Beta
সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
Beta
সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

বিদেশি ঋণ : যা আসছে, চলে যাচ্ছে তার বেশি

SS-US-dollars-120824
[publishpress_authors_box]

বিদেশি ঋণ পরিস্থিতিতে নাজুক অবস্থা দেখা দিয়েছে; যা আসছে তার চেয়ে বেশি চলে যাচ্ছে আগে নেওয়া ঋণের সুদ-আসল পরিশোধে। অর্থাৎ দেশে যত বিদেশি ঋণ আসছে, আগে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধে তার তুলনায় বেশি অর্থ খরচ করতে হচ্ছে।

আর এতে বিদেশি সাহায্যপুষ্ট প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারছে না সরকার; উন্নয়ন কাজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। বিদেশি ঋণপ্রাপ্তির চেয়ে পরিশোধ বেশি হওয়া অবশ্যই উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।

বৃহস্পতিবার অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকের (তিন মাস, জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিদেশি ঋণ পরিস্থিতি সম্পর্কে হালনাগাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে।

তাতে দেখা যায়, এই তিন মাসে বিশ্ব ব্যাংক, এডিবি ও জাইকাসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে ১১৪ কোটি ৮৬ লাখ (১.১৫ বিলিয়ন) ডলার ঋণ পেয়েছে বাংলাদেশ। একই সময়ে পুঞ্জীভূত পাওনা থেকে অর্থাৎ বিভিন্ন সময়ে নেওয়া ঋণের সুদ-আসল বাবদ দাতাদের পরিশোধ করতে হয়েছে ১২৮ কোটি (১.২৮ বিলিয়ন) ডলার।

এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, ঋণ পাওয়ার চেয়ে পরিশোধ করতে হয়েছে ১১ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেশি।

ইআরডির তথ্যে দেখা যায়, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বিদেশি ঋণের আসল বাবদ শোধ করা হয়েছে ৮৬ কোটি ১৯ লাখ ডলার; সুদ পরিশোধ করা হয়েছে ৪৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের এই তিন মাসে বিদেশি ঋণের আসল বাবদ শোধ করা হয়েছিল ৬৮ কোটি ৫৫ লাখ ডলার; সুদ পরিশোধ করা হয় ৪৪ কোটি ১০ লাখ ডলার।

এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এই অর্থ বছরের প্রথম প্রান্তিকে আসল পরিশোধ বেড়েছে ১৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। আর সুদ পরিশোধ বেড়েছে ৫ শতাংশ।

ইআরডির তথ্য বলছে, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে সুদ—আসল পরিশোধ বাবদ মোট ১৫ হাজার ৫৯২ কোটি টাকা চলে গেছে। তবে প্রতি ডলার কতো টাকা ধরে হিসাব করা হয়েছে, তা জানানো হয়নি।

গত বছরের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর বিশ্ব ব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলসহ (আইএমএফ) উন্নয়ন সহযোগীদের অনেকে বাংলাদেশকে কয়েকশ কোটি ডলার ঋণ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার যেসব সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে, তার বাস্তবায়নে সহায়তা করতে মূলত অতিরিক্ত ঋণ দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।

গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের শেষের দিকে সেই প্রতিশ্রুত ঋণের একটি মোটা অঙ্ক পেয়েছিল বাংলাদেশ; অর্থ বছরের শেষ মাস জুনেই প্রায় ৪০০ কোটি (৪ বিলিয়ন) ডলার ছাড় করেছিল দাতারা।

তবে চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে ছাড় করা হয়েছে কম অর্থ। বিপরীতে এ সময়ে দেশকে নিয়মিতভাবে বিদেশি ঋণ পরিশোধ করতে হয়েছে।

সাধারণত বাংলাদেশের জন্য যে পরিমাণ বিদেশি ঋণ ছাড় করা হয়, ঋণ পরিশোধ হয় তার চেয়ে কম। ইআরডি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের প্রথম দিকেও বিদেশি ঋণছাড় কম হয়েছিল; পরিশোধ ছিল বেশি।

ইআরডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, গত এক দশক বাংলাদেশ অনেকগুলো মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক ঋণ গ্রহণ করেছে। এখন সেসব ঋণের সুদসহ পরিশোধ করতে হচ্ছে। ফলে এখন ঋণ দাতাদের কাছে পরিশোধের চাপও বেড়েছে। আগামীতে এই চাপ আরও বাড়তে পারে।

চলতি অর্থ বছরে দাতাদের প্রায় ৫০০ কোটি (৫ বিলিয়ন) ডলারের কাছাকাছি পাওনা পরিশোধ করতে হতে পারে বলে জানান তারা।

গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধে রেকর্ড গড়েছে বাংলাদেশ; অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ৪০৯ কোটি (৪.০৯ বিলিয়ন) ডলার পরিশোধ করেছিল।

এর আগে কখনও এত ঋণ শোধ করা হয়নি। আগের অর্থ বছরে (২০২৩-২৪) ৩৩৭ কোটি (৩.৩৭ বিলিয়ন) ডলার ঋণ পরিশোধ করা হয়েছিল।

সবচেয়ে বেশি ছাড় বিশ্ব ব্যাংকের

চলতি অর্থ বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থা ১১৪ কোটি ৮৬ লাখ (১.১৫ বিলিয়ন) ডলারের যে ঋণ ছাড় করেছে, তারমধ্যে সবচেয়ে বেশি দিয়েছে বিশ্ব ব্যাংক, ৩২ কোটি ২৬ লাখ ৩০ হাজার ডলর। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩১ কোটি ৫৪ লাখ ডলার দিয়েছে রাশিয়া।

এছাড়া এডিবি দিয়েছে ১৮ কোটি ৭৭ লাখ ২০ হাজার ডলার। ভারত ও জাপান ছাড় করেছে যথাক্রমে ৬ কোটি ২৮ লাখ ৩০ হাজার ও ৪ কোটি ৬ রাখ ৭০ হাজার ডলার।

এক যুগে বিদেশি ঋণ শোধ বেড়েছে চার গুণ

কয়েক বছর ধরেই বিদেশি ঋণ পরিশোধ ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ইআরডির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১২-১৩ অর্থবছরে সব মিলিয়ে ১১০ কোটি (১.১০ বিলিয়ন) ডলার ঋণ পরিশোধ করেছিল বাংলাদেশ।

১০ বছর পর ২০২১-২২ অর্থবছরে ঋণ পরিশোধ বেড়ে প্রায় দ্বিগুণ ২০১ কোটি (২.০১ বিলিয়ন) ডলারে উন্নীত হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে তা পৌনে ২৭৫ কোটি (২.৭৫ বিলিয়ন) ডলারে পৌঁছায়।

২০২৩-২৪ অর্থবছরে বিদেশি ঋণ পরিশোধ বাবদ ৩৩৭ কোটি (৩.৩৭ বিলিয়ন) ডলার দিতে হয়েছে বাংলাদেশকে। সবশেষ গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে গেছে ৪০৯ কোটি (৪.০৯ বিলিয়ন) ডলার।

হিসাব বলছে, গত এক যুগে বিদেশি ঋণ পরিশোধ বেড়ে প্রায় চার গুণ হয়েছে।

ভবিষ্যতে ঋণের চাপ আরও বাড়বে। কারণ, বেশ কয়েকটি বড় প্রকল্পের ঋণের সুদ ও আসল পরিশোধ শুরু হচ্ছে। যেমন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, হজরত শাহজালাল (রহ.) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পের ঋণের কিস্তি শুরু হচ্ছে শিগগিরই। জাপানকে এ অর্থ দিতে হবে।

এদিকে কর্ণফুলী নদীর তলদেশে টানেল নির্মাণ ও মেট্রোরেল প্রকল্পের ঋণের কিস্তি শুরু হয়েছে।

ইআরডির কর্মকর্তারা বলছেন, বড় বড় মেগা প্রকল্পের ঋণের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে হওয়ায় বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপ বাড়ছে। তবে বিদেশি ঋণ নিয়ে চাপ কমাতে সম্প্রতি কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ইআরডি সূত্রে জানা গেছে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের জন্য নেওয়া ঋণের আসল শোধ শুরু হওয়ার কথা ২০২৭ সালের মার্চ মাসে। এটি আরও দুই বছর পেছানোর প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া বেইজিংয়ের কাছ থেকে চীনা মুদ্রায় ৫০০ কোটি ডলারের সমপরিমাণ একটি ঋণ নেওয়ার বিষয়ে ‘ধীরে চলো’ নীতি অবলম্বন করেছে ঢাকা।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় এসে বিদেশি ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রে আরও সতর্ক হতে কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিয়েছে। বিদেশি ঋণ নেওয়ার সময় সুদের হার, কিস্তি, পরিশোধের মেয়াদসহ শর্তগুলো ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করার জন্য ইআরডিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

অর্থনীতির গবেষক বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “বিদেশি ঋণপ্রাপ্তির চেয়ে পরিশোধ বেশি হওয়া অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। অতীতে বেশ কিছু প্রকল্পের জন্য বাছবিচার ছাড়াই বিদেশি ঋণ নেওয়া হয়েছে। অনেক প্রকল্পে বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু এর বিপরীতে অর্থনৈতিক সুবিধা (রিটার্ন) কবে পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিত নয়। যেমন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।”

সেলিম রায়হানের মতে, ঋণ করে বিদেশি ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হলে তা দেশের অর্থনীতির জন্য আরও বেশি উদ্বেগের বিষয় হবে। ভবিষ্যতে ঋণের বোঝা আরও বাড়বে।

বিদেশি ঋণের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা নিয়ে একটি পর্যালোচনা করার পরামর্শ দেন এই অর্থনীতিবিদ।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত