অপেক্ষার পর্ব শেষ। শনিবার (৮ নভেম্বর, ২০২৫) পর্দা উঠছে তীর এশিয়ান আর্চারি চ্যাম্পিয়নশিপের। কদিন ধরে টঙ্গি ও জাতীয় স্টেডিয়ামের আঙিনা মুখরিত ছিল এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে আসা আরচ্যারদের অনুশীলনে। শনিবার শুরু হবে তীর-ধনুকের আসল লড়াই।
রিকার্ভ ও কম্পাউন্ড মিলিয়ে ১০ ইভেন্টের পদকের লড়াইয়ে ৩০টি দেশের মোট ২০৯ জন আর্চার অংশ নিচ্ছে এবার। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী আর্চারও অংশ নিচ্ছেন, রিকার্ভে ৫৪ জন এবং কম্পাউন্ডে ৩৮ জন মিলিয়ে মোট ৯২ জন। এছাড়া ৮০ জন অফিসিয়াল ও ১৭ জন অতিথিও অংশ হচ্ছেন এশিয়ান আর্চারির সর্বোচ্চ আসরের এবারের আয়োজনে। ৮ নভেম্বর প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে শেষ হবে ১৪ নভেম্বর। জাতীয় স্টেডিয়াম ও আর্মি স্টেডিয়াম-এই দুই ভেন্যুতে হবে প্রতিযোগিতা।

আয়োজক হতে অবশ্য বাংলাদেশকে পোড়াতে হয়েছিল অনেক কাঠখড়। ভারত ও চীন ছিল আয়োজক সত্ত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী। ভারত ‘ছাড়’ দিলে চীন ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতায়। ভোটাভুটিতে ১৪-১০ ব্যবধানে জিতে বাংলাদেশ। তাতে নিশ্চিত হয় ২০১৭ ও ২০২১ সালের পর তৃতীয়বারের মতো এই আসরের আয়োজক হিসেবে বাংলাদেশের নাম।
সেই থেকে শুরু হয় বাংলাদেশ আর্চারি ফেডারেশনের নতুন চ্যালেঞ্জও। বিভিন্ন দেশের আর্চার, কর্মকর্তাদের ঢাকায় আনা, হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে থাকার ব্যবস্থা করা, প্রস্তুতির ভেন্যু নির্ধারণ, আর্চারদের যাতায়াত ব্যবস্থা করাসহ নানা চ্যালেঞ্জ দাঁড়ায় ফেডারেশনের সামনে। সরকারের সহযোগিতা, সিটি গ্রুপের পৃষ্ঠপোষকতায় বাধাগুলো পেরিয়ে যায় আর্চারি ফেডারেশন।
চ্যালেঞ্জ ছিল আরও। বিশেষ করে নানা সংঘাতে বিধ্বস্ত, বিপর্যস্ত ফিলিস্তিন, সিরিয়া, ইয়েমেনের মতো দেশগুলোর আর্চারদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে বিশেষ প্রণোদনার ব্যবস্থা করতে হয়। ফিলিস্তিন থেকে অংশ নিচ্ছেন চার ৪ জন আর্চার।
এর অন্যতম রাশা ইয়াহিয়া আহমেদ। যুদ্ধ বিধ্বস্ত গাজা থেকে উঠে আসা রাফা বর্তমানে লেখাপড়া করছেন ওমানের মাসকটের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে, চাকুরি করেন সংযুক্ত আরব আমিরাতে। তিন বছর আগে তীর-ধনুক হাতে তুলে নেওয়া এই আর্চার বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসায়, আর্চারি ফেডারেশনের আয়োজনে মুগ্ধতার কথা জানিয়েছেন,“এই প্রথম বাংলাদেশে এসেছি এবং বিমানবন্দর থেকে শুরু করে এখানকার সবাই ভীষণ আন্তরিকতা নিয়ে আমাদের স্বাগত জানিয়েছে। এমনকি, বিমানবন্দর থেকে হোটেলে আসা পর্যন্ত সবাই ছিল ভীষণ আন্তরিক। আমাদের সবাই খুশি এবং সবাই আমাদের স্বাগত জানাচ্ছে, সহযোগিতা করছে।”

তিনি আরও যোগ করেন,“একটা বিষয় বলতে ভালো লাগবে, একজন ফিলিস্তিনি হিসেবে আমরা জানি এবং অনুভব করি বাংলাদেশের মানুষের সমর্থন। যখন এখানে এসেছি, আমি অনুভব করতে পারছি, সবাই আমাদেরকে নিজেদের করে নিয়েছে। এমনকি যারা বাইরের মানুষ, তারাও আসছে, আমাদের সমর্থন করছে। বাংলাদেশের আয়োজনও বিশ্বমানের, দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে এখানকার আয়োজনের কোনো পার্থক্য আমার চোখে পড়ছে না।”
বাংলাদেশের চোখ অবশ্য থাকবে নিজেদের তারকা আব্দুর রহমান আলিফ, সাগর ইসলাম, বন্যা আক্তারদের দিকে। ২০২১ সালের আসরে একটি রুপা ও দুটি ব্রোঞ্জ পেয়েছিল বাংলাদেশ। তিনটি পদকই ছিল দলগত ইভেন্ট থেকে পাওয়া। রিকার্ভ মিশ্র থেকে এসেছিল রুপার পদক। ২০২৩ সালের সবশেষ থাইল্যান্ডের আসরে অবশ্য খালি হাতে ফিরতে হয় দলকে। এবার সে হতাশার বলয় থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনতে চান আর্চাররা।
রিকার্ভ ইভেন্টের সাগর ইসলাম বলেন, “আমাদের দেশের মাঠে এবারের প্রতিযোগিতা। স্বাভাবিকভাবে অনেক কিছু আমাদের পক্ষে থাকবে। এখানকার সবকিছুই আমাদের জানা। এই প্রতিযোগিতার জন্য আমরা বছর জুড়ে ক্যাম্পে কঠোর পরিশ্রম করেছি। আশা করি, পরিশ্রমের ফল আমরা পাব। দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে পারব।”

রিকার্ভ ইভেন্টের আরচ্যার আব্দুর রহমান আলিফ বলেন, “বিভিন্ন দেশ থেকে অনেক ভালো মানের আর্চার এসেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত থেকে এসেছে অনেকে। অভিজ্ঞতায় তারা হয়ত এগিয়ে থাকবে, তবে আমাদেরও আত্মবিশ্বাস আছে দেশকে ভালো কিছু এনে দেওয়ার। আর্চারি একটি নির্দিষ্ট দিনের খেলা, র্যাঙ্কিংয়ে অবস্থান যা-ই হোক না কেন, যে সেরাটা মেলে ধরতে পারবে, সেই সেরা হবে।”
কম্পাউন্ড ইভেন্টের আর্চার বন্যার আক্তার বলেন, “কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখের অধীনে আমরা এতদিন অনুশীলনে যে পরিশ্রম করেছি, আমাদের জন্য সে পরিশ্রমের ফল তুলে আনার উপলক্ষ্য এই আসর। সামর্থ্যের সবটুকু দিয়ে আমরা চেষ্টা করব।”
কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখ বলেন, “আর্চােরদের প্রতি আমার আস্থা আছে। ব্যাংককের গত আসরে আমরা কোনো পদক পাইনি। এ নিয়ে হতাশা আছে ওদের মধ্যে। এবার সেই হতাশা কাটাতে চায় ওরা।’’



