার।

চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে ২ কোটি ৯৮ লাখ ৭০ হাজার ডলারের বিদেশি মুদ্রা দেশে এসেছে। এছাড়া প্লাস্টিক দ্রব্য থেকে ১ কোটি ৯৭ লাখ ১০ হাজার এবং কটন ও কটন প্রোডাক্টস থেকে ২ কোটি ১৮ লাখ ৬০ হাজার ডলার এসেছে।

অপ্রচলিত বাজার হিসাবে ভারতে তৈরি পোশাক রপ্তানি বাড়ছিল চোখে পড়ার মতো করে। পোশাক রপ্তানিকারকরা আশা করেছিলেন, গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ভারতে ১ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি হবে। সামগ্রিক রপ্তানি আবার ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে।

কিন্তু গত বছরের জুলাই মাসে অর্থ বছরের শুরুতেই বাংলাদেশে কোটা সংস্কার নিয়ে আন্দোলন শুরু হয়। তা আগস্টের শুরুতেই গণবিস্ফোরণে রূপ নিলে পতন ঘটে শেখ হাসিনার সরকারের। তিনি আশ্রয় নেন ভারতে।

এরপর থেকে ঢাকা-নয়াদিল্লি কূটনৈতিক টানাপড়েন চলছেই। এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে বাংলাদেশ স্থলবন্দর দিয়ে ভারত থেকে সুতা আমদানি বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেয়।

তার জেরেই ভারত সরকার ধাপে ধাপে স্থলপথে বাংলাদেশ থেকে পণ্য আমদানি নিষিদ্ধ করছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি এখন ৮০০ কোটি (৮ বিলিয়ন) ডলারের মতো। অর্থাৎ বাংলাদেশ যত পণ্য আমদানি করে, তার অনেক কমই রপ্তানি করে থাকে।

চট্টগ্রাম বন্দর। ফাইল ছবি
চট্টগ্রাম বন্দর। ফাইল ছবি

অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ২০২২-২৩ অর্থ বছরে ভারতে ২১৩ কোটি (২.১৩ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি হয়েছিল। ভারতে পণ্য রপ্তানি করে ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি আয় বাংলাদেশের সেটাই প্রথম।

ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ভারত ছিল বাংলাদেশের অষ্টম বড় রপ্তানি বাজার। এই আর্থিক বছরে ভারতে ১৭৬ কোটি ৪২ লাখ (১.৭৬ বিলিয়ন) ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছিলেন বাংলাদেশের বিভিন্ন খাতের রপ্তানিকারকরা, যা ছিল আগের অর্থ বছরের চেয়ে ১২ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি।

গত অর্থ বছরে ভারত থেকে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৩ দশমিক ৬৫ শতাংশ আসে। ভারতের তুলনায় বাংলাদেশের বড় বাজারগুলো হলো— যুক্তরাষ্ট্র, জার্মানি, যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স, নেদারল্যান্ডস ও পোল্যান্ড।

ভারতের বাজারসহ বিভিন্ন দেশে পোশাক রপ্তানি করে এম বি নিট ফ্যাশন লিমিটেড।

প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও নিট পোশাক শিল্পমালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “সব মিলিয়ে এই মুহূর্তে আমরা ভালো অবস্থায় নেই। ট্রাম্প শুল্কের ধাক্কা লেগেছে আমাদের পোশাক রপ্তানিতে। টানা তিন মাস ধরে (আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর) কমছে রপ্তানি; সাম্প্রতিক সময়ে এমনটি দেখা যায়নি।

“এ সবের প্রভাব যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপের বড় বাজারের পাশাপাশি ভারতের বাজারেও পড়েছে। তবে, বড় বাজারে এখন প্রবৃদ্ধি আছে। কিন্তু ভারতে নেকিবাচক (মাইনাস-ঋণাত্মক) প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।”

মোহাম্মদ হাতেম বলেন, “ভারতে আমাদের রপ্তানি আস্তে আস্তে ভালোই বাড়ছিল। এক সময় সামগ্রিক রপ্তানি ২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। পোশাক রপ্তানি প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি গিয়ে ঠেকেছিল। কিন্তু এখন একটা বড় ধাক্কা খেলাম আমরা।”

খাদ্যপণ্য এখন শুধু ভোমরা ও হিলি স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানির সুযোগ রেখেছে ভারত। সমুদ্রপথেও রপ্তানি করা যায়। বাকি সব স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানিতে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

ভারতে খাদ্যপণ্যের বড় রপ্তানিকারক প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ। গ্রুপটি গত বছরের জুলাই-অক্টোবরের সময়ে তুলনায় এবার ভারতে ২০ শতাংশ কম রপ্তানি করেছে।

জানতে চাইলে প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের বিপণন পরিচালক কামরুজ্জামান কামাল সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “ঘুরপথে পণ্য পাঠাতে ৮ থেকে ৯ শতাংশ খরচ বেড়েছে। এ পরিস্থিতিতে দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে এটা সমাধান করা উচিত।”

বিধিনিষেধের আগে বাংলাদেশ থেকে সমুদ্রপথে ভারতে রপ্তানি হতো ৩০ শতাংশ পোশাক। স্থলবন্দর দিয়ে রপ্তানি হতো ৬৯ শতাংশ। প্রায় ১ শতাংশের কাছাকাছি যেত আকাশপথে।

বিধিনিষেধের পর এখন প্রায় সব পোশাকই যাচ্ছে সমুদ্রপথে।

তবে পাটপণ্য রপ্তানিতে বিপর্যয় নেমে এসেছে। ভারতে বাংলাদেশি পাটপণ্য রপ্তানি হতো মূলত স্থলবন্দর দিয়ে। দু-একটি চালান যেত চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দিয়ে। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, এখন পাটপণ্য শুধু সমুদ্রপথে ভারতের মুম্বাইয়ের নভোসেবা বন্দর দিয়ে রপ্তানি করতে হচ্ছে।

ইপিবির তথ্যে দেখা যায়, বিধিনিষেধের আগে গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে ভারতে পাট ও পাটজাত পণ্য রপ্তানি হয়েছিল ৬ কোটি ১ লাখ ডলারের।

বিধিনিষেধের পর ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের জুলাই-অক্টোবর সময়ে তা ৪ কোটি ২৬ লাখ ডলারে নেমে এসেছে।

বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ প্রথম আরোপ করে ভারত।

গত ৮ এপ্রিল বাতিল করা হয় বাংলাদেশকে দেওয়া ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা, যার আওতায় ভারতের বিমানবন্দর ব্যবহার করে তৃতীয় দেশে পণ্য রপ্তানির সুবিধা পেত বাংলাদেশ। ১৫ এপ্রিল ভারত থেকে স্থলবন্দর দিয়ে সুতা আমদানি বন্ধ করে দেয় বাংলাদেশ।

এরপর স্থলপথে পণ্য রপ্তানিতে একের পর বিধিনিষেধ আরোপ করতে থাকে ভারত।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found