Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

জাদুকরী মেসির ছোঁয়ার সঙ্গে ইনফান্তিনোর অটোগ্রাফ

লিওনেল মেসি মিউজিয়ামে লেখক। ছবি: সংগৃহীত
লিওনেল মেসি মিউজিয়ামে লেখক। ছবি: সংগৃহীত
[publishpress_authors_box]

গল্পটা যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী একজন বাংলাদেশি ফুটবলপাগল তীর্থযাত্রীর। যিনি ফুটবলের নেশায় কখনও ভুলে যান সব। কাজ ফেলে ছুটে বেড়ান শহর থেকে শহরে। স্বাভাবিকভাবেই যুক্তরাষ্ট্রে চলমান ক্লাব বিশ্বকাপের উন্মাদনা ছুঁয়ে গেছে তাকে। তাইতো ইন্টার মায়ামি-আল আহলি এফসির উদ্বোধনী ম্যাচ দেখতে সিয়াটল থেকে ছুটে গেছেন মায়ামি হার্ড রক স্টেডিয়ামে। এরপর একে একে মাঠে বসে দেখেছেন আরও বেশ কয়েকটি ম্যাচ। সেই অভিজ্ঞতাসহ খুব কাছ থেকে বেশ কয়েকবার মেসিকে দেখার গল্প যুক্তরাষ্ট্র থেকে শোনাচ্ছেন মশিউর রহমান

কারো শখ জার্সি সংগ্রহের। কেউ বারবার দেখে প্রিয় ফুটবলারের গোলের রিপ্লে। আমি সংগ্রহ করি মুহূর্ত। কথাগুলো ঠিক বোঝা গেল না, তাইতো? আমি সেই মুহূর্তগুলো মনের মধ্যে সংরক্ষণ করি যখন ফুটবল উন্মাদনায় মেতে ওঠা শহরগুলো হয়ে ওঠে আমার বাড়ি। অপরিচিতদের বানিয়ে দেয় বন্ধু। কখনও কখনও ক্ষণিকের দৃশ্য হয়ে ওঠে জীবনের অমর স্মৃতি।

এই মুহূর্তগুলোর বাইরেও এমন কিছু খুঁজে পাই যা আরও গভীর। নিজের দেশের প্রতি ভালোবাসা। ফুটবল যেভাবে পরিণত হয় একটি শিল্পে। যেখানে আবেগ নেচে ওঠে কোটি মানুষের সামনে। ফুটবল নিয়ে আমার সেই আবেগের গল্পের অভিজ্ঞতা আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।

ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ: গ্লোবাল যখন মিশে যায় স্থানীয়র মাঝে

ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠান দেখতে গিয়েছিলাম মায়ামির হার্ড রক স্টেডিয়ামে। যেখানে ইন্টার মায়ামি মুখোমুখি হয়েছিল আল আহলি এফসির। স্টেডিয়ামে পা দিয়ে মনে হচ্ছিল যেন স্বপ্ন দেখছি। আলো, সঙ্গীত আর বড় স্ক্রিনে ফুটে ওঠা “ফুটবল ইউনাইটস দ্য ওয়ার্ল্ড”যেন সত্যিই পুরো পৃথিবীকে এক করে দিয়েছিল।

আল আহলির সমর্থকেরা ছিল প্রচুর। তাদের দলও খুব আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলছিল। সমর্থকরা আত্মবিশ্বাসী ছিল যে  শেষ ষোলো পর্যন্ত যাবে। যদিও শেষ পর্যন্ত পারেনি তারা।

আতলেতিকো মাদ্রিদ বনাম সিয়াটল সাউন্ডার্স ম্যাচে ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর অটোগ্রাফ নিচ্ছেন লেখক। ছবি: সংগৃহীত

তবে সবকিছুর ওপরে, ফিফা আয়োজিত কোনও ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকতে পেরে মনে হচ্ছিল যেন ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছি। যুদ্ধ, অশান্তি, বিশৃঙ্খলা যেখানে সংবাদের বড় অংশ জুড়ে থাকে সেখানে ঐক্যের বার্তাই আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ফুটবল মনে করিয়ে দেয় এক আকাশের নিচে আমরা সবাই এক। এবং খেলায় কোনও ভাষার দেওয়াল নেই।

এরপর এল সেই মুহূর্ত যখন সিয়াটল নিজেই হয়ে উঠল ফুটবলের রাজধানী। পিএসজির মুখোমুখি সিয়াটল সাউন্ডার্স এফসি। সেই পিএসজি যারা মাত্রই ইন্টার মিলানকে ৫-০ গোলে উড়িয়ে চ্যাম্পিয়নস লিগের শিরোপা জিতেছে। তারা এবার আমাদের শহরে। সিয়াটলিরা গলা ছেড়ে গাইছিলাম, স্কার্ফ নাড়ছিলাম।

এর আগে ছিল আতলেতিকো মাদ্রিদ বনাম সিয়াটল সাউন্ডার্স ম্যাচ। আতলেতিকোর ওই ম্যাচে আমি ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর সঙ্গেও দেখা করেছিলাম। এমনকি তার অটোগ্রাফও নিয়েছিলাম। সে এক অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতা!

সিয়াটল, ২০১৬ : মেসি এলেন আমাদের মাঠে

কোপা আমেরিকা, সেন্টেনারিও। আর্জেন্টিনা বনাম বলিভিয়া। এটি ছিল আমার জীবনের প্রথম লাতিন আমেরিকার শীর্ষ দলের খেলা সরাসরি মাঠে বসে উপভোগ করা। এর আগ পর্যন্ত আমি ভাবতাম, ফুটবল হয়তো ধীরে ধীরে টাকা পয়সা, অবকাঠামো আর কর্পোরেটের কবলে পড়ে যাবে। ফুটবল শুধু এলিট ইউরোপীয় ক্লাবগুলোর শাসনেই থাকবে।

ওই ম্যাচে মেসি একাদশে ছিলেন না। তিনি ৪৪তম মিনিটে মাঠে নামলেন বদলি হিসেবে। ততক্ষণে আর্জেন্টিনা ৩-০ গোলে এগিয়ে। তিনি কোনও গোল করেননি। কিন্তু যখনই বল ছুঁয়েছিলেন স্টেডিয়াম গর্জে উঠেছিল। সেই বিকেলেই আমার ধারণা বদলেছিল। আমি যা দেখেছিলাম তা প্রমাণ করেছিল যে এই দক্ষতা টাকা দিয়ে কেনা যায় না, বানানো যায় না, নকল করা যায় না। শুধু নিখাদ ভালোবাসা, অদম্য আবেগ এমন জাদু তৈরি করতে পারে।

কোপা আমেরিকার বলিভিয়ার বিপক্ষে ম্যাচে মেসিকে আটকানোর চেষ্টা । ছবি: সংগৃহীত

সেই ৯০ মিনিটের জন্য, সিয়াটল যেন হয়ে গিয়েছিল বুয়েনস আইরেস। ফুটবল মনে করিয়ে দিয়েছিল, যখন এরা দেশের প্রতিনিধিত্ব করে, তখন মানুষের সবচেয়ে পরিশীলিত রূপটিই ফুটিয়ে তোলে। অর্থনৈতিক দুশ্চিন্তা, রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা, সামাজিক টানাপোড়েন— সব পেছনে ফেলে কিছু সময়ের জন্য মানুষ অন্য জগতের স্বপ্ন দেখতে পারে।

মিয়ামি, ২০২৩: পদার্থবিদ্যার সীমা ছাড়া ফ্রি কিক এবং হলিউড মুহূর্ত

মেসির ইন্টার মায়ামিতে যোগ দেওয়া শুধু একটা দলবদল নয়। পুরো দুনিয়ার জন্য বিশাল ঘটনা। আমি সিয়াটল থেকে উড়ে গেলাম তার প্রথম মার্কিন পেশাদার ম্যাচ দেখার জন্য। স্টেডিয়াম শুধু ফুটবলপ্রেমীদের দিয়ে নয়, কিম কারদাশিয়ান, লেব্রন জেমস, সেরেনা উইলিয়ামস, ডেভিড বেকহামের মতো তারকাদের উপস্থিতিতে পূর্ণ ছিল।

ম্যাচটি ড্রয়ের দিকে এগোচ্ছিল। যোগ হওয়া সময়ে মেসি ফ্রি কিক নিতে এলেন। আমার মনে হচ্ছিল, “এটাই সেই মুহূর্ত। শেষ সুযোগ। এই মিনিটটার জন্যই তো আমি সিয়াটল থেকে উড়ে এসেছি।”

মেসির ইন্টার মায়ামির হয়ে অভিষেক ম্যাচে ছিলেন ডেভিড বেকহামসহ অনেক তারকা। ছবি: সংগৃহীত

বলটি বাঁক নিল, নিচে নামল, পদার্থবিদ্যাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে জালে জড়িয়ে গেল। স্টেডিয়াম বিস্ফোরিত হলো। এটা শুধু একটা গোল ছিল না। এটা ছিল একটি শিল্প এবং বিজ্ঞানের অদ্ভুত সংমিশ্রণ, যা হলিউডের কল্পনাকেও হার মানায়। অসম্ভব অথচ নিশ্চিত এই তো ছোট্ট জাদুকরের ট্রেডমার্ক। সত্যি বলতে তখন মনে হচ্ছিল মেসি কখনো কখনো যেন ফুটবলার নন। ধ্যানমগ্ন শিল্পী। জাদুর তুলিতে ফুটিয়ে তোলেন আশ্চর্য শিল্প। 

ইউরো ২০২৪: তুর্কি রঙে রঙিন বার্লিন এবং জার্মানির স্টেডিয়ামগুলো

এরপরের গ্রীষ্মে আমি আবার ছুটলাম, এবার ইউরো ২০২৪ এর জন্য। বার্লিনে নেদারল্যান্ডস বনাম তুরস্কর কোয়ার্টার ফাইনাল দেখতে। পুরো শহর তুর্কি ডায়াস্পোরার লাল পতাকা, গান, ড্রাম আর উল্লাসে মুখরিত ছিল। হেরে যাওয়ার পরও তারা রাত ৩টা পর্যন্ত উদযাপন করেছে—হর্ন, গান, আর দারুণ গর্ব নিয়ে। তখনই বুঝলাম, ফুটবল শুধুই জেতা নয়; এটা সমাজ, পরিচয়, আর অস্তিত্বের গল্প।

জার্মানির আলিয়াঞ্জ অ্যারেনায় লেখক। ছবি: সংগৃহীত

এরপর মিউনিখে স্পেন বনাম ফ্রান্সের সেমিফাইনাল। আলিয়াঞ্জ অ্যারেনার আলোতে, দেখলাম কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং লামিন ইয়ামাল নামের কিশোর স্প্যানিশ জাদুকরের লড়াই। স্টেডিয়ামটা যেন মন্দির। আলো, সুর, আর ৭০ হাজার মানুষের সমবেত শ্বাসে ভরে ছিল। আমার স্ত্রী আর মেয়ের সঙ্গে ফুটবল উপভোগ জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা।

মিয়ামি ২০২৪: কোপা আমেরিকা ফাইনাল যেন আবেগের পরাকাষ্ঠা

আবার মায়ামি ফিরি কোপা আমেরিকা ফাইনাল দেখতে। আর্জেন্টিনা ও কলম্বিয়া মুখোমুখি। টিকিট পাওয়াই দুষ্কর ছিল। কিন্তু হার্ড কপি টিকিট পেয়েছিলাম। যা বিরল ঘটনা। মেসি অসাধারণ খেলছিলেন, কিন্তু ৬৬তম মিনিটে চোট পেয়ে মাঠ ছাড়লেন। তখন স্টেডিয়ামের নীরবতায় সব বলে দিচ্ছিল দর্শকেরা কতটা অখুশি।

ম্যাচে আরও একটি বিশেষ মুহূর্ত ছিল। শাকিরা ম্যাচের বিরতির সময় গান গাইলেন। আলো, সুর আর  লাতিন স্পন্দনে স্টেডিয়ামে যেন স্বর্গীয় পরিবেশ।

মাঠে বাংলাদেশের পতাকা হাতে লেখক। ছবি: সংগৃহীত

ম্যাচের পরে আমরা স্টেডিয়ামে থেকে গেলাম। ফুটবলারদের সন্তানেরা মাঠে দৌড়াচ্ছিল। ফুটবল খেলছিল। চারপাশে বন্ধু আর পরিবার নিয়ে আনন্দে মেতে ছিল। আমার বন্ধুর হাতে ছিল বাংলাদেশের পতাকা। অনেক আর্জেন্টাইন এসে বলল, “আমরা বাংলাদেশকে ভালোবাসি।”

মেসি আর আনহেল দি মারিয়ার কান্না আর হাসি প্রমাণ করে, দশকের পর দশক পেশাদার ফুটবলার হওয়ার পরও তাদের আবেগ শেষ হয়নি। প্রতিটি ট্রফি, প্রতিটি গোল তাদের কাছে নতুনই থাকে।

মায়ামি, ২০২৪: মেসির জীবনের জাদু ছোঁয়া

সেই ট্রিপে আমি মেসি মিউজিয়াম ঘুরে দেখেছিলাম। রোসারিওর শৈশবের ছবি। বার্সার প্রথম ফোন কলের রেকর্ড। জার্সি, বুট, গোল্ডেন বল—প্রতিটি জিনিস তার জীবনের আরেকটি স্তর মেলে ধরেছিল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা সেখানে কাটিয়েছিলাম। ছবি তুলছিলাম। ভাবছিলাম—কি অবিশ্বাস্য যাত্রা এক মানুষের!

ফুটবল: সংস্কৃতির সেতুবন্ধন

আমি কাতার বিশ্বকাপ দেখতে যাইনি, কিন্তু দেখেছি কিভাবে ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়া আর আমেরিকার সমর্থকরা মধ্যপ্রাচ্যের সংস্কৃতির সাথে মানিয়ে নিচ্ছিল—পোশাক, খাবার, রীতি, নিয়ম। সেই বিশ্বকাপ ছিল গল্প ভাগাভাগি আর দৃষ্টিভঙ্গি বদলের এক মঞ্চ। এটাই ফুটবলের আসল শক্তি—সংস্কৃতির দেয়াল ভেঙে দেয়।

স্ত্রী ও কন্যার সঙ্গে ফুটবল উপভোগ লেখকের। ছবি: সংগৃহীত

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংযোগগুলো

ফুটবল শেখায়, পৃথিবী কত ছোট। স্টেডিয়ামে আর্জেন্টাইনরা জিজ্ঞেস করে, কোথা থেকে? বলি, “সিয়াটল।” তারা থামে। তারপর বলি, “বাংলাদেশ।” তাদের মুখে হাসি ফুটে ওঠে। ক্লাব বিশ্বকাপের সময় রিভার প্লেট সমর্থকরা আমাকে সিয়াটলের পার্টিতে আমন্ত্রণ করেছিল। ফুটবল এক প্রশ্নেই অচেনাদের বন্ধুতে পরিণত করে, “তুমি কাকে সমর্থন করো?”

কেন এখনো ফুটবলের পেছনে ঘুরি

মেসি, এমবাপ্পে, ইয়ামাল—তারা শুধু খেলোয়াড় নন। তারা প্রতীক। একটি বল, যা মাঠ জুড়ে ঘোরে। ভেঙে ফেলে সীমানা, শহরকে বাড়ি বানায়। মানুষকে বদলে দেয় পরিবারে। তাইতো ফুটবলের প্রতিটি ম্যাচ উপভোগ করাটা আমার কাছে হয়ে ওঠে একেকটি তীর্থযাত্রা। আমার কাছে ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে সুন্দর ভাষা। তাইতো সময় পেলেই সেই ভাষার অন্তমিল খুঁজে বেড়াই।

  • লেখক পরিচিতি : মশিউর রহমান পেশায় একজন প্রকৌশলী। বর্তমানে সিয়াটলে বহুজাতিক প্রযুক্তি কর্পোরেশন ওরাকলে কর্মরত।

আরও পড়ুন

সর্বাধিক পঠিত