Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

এখনই কেন গাজা চুক্তি

gaza
[publishpress_authors_box]

ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত যুদ্ধবিরতি চুক্তি এখন গাজায় কার্যকর হচ্ছে। এই চুক্তি উভয় পক্ষের জন্যই উল্লেখযোগ্য অর্জন নিয়ে এসেছে। 

ইসরায়েল তার অবশিষ্ট জিম্মিদের, যাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন জীবিত বলে ধারণা করা হচ্ছে এবং মৃতদের দেহ ফিরে পাবে। এর বিনিময়ে প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসরায়েল প্রায় ২,০০০ ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দেবে, গাজায় চলমান দুই বছরের যুদ্ধের ইতি টানবে এবং এলাকা থেকে বড় পরিসরে সেনা প্রত্যাহার করবে। এই চুক্তি বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা প্রশংসনীয়।

তবে এই চুক্তির মূল কাঠামো বহু মাস ধরেই আলোচনার টেবিলে ছিল। এবার উভয় পক্ষই তাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দাবির বিষয়ে আপস করতে রাজি হয়েছে। 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামাসকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করার অঙ্গীকার করেছিলেন। কিন্তু এখনও হামাসই গাজার সবচেয়ে শক্তিশালী পক্ষ হিসেবে টিকে আছে। অপরদিকে হামাস চেয়েছিল ইসরায়েলের পূর্ণ প্রত্যাহার এবং ভবিষ্যতে কোনও সামরিক অভিযান না চালানোর নিশ্চয়তা, যা এখনও অনিশ্চিত।

তাহলে প্রশ্ন হলো, উভয় পক্ষই কেন তাদের সর্বোচ্চ লক্ষ্য থেকে পিছিয়ে এলো? এবং কেন এখন?

প্রথমে হামাসকে নিয়ে শুরু করা যাক। বহুদিন ধরেই তারা জিম্মিদেরকে আলোচনার হাতিয়ার হিসেবে ধরে রেখেছিল। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর হামাস যে হামলা চালায়, তাতে জিম্মি নেওয়ার মূল উদ্দেশ্যই ছিল ইসরায়েলকে বড় ছাড় দিতে বাধ্য করা। 

২০১১ সালে হামাসের হাতে বন্দি একমাত্র সৈনিক জিলাদ শালিতের বিনিময়ে ইসরায়েল ১ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি বন্দিকে মুক্তি দিয়েছিল। এবারও হামাস তেমন ছাড় পেতে চেয়েছিল। তাছাড়া সব জিম্মিকে ছেড়ে দিলে ইসরায়েল আরও আগ্রাসী হয়ে হামলা চালাবে, এই আশঙ্কাও ছিল হামাস নেতৃত্বের।

তবুও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে জিম্মিদেরকে ‘চাপের হাতিয়ার’ হিসেবে রাখা ক্রমেই দুর্বল কৌশলে পরিণত হয়। যদিও জিম্মিদের ভাগ্য অনেক ইসরায়েলির জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয়। তবুও তা ইসরায়েলের সামরিক অভিযান থামাতে পারেনি। ইসরায়েল বারবার হামাসের নেতাদের ও যোদ্ধাদের হত্যাকেই অগ্রাধিকার দিয়েছে, এমনকি তা জিম্মিদের জীবনের ঝুঁকি বাড়ালেও। 

গাজার শহরাঞ্চলে ইসরায়েলের সাম্প্রতিক গভীর অগ্রযাত্রা প্রমাণ করে যে জিম্মিদের নিরাপত্তা ইসরায়েলের কাছে বড় বাধা নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া এই চুক্তিতে অন্তত হামাস এখন জিম্মিদের ব্যবহার করে নিজেদের জন্য এক ধরনের ‘রাজনৈতিক বিজয়’ দাবি করতে পারছে। এর মাধ্যমে ইসরায়েলকে সেনা প্রত্যাহারে বাধ্য করা ও ফিলিস্তিনি বন্দিদের মুক্তি আদায় করা যাচ্ছে।

তবে দুই বছরের ভয়াবহ যুদ্ধে হামাস নিজেও প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত। ইসরায়েল সংগঠনটির বহু শীর্ষ নেতা, যার মধ্যে ৭ অক্টোবর হামলার নেপথ্যের মূল পরিকল্পনাকারী ইয়াহিয়া সিনওয়ারও রয়েছেন, হত্যা করেছে। ইরান, লেবানন ও কাতারেও হামাস নেতাদের ওপর ইসরায়েলের হামলার চেষ্টা হয়েছে। অর্থাৎ কোথাও তারা নিরাপদ নয়। 

ইসরায়েল গত জানুয়ারিতে দাবি করে যে তারা প্রায় ২০ হাজার হামাস যোদ্ধাকে হত্যা করেছে। যদিও এ সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। তবুও নিহতের পরিমাণ নিঃসন্দেহে বিপুল। নতুন যোদ্ধা নিয়োগ করা হলেও তাদের প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা আগের তুলনায় অনেক কম।

গাজার খুব কম ফিলিস্তিনি পরিবারই আছে যারা ক্ষতির মুখোমুখি হয়নি। গত সপ্তাহে মৃত্যুর সংখ্যা ৬৭ হাজার ছাড়িয়েছে। গোটা অঞ্চল কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত। গাজার মানুষ অনেক আগেই যুদ্ধের অবসান চেয়েছিল। অনাহারে ও চিকিৎসাহীনতায় ভুগতে থাকা এই মানুষগুলো বারবার স্থানচ্যুত হয়েছে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানে। প্রতিটি অতিরিক্ত দিন ছিল তাদের জন্য যন্ত্রণার। তাই এখন তারা আশা করছে খাদ্য ও ওষুধ আবার গাজায় প্রবেশ করতে পারবে এবং পুনর্গঠন শুরু হবে।

ইসরায়েলিরাও দুই বছরের এই অবিরাম যুদ্ধে ক্লান্ত। বারবার রিজার্ভ সৈন্য ডাকার কারণে ইসরায়েলি পরিবার ও দেশের অর্থনীতি মারাত্মক চাপে পড়েছে। এই যুদ্ধে ইসরায়েলের ৪৬৬ জন সেনা নিহত হয়েছে, যা আগের গাজা যুদ্ধগুলোর তুলনায় অনেক বেশি। সাম্প্রতিক এক জরিপে দুই-তৃতীয়াংশ ইসরায়েলি নাগরিক যুদ্ধবিরতির পক্ষে মত দিয়েছে।

আন্তর্জাতিক চাপও ছিল দুই পক্ষের ওপর। জুলাইয়ে আরব লীগ হামাসকে নিরস্ত্র হতে ও গাজায় তাদের শাসনের ইতি টানার আহ্বান জানায়। পাশাপাশি ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ৭ অক্টোবরের হামলাকে সরাসরি নিন্দা জানায়। ইউরোপীয় দেশগুলো বারবার যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়ে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের সমালোচনা করেছে। কানাডা, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

ইসরায়েল সাধারণত ইউরোপীয় চাপকে উপেক্ষা করে। কিন্তু ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উপেক্ষা করা সম্ভব হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ট্রাম্প ইসরায়েল-সংক্রান্ত বিষয়ে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত প্রভাবশালী। যদি জো বাইডেন নেতানিয়াহুকে কোনও চুক্তির জন্য চাপ দিতেন এবং নেতানিয়াহু অস্বীকার করতেন, তাহলে প্রায় সব রিপাবলিকান ও কিছু ডেমোক্র্যাট নেতানিয়াহুর পক্ষেই থাকতেন। 

কিন্তু ট্রাম্প যখন চাপ দেন, তখন বেশিরভাগ ডেমোক্র্যাটও একমত হন এবং ট্রাম্প নিজ দলের সমর্থনও নিশ্চিত করতে পারেন। তাছাড়া ট্রাম্প রাজনীতিকে ব্যক্তিগতভাবে গ্রহণ করেন। আর এক্ষেত্রে নেতানিয়াহুর আশঙ্কা থাকে, তিনি প্রেসিডেন্টকে অমান্য করলে ট্রাম্প সহজে ক্ষমা করবেন না বা ভুলবেন না। সিরিয়া, ইয়েমেন ও অন্যান্য আঞ্চলিক বিষয়ে ট্রাম্পের নীতিগুলো ইসরায়েলের অবস্থানের সঙ্গে আগেও সাংঘর্ষিক ছিল।

কাতারকে দেওয়া ট্রাম্পের নিরাপত্তা নিশ্চয়তাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। কাতার যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র এবং প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ব্যক্তিগত সম্পর্ক উন্নয়নে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়েছে। যেমন বিলাসবহুল ৭৪৭ জেট উপহার দেওয়ার মতো পদক্ষেপ। 

ইসরায়েল যখন কাতারের ওপর হামলা চালায়, তখন ট্রাম্প প্রচণ্ড ক্ষুব্ধ হন। কাতারকে নিরাপত্তা নিশ্চয়তা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন হামাস নেতাদের জন্য এক ধরনের আশ্রয়দাতা রাষ্ট্রের ভূমিকা নিশ্চিত করেছে। যেখানে তারা গাজায় থাকলে ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তু হতে পারত।

কাতারে হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ বাড়তে থাকায় নেতানিয়াহুর সামনে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসে গিয়েছিল। যুদ্ধের ক্লান্তি, জিম্মিদের ফেরত আনার ইচ্ছা ও যুদ্ধবিরতির প্রতি জনসমর্থনের পাশাপাশি নেতানিয়াহুর নিজস্ব জোটও ভেঙে পড়ছিল। বিশেষত ইসরায়েলের সুপ্রিম কোর্টের জুন মাসের সেই রায়ের পর, যেখানে বলা হয় অতিআর্থোডক্স ইহুদিদেরও সামরিক সেবা দিতে হবে। 

ট্রাম্পের বিরোধিতা করা, এমনকি একটি অজনপ্রিয় যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া, দুটোই নেতানিয়াহুর জন্য কৌশলগত ও রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। যেহেতু বেশিরভাগ ইসরায়েলি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝে, তাই নেতানিয়াহু এখন ট্রাম্পের চাপকেই যুদ্ধ থামানোর যৌক্তিক কারণ হিসেবে দেখাতে পারেন, ডানপন্থীদের আস্থা না হারিয়েই।

নেতানিয়াহু রাজনীতিরও ওস্তাদ। ইসরায়েল নির্বাচনের মৌসুমে প্রবেশ করছে। এখন তিনি নিজেকে এমন একজন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করতে পারবেন যিনি হামাস ও হিজবুল্লাহকে দুর্বল করেছেন এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকেও পিছিয়ে দিয়েছেন।

বর্তমান চুক্তিটি নিঃসন্দেহে এক বড় অর্জন। গাজা ও ইসরায়েল উভয়ের জন্যই এক গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি। তবে এই শান্তি স্থায়ী করা অনেক বেশি কঠিন হবে। ভালো দিক হলো, যে ক্লান্তি, চাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এই চুক্তি আনতে সাহায্য করেছে, যেমন আরব ও ইউরোপীয় চাপ, তা এখনও বহাল থাকবে। কিন্তু কিছু উপাদান বেশ নড়বড়ে। 

নির্বাচনী মৌসুমে রাজনৈতিক সুবিধা নিতে নেতানিয়াহু যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ করতে পারেন। ধরা যাক কোনও হামাস নেতাকে লক্ষ্য করে হামলা চালিয়ে অথবা কোনও বিতর্কিত বন্দিকে মুক্তি দেওয়ার মতো অজনপ্রিয় সিদ্ধান্তে বিলম্ব করতে পারেন। অপরদিকে হামাস হয়তো ভাবতে পারে, তাদের ক্ষমতা পুরোপুরি হারানোর ঝুঁকি নেওয়া যাবে না বা নিজেদের ‘প্রতিরোধ আন্দোলনের’ ভাবমূর্তি বিসর্জন দেওয়া সম্ভব নয়।

সব মিলিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে তার মিত্রদের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় বজায় রাখতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে চুক্তি মেনে চলতে বাধ্য করতে হবে। পাশাপাশি আরও বৃহত্তর পদক্ষেপ নিতে হবে, যেমন গাজার পুনর্গঠন, একটি হামাসমুক্ত সরকার গঠন, এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দিকে অগ্রসর হওয়া। 

কিন্তু ট্রাম্পের মনোভাব অস্থির। তার অবস্থান হঠাৎ বদলে যেতে পারে। তিনি অন্য কোনও সংকটে মনোযোগ দিতে পারেন, অথবা ইসরায়েলের ওপর চাপ কমাতে পারেন।

শেষ পর্যন্ত এই চুক্তি কোনও পক্ষের পূর্ণ বিজয়ের প্রতীক নয়। বরং এটি এক ক্লান্তি, আন্তর্জাতিক চাপ ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ থেকে জন্ম নেওয়া এক অস্থায়ী বিরতি। এর স্থায়িত্ব নির্ভর করবে না কেবল চুক্তির বয়ানের ওপর। বরং সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের, বিশেষ করে ওয়াশিংটনের ইচ্ছার ওপর। তারা কতটা আন্তরিকভাবে এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতিকে স্থায়ী শান্তির ভিত্তি বানাতে পারে, তাই দেখার বিষয়।

তথ্যসূত্র : ফরেন পলিসি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত