একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে। এই পাঁচ ব্যাংকের ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়ে আপাতত বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনও কিছুই করার নেই; তবে সরকার চাইলে তাদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয় বিবেচনা করতে পারে বলে বলে জানিয়েছে ব্যাংক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।
বৃহস্পতিবাররাতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, আন্তর্জাতিক সর্বোত্তম চর্চার সঙ্গে সংগতি রেখে আইএমএফ (আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল), বিশ্বব্যাংক, এফসিডিওর কারিগরি সহায়তা ও মতামতসমূহ বিবেচনায় নিয়ে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫ তৈরি করা হয়েছে। এ রেজল্যুশন অধ্যাদেশের আওতাধীন ব্যাংকসমূহের আমানতকারী, শেয়ারহোল্ডারসহ বিবিধ পাওনাদারের অধিকারের বিষয়টি সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে।
ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর ধারা ১৬ (২) (ট), ২৮ (৫), ৩৭ (২) (গ) এবং ৩৮ (২) অনুযায়ী, বাংলাদেশ ব্যাংক রেজল্যুশন টুলস প্রয়োগের সঙ্গে সংগতি রেখে রেজল্যুশনের অধীন তফসিলি ব্যাংকের শেয়ারধারী, দায়ী ব্যক্তি, অ্যাডিশনাল টিয়ার ১ মূলধন ধারক এবং টিয়ার ২ মূলধন ধারক ব্যতীত সাব–অর্ডিনেটেড ডেট হোল্ডারের ওপর লোকসান আরোপ করতে পারবে।
“এ ছাড়া ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, ২০২৫–এর ধারা ৪০-এ অবসায়ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রেজল্যুশনের অধীন থাকা ব্যাংককে বিলুপ্ত করা হলে শেয়ারধারীরা যে পরিমাণ ক্ষতির সম্মুখীন হতেন, তার চেয়ে অধিক ক্ষতির সম্মুখীন হলে তাদের ক্ষতির পরিমাণের পার্থক্যের জন্য ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
“ওই ধারা অনুযায়ী, রেজল্যুশনের প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিযুক্ত কোনও স্বতন্ত্র পেশাদার মূল্যায়নকারী কর্তৃক সম্পাদিত মূল্যায়নের ভিত্তিতে শেয়ারধারীরা কোনও ক্ষতিপূরণ প্রাপ্য হলে তা দেওয়া যাবে।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, “আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত একিউআর এবং বিশেষ পরিদর্শনে প্রাপ্ত তথ্যগুলো বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব ব্যাংক বিশাল লোকসানে রয়েছে এবং তাদের নিট সম্পদমূল্য ঋণাত্মক। গত সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত ব্যাংকিং সেক্টর ক্রাইসিস ম্যানেজমেন্ট কমিটির সভায় ‘৫টি সঙ্কটাপন্ন ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের রেজ্যুলেশন প্রক্রিয়ায় ব্যাংকের লোকসানের দায়ভার বহন করতে হবে’ মর্মে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
“এমন প্রেক্ষাপটে পাঁচটি ব্যাংক একীভূতকরণের ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারী বা শেয়ারধারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয় বিবেচনার কোনও সুযোগ আপাতত নেই। তবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী বা শেয়ারধারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে তাদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করতে পারে।”

একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা শরিয়াহভিত্তিক পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে। পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বৃহস্পতিবার এসব ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন স্থগিতের সিদ্ধান্ত জানিয়েছে। পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর শেয়ার লেনদেন স্থগিত থাকবে।
দেশের দুই পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) বৃহস্পতিবার সকালে লেনদেন শুরুর আগেই তাদের ওয়েবসাইটে এই পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার লেনদেন স্থগিতের ঘোষণা দয়।
শেয়ার লেনদেন স্থগিত হওয়া ব্যাংকগুলো হলো- ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক (এসআইবিএল), এক্সিম ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক।
এমনিতেই টানা দরপতনে পুঁজি হারিয়ে দিশেহারা বিনিয়োগকারীরা। অন্যদিকে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত এই পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা ও লেনদেন স্থগিত করায় তা নিয়েও উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে।
সব মিলিয়ে পুঁজিবাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে; ফের রাস্তায় নেমেছেন ছোট বিনিয়োগকারীরা। পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা ও লেনদেন স্থগিতের প্রতিবাদে বৃহস্পতিবার মতিঝিলে ডিএসই ভবনের সামনে মানববন্ধন করেছেন ছোট বিনিয়োগারীরা।
মানববন্ধন থেকে ১১ নভেম্বর মঙ্গলবার দুপুর ২টায় পাঁচ ব্যাংকের বিনিয়োগকারী ও আমানতকারীদের নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ঘেরাও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।
বৃহস্পতিবার লেনদেন স্থগিত করার কারণ হিসেবে ডিএসই থেকে জানানো হয়েছে, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ধারা ১৫ অনুসারে ৫ নভেম্বর থেকে ব্যাংকগুলোকে অকার্যকর হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে।
ডিএসই আরও জানিয়েছে, ব্যাংকগুলো জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ৫ নভেম্বর চিঠির মাধ্যমে নির্দেশ দিয়েছে ব্যাংকগুলো এখন থেকে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫ অনুসারে পরিচালিত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক আরেকটি চিঠির মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদও ভেঙে দিয়েছে।
বুধবার এই পাঁচ ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দিয়ে তাদের দায়িত্ব নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। পর্ষদ ভেঙে দেওয়ার পরপরই ব্যাংকগুলোয় প্রশাসকও নিয়োগ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

এ উপলক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর ব্যাংকগুলোর শেয়ারের মূল্য শূন্য ঘোষণা করেন। তিনি জানান, ব্যাংকগুলোর বর্তমান যে আর্থিক পরিস্থিতি, তাতে শেয়ারধারীরা অর্থ পাবেন না।
গভর্নর বলেন, “পাঁচ ব্যাংকের শেয়ারহোল্ডারদের ইকুইটির মূল্য এখন শূন্যের নিচে। ফলে শেয়ারগুলোর ভ্যালু জিরো হিসেবে বিবেচিত হবে। কাউকে কোনও ধরনের ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে না।”
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের এই ঘোষণার পর বুধবার বিকাল থেকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন দেখা দেয়। বৃহস্পতিবার লেনদেন শুরুর আগেই এই ব্যাংক পাঁচটির লেনদেন স্থগিতের কথা জানায় বিএসইসি।
যদিও শেয়ারবাজার–সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিএসইসি বেশ বিলম্ব করেছে। ফলে বিনিয়োগকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে যখন এসব ব্যাংক একীভূত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তখন বিএসইসি ব্যাংকগুলোর লেনদেন স্থগিতের সিদ্ধান্ত নিলে নতুন করে কোনও বিনিয়োগকারী ক্ষতিগ্রস্ত হতেন না।
এদিকে পুঁজিবাজারে দরপতন চলছেই; সপ্তাহজুড়েই সূচক পড়েছে দুই বাজারে। কমেছে লেনদেনের অঙ্ক।
দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স বুধবার আবার ৫ হাজার পয়েন্টের মাইলফলকের নিচে নেমে আসে।
সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার ডিএসইএক্স আর ১৯ পয়েন্টে কমে ৪ হাজার ৯৬৮ পয়েন্টে নেমেছে। অন্য সূচকগুলোর মধ্যে ডিএসই শরিয়াহ সূচক ডিএসইএস ৫ পয়েন্ট কমে ১ হাজার ৩৯ পয়েন্টে এবং ডিএসইর বাছাই করা ৩০ কোম্পানির শেয়ার নিয়ে গঠিত ডিএসই-৩০ সূচক আগের দিনের মতো ১ হাজার ৯৪১ পয়েন্টে স্থির রয়েছে।
অপর বাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সিএসসিএক্স সূচক আগের দিনের চেয়ে ৩৭ দশমিক ১৭ পয়েন্ট কমে অবস্থান করছে ৮ হাজার ৬১৫ পয়েন্টে। সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৭০ দশমিক ১২ পয়েন্ট কমে ১৩ হাজার ৯৫৮ পয়েন্টে, শরিয়াহ সূচক ৩ দশমিক ১৭ পয়েন্ট কমে ৮৭৪ পয়েন্টে এবং সিএসই ৩০ সূচক ৫৯ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট কমে ১২ হাজার ৪১৩ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
টানা দরপতনের মধ্যে পাঁচ ব্যাংক একীভূত করার প্রক্রিয়ায় পুঁজিবাজারের ক্ষুদ্র শেয়ারধারীদের ভাগ্য নিয়ে বিতর্ক ও প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।
এর আগে গত ১৩ অক্টোবর অর্থ মন্ত্রণালয় একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এমন কোনও সিদ্ধান্ত সরকার গ্রহণ করেনি এবং একীভূত করার প্রক্রিয়ায় বিনিয়োগকারীদের স্বার্থের বিষয়টি সরকার গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছে।
এমন পরিস্থিতিতে বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংক এই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। এতে পরিস্কার করে বলা হয়েছে, অধ্যাদেশ অনুযায়ী, পাঁচ ব্যাংক একীভূতকরণের ক্ষেত্রে সাধারণ বিনিয়োগকারী/শেয়ারধারীদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয় বিবেচনার কোনও সুযোগ আপাতত নেই।
“তবে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী/শেয়ারধারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে তাদের ক্ষতিপূরণ প্রদানের বিষয়টি সরকার বিবেচনা করতে পারে।”



