Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

রেমিটেন্স : ২২ দিনে এল ২৬ হাজার কোটি টাকা

SS-US-dollars-120824
[publishpress_authors_box]

প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্সের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। চলতি অর্থ বছরের পঞ্চম মাস নভেম্বরেও জোয়ার বইছে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ এই সূচকে। এই মাসের প্রথম ২২ দিনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানরত প্রবাসীরা ২১৩ কোটি ৫০ লাখ (২.১৩ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংক রোববার রেমিটেন্স প্রবাহের সাপ্তাহিক তথ্য প্রকাশ  করেছে। তাতে দেখা যায়, গত কয়েক মাসের মতোই চলতি নভেম্বর মাসেও পরবার-পরিজনের জন্য বেশি অর্থ পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা। এই মাসের ২২ দিনেই ২ বিলিয়ন ডলারের বেশি ২.১৩ বিলিয়ন (২১৩ কোটি ৫০ লাখ) ডলার পাঠিয়েছেন, যা গত বছরের নভেম্বরের পুরো মাসের প্রায় সমান।

গত বছরের নভেম্বরের পুরো সময়ে ২২০ কোটি (২.২০ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “রেমিটেন্সের ঊর্ধ্বমুখী ধারা অব্যাহত রয়েছে। নভেম্বর মাসেও পরিবার-পরিজনের কাছে বেশি বেশি অর্থ পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা।”

আর এই রেমিটেন্সের ওপর ভর করে বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ নিয়ে আর উদ্বেগ নেই। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানি বিল পরিশোধের পরও সন্তোষজনক অবস্থায় থাকছে রিজার্ভ।

রেমিটেন্সে প্রতি ডলারে ১২২ টাকা দিচ্ছে ব্যাংকগুলো। সে হিসাবে টাকার অঙ্কে নভেম্বরের ২২ দিনে ২৬ হাজার ৪৭ কোটি টাকা দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। প্রতিদিনে গড়ে এসেছে ৯ কোটি ৭০ লাখ ডলার; টাকার অঙ্কে ১ হজার ১৮৪ কোটি টাকা।

মাসের বাকি ৮ দিনে (২৩ নভেম্বর থেকে ৩০ নভেম্বর) এই হারে এলে মাস শেষে রেমিটেন্সের মোট অঙ্ক ২৯১ কোটি ১৩ লাখ (২.৯১ বিলয়ন) ডলারে গিয়ে ঠেকবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত অক্টোবর মাসে ২৫৬ কোটি ৩৫ লাখ (২.৫৬ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা ছিল গত বছরের অক্টোবরের চেয়ে ৭ দশমিক শূন্য তিন শতাংশ বেশি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে এসেছিল ২৩৯ কোটি ৫০ লাখ (২.৩৯ বিলিয়ন) ডলার।

আগের মাস সেপ্টেম্বরে ২৬৮ কোটি ৫৯ লাখ (২.৬৮ বিলিয়ন) ডলার রেমিটেন্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা, যা ছিল চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের চার মাসের মধ্যে (জুলাই, আগস্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর) সবচেয়ে বেশি।

অর্থ বছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ২৪৭ কোটি ৭৯ লাখ (২.৪৮ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা, যা ছিল গত বছরের জুলাইয়ের চেয়ে ২৯ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি।

দ্বিতীয় মাস আগস্টে আসে ২৪২ কোটি ১৯ লাখ (২.৪২ বিলিয়ন) ডলার, যা ছিল ২০২৪ সালের আগস্টের চেয়ে ৯ শতাংশ বেশি।

সব মিলিয়ে এই অর্থ বছরের ৪ মাস ১৮ দিনে (১ জুলাই থেকে ১৮ নভেম্বর) ১ হাজার ২০৫ কোটি ৩০ লাখ (১২.০৫ বিলিয়ন) ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা, যা গত অর্থ বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৫ দশমিক ৯০ শতাংশ বেশি।

একক মাসের হিসাবে সবচেয়ে বেশি রেমিটেন্স এসেছিল গত মার্চ মাসে; রোজা ও ঈদ সামনে রেখে ওই মাসে অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে ৩২৯ কোটি ৫৬ লাখ (৩.২৯ বিলিয়ন) ডলার রেমিটেন্স আসে দেশে।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ২৯৬ কোটি ৯৫ লাখ (২.৯৬ বিলিয়ন) ডলার আসে মে মাসে। তৃতীয় সর্বোচ্চ ২৮২ কোটি ২৫ লাখ (২.৮২ বিলিয়ন) ডলার আসে জুনে।

দেশের অর্থনীতির প্রধান সূচকগুলোর মধ্যে এখন রেমিটেন্সই সবচেয়ে ভালো অবস্থানে আছে, যা সঙ্কটে পড়া অর্থনীতির চাকা ঘুরিয়ে যাচ্ছে।

অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৩ হাজার ৩২ কোটি ৭৫ লাখ (৩০.৩৩ বিলিয়ন) ডলার দেশে পাঠান প্রবাসীরা, যা ছিল আগের অর্থ বছরের (২০২৩-২৪) চেয়ে ২৬ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেশি।

গত অর্থ বছরে প্রতি মাসে গড়ে রেমিটেন্স এসেছিল ২৫১ কোটি ৯৮ লাখ (২.৫২ বিলিয়ন) ডলার। চলতি অর্থ বছরে চার মাসে হিসাবে গড়ে এসেছে ২৫৩ কোটি ৭৫ লাখ (২.৫৪ বিলিয়ন) ডলার।

২০২৩-২৪ অর্থ বছরে রেমিটেন্স এসেছিল ২ হাজার ৩৯১ কোটি ২২ লাখ ডলার। ২০২২-২৩ অর্থ বছরে আসে ২ হাজার ২৬১ কোটি ডলার। ২০২১-২২ অর্থ বছরে এসেছিল ২ হাজার ১০৩ কোটি ডলার।

২০২০-২১ অর্থ বছরে আসে ২ হাজার ৪৭৮ কোটি ডলার। ২০১৯-২০ অর্থ বছরে এসেছিল ১ হাজার ৮২০ কোটি ডলার।

রিজার্ভ নিয়ে আর উদ্বেগ নেই

বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়ন বা রিজার্ভ নিয়ে আর উদ্বেগ নেই। এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের (আকু) আমদানি বিল পরিশোধের পরও সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে রিজার্ভ।

গত ৯ নভেম্বর আকুর সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মেয়াদের ১৬১ কোটি (১.৬১ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধ করে বাংলাদেশ ব্যাংক; এই দেনা মেটানোর পরও বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ২৬ বিলিয়ন ডলারের উপরে অবস্থান করছে। গ্রস বা মোট হিসাবে রয়েছে ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার (২০ নভেম্বর) বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৬ দশমিক ৪৩ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলার।

এক বছর আগে গত বছরের ২০ নভেম্বর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ১৮ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ২৪ দশমিক ২০ বিলিয়ন ডলার।

আকুর বিল শোধের আগে বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৮ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩২ দশমিক ৭১ বিলিয়ন ডলার।

দুই মাস আগে ৭ সেপ্টেম্বর রিজার্ভ থেকে আকুর জুলাই-আগস্ট মেয়াদের ১৫০ কোটি (১.৫০ বিলিয়ন) ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ কমে ২৫ দশমিক ৩০ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। গ্রস হিসাবে নেমেছিল ৩০ দশমিক শূন্য চার বিলিয়ন ডলার।

ওই সময় আকুর দেনা শোধের আগে বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ছিল ২৬ দশমিক ৭৭ বিলিয়ন ডলার। গ্রস হিসাবে ছিল ৩১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার।

গত দুই মাসে সেই রিজার্ভ বেশ খানিকটা বাড়ে। সে কারণে জুলাই-আগস্টের মেয়াদের চেয়ে সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মেয়াদে আকুর বেশি বিল শোধের পরও সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। এই রিজার্ভ দিয়ে চার মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব।

অর্থনীতির সামর্থ্য প্রকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক রিজার্ভ নিয়ে বাংলাদেশে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা চলছে আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময় থেকেই। অভ্যুত্থানের পর গত বছর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিলেও উদ্বেগ কাটছিল না।

তবে এক বছর পর প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স, রপ্তানি আয় এবং বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ ও এডিবিসহ অন্যান্য দাতা সংস্থার বাজেট সহায়তার ঋণ এবং নিলামে ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে ডলার কেনার কারণে রিজার্ভ স্বস্তির জায়গায় এসেছে বলে মনে করছেন ব্যাংকাররা।

গত ৭ জুলাই আকুর মে-জুন মেয়াদের ২ দশমিক শূন্য ২ বিলিয়ন ডলার আমদানি বিল পরিশোধের পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ২৪ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। গ্রস বা মোট রিজার্ভ নেমেছিল ২৯ দশমিক ৫২ বিলিয়ন ডলারে।

৮ মে আকুর মার্চ-এপ্রিল মেয়াদের ১৮৮ কোটি ৩০ লাখ (১.৮৮ বিলিয়ন) ডলার বিল পরিশোধ করার পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ২০ দশমিক ১৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল। গ্রস হিসাবে নেমেছিল ২৫ বিলিয়ন ডলারে।

এর আগে গত মার্চে জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারির জন্য আকুর আমদানির বিল বাবদ ১ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার এবং জানুয়ারিতে নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ের জন্য ১ দশমিক ৬৭ বিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়।

সেই দুই বারই আকুর বিল শোধের পর বিপিএম-৬ হিসাবে রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল।

আকু হলো এশিয়ার কয়েকটি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মধ্যকার একটি আন্তঃআঞ্চলিক লেনদেন নিষ্পত্তি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে এশিয়ার নয়টি দেশের মধ্যে যেসব আমদানি-রপ্তানি হয়, তার মূল্য প্রতি দুই মাস পরপর নিষ্পত্তি করা হয়।

আকুর সদস্য দেশগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, ইরান, নেপাল, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মিয়ানমার, ভুটান ও মালদ্বীপ। এর মধ্যে ভারত পরিশোধ করা অর্থের তুলনায় অন্য দেশগুলো থেকে বেশি পরিমাণে ডলার আয় করে। অন্যদিকে বেশিরভাগ দেশকেই আয়ের তুলনায় আমদানি ব্যয় হিসাবে অতিরিক্ত ডলার খরচ করতে হয়।

ব্যাংকগুলো আমদানির খরচ নিয়মিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দেয়, যা রিজার্ভে যোগ হয়। তবে ওই দায় দুই মাস পরপর রিজার্ভ থেকে পরিশোধ করে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক বিপিএম-৬ হিসাবের রিজার্ভকে তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ হিসেবে দাবি করে।

সবশেষ গত সেপ্টেম্বর মাসের আমদানির যে তথ্য প্রকাশ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, তাতে দেখা যায় যে ওই মাসে পণ্য আমদানিতে বাংলাদেশের ৬ দশমিক ২১ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে।

সে হিসাবে বর্তমানের ২৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার তাৎক্ষণিক ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দিয়ে চার মাসের বেশি সময়ের আমদানি ব্যয় মেটানো সম্ভব হবে।

আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, একটি দেশের কাছে অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সমপরিমাণ বিদেশি মুদ্রা মজুদ থাকতে হয়।

এক দশক আগে রিজার্ভের বাড়-বাড়ন্ত নিয়ে মধুর সমস্যায় ছিল বাংলাদেশ। রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার পর এই অর্থ অলস বসিয়ে না রেখে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা ছিল চিন্তার বিষয়।

কিন্তু ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও তার প্রভাব পড়ে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেল, খাদ্যপণ্যসহ সব ধরনের জিনিসের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ বেড়ে যায়। তাতে রিজার্ভ কমতে থাকায় দেখা দেয় উদ্বেগ।

রিজার্ভের পতন ঠেকাতে আওয়ামী লীগ সরকার শেষের দিকে আইএমএফ থেকে ঋণ নেয়। তাদের শর্ত মেনে ২০২৩ সাল থেকে রিজার্ভের তথ্য গ্রস হিসাবের পাশাপাশি আইএমএফ অনৃসৃত বিপিএম-৬ পদ্ধতিও প্রকাশ শুরু করে।

এখন বিপিএম-৬ ও গ্রস হিসাবের পাশাপাশি রিজার্ভের নিট বা প্রকৃত হিসাবও করে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। তবে সেটি নিয়মিত প্রকাশ করা হয় না। মাঝে-মধ্যে প্রকাশ করা হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ২০২১ সালের আগস্টে প্রথমবারের মতো রিজার্ভ (তখন বিপিএম-৬ ও নিট হিসাবে প্রকাশ করা হতো না) ৪৮ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করে। সেখান থেকে ধারাবাহিকভাবে কমে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের আগে গত বছরের জুলাই শেষে ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলারে নেমেছিল।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found