Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

টেসলার বিরুদ্ধে বিক্ষোভে সরোসকে কেন দায়ী করছেন মাস্ক

elon-musk-george-soros-right
[publishpress_authors_box]

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠাৎ মিত্র ধনকুবের ইলন মাস্ক। প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের কয়েক মাস আগে হঠাৎ করে ট্রাম্পের ইনার সার্কেলে তার প্রবেশ। এরপর ট্রাম্পের পুরো নির্বাচনী প্রচারের প্রধান মুখ হয়ে ওঠেন তিনি।

ট্রাম্পের পেছনে তহবিল দেওয়া থেকে শুরু করে প্রচারাভিযানে অংশগ্রহণের মতো বিষয়গুলোতে ছিল মাস্কের সরব উপস্থিতি। নির্বাচনে জেতার পর ট্রাম্প ভুলে যাননি মাস্ককে। তার এজেন্ডা বাস্তবায়নের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দিয়েছেন তাকে।

ধনকুবের ইলন মাস্ককে ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’ (ডিওজিই) নামক সংস্থার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি জানুয়ারি থেকে কার্যক্রম শুরু করে এবং ইতোমধ্যে ৬২ হাজারের বেশি ফেডারেল চাকরি ছেঁটে ফেলেছে। আরও চাকরি ছাঁটার পরিকল্পনা রয়েছে, বিশেষ করে ভেটেরান্স অ্যাফেয়ার্স ডিপার্টমেন্টে, যেখানে আগামী কয়েক মাসে হাজার হাজার চাকরি কাটা হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশি সহায়তা সংস্থা ইউএসএআইডির বহু কর্মীর ছাঁটাই ও এর বিদেশি সহায়তা বন্ধের পেছনেও মাস্কই দায়ী, এমনটা দাবি করেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটরা।

এছাড়া গত জানুয়ারিতে হলোকাস্ট স্মরণ দিবসের আগে মাস্ক একটি বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন। তিনি একটি ডানপন্থী জার্মান রাজনৈতিক দলের সভায় হাজার হাজার মানুষের সামনে বলেছিলেন, “শিশুরা তাদের পিতামাতার অপরাধের জন্য দোষী হওয়া উচিৎ নয়, তাদের দাদা-দাদীরও নয়।”

তবে শুধু যে ডিওজিই সংস্থার কারণেই মাস্কের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ বা তার মালিকানাধীন টেসলার ওপর হামলা হচ্ছে, তা নয়। ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নেওয়ার দিন থেকেই টেসলার ওপর হামলা শুরু হয় আমেরিকার বিভিন্ন স্থানে।

পরে এর সঙ্গে যুক্ত হয় জিওজিই ইস্যু। মাস্কের কিছু সিদ্ধান্তে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ। মাস্কের মালিকানাধীন টেসলার ডিলারশিপের সাইনবোর্ডে গ্রাফিটি আঁকা হয়েছে। আরেকটি ডিলারশিপের পার্কিং লটে মলোটভ ককটেল নিক্ষেপ করা হয়েছে। টেসলার চার্জিং স্টেশনগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে।  ট্রাম্প প্রশাসনে মাস্কের ভূমিকার কারণে টেসলা কোম্পানির বিভিন্ন আউটলেট এবং গাড়িগুলোকে টার্গেট করা হচ্ছে।

টেসলার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ ও হামলার ঘটনা বেড়েছে। আদালতের নথি, নজরদারি ছবি, পুলিশ রিপোর্ট ও স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্যানুসারে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর থেকে টেসলার বিভিন্ন স্থাপনায় এক ডজনের বেশি সহিংস বা ধ্বংসাত্মক ঘটনা ঘটেছে। 

ইলন মাস্ক ট্রাম্পের অন্যতম বড় সমর্থক ও একজন রক্ষণশীল আলোচক হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর এসব ঘটনা আরও বেড়েছে। অনলাইনে তার প্রতি ক্ষোভ ধীরে ধীরে বাস্তব হামলায় রূপ নিচ্ছে। টেসলার শোরুম, চার্জিং স্টেশন ও গাড়িতে ভাঙচুর চালানো হচ্ছে।

মার্চের শুরুতে ম্যাসাচুসেটসের লিটলটনের একটি শপিং সেন্টারে টেসলার সুপারচার্জারগুলোতে আগুন দেওয়া হয়। মেরিল্যান্ডে দুর্বৃত্তরা টেসলার একটি ভবনে ‘নো মাস্ক’ লিখে স্প্রে-পেইন্ট করে এবং এর পাশে স্বস্তিকা সদৃশ চিহ্ন আঁকে। ফেব্রুয়ারিতে এক ব্যক্তি সেমি-অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ওরিগনের সেলেমে টেসলার শোরুমে গুলি চালায়। তদন্তকারীদের মতে, কয়েক সপ্তাহ আগে একই ব্যক্তি ওই শোরুমে মলোটভ ককটেল ছুড়ে হামলা চালিয়েছিল। এতে টেসলার গাড়ি ও শোরুমের জানালার ক্ষতি হয়। আদালতের নথি অনুযায়ী, হামলায় প্রায় ৫ লাখ ডলারের ক্ষতি হয়েছে।

এই ধ্বংসযজ্ঞ আরও বিপাকে ফেলছে আগে থেকেই সঙ্কটে থাকা টেসলাকে। ট্রাম্পের শপথ গ্রহণের পর থেকে কোম্পানির শেয়ারমূল্য ৩৫ শতাংশের বেশি কমেছে। গত বছর এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো টেসলার বার্ষিক বিক্রি হ্রাস পায়। গত বুধবার প্রকাশিত তথ্যানুসারে, জার্মানিতে ফেব্রুয়ারিতে টেসলার গাড়ি বিক্রি এক বছরের তুলনায় ৭৬ শতাংশ কমে গেছে। অনেক মালিক তাদের গাড়ি কেনার সিদ্ধান্ত নিয়ে অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন। একসময় পরিবেশবান্ধবতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত টেসলা এখন অনেকের কাছে চরম ডানপন্থী রাজনীতির প্রতীক হয়ে উঠেছে।

টেসলার দীর্ঘদিনের বিনিয়োগকারী ও মাস্কের সমালোচক রস গার্বার জানিয়েছেন, টেসলার শোরুম, গাড়ি ও সুপারচার্জারের ওপর হামলার ঘটনা মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করতে পারে। তিনি বলেন, “গ্রাহকরা হয়তো মাস্কের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে চাইবেন না কিংবা ভাঙচুরের ঝুঁকি নিতে চাইবেন না।”

লিটলটনের পুলিশ প্রধান ম্যাথিউ পিনার্ড বলেছেন, কোনও ঘটনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত হোক বা না হোক, অগ্নিসংযোগ ও সম্পত্তি ধ্বংস করা মত প্রকাশের সঠিক উপায় নয়। লিটলটনে এই সপ্তাহে কয়েকটি টেসলা চার্জিং স্টেশনে আগুন দেওয়া হয়।

সহিংস ঘটনাগুলো এমন সময়ে ঘটছে যখন মাস্ক জাতীয় পর্যায়ে বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন। আগে তিনি মূলত রাজনীতি থেকে দূরে থাকতেন। টেসলার মাধ্যমে টেকসই ভবিষ্যৎ গড়া ও তার কোম্পানি স্পেসএক্সের রকেট উৎক্ষেপণের কাজেই বেশি মনোযোগী ছিলেন।

কিন্তু এই গ্রীষ্মে তিনি দ্রুত ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মহলে জায়গা করে নেন। তিনি ট্রাম্প ও অন্যান্য রিপাবলিকান প্রার্থীদের নির্বাচনে সহায়তা করতে কমপক্ষে ২৮৮ মিলিয়ন ডলার দান করেন।

অনেকে মনে করেন, টেসলার বিরুদ্ধে বর্তমান প্রতিক্রিয়া সত্ত্বেও ট্রাম্পকে দেওয়া মাস্কের বড় বিনিয়োগ লাভজনক হবে। বিনিয়োগকারী ও বিশ্লেষকদের মতে, স্বয়ংক্রিয় গাড়ি চালনার নিয়ম সহজ হলে টেসলা বড় সুবিধা পাবে। মাস্ক জানিয়েছেন, এটি কোম্পানির ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়েডবুশ সিকিউরিটিজের গ্লোবাল টেকনোলজি গবেষণা প্রধান ড্যান আইভস বলেছেন, মাস্ক ও ট্রাম্পের সম্পর্ক টেসলার ব্র্যান্ডের জন্য বড় উদ্বেগ তৈরি করেছে। তবে শেষ পর্যন্ত এটি লাভজনক হবে।  

বৃহস্পতিবার এক বিনিয়োগকারীদের নোটে তিনি বলেন, “এই বিভ্রান্তিগুলো ধীরে ধীরে কমে যাবে। মাস্ক ও টেসলার জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ ছিল ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে থাকা। এটি একটি সহজ নিয়মকানুনের পরিবেশ তৈরি করবে, যেখানে ফেডারেল পর্যায়ে স্বয়ংক্রিয় গাড়ির নীতিমালা টেসলার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মূল অংশ হবে।”

এসব হামলা ও সহিংসতার ঘটনা নিয়ে মাস্ক ও টেসলা শুরুতে কোনও মন্তব্য করেননি। গত মাসে এক ব্যক্তি সোশাল মিডিয়ায় একটি সুপারচার্জারের ছবি পোস্ট করেন, যেখানে “নাৎসি” শব্দটি স্প্রে-পেইন্ট করা ছিল। এর জবাবে, টেসলার অফিসিয়াল সোশাল মিডিয়া অ্যাকাউন্ট জানায়, কোম্পানি এই ধরনের ভাঙচুরের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেবে।

তবে মাস্ক বর্তমান প্রতিবাদ ও টেসলার শোরুমে ভাঙচুরের জন্য ডেমোক্র্যাটিক দাতাদের একটি গ্রুপকে দায়ী করেছেন। তিনি সোশাল মিডিয়ায় এক পোস্টে বলেন, “তদন্তে ৫টি অ্যাক্টব্লু-অর্থায়িত গ্রুপকে টেসলার বিরুদ্ধে ‘প্রতিবাদ’ করার জন্য দায়ী করা হয়েছে: ট্রাবলমেকার্স, ডিসরাপশন প্রজেক্ট, রাইজ অ্যান্ড রেজিস্ট, ইন্ডিভিজিবল প্রজেক্ট ও ডেমোক্র্যাটিক সোশালিস্টস অব আমেরিকা। অ্যাক্টব্লু-র অর্থদাতা হলেন জর্জ সরোস, রিড হফম্যান, হার্বার্ট স্যান্ডলার, প্যাট্রিসিয়া বাউম্যান ও লিয়া হান্ট-হেনড্রিক্স।”

তিনি আরও বলেন, “অ্যাক্টব্লু বর্তমানে বিদেশি ও অবৈধ দান গ্রহণের জন্য তদন্তের সম্মুখীন হয়েছে। গ্রুপটি নির্বাচনী অর্থায়ন নিয়ম ভঙ্গ করছে। এই সপ্তাহে অ্যাক্টব্লুর ৭ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা পদত্যাগ করেছেন। তাদের মধ্যে সহযোগী সাধারণ পরামর্শকও রয়েছেন।”

অ্যাক্টব্লু একটি তহবিল সংগ্রহের প্ল্যাটফর্ম। এটি যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্র্যাটিক প্রার্থীরা, প্রগতিশীল সংগঠনগুলো ও বামপন্থী সংগঠনগুলোর জন্য ব্যবহার করে। এটি দাতাদের বিভিন্ন প্রচারাভিযান ও উদ্যোগে দান করার একটি সহজ পদ্ধতি অবলম্বন করে।

অ্যাক্টব্লু প্লাটফর্মের অর্থদাতা জর্জ সরোসকে নিয়ে এর আগেও আপত্তি তুলেছিলেন মাস্ক। ভারতের ক্ষমতাসীন নরেন্দ্র মোদী সরকারকে হটাতে সরোস এনজিওতে অর্থায়ন করেছিল, এমন অভিযোগের পর এনিয়ে মুখ খোলেন মাস্ক।

তখন তিনি সোশাল মিডিয়ায় লিখেছিলেন, “জর্জ সরোস একটি সিস্টেম হ্যাকারের মতো। মানে তিনি বুঝতে পেরেছেন কীভাবে সিস্টেমটি হ্যাক করা যায়। তিনি কম দামে কিনে বেশি দামে বিক্রির ক্ষেত্রে একজন জিনিয়াস। এখন বয়স হলেও, তিনি এই কাজে অনেক দক্ষ। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, কীভাবে কম টাকা ব্যবহার করে একটি নন-প্রফিট প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যায়, তারপর রাজনীতিবিদদের প্রভাবিত করে সেই প্রতিষ্ঠানকে অনেক টাকা দেওয়া যায়। এর ফলে, ১০ মিলিয়ন ডলার দান দিয়ে একটি নন-প্রফিট তৈরি করে, সেটিকে এক বিলিয়ন ডলারের একটি এনজিওতে পরিণত করা সম্ভব।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত