যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় ডোনাল্ড ট্রাম্প আসার পর থেকেই দেশটির বিভিন্ন স্তরে শুরু হয়েছে পালাবদল। পররাষ্ট্রনীতি থেকে শুরু করে অভ্যন্তরীণ নানা বিষয়ে এই পরিবর্তনের ঢেউ লেগেছে। এর থেকে বাইরে নেই ‘বিজ্ঞানও’।
সম্প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের বিজ্ঞান সংক্রান্ত বিভিন্ন বার্তায় একটি নতুন বাক্য বারবার উঠে আসছে। সেটি হলো, ‘গোল্ড-স্ট্যান্ডার্ড সায়েন্স’, অর্থাৎ ‘স্বর্ণমানের বিজ্ঞান‘ ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি।
যদিও অনেক বিজ্ঞানীর মতে, বাস্তবে তার উল্টোটা ঘটছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মন্ত্রিসভার সদস্য ও রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা মিলে ‘মাহা রিপোর্ট’ নামের একটি সরকারি দলিল লিখেছেন। এটি দেশটির যুক্তরাষ্ট্রের শিশুদের স্বাস্থ্য খারাপ হওয়ার কারণ অনুসন্ধানের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।
যারা এই রিপোর্টটি লিখেছিলেন, তাদের অধিকাংশেরই কোনও বৈজ্ঞানিক বা চিকিৎসা সংক্রান্ত যোগ্যতা নেই। রিপোর্টটিতে অনেক ভুল ছিল—উল্টাপাল্টা সূত্র, ভুয়া গবেষণা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য।
বিশেষজ্ঞদের মূল্যায়নের মাধ্যমে অনুমোদিত হয়েছিল এমন হাজার হাজার গবেষণা প্রকল্প রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে না মেলার কারণে বাতিল করা হয়েছে।
প্রশাসন প্রস্তাব দিয়েছে যে, সরকারি অনুদান বিতরণের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তাদের পদমর্যাদা বদলে ফেলা হবে যেন চাকরির দায়বদ্ধতা বাড়ানো যায়। কিন্তু সমালোচকদের মতে, এটি রাজনীতি দিয়ে বিজ্ঞানের উপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার একটি পন্থা।

সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড সায়েন্স’ বিষয়ে একটি নির্বাহী আদেশ জারি করেছেন। এতে বলা হয়েছে, কোনটি প্রমাণ মানসম্পন্ন এবং কোনটি নয়, তা নির্ধারণের জন্য নতুনভাবে নজরদারি চালানো হবে। প্রতিটি সংস্থার প্রধান একজন সিনিয়র রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তকে নিযুক্ত করবেন, যিনি এই প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকবেন এবং অভিযোগ যাচাই করবেন।
হোয়াইট হাউসের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি নীতিবিষয়ক দপ্তরের পরিচালক মাইকেল ক্র্যাটসিয়োস জানান, এই নির্বাহী আদেশের উদ্দেশ্য হলো “যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ যেন আবার জাতীয় বিজ্ঞান খাতে আস্থা ফিরে পায়।” তিনি আরও বলেন, “আমাদের গবেষণা খাতে প্রচলিত অবস্থা থেকে খুব কমই ফল আসছে, অনেক সম্পদ নষ্ট হচ্ছে, এবং জনগণের আস্থা কমে গেছে।”
তবে শত শত বিজ্ঞানী এখন এই উদ্যোগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। তারা বলছেন, প্রশাসন এমন এক সময় বিজ্ঞানের উন্নয়ন-ভাষা ব্যবহার করছে, যখন আসলে সেটিকে ধ্বংস করছে।
আগের ট্রাম্প প্রশাসনেও পরিবেশনীতির ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক প্রমাণের ব্যবহার সীমিত করার চেষ্টা হয়েছিল। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, ‘গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড সায়েন্স’ নামের এই প্রচেষ্টা আসলে এক ধরনের ছলচাতুরি।
ইউনিভার্সিটি অব আইডাহোর মার্কেটিং বিভাগের অধ্যাপক বারনা ডেভেজার। তিনি ‘মেটাসায়েন্স’ বা বিজ্ঞানচর্চা নিয়েই গবেষণা করেন। তিনি বলেন, “এই নির্বাহী আদেশে রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তদের ক্ষমতা বাড়ানো গুরুতর উদ্বেগের বিষয়।”
এক ইমেইল বার্তায় বারনা ডেভেজার লেখেন, “বিজ্ঞানচর্চার দৃষ্টিকোণ থেকে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—বৈজ্ঞানিক অবকাঠামো ও কার্যক্রমের উপর রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা। একে বলা যেতে পারে—বিজ্ঞানের উপর নিয়ন্ত্রক দখলদারি। বিজ্ঞান কার্যকর তখনই হতে পারে, যখন তা স্বাধীন, বিকেন্দ্রীভূত এবং গণতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হয়।”
“স্ট্যান্ড আপ ফর সায়েন্স” নামের একটি সচেতনতামূলক গোষ্ঠীর উদ্যোগে করা এক আবেদনে ইতোমধ্যে ৫ হাজারের বেশি বিজ্ঞানী ও সচেতন ব্যক্তি স্বাক্ষর দিয়েছেন। এই আবেদনে বলা হয়েছে, এই নির্বাহী আদেশ বিজ্ঞানের ভাষা অপব্যবহার করে এর বিপরীত কাজ করছে। এতে বলা হয়, আদেশটি “বিজ্ঞানের কঠোরতা ও স্বচ্ছ অগ্রগতিকে ধ্বংস করবে।”
একই সময়ে কয়েকজন খ্যাতনামা বিজ্ঞানী দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় এক নিবন্ধে লেখেন, “এই বিজ্ঞানের ভাষার আড়ালে এমন একটি পরিকল্পনা লুকিয়ে আছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে বিজ্ঞানের স্বাধীনতাকে শেষ করে দেবে। এটি রাজনৈতিক নিয়োগপ্রাপ্তদের এমন ক্ষমতা দেবে যাতে তারা সম্পূর্ণ গবেষণাকাজ বাতিল করে দিতে পারে, এমনকি সেইসব গবেষকদের শাস্তিও দিতে পারে যারা প্রশাসনের সঙ্গে একমত নন।”
হোয়াইট হাউস ও স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের মুখপাত্ররা এই আদেশ নিয়ে করা প্রশ্নের উত্তর দেননি।
“গোল্ড-স্ট্যান্ডার্ড” শব্দটি নানা ঘোষণা ও নীতিতে ব্যবহার করা হচ্ছে। যেমন—কিছু খাবারের রং বন্ধ করার সিদ্ধান্ত, এমআরএনএ ভ্যাকসিন থেকে পুরনো প্রযুক্তিতে ফিরে যাওয়া, স্বাস্থ্য বিভাগে অফিস পুনর্গঠন এবং কোভিড ভ্যাকসিন অনুমোদনের নিয়ম বদলানো ইত্যাদিতে।
ন্যাশনাল ক্যান্সার ইনস্টিটিউটের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে এর আগে এক পোস্টে বলা হয়েছিল, প্রশাসনিক যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকবে। কিন্তু গত বৃহস্পতিবার আরেক পোস্টে বলা হয়, “ঐ পোস্টটি একটি ক্যারিয়ার কর্মকর্তা করেছিলেন। তার উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্প প্রশাসনকে ক্ষতিগ্রস্ত করা। … ট্রাম্প প্রশাসন গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড ক্যান্সার গবেষণার প্রতি সম্পূর্ণভাবে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
ওই পোস্টে কয়েকশ মানুষ মন্তব্য করেন। সেখানে একজন মন্তব্যকারী লিখেছেন, “গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড সায়েন্স কি আমাদের সঙ্গেই রয়েছে?”

বিজ্ঞানের উন্নয়ন
ট্রাম্পের নতুন নির্বাহী আদেশে বলা হয়েছে, “গোল্ড-স্ট্যান্ডার্ড সায়েন্স” এমন হতে হবে যা পুনরায় প্রমাণযোগ্য, স্বচ্ছ, খণ্ডনযোগ্য, সহকর্মী মূল্যায়নের আওতায় পক্ষপাতহীন, অনিশ্চয়তা সম্পর্কে স্পষ্ট, সংশয়বাদী, আন্তঃবিষয়ভিত্তিক, নেতিবাচক ফলাফলকে গ্রহণযোগ্য ও স্বার্থের সংঘাতমুক্ত।
বিগত কয়েক বছর ধরে বিজ্ঞানকে উন্নত করার লক্ষ্যে “ওপেন সায়েন্স মুভমেন্ট” বা “উন্মুক্ত বিজ্ঞান আন্দোলন”-এর সঙ্গে যুক্ত বিজ্ঞানীরা এই নীতিগুলো গবেষণায় যুক্ত করার জন্য আহ্বান জানিয়ে আসছেন। তাদের লক্ষ্য হলো বিজ্ঞানকে আরও স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য ও নিরপেক্ষ করা। তারা চায় যেন গবেষণা জালিয়াতির সুযোগ কমে এবং বিজ্ঞান মানুষের আস্থার জায়গা হয়ে উঠে।
ভার্জিনিয়া ইউনিভার্সিটির মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ব্রায়ান নোসেক বিজ্ঞান সংস্কারের পক্ষে একজন গুরুত্বপূর্ণ কণ্ঠ।
তিনি বলেন, “যদি আমি শুধু নির্বাহী আদেশের ৩ নম্বর ধারা পড়তাম, তাহলে আমি খুবই খুশি হতাম—অসাধারণ! এগুলো তো আমি সবসময় বলে আসছি। এগুলোই আমার কাজের লক্ষ্য। এগুলোই ওপেন সায়েন্স আন্দোলনের মূল দাবি।” কিন্তু অধ্যাপক নোসেক বলেন, আদেশটির বাকি অংশ সম্পূর্ণ ভিন্ন পথে চলে গেছে।
আগের ট্রাম্প প্রশাসনের সময় তৎকালীন পরিবেশ সুরক্ষা সংস্থার (ইপিএ) প্রধান স্কট প্রুইট এমন একটি নীতি চালু করেছিলেন। সেখানে বলা হয়েছিল, যেসব গবেষণার মূল উপাত্ত (ডেটা) প্রকাশ করা হয়নি, সেগুলো নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করা যাবে না। অথচ বিজ্ঞানীরা বরাবরই প্রমাণভিত্তিক গবেষণাকে আরও উন্নত করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
নোসেক বলেন, “কোনও গবেষণায় একটি বৈশিষ্ট্য না থাকলেই তা পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া উচিত নয়। বরং যেটুকু প্রমাণ আছে, তার ভিত্তিতেই সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা উচিত। কারণ বৈজ্ঞানিক প্রমাণ ব্যবহার না করলে অবশিষ্ট থাকে কেবল মতাদর্শ বা আদর্শবাদ।”
নির্বাহী আদেশে কিছু উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে—স্বর্ণমানের বিজ্ঞানের চর্চা লঙ্ঘিত হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মহামারিকালে স্কুল খুলে দেওয়ার ফেডারেল নির্দেশনা, পরিবেশনীতি, এবং জলবায়ু পরিবর্তন সংক্রান্ত নির্দেশনা।
সাধারণ মানুষ অনেক সময় বিজ্ঞানকে বইয়ে লেখা অটল সত্যের তালিকা বলে মনে করে। কিন্তু বিজ্ঞানীরা স্বীকার করেন, বিজ্ঞান একটি মানবিক প্রচেষ্টা। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যেখানে প্রতিনিয়ত উন্নয়ন ঘটছে। এখানে রয়েছে আত্মকেন্দ্রিকতা, ব্যর্থতা, জালিয়াতি, সৎ ভুল, এবং কিছু সময়ের জন্য জনপ্রিয় হয়ে ওঠা ধ্যানধারণা। আবার একইসঙ্গে রয়েছে কঠিন, ধৈর্যশীল ও প্রায়ই নিরব গম্ভীর পরিশ্রম, যার মাধ্যমে নতুন কিছু আবিষ্কারের চেষ্টা করা হয়।
বিজ্ঞান ভালো হতে পারে এবং হওয়া উচিত—এমনটাই মনে করেন বিজ্ঞান সমালোচকরা। কিন্তু তারা মনে করেন, বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন এই লক্ষ্য নিয়ে আন্তরিকভাবে কাজ করছে না।
বিজ্ঞান সততা বিষয়ক পরামর্শক ও গবেষণায় বিকৃত ছবি শনাক্ত করার ক্ষেত্রে অগ্রগণ্য এলিজাবেথ বিক বলেন, “আমি খুব সূক্ষ্ম একটি রেখা ধরে হাঁটছি—একদিকে বলছি, বিজ্ঞানে জালিয়াতি আছে—আমাদের আরও ভালো করতে হবে এবং এই ভুলের পরিণাম থাকা উচিত।
অন্যদিকে এর মানে এই না যে, সব বিজ্ঞানই ভুয়া। কিছু ভুলকে ধরিয়ে দিয়ে পুরো বিজ্ঞানের বিশ্বাসযোগ্যতাকে বাতিল করে দেওয়া ঠিক নয়। সেটি বাস্তবতার প্রতিফলন নয়।”
তথ্যসূত্র : ওয়াশিংটন পোস্ট



