চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ দুটোই কমেছে। ১১ শিক্ষা বোর্ডের ১৯ লাখ ৪ হাজার ৮৬ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন।
ছাত্র-জনতার রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে বদলে যাওয়া বাংলাদেশে প্রথম এই পাবলিক পরীক্ষায় গড় পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ, যা গত ১৫ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম। গত বছর এ পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। এ হিসাবে এবার পাসের হার কমেছে ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ।
অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এই পাবলিক পরীক্ষার ফল ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে প্রকাশ করার অভিযোগ আছে। গড়ে প্রায় ৮০ শতাংশ শিক্ষার্থী পাসের পাশাপাশি প্রত্যেক বছরই জিপিএ-৫ এর রেকর্ড হচ্ছিল। এর মধ্যে ২০২১ সালে রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করে।
এবার এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমেছে। জিপিএ-৫ পেয়েছে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন, যা পাস করা মোট শিক্ষার্থীর ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। গতবার জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন। এই হিসাবে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে ৪৩ হাজার ৯৭ জন।
তবে ছাত্রীরা এবারও পাসের হার ও জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যার দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে। ৭১ দশমিক ০৩ শতাংশ ছাত্রী পরীক্ষায় পাস করেছে; ছাত্রদের পাসের হার ৬৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ।
এবার পূর্ণাঙ্গ জিপিএ অর্থাৎ পাঁচ এ পাঁচ পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬৫ হাজার ৪১৬ জন ছাত্র, আর ছাত্রী ৭৩ হাজার ৬১৬ জন। এ হিসাবে ৮ হাজার ২০০ জন বেশি ছাত্রী জিপিএ-৫ পেয়েছে।
অন্যান্য বছরের মতো ফল প্রকাশের আগে সরকার প্রধানের হাতে পরিসংখ্যান তুলে দেওয়ার অনুষ্ঠানিকতা এবার ছিল না। বৃহস্পতিবার দুপুরে ২টায় দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ড একযোগে ফল প্রকাশ করে।
ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডে এক সংবাদ সম্মেলনে পরীক্ষার ফলের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন শিক্ষা বোর্ডগুলোর মোর্চা আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি এবং ঢাকা মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক খন্দোকার এহসানুল কবির।
তিনি জানান, এবার এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ-৫ কম হলেও যে ফল হয়েছে সেটিই প্রকৃত, বাড়তি নম্বর দেওয়ার সুযোগ নেই।
খন্দোকার এহসানুল কবির বলেন, “আগে কী হয়েছে সেটি আমরা বলব না। তবে, এখন যে তথ্য দিয়েছি সেটিই প্রকৃত। যা হয়েছে সেটি উপস্থাপন করা হয়েছে। এর মধ্যে আমাদের কোনও হাত নেই। আমাদের ওপর মহল থেকে কোনও ধরনের চাপ ছিল না। আমাদের বলা হয়েছে, রেজাল্ট যা হবে সেটিই দিতে হবে। আমরাও পরীক্ষকদের এ অনুরোধ জানিয়েছি। তাদের যথার্থভাবে খাতা মূল্যায়ন করার জন্য বলা হয়েছে।”

গত ১০ এপ্রিল সারা দেশে একযোগে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হয়। লিখিত পরীক্ষা শেষ হয় ১৩ মে। ব্যবহারিক পরীক্ষা হয় ১৫-২২ মে। শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা বোর্ডের ওয়েবসাইট ও মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে ফল জানতে পারছে।
ফল নিয়ে অসন্তুষ্ট শিক্ষার্থীদের জন্য এবারও খাতা চ্যালেঞ্জ বা ফল পুনঃনিরীক্ষার আবেদনের সুযোগ রয়েছে। এজন্য ১১ জুলাই থেকে ১৭ জুলাইয়ের মধ্যে টেলিটক মোবাইলের মাধ্যমে আবেদন করা যাবে।
ফল প্রকাশের আগের দিন ৯ জুলাই শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বাসসকে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানান, গত ১৬ বছর আওয়ামী লীগ আমলে পাসের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি জিপিএ-৫ এর সংখ্যাও বেশি দেখানো হয়। এবার জিপিএ-৫ নয়, প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন দেখা যাবে; ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে অতীতের মতো রেজাল্ট দেওয়া হবে না।
২০১০ সালের পর সবচেয়ে কম পাস
এ বছর ৩০ হাজার ৮৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯ লাখ ৪ হাজার ৮৬ জন শিক্ষার্থী এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে, তাদের মধ্যে পাস করেছে ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন, যেখানে ২০২৪ সালে ২০ লাখ ১৩ হাজার ৫৯৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১৬ লাখ ৭২ হাজার ১৫৩ জন পাস করে।
এবার দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডে গড়ে পাসের হার ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। সেই হিসাবে এবার পাসের হার প্রায় সাড়ে ১৪ শতাংশ কমেছে।

২০২১ সালে রেকর্ড ৯৩ দশমিক ৬ শতাংশ শিক্ষার্থী এসএসসি পাস করে। ২০১০ সালের পর চলতি বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় গড় পাসের হার সবচেয়ে কম। এর আগে এই সময়ের মধ্যে ২০১৮ সালে পাসের হার ছিল সবচেয়ে কম, ৭৭ দশমিক ০৮ শতাংশ।
এবার এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় ১৩৪টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কোনও শিক্ষার্থী পাস করতে পারেনি; শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করেছে এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ৯৮৪টি।
গত বছর কোনও শিক্ষার্থী পাস করেনি এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল ৫১টি। আর ২ হাজার ৯৬৮টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শতভাগ শিক্ষার্থী উত্তীর্ণ হয়েছিল। সে হিসাবে শতভাগ পাসের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবার কমেছে ১ হাজার ৯৮৪টি, সব পরীক্ষার্থী ফেল করা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়েছে ৮৩টি।
সব বোর্ডেই পাসের হার কমেছে
এবার ১১টি শিক্ষা বোর্ডের মধ্যে নয়টি সাধারণ বোর্ডে ৬৮ দশমিক ০৪ শতাংশ, মাদ্রাসা বোর্ডে ৬৮ দশমিক ০৯ শতাংশ এবং কারিগরি বোর্ডে ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছে।
এ বছরে ঢাকা বোর্ডে পাসের হার ৬৭ দশমিক ৫১ শতাংশ, গত বছর ছিল ৮৯ দশমিক ৩২ শতাংশ, চট্টগ্রাম বোর্ডে পাসের হার ৭২ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ, গত বছর ৮২ দশমিক ৮০ শতাংশ ছিল।
রাজশাহী বোর্ডে এবার পাসের হার ৭৭ দশমিক ৬৩, গত বছর ৮৯ দশমিক ২৫ শতাংশ ছিল। কুমিল্লা বোর্ডে গত বছর পাসের হার ছিল ৭৯ দশমিক ২৩ শতাংশ, এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৬৩ দশমিক ৬০ শতাংশে।
গত বছর ৯২ দশমিক ৩৩ শতাংশ পাসের হার নিয়ে প্রথম ছিল যশোর বোর্ড, এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ৭৩ দশমিক ৬৯ শতাংশে।

এবার দিনাজপুর বোর্ডে পাসের হার ৬৭ দশমিক শূন্য ৩, গত বছর তা ছিল ৭৮ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এবার ময়মনসিংহ বোর্ডে পাসের হার ৫৮ দশমিক ২২, গতবার ছিল ৮৪ দশমিক ৯৭ শতাংশ। এবার মাদ্রাসা বোর্ডে পাসের হার ৬৮ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ, গত বছর ছিল ৭৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ।
এবার বরিশাল বোর্ডে পাসের হার ৫৬ দশমিক ৩৮, যা গতবার ৮৯ দশমিক ১৩ শতাংশ ছিল। সিলেট বোর্ডে এবারের পাসের হার ৬৮ দশমিক ৫৭, যা গতবার ৭৩ দশমিক ৩৫ ছিল।
কারিগরি বোর্ডে এবার পাসের হার ৭৩ দশমিক ৬৩ শতাংশ, গতবার ছিল ৮১ দশমিক ৩৮ শতাংশ।
গত পাঁচ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, চলতি বছরে যেখানে শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান রয়েছে ৯৮৪টি, যেখানে গত বছর এই সংখ্যা ছিল দুই হাজার ৯৬৮টি, ২০২৩ সালে ছিল দুই হাজার ৩৫৪টি, ২০২২ সালে ছিল দুই হাজার ৯৭৫টি আর ২০২১ সালে ছিল পাঁচ হাজার ৪৯৪টি। চলতি বছরে শতভাগ ফেল প্রতিষ্ঠান ১৩৪টি, গতবছরে ছিল ৫১টি, ২০২৩ সালে ছিল ৪৮টি, ২০২২ সালে ছিল ৫০টি আর ২০২১ সালে ছিল ১৮টি।
এবার স্কুলের গণ্ডি পেরোনো ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জন জিপিএ-৫ পেয়েছে, যা পাস করা মোট শিক্ষার্থীর ১০ দশমিক ৬৬ শতাংশ। গত বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন; এবার জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী কমেছে ৪৩ হাজার ৯৭ জন।
চলতি বছর যে শিক্ষার্থীরা এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় বসেছেন তারা ২০১২ সালে প্রণীত শিক্ষাক্রমে নবম ও দশম শ্রেণিতে পড়েছিলেন। গত বছরের মতোই এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা হয়েছে পূর্ণাঙ্গ সিলেবাসে, সব বিষয়ে পূর্ণ নম্বর ও সময়ে।
রেওয়াজ ছিল ফেব্রুয়ারিতে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা নেওয়ার। কোভিড ১৯ মহামারির জেরে তিন বছর ফেব্রুয়ারিতে এ পরীক্ষা নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে ২০২৪ সালে ফেব্রুয়ারিতেই শুরু হয়েছিল এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা। আর এবার গণঅভ্যুত্থানের পর দুই মাস পিছিয়ে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা শুরু হয় ১০ এপ্রিল।
এবারও এগিয়ে মেয়েরা
এবারও পাসের হার এবং জিপিএ-৫ পাওয়ার সংখ্যা- দুদিক দিয়েই এগিয়ে আছে মেয়েরা।
ছাত্রদের পাসের হার যেখানে ৬৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ, সেখানে ছাত্রীদের মধ্যে ৭১ দশমিক ০৩ শতাংশ পাস করেছে।
মাধ্যমিক ও সমমানের পরীক্ষায় এবার ৯ লাখ ৫১ হাজার ৬৯৭ জন ছাত্র পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। তাদের মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছেন ৬ লাখ ২৬ হাজার ৯৮১ জন।
আর ৯ লাখ ৫২ হাজার ৩৮৯ জন ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, তাদের মধ্যে পাস করেছেন ৬ লাখ ৭৬ হাজার ৪৪৫ জন।
আর পূর্ণাঙ্গ জিপিএ, অর্থাৎ পাঁচে পাঁচ পাওয়া ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ শিক্ষার্থীর মধ্যে ৭৩ হাজার ৬১৬ জন ছাত্রী এবং ৬৫ হাজার ৪১৬ জন ছাত্র।

১৯৯০-২০১৬ এসএসসিতে পাস বেড়েছে যে হারে
বিডিনিউজ জানিয়েছে, ১৯৯০ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় যেখানে ৩১ দশমিক ৭৩ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করেছিল, সেখানে ২০১৬ সালে পাস করে ৮৮ দশমিক ৭০ শতাংশ পরীক্ষার্থী। অর্থাৎ, এই সময়ে পাসের হার বেড়েছে ৫৬ দশমিক ৯৭ শতাংশ পয়েন্ট। গণিতের হিসাবে পাসের হার বৃদ্ধির হার দাঁড়াচ্ছে ১৭৯ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসএসসিতে ১৯৯০ সালে চার লাখ ৩৫ হাজার ৯১৮ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়েছিল। ২০১৬ সালে এসে এই সংখ্যা হয় ১৩ লাখ ২৮৪ জন জন। এ হিসাবে ২৬ বছরে এসএসসিতে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়ে তিন গুণের বেশি।
১৯৯০ সালে পাসের হার ছিল ৩১ দশমিক ৭৩ শতাংশ; ১৯৯১ সালে ৬৪ দশমিক ৯৫ শতাংশ; ১৯৯২ সালে ৬১ দশমিক ৬০ শতাংশ; ১৯৯৩ সালে ৬১ দশমিক ০৯ শতাংশ; ১৯৯৪ সালে ৭১ দশমিক ৪৬ শতাংশ; ১৯৯৫ সালে ৭৩ দশমিক ২০ শতাংশ; ১৯৯৬ সালে ৪২ দশমিক ৬১ শতাংশ; ১৯৯৭ সালে ৫১ দশমিক ৪৫ শতাংশ; ১৯৯৮ সালে ৪৭ দশমিক ৯৬ শতাংশ; ১৯৯৯ সালে ৫৪ দশমিক ৬২ শতাংশ; ২০০০ সালে ৪১ দশমিক ৫৮ শতাংশ; ২০০১ সালে ৩৫ দশমিক ২২ শতাংশ; ২০০২ সালে ৪০ দশমিক ৬৬ শতাংশ; ২০০৩ সালে ৩৫ দশমিক ৯১ শতাংশ; ২০০৪ সালে ৪৮ দশমিক ০৩ শতাংশ; ২০০৫ সালে ৫২ দশমিক ৫৭ শতাংশ; ২০০৬ সালে ৫৯ দশমিক ৪৭ শতাংশ; ২০০৭ সালে ৫৭ দশমিক ৩৭ শতাংশ; ২০০৮ সালে ৭০ দশমিক ৮১ শতাংশ; ২০০৯ সালে ৬৭ দশমিক ৪১ শতাংশ; ২০১০ সালে ৭৮ দশমিক ১৯ শতাংশ; ২০১১ সালে ৮২ দশমিক ১৬ শতাংশ; ২০১২ সালে ৮৬ দশমিক ৩২ শতাংশ; ২০১৩ সালে ৮৯ দশমিক ২৮ শতাংশ; ২০১৪ সালে ৯২ দশমিক ৬৭ শতাংশ; ২০১৫ সালে ৮৬ দশমিক ৭২ শতাংশ এবং ২০১৬ সালে পাসের হার ছিল ৮৮ দশমিক ৭০ শতাংশ ।
২০১৬ সালে পাসের হার ৮৮ দশমিক ৭০ শতাংশ হলেও পরের বছর পাসের হার প্রায় ৮ শতাংশ কমে যায়। সে বছর পাসের হার ছিল ৮০ দশমিক ৪ শতাংশ । এরপর ২০১৮ সালে ছিল ৭৭ দশমিক ০৮ শতাংশ; ২০১৯ সালে ৮২ দশমিক ০২ শতাংশ ও ২০২০ সালে ৮২ দশমিক ০৯ শতাংশ। ২০২১ সালে রেকর্ড ৯৩ দশমিক ০৬ শতাংশ পরীক্ষার্থী পাস করে। ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ; ২০২৩ সালে ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং গত বছর ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে ২০১১ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত এক বছর ছাড়া প্রত্যেকবার ৮০ শতাংশের বেশি শিক্ষার্থী পাস করে।
২০১৬ সালে ফল প্রকাশের দিন আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব কমিটির সভাপতি অধ্যাপক মাহবুবুর রহমান বলেছিলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাসের হারে এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ ও সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করার কারণে। পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতাও এক্ষেত্রে কাজ করেছে।
তিনি বলেছিলেন, “শিক্ষার্থীদের যোগ্যতার কারণেই পাসের হার বেড়েছে। আগে পারিবারিকভাবে এভাবে পড়ালেখায় যত্ন নেওয়া হতো না। এখন বাচ্চাদের নিয়ে সবাই সচেতন। বেতনের একটি বড় অংশ সন্তানের লেখাপড়ায় ব্যয় হচ্ছে।”

কোন বছরে কত জিপিএ-৫
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, বাংলাদেশে ২০০১ সাল থেকে এসএসসি এবং ২০০৩ সাল থেকে এইচএসসিতে জিপিএ পদ্ধতি চালু হয়। ওই বছর এসএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট প্রকাশের মাধ্যমে সর্ব প্রথম গ্রেডিং পদ্ধতিতে রেজাল্ট প্রকাশ শুরু হয়।
ঢাকা পোস্ট জানিয়েছে, ২০০১ সালে সারাদেশে মাত্র ৭৬ জন পরীক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পায়। এরপর ধারাবাহিকভাবে জিপিএ-৫ এর সংখ্যা প্রতিবছর বাড়তে শুরু করে। গত দুই দশকে এ সংখ্যাটা কয়েক হাজার গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। ২০০২ সালে ৩২৭, ২০০৩ সালে ১ হাজার ৩৮৯, ২০০৪ সালে ৮ হাজার ৫৯৭, ২০০৫ সালে ১৫ হাজার ৬৩১, ২০০৬ সালে ২৪ হাজার ৩৮৪, ২০০৭ সালে ২৫ হাজার ৭৩২, ২০০৮ সালে ৪১ হাজার ৯১৭ জন জিপিএ-৫ পায়।
এছাড়া ২০০৯ সালে ৪৫ হাজার ৯৩৪, ২০১০ সালে ৫২ হাজার ১৩৪, ২০১১ সালে ৬২ হাজার ২৮৮, ২০১২ সালে ৮২ হাজার ২১২, ২০১৩ সালে ৯১ হাজার ২২৬, ২০১৪ সালে ১ লাখ ৪২ হাজার ২৭৬, ২০১৫ সালে ১ লাখ ১১ হাজার ৯০১, ২০১৬ সালে ১ লাখ ৯ হাজার ৭৬১, ২০১৭ সালে ১ লাখ ৪ হাজার ৭৬১, ২০১৮ সালে ১ লাখ ১০ হাজার ৬২৯, ২০১৯ সালে ১ লাখ ০৫ হাজার ৫৯৪ জন পরীক্ষার্থী জিপিএ-৫ পায়।

২০২১ সালে জিপিএ-৫ পায় ১ লাখ ৩৫ হাজার ৮৯৮ জন, ২০২২ সালে পায় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৩৪০ জন; ২০২৩ পায় ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫৭৮ জন এবং ২০২৪ সালে ১ লাখ ৮২ হাজার ১২৯ জন।
২০২২ সালে জিপিএ-৫ বিষয়ে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেছিলেন, শিক্ষার্থীদের সুন্দর ভবিষ্যত গড়তে হলে জিপিএ-৫ এর উন্মাদনা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। স্কুল-কলেজের শেষ পরীক্ষায় জিপিএ-৫ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে উন্মাদনা রয়েছে। যা শিক্ষার্থীদের জীবনে নেতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। শিক্ষার্থীরা যে যার মেধা অনুযায়ী সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেবে এবং সে অনুযায়ী ফলাফল পাবে।
এবার ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী ছিল ১৪ লাখ ৯০ হাজার ১৪২ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৭ লাখ এক হাজার ৫৩৮ জন এবং ছাত্রী ৭ লাখ ৮৮ হাজার ৬০৪ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে পরীক্ষার্থী ছিল ২ লাখ ৯৪ হাজার ৭২৬ জন। এর মধ্যে ছাত্র এক লাখ ৫০ হাজার ৮৯৩ জন এবং এক লাখ ৪৩ হাজার ৮৩৩ জন ছাত্রী। বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে সর্বমোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ১ লাখ ৪৩ হাজার ৩১৩ জন। এর মধ্যে ছাত্র ১ লাখ ৮ হাজার ৩৮৫ এবং ছাত্রী ৩৪ হাজার ৯২৮ জন।

ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রেজাল্ট দেওয়া হবে না : শিক্ষা উপদেষ্টা
৯ জুলাই বাসসকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে শিক্ষা উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. চৌধুরী রফিকুল আবরার বলেন, “অতীতে আমরা দেখেছি শিক্ষার্থীরা যেভাবে পরীক্ষা দিত, প্রকৃত মূল্যায়নে তাদের রেজাল্ট প্রকাশ করা হতো। কিন্তু গত ১৬ বছরে যে সরকার ছিল, তাদের আমলে সরকারের সাফল্য দেখানোর জন্য ছাত্র-ছাত্রীদের নম্বর বাড়িয়ে দিয়ে জিপিএ-৫ এর সংখ্যা ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে ফলাফল প্রকাশ করা হতো।
“এমনকি সেই ফলাফল প্রকাশ নিয়ে এক ধরনের ফটোসেশনের আয়োজন ছিল রাষ্ট্রপ্রধানের। শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানগণ পরীক্ষার ফলাফলের বই নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর কাছে যেতেন এবং প্রধানমন্ত্রী তখন তাদেরকে নিয়ে ফটোসেশন করে রেজাল্ট প্রকাশ করতেন। “ “আমাদের অন্তর্বর্তী সরকার এটাকে বাহুল্য মনে করছে এবং এটা থেকে সরে এসে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার খাতার প্রকৃত মূল্যায়নে শিক্ষা বোর্ডগুলোকে নির্দেশ দিয়েছে।”
শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে পরীক্ষার মাধ্যমে তাদের প্রকৃত মেধা প্রকাশ করতে পারে, সেজন্য এবার পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। শিক্ষা বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ছাড়াও শিক্ষক, অভিভাবক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে এবার যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করেছে।
তিনি বলেন, “ফুলিয়ে ফাঁপিয়ে রেজাল্ট প্রকাশের কারণে অতীতে ছাত্র-ছাত্রীদের প্রকৃত মূল্যায়ন না হওয়ায় তাদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। পরীক্ষায় পাশের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি জিপিএ-৫ এর সংখ্যাও বেশি পরিমাণে দেখানো হয়েছে। আমরা এবার জিপিএ-৫ নয়, প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন দেখতে যাচ্ছি।”
এবার দুই মাসেরও কম সময়ে এসএসসির ফলাফল প্রকাশ করা হচ্ছে জানিয়ে শিক্ষা উপদেষ্টা বলেন, “দুই মাসের মধ্যে রেজাল্ট প্রকাশ করায় শিক্ষার্থীরা পরবর্তী শিক্ষাবর্ষে দুই মাস বেশি ক্লাস করার সুযোগ পাবে। তাদের শিক্ষা জীবন সমৃদ্ধ হবে।”



