আজকের শিশুরা এমন এক পৃথিবীতে বড় হচ্ছে, যা তাদের বাবা-মায়ের সময়ের তুলনায় অনেক ভিন্ন। সম্প্রতি নেটফ্লিক্সে মুক্তি পাওয়া সিরিজ ‘অ্যাডোলেসেন্স’ এই পার্থক্যটি দারুণভাবে তুলে ধরেছে।
সিরিজের দ্বিতীয় পর্বে, গোয়েন্দা লুক বাসকম্ব (অ্যাশলি ওয়াল্টার্স) একটি স্কুলে খুনের তদন্ত করতে যান। ১৩ বছরের এক কিশোর, জেইমি মিলার (ওয়েন কুপার), তার সহপাঠী ক্যাটিকে খুন করেছে। তদন্ত করতে গিয়ে বাসকম্ব জেইমির ইনস্টাগ্রাম চ্যাট দেখে ধরে নেন যে, তারা হয়তো বন্ধু ছিল কিংবা তাদের মধ্যে হয়তো প্রেমের সম্পর্ক ছিল।
কিন্তু বাসকম্বের নিজের ছেলে, যে একই স্কুলে পড়ে, বাবাকে জানায়— ইনস্টাগ্রামের কিছু ইমোজি আসলে অন্য অর্থ বহন করে। যেগুলো বাসকম্ব বন্ধুত্ব বা ভালোবাসার চিহ্ন মনে করেছিলেন, সেগুলো আসলে অনলাইন বুলিং বা অপমান করার ইঙ্গিত।
জেইমির ইনস্টাগ্রামে ক্যাটির কিছু নিরীহ ইমোজি মন্তব্য ছিল, যা আদতে ‘রেড পিল’ নামের একটি গোষ্ঠীর প্রতীক। এই গোষ্ঠী ‘ম্যানোস্ফিয়ার’-এর অন্তর্ভুক্ত, যারা নারীদের নিয়ে নেতিবাচক ধারণা প্রচার করে। তাদের মতে, নারীরা শুধু সমাজের শীর্ষ ২০% শক্তিশালী পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট হয় এবং বাকি ৮০% পুরুষকে উপেক্ষা করে।
এখান থেকে বোঝা যায়, অনলাইন জগতে কিশোরদের মধ্যে কীভাবে নারীদের প্রতি বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে এবং সেটি তাদের আচরণে কীভাবে প্রভাব ফেলছে।
ইনসেল সংস্কৃতি ও এর প্রভাব
ক্যাটি বুঝিয়ে দিয়েছিল যে, জেইমি একজন ‘ইনসেল’— যা ‘ইনভলান্টারি সেলিব্যাট’ (অনিচ্ছাকৃতভাবে অবিবাহিত) শব্দ থেকে এসেছে। ইনসেলরা মনে করে, তারা নারীদের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে এবং এজন্যই তারা নারীদের প্রতি ঘৃণা পোষণ করে।
এই সম্প্রদায়ের সদস্যরা অনলাইনে নিজেদের হতাশা, রাগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে। তারা বিশ্বাস করে, নারীরা ক্ষমতাবান এবং পুরুষদের শোষণ করে। তাই পুরুষদের নিজেদের শারীরিক ও মানসিকভাবে শক্তিশালী করতে হবে এবং নারীদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।
তদন্ত কর্মকর্তা বাসকম্ব এবং তার মতো এই প্রজন্মের অন্যরাও এই বাস্তবতা সম্পর্কে খুব একটা জানতেন না। ফলে তারা নিজেদের সন্তানদের এই সংকট থেকে রক্ষা করতেও অক্ষম।
সিরিজের নির্মাতা ও গবেষণা
সিরিজের অন্যতম নির্মাতা জ্যাক থর্ন জানান, গল্পটি তৈরির অনুপ্রেরণা এসেছে তার বন্ধু স্টিফেন গ্রাহাম-এর কাছ থেকে। যুক্তরাজ্যে কিশোরদের মধ্যে সহিংসতা বাড়ছে, ছুরি নিয়ে অপরাধ ঘটছে— এই বিষয়টি তুলে ধরতে চেয়েছিলেন তারা।
থর্ন জানান, তিনি গবেষণার জন্য বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ঘেঁটেছেন, যেমন রেডিট ও ফোরচ্যান। সেখানে অনেক অন্ধকার দিক রয়েছে, যেখানে তরুণদের মনে বিষাক্ত ধারণা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়।
তিনি বলেন, “১৩ বছর বয়সীরা সরাসরি কোনো উগ্রবাদীকে অনুসরণ করে না। তারা সাধারণত গেমিং, মিউজিক বা টিভি শো পছন্দ করে এমন কাউকে অনুসরণ করে। সেই মাধ্যমেই উগ্র ধারণাগুলো তাদের মনে ঢুকে পড়ে।”
একটি শিশুকে ধ্বংস করতেও লাগে একটি সমাজ
সিরিজটি প্রশ্ন তোলে— জেইমি কেন খুন করল?
এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলব্যবস্থা, পরিবার, বন্ধুবান্ধব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম— সব মিলিয়ে তার জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
থর্ন বলেন, “একটি শিশুকে গড়ে তুলতে যেমন একটি সমাজের দরকার, তেমনি তাকে ধ্বংস করতেও পুরো সমাজ দায়ী।”
তিনি আরও বলেন, “জেইমি ধ্বংস হয়ে গেছে— কারণ তার স্কুল তাকে সাহায্য করেনি, তার বাবা-মা তাকে বোঝেনি, তার বন্ধুরা তাকে সঠিক পথে আনতে পারেনি।”
বাবা-মা এবং সমাজের করণীয়
থর্নের মতে, অভিভাবকদের সন্তানের ডিজিটাল জীবন সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। কী ধরনের কনটেন্ট তারা দেখছে, কার সঙ্গে মিশছে— এসব বিষয়ে খোঁজ নেওয়া জরুরি।
তিনি বলেন, “আমার নিজের ছেলের বয়স ৯ বছর। এখনো সে ফোন ব্যবহার শুরু করেনি। তবে আমি জানি, একসময় তাকে এই বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হবে। তখন আমি কীভাবে তাকে রক্ষা করবো, সেটা ভাবতে হবে।”
সিরিজের নির্মাণশৈলী ও বার্তা
সিরিজটি চারটি পর্বে নির্মিত হয়েছে, যেখানে প্রতিটি পর্ব একটি অবিচ্ছিন্ন শটে ধারণ করা হয়েছে। এতে দর্শকদের মনে হয়েছে, তারা যেন সরাসরি ঘটনার সঙ্গে যুক্ত রয়েছে।
সিরিজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্য ছিল, যখন বাসকম্বের ছেলে তাকে ইমোজির লুকানো অর্থ বোঝায়। এটি দেখিয়েছে, আজকের অভিভাবক ও সন্তানদের মধ্যে কত বড় একটি যোগাযোগের ফাঁক তৈরি হয়েছে।
থর্ন বলেন, “এই দৃশ্যটি আমার প্রিয়। কারণ এটি শুধু একটি তথ্য নয়, বরং বাবা-ছেলের সম্পর্কের একটি সূক্ষ্ম দিক তুলে ধরে।”
‘অ্যাডোলেসেন্স’ সিরিজটি দেখিয়েছে, কিশোরদের মানসিকতা ও আচরণ কীভাবে বদলাচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ও গোপন গোষ্ঠীগুলো তাদের মনে কীভাবে ঘৃণা ঢুকিয়ে দিচ্ছে, তা আমরা হয়তো বুঝতেই পারছি না।
সিরিজটি আমাদের চোখ খুলে দেয়— অভিভাবক, শিক্ষক ও সমাজকে সতর্ক হতে শেখায়। সময় এসেছে, আমরা নতুন প্রজন্মকে আরও ভালোভাবে বোঝার চেষ্টা করি।
তথ্য সূত্র : সিএনএন



