যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার দর্শকদের জন্য ওটিটি প্ল্যাটফর্ম লিডার নেটফ্লিক্স তার সাবস্ক্রিপশন ফি বাড়িয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে (সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর) ১ কোটি ৯০ লাখ গ্রাহক বাড়তি যোগ হওয়ার পর নেটফ্লিক্সের পক্ষ থেকে এই ঘোষণা আসলো।
নতুন করে ১ কোটি ৯০ লাখ যোগ হওয়ায় নেটফ্লিক্সের মোট সাবস্ক্রাইবার এখন সারা বিশ্বব্যাপী ৩০ কোটি ২০ লাখে ঠেকেছে, যা প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোর মধ্যে আরও পোক্ত করলো।
গত নভেম্বরে মাইক টাইসন ও জ্যাক পলের মধ্যে বক্সিং ম্যাচটি লাইভ স্ট্রিম করে নেটফ্লিক্স। নেটফ্লিক্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই ম্যাচটি সারা বিশ্বব্যাপী ১০ কোটি ৮০ লাখ লোক সরাসরি উপভোগ করেছে। লাইভ স্ট্রিমের ক্ষেত্রে এটি সর্বকালের রেকর্ড ভেঙে দেয়।
এছাড়াও বড়দিন উপলক্ষে নেটফ্লিক্স লাইভ স্ট্রিম করে দুইটি ‘ক্রিসমাস ডে এনএফএল’ অর্থাৎ আমেরিকান ফুটবল (রাগবির মতোই খেলাটি, তবে নিয়ম ভিন্ন) ম্যাচের। গড়ে ৩ কোটি লোক ওই খেলাগুলো সরাসরি দেখেন। আমেরিকান ফুটবল গেইমের ইতিহাসেও সরাসরি কোন প্ল্যাটফর্মে খেলা উপভোগকারী দর্শকদের সংখ্যার দিক থেকে এটি একটি রেকর্ড।
সাবস্ক্রিপশন বাড়ার ক্ষেত্রে ‘স্কুইড গেইম’ এর দুই নম্বর সিজনটিও ভূমিকা রেখেছে। এটি মুক্তির প্রথম সপ্তাহেই ৬ কোটি ৮০ লাখ সাবস্কাইবার যোগ হয়েছে। এছাড়া জানুয়ারি মাসের শুরুতেই নেটফ্লিক্স নিয়ে এসেছে রেসলিং প্রতিযোগিতা ডাব্লিউডাব্লিউই ‘র’- এর সোমবারের নাইট লাইভ শো।
নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, নেটফ্লিক্স তার বিজ্ঞাপন ছাড়া মাসিক প্যাকেজের ফি ১৫ ডলার ৪৯ সেন্ট থেকে আড়াই ডলার বাড়িয়ে ১৯ ডলার ৯৯ সেন্ট নির্ধারণ করেছে। অন্যদিকে বিজ্ঞাপনসহ এই প্যাকেজটির দাম ৭ মার্কিন ডলার ৯৯ সেন্ট। আর ফোরকে রেজুলশনসহ প্রিমিয়াম সাবস্ক্রিপশন ফি ২ ডলার বাড়িয়ে ২৪ মার্কিন ডলার ৯৯ সেন্ট করা হয়েছে।
এক বার্তায় নেটফ্লিক্স এর পক্ষ থেকে সাবস্ক্রিপশন ফি বাড়ানোর বিষয়ে বলা হয়, “গ্রাহকরা যাতে সর্বোচ্চ বিনোদন উপভোগ করেন, সে কারণে আমাদের অনুষ্ঠানের জন্য বিনিয়োগ বেশি করতে হয়। তাই গ্রাহকদেরও একটু বেশি ফি গুণতে হয়। আর এটা আমাদের করা লাগে এ কারণে যাতে আমরা আরও উন্নতির জন্য পুনরায় বিনিয়োগ করতে পারি।”
মূল্যবৃদ্ধির এই ধারা স্ট্রিমিং সার্ভিসগুলোর সাম্প্রতিক বাজার কৌশল। গ্রাহকদের মাসিক খরচ বাড়িয়ে অনুষ্ঠানের ভেতরে বিজ্ঞাপন দিয়ে সস্তা প্যাকেজের দিকে গ্রাহকদের আগ্রহী করতেই মূলত এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। গত কয়েক বছরে ডিজনি, ম্যাক্স, পিকক, অ্যাপল ইত্যাদি ওটিটি প্ল্যাটফর্মও তাদের গ্রাহক ফি বাড়িয়েছে। ২০২২ সালে শেষবারের মতো নেটফ্লিক্স তাদের স্ট্যান্ডার্ড প্যাকেজের দাম বাড়িয়েছিল।
মঙ্গলবার কোম্পানিটি জানিয়েছে, গত প্রান্তিকে (সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর) তাদের আয় আগের প্রান্তিকের চেয়ে ১৬ শতাংশ বেড়ে প্রথমবারের মতো ১ হাজার কোটি মার্কিন ডলার অতিক্রম করেছে। প্রতিষ্ঠান পরিচালনার আয় বাদ দিয়ে এই আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৩০ কোটি ডলারে। এক বছর আগের তুলনায় এই আয় বৃদ্ধির পরিমাণ ৫২ শতাংশ বেশি।
সম্প্রতি নেটফ্লিক্স ১ হাজার ৫০০ কোটি ডলারের শেয়ার ‘বাই ব্যাক’ করার ঘোষণা দেয়। এই খবরের পর নেটফ্লিক্সের শেয়ারের দাম ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। কেননা কোন প্রতিষ্ঠান তখনই ‘শেয়ার বাই ব্যাক’ এর ঘোষণা দেয়, যখন প্রতিষ্ঠানটি মনে করে তার শেয়ারের বর্তমান বাজার মূল্য কম, কাজেই অতিরিক্ত নগদ অর্থ দিয়ে শেয়ারহোল্ডারদের লাভ আরো বাড়িয়ে দিতে হবে।
কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের মধ্যে এক আলোচনায় নেটফ্লিক্সের সহ-প্রধান নির্বাহী টেড সারানডোস সরাসরি সম্প্রচার ইভেন্টের সাম্প্রতিক সাফল্যের কথা উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, “একটি দুর্দান্ত প্রান্তিক গিয়েছে। আমরা তিনটি বড় সরাসরি ইভেন্ট পেয়েছি — একটি অসাধারণ ফাইট, দুটি এনএফএল গেমস — এবং ‘স্কুইড গেম’ সিজন টু আমাদের অন্যতম বড় টিভি সিরিজ হয়ে উঠেছে। এগুলো আমাদের জন্য খুব সফল ইভেন্ট এবং শো ছিল।”
তিনি আরও জানান, কোম্পানি ভবিষ্যতে সরাসরি ইভেন্ট এবং স্পোর্টস নিয়ে আরও এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছে- “যদি এমন কোনও পথ থাকে, যেখানে আমরা আমাদের এবং (এনএফএল) লিগের দুই পক্ষের জন্য অর্থনৈতিক সুবিধা আনতে পারি, তবে আমরা অবশ্যই তা খতিয়ে দেখব। তবে আপাতত, আমরা বিশ্বাস করি সরাসরি ইভেন্ট ব্যবসায় থাকা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এবং স্পোর্টস তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।”
নেটফ্লিক্স জানিয়েছে, মঙ্গলবারের আয় প্রতিবেদনটি ছিল ব্যবহারকারীর সংখ্যা সম্পর্কে শেষবারের মতো কোয়ার্টারভিত্তিক প্রতিবেদন। এর পর থেকে বছরে দুইবার ‘এনগেজমেন্ট রিপোর্ট’ প্রকাশ করবে ওটিটি প্ল্যাটফর্মটি।
সদস্যপদ বৃদ্ধির মাধ্যমে নেটফ্লিক্স স্ট্রিমিং জগতে তাদের আধিপত্য আরও মজবুত করেছে। গত কয়েক বছরে বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী মিডিয়া কোম্পানি নিজস্ব স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্ম চালু করতে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। তবে, ডিজনি এবং ওয়ার্নার ব্রস ডিসকভারিসহ অনেক কোম্পানি সম্প্রতি স্ট্রিমিং থেকে লাভজনক অবস্থায় পৌঁছালেও তারা নেটফ্লিক্সের মার্কেট শেয়ারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হিমশিম খাচ্ছে।
নেটফ্লিক্স তাদের প্রতিবেদন শেষে জানায়, “আমাদের সৌভাগ্য যে আমাদের লিনিয়ার নেটওয়ার্ক ব্যবস্থাপনার মতো বিষয় নিয়ে বিভ্রান্ত হতে হয় না। আমাদের ফোকাস ঠিক থাকায় এবং বিনিয়োগ অব্যাহত হওয়ার ফলে আমরা বিশ্বজুড়ে একটি ভালো এবং উন্নত সার্ভিস দিতে পারছি।”



