Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

যাদবপুর ইউনিভার্সিটি কেন উত্তপ্ত থাকে

jadavpur
[publishpress_authors_box]

ভারতের কেন্দ্রীয় শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদার গত ১২ মার্চ বলেন, কলকাতার যাদবপুর ইউনিভার্সিটি তার ‘ইন্সটিটিউট অব এমিনেন্স’ (আইওই) মর্যাদা হারাতে বসেছে। এর কারণ হিসেবে বাজেট ঘাটতির কথা বলেন তিনি।

সুকান্ত পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য বিজেপিরও সভাপতি। পার্লামেন্টে যাদবপুর ইউনিভার্সিটি নিয়ে বিজেপির শমিক ভট্টাচার্যের করা প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এম্পাওয়ার্ড এক্সপার্টস কমিটি’ (ইইসি) যাদবপুর ইউনিভার্সিটির সংশোধিত প্রস্তাব পর্যালোচনা করে দেখেছে, আগের ৩ হাজার ২৯৯ কোটি টাকার বাজেট কমে ৬০৬ কোটি টাকায় নেমে এসেছে। বাজেটে এত বড় হ্রাস আইওই প্রতিষ্ঠানগুলির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক নয়।

এই প্রশ্ন ও জবাব পশ্চিমবঙ্গের দুই প্রবীণ বিজেপি নেতার মধ্যে হলেও এই ঘটনা যাদবপুর ইউনিভার্সিটির জন্য আরও খারাপ সময়ে এসেছে। পশ্চিমবঙ্গের সর্বোচ্চ র‌্যাংকধারী এই বিশ্ববিদ্যালয় নানা কারণে গত তিন সপ্তাহ ধরে উত্তপ্ত।

নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে গত ১ মার্চ যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে সহিংসতা ঘটে। পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু এক দল ছাত্রের মুখোমুখি হন। ছাত্ররা মন্ত্রীর গাড়ি আটকে বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দাবিতে বিক্ষোভ করছিল। কিছুক্ষণ গোলমালের পর মন্ত্রীর গাড়ি বিক্ষোভকারী ছাত্রদের ওপর দিয়ে চলে যায়।

মন্ত্রীদের গাড়ি আটকে বিক্ষোভ করার ঘটনা নতুন নয়। তবে মন্ত্রীর গাড়ির চাকার নিচে ছাত্রদের আঘাত পাওয়ার ঘটনা আগে ঘটেনি।

তার জেরে দুই সপ্তাহের বেশি সময় ধরে বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ চলতে থাকে এবং শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ থাকে। এই ঘটনায় নয়টি মামলা করা হয়। এর মধ্যে আটটি ছাত্রদের বিরুদ্ধে, একটি কলকাতা হাই কোর্টের নির্দেশে মন্ত্রী, তার ড্রাইভার ও বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপকের বিরুদ্ধে।

যাদবপুর ইউনিভার্সিটি ১৯৫৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনের ফসল হিসাবে বিবেচিত। এটি এখন পশ্চিমবঙ্গের সেরা হলেও এক সময় ভারতের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি ছিল।

২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের জাতীয় প্রতিষ্ঠান র‌্যাংকিং ফ্রেমওয়ার্ক (এনআইআরএফ) অনুযায়ী, যাদবপুর ইউনিভার্সিটি ভারতের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে নবম স্থানে রয়েছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবিক, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিভাগে অধ্যাপনা করেন নামকরা সব অধ্যাপকরা। বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কার্যক্রমও বেশ গতিশীল।

তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নে রাজনীতি ও প্রতিবাদের পাশাপাশি অর্থ সংকটও একটি বড় বাধা। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি (জেইউটিএ) প্রশ্ন তুলেছে যে, আইওই মর্যাদার জন্য আবেদন করতে ১ কোটি টাকা ক্রাউডফান্ডিং করা হয়েছিল।

জেইউটিএ গত জানুয়ারিতে এক বিবৃতিতে জানায়, বিশ্ববিদ্যালয় তার তহবিল থেকে ৩৪ দশমিক ৯৭ কোটি টাকা ‘বেতনবহির্ভূত রক্ষণাবেক্ষণ সংক্রান্ত ব্যয়ের’ জন্য ব্যয় করেছে। পাশপাশি পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে তহবিল ধার করতে হতে পারে।

বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের মুখোমুখি পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু।

যাদবপুর ইউনিভার্সিটি রাজ্য সরকারের অর্থায়নের উপর নির্ভরশীল। এটি স্ব-অর্থায়ন কোর্স চালু বা সাবেক শিক্ষার্থীদের বিশাল নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মতো উপায়ে নিজস্ব সম্পদ তৈরির সুযোগ হাতছাড়া করেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের তরফ থেকে কোনও অর্থায়নের সম্ভাবনা নেই। 

রাজ্য সরকারও নারী ও শিশুদের জন্য নগদ প্রণোদনা প্রকল্পের মতো অন্যান্য আর্থিক বাধ্যবাধকতার কারণে অর্থ সঙ্কটে রয়েছে। এর ফলে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়কে কিছু সময়ের জন্য অর্থ সঙ্কটের সঙ্গে লড়াই করতে হতে পারে।

এই বিতর্কের মূল কারণ হল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনীতি। গত কয়েক দশক ধরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় বাম আদর্শের ছাত্র সংগঠনগুলোর একটি প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। ১৯৭০ এর দশকের উত্তাল নকশাল আন্দোলনের সময় এই ক্যাম্পাসও ছিল উত্তাল। 

পশ্চিমবঙ্গে প্রায় ১৪ বছর ক্ষমতায় থাকার পরও তৃণমূল কংগ্রেস এই শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) ছাত্র শাখা অখিল ভারতীয় বিদ্যার্থী পরিষদ (এবিভিপি) বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজেদের অবস্থান গড়ার চেষ্টা করেও সাফল্য পায়নি।

২০২৫ সালের মার্চে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ভুল কারণে শিরোনামে আসে। যদিও এটি প্রথমবার নয়। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে প্রায় একইরকম পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তখন ছাত্ররা তখনকার কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বাবুল সুপ্রিয়র গাড়িবহরকে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ঘেরাও করেছিল। সুপ্রিয় তখন বিজেপির পার্লামেন্ট সদস্য। ঘেরাও থেকে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন রাজ্যপাল জগদীপ ধনখড় তাকে উদ্ধার করেছিলেন।

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের দেয়ালে রঙবেরঙের গ্রাফিতি এবং চারদিকে আঁকা বিপ্লবী স্লোগানের পাশাপাশি ছাত্র রাজনীতি প্রায়ই জটিল রূপ নেয়। কখনও উপাচার্য ও কর্তৃপক্ষের অফিস ঘেরাও, আবার কখনও ২০১৪ সালের ‘হোক কলরব’ আন্দোলনের মতো ঘটনা ঘটে।

২০২৩ সালের আগস্টে এক প্রথম বর্ষের ছাত্র র‌্যাগিংয়ের শিকার হয়ে মারা গেলে ওই ঘটনায় জড়িত ১৩ জন ছাত্রকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং মামলাটি কলকাতা হাই কোর্টে চলছে।

আক্রমণাত্মক ছাত্র রাজনীতির বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অংশীদারদের অনেক বিষয় মোকাবেলা করতে হয়। ছাত্ররা ক্যাম্পাসে নজরদারির ও পুলিশ আউটপোস্ট স্থাপনের বিরোধিতা করে। এসব বিরোধিতার জায়গা থেকে ছাত্ররা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও অন্যান্য সাংবিধানিক পদাধিকারীদের ঘেরাও করে।

অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও দায়িত্ব এড়ানোর চেষ্টা করে। ২০২৫ সালের ১ মার্চ শিক্ষামন্ত্রীর গাড়ি ছাত্ররা ঘেরাও করলে উপাচার্য ভাস্কর গুপ্তকে দেখা যায়নি। পরে তিনি অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন।

অতীতেও যখন ক্যাম্পাস হোস্টেলে রাগিংয়ের কারণে মৃত্যু হয়েছিল বা কোনও কেন্দ্রীয় মন্ত্রীর গাড়িবহর আটকানো হয়েছিল, তখনও বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ সক্রিয়ভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করেনি।

বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠনগুলো তাদের প্রতিনিধিত্বকারী আদর্শের প্রতি বেশি নিবেদিত বলে মনে হয়। তাদের কাজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বার্থের চেয়ে তাদের আদর্শের স্বার্থেই বেশি পরিচালিত হয়। যদি সংশ্লিষট সবাই অর্থাৎ ছাত্র, শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে ঐতিহাসিক পক্ষপাত দূর না করে এবং স্বাভাবিক নিয়মে কাজ চালিয়ে গেলে শিক্ষাদান ও শিক্ষাগ্রহণ কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক অবনতির দিকে এগিয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found