Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

কোরিয়ার তারকা-জীবন যেন বাস্তবের ‘স্কুইড গেইম’

korea-industry
[publishpress_authors_box]

অভিনেত্রী কিম সে-রনের আত্মহত্যার ঘটনায় দক্ষিণ কোরিয়ার শো-বিজ জগতের তারকাদের ওপর তৈরি মানসিক চাপ নিয়ে নতুন করে সমালোচনা শুরু হয়েছে।

রোববার অভিনেত্রী ২৪ বছর বয়সী কিমকে তার সিউলের বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়। ২০২২ সালে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হলে নেতিবাচক সংবাদ এবং অনলাইনে বিদ্বেষমূলক মন্তব্যের শিকার হয়েছিলেন আত্মহত্যাকারী ওই অভিনেত্রী। পুলিশ তার মৃত্যুর বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানায়নি।

কিমের এরকম অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর জন্য বিশেষজ্ঞরা সাইবার বুলিংকেই দোষারোপ করছেন। পরিস্থিতি দিন দিন হতাশাজনক ও খারাপের দিকে যাচ্ছে বলেই তাদের মত। সাইবার বুলিংয়ের কারণে ক্যারিয়ার বিপর্যস্ত হওয়ার পর আরও কিছু কোরিয়ান তারকারাও গত কয়েকবছরে আত্মহত্যায় প্ররোচিত হয়েছেন।  

বুধবার যখন কিমের শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়।

দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদন শিল্পের এখন স্বর্ণসময় চলছে। বিশ্বজুড়ে কোরিয়ান বিনোদন জগতের আনুমানিক ২২০ মিলিয়নেরও বেশি ভক্ত রয়েছেন – যা দক্ষিণ কোরিয়ার জনসংখ্যার চারগুণ।

কিন্তু কোরিয়ান বিনোদন শিল্পের অন্ধকার দিকটিও কিমের মৃত্যুর পর আরও জোরেসোরে আলোচনায় আসছে।

শিক্ষা থেকে ক্যারিয়ার পর্যন্ত- দক্ষিণ কোরিয়া জীবনের প্রায় সব ক্ষেত্রেই তার অতি-প্রতিযোগিতামূলক সংস্কৃতির জন্য পরিচিত। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে দক্ষিণ কোরিয়াতেই আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি। দেশটিতে সামগ্রিকভাবে আত্মহত্যার হার কমতে শুরু করলেও, ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সীদের মধ্যে আত্মহননের প্রবণতা বাড়ছে।

এই চাপ সেলিব্রিটিদের ক্ষেত্রে আরও বাড়ন্ত। নিখুঁত হওয়ার প্রচণ্ড চাপের মুখোমুখি এইসব তারকারা ‘সুপার ফ্যান’দের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হন, যারা ক্যারিয়ার তৈরি বা ভেঙে দিতে পারে।

এই কারণেই সামান্যতম ভুল পদক্ষেপও কোরিয়ার শো-বিজ জগতের একজন সেলিব্রিটির ক্যারিয়ার শেষ করে দিতে পারে। কিম সে-রন এতটাই অপ্রিয় হয়ে গিয়েছিলেন যে, নেটফ্লিক্সে ২০২৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ড্রামা ব্লাডহাউন্ডস এর মতো শো থেকে তার অভিনীত দৃশ্যগুলো বাদ দেওয়া হয়েছিল।

কোরিয়ান সংস্কৃতি সমালোচক কিম হার্ন-সিক বিবিসিকে বলেন, “সেলিব্রিটিরা আইনিভাবে শাস্তি পেয়েই মুক্তি পান না। তারা নিরন্তর সমালোচনার লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে।”

তিনি কে-পপ শিল্পী সুলি এবং গু হারার কথা উল্লেখ করেন। ইন্টারনেট ট্রলিং এর দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ক্লান্ত হয়ে যারা ২০১৯ সালে এই দুই শিল্পী আত্মহত্যা করেন। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে আইন ভাঙার কোনো অভিযোগও ছিল না।

সুলি কে-পপ জগতের প্রচলিত ধ্যান-ধারণা বা ছাঁচের সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেননি বলে ভক্তদের দ্বারা সমালোচিত হচ্ছিলেন। অর্থাৎ, কে-পপ তারকাদের যেমন হওয়া উচিত বলে মনে করা হয়, সুলি সেই ছাঁচে পুরোপুরি ফিট ছিলেন না। তার ব্যতিক্রমী কাজকর্ম বা চিন্তাভাবনার জন্য অনেক ভক্ত তাকে অপছন্দ করতে শুরু করেন।

অন্যদিকে, গু হারার তার প্রাক্তন প্রেমিকের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের দ্বারা সমালোচিত হয়েছিলেন। তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে অনেক কটূ কথা বলা হচ্ছিল এবং তাকে অনলাইনে হয়রানি করা হয়েছিল।

এই দুটি ঘটনাই দক্ষিণ কোরিয়ার বিনোদন জগতে তারকাদের ব্যক্তিগত জীবন এবং তাদের কাজকর্ম নিয়ে দর্শকদের অতিরিক্ত সংবেদনশীলতার উদাহরণ।

‘একটি বাস্তব জীবনের স্কুইড গেম’

কিম হার্ন-সিক বিবিসিকে বলেন, সাইবার বুলিং কিছু লোকের জন্য অর্থ উপার্জনের একটি মাধ্যমেও পরিণত হয়েছে- “ইউটিউবাররা ভিউ পায়, ফোরামগুলো এনগেজমেন্ট পায়, নিউজ আউটলেটগুলো ট্র্যাফিক পায়। আমি মনে করি না [কিমের মৃত্যু] পরিস্থিতির পরিবর্তন করবে। বাজে মন্তব্য করার বিরুদ্ধে আরও কঠোর ফৌজদারি শাস্তি হওয়া দরকার।”

কিম সে-রনের বাবা তার মৃত্যুর জন্য একজন ইউটিউবারকে দায়ী করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ওই ইউটিউবারের প্রকাশিত বিতর্কিত ভিডিওগুলোর কারণে কিম গভীর মানসিক কষ্টে ছিলেন।

অন্যরা কিছু স্থানীয় মিডিয়া আউটলেটকে দায়ী করছেন, যারা কিমের বিরুদ্ধে ভুয়া রিপোর্ট করে জনগণকে ‘উস্কানি’ দিচ্ছিল।

মঙ্গলবার নাগরিক গোষ্ঠী সিটিজেনস কোয়ালিশন ফর ডেমোক্রেটিক মিডিয়া এক বিবৃতিতে বলেছে, “মিডিয়া-চালিত চরিত্র হননের এই চক্র অবশ্যই বন্ধ করতে হবে।”

ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিশেষজ্ঞ না জং-হো দক্ষিণ কোরিয়ার সেলিব্রিটিদের মৃত্যুর ঘটনাকে স্কুইড গেমের বাস্তব জীবনের সংস্করণের সঙ্গে তুলনা করেছেন। স্কুইড গেইম হলো নেটফ্লিক্সে প্রচারিত একটি দক্ষিণ কোরিয়ান নেটফ্লিক্স ব্লকবাস্টার সারভাইবাল ড্রামা। এতে দেখানো হয়, বহু ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি বিশাল অর্থ পুরস্কারের জন্য জীবন-মরণ খেলায় অংশ নেয়। সিরিজটির গল্পে, প্রতিযোগীরা ছয়টি শিশুদের খেলা খেলতে বাধ্য হয়। কিন্তু হেরে গেলে তাদের নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এটি কোরিয়ার সমাজব্যবস্থার কঠোর প্রতিযোগিতা, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য ও মানবিক মূল্যবোধ নিয়ে প্রতীকীভাবে তীব্র সমালোচনা করে।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ না জং-হো এক ফেইসবুক পোস্টে লিখেছেন, “আমাদের সমাজ যারা হোঁচট খায় তাদের পরিত্যাগ করে এবং কিছুই হয়নি যেন এমনভাবে এগিয়ে যায়… কত জীবন হারাতে হবে তার আগে আমরা মানুষকে এই ধ্বংসাত্মক, দমবন্ধ করা লজ্জা দেওয়া বন্ধ করব?”

“মদ্যপান করে গাড়ি চালানো একটি বড় ভুল। যদি এর শাস্তি না হয় তবে আমাদের আইনি ব্যবস্থায় সমস্যা হবে। তবে, যে সমাজ ভুল করলে মানুষকে দ্বিতীয় সুযোগ না দিয়ে কবর দেয় সেটি সুস্থ সমাজ নয়।”

গত বছর বিবিসি জানিয়েছিল যে কে-পপ ইন্ডাস্ট্রিতে কুখ্যাত ‘সুপার ফ্যানরা’ কীভাবে তাদের আইডলদের ব্যক্তিগত জীবন – তাদের রোমান্টিক সম্পর্ক থেকে শুরু করে কাজের বাইরে তাদের দৈনন্দিন কার্যক্রম পর্যন্ত – নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে এবং যখন কিছু ভুল হয় তখন তারা তারকাদের প্রতি ক্ষমাশীল আচরণ করতে ভুলে যায়

কাজেই বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই যে, কিম সে-রন দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর জনসমক্ষে আসা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিলেন। যদিও মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর জন্য ২০২৩ সালের এপ্রিলে তিনি ১১ হাজার পাউন্ড জরিমানাও দিয়েছিলেন।

তবে, এটাও ঠিক যে কোরিয়ার সব ‘পাবলিক ফিগার’ একই ধরনের আচরণের শিকার হন না। অতীতে দেশটির বিরোধীদলীয় নেতা লি জে-মিয়ং সহ রাজনীতিবিদদেরও বিরুদ্ধে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর অভিযোগ উঠেছে। কিন্তু তাদের অনেকেই আবার হারানো ইমেইজ পুনরুদ্ধার করতে পেরেছেন। জরিপে দেখা গিয়েছে- লি এখন দেশের রাষ্ট্রপতি পদপ্রার্থীর জন্য জনপ্রিয়তার শীর্ষে রয়েছেন।

“আইডল ইমেজে ফাটল ধরলে কোরিয়ায় শিল্পীদের জন্য সেটি পুনরুদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন”, বলেন কে-পপ কলামিস্ট জেফ বেঞ্জামিন।

তিনি এর বিপরীতে পশ্চিমা বিনোদন শিল্পের উদাহরণ টেনে বলেন, “সেখানে বিতর্ক এবং কেলেঙ্কারি কখনও কখনও সেলিব্রিটিদের খ্যাতিতে ‘রকস্টারের মতো তকমা’ যোগ করে।”

তিনি বলেন, “যদিও কোনও হলিউড সেলিব্রিটি ডিইউআই [মাদক দ্রব্য বা অ্যালকোহল সেবন করে গাড়ি চালানোর জন্য] এর জন্য গ্রেপ্তার হলে বা উল্লেখযোগ্য অপরাধের জন্য জেলে গেলে কেউ উল্লাস করে না, তবে এটি ক্যারিয়ার শেষ হওয়ার মতো নয়।”

সম্প্রতি শিল্পীদের মানসিক স্বাস্থ্য উদ্বেগ মোকাবেলায় নানা রকম পদক্ষেপ নিচ্ছে কোরিয়ার সরকার। তবে এর কার্যকারিতা স্পষ্ট নয়। বেঞ্জামিন বলেন, “আসল পরিবর্তন তখনই হতে পারে যখন এই ধরনের (তারকাদের ব্যক্তিগত জীবনে) অনুপ্রবেশকারী রিপোর্টিং চালিয়ে যাওয়ার জন্য আর কোনও আর্থিক প্রণোদনা বা সাধারণ ভক্তদের মনোযোগ পাবেন না।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found