স্বাধীন চলচ্চিত্র ‘অ্যানোরা’র জন্য ৬৭ তম অস্কারের রাতটি ছিল বিশেষ কিছু। সিনেমাটির পরিচালক শন বেকার তার এই চলচ্চিত্রের জন্য রেকর্ড ভেঙে নিজেই চারটি পুরস্কার জিতে নিয়েছেন।
অ্যানোরার পরিচালনা, সম্পাদনা, লেখা এবং প্রযোজনা- এই চারটি বিভাগেই বেকার সেরার পুরস্কারটি পেয়েছেন। এতে অভিনয় করে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কারটি ছিনিয়ে নিয়েছেন নবাগত তারকা মাইকি ম্যাডিসন।
দুরন্ত গতির ড্রামা জনরার এই সিনেমায় নবাগত অভিনেত্রী ম্যাডিসনকে নিউ ইয়র্কের একজন স্ট্রিপার হিসেবে দেখানো হয়েছে, যিনি একজন ধনী রাশিয়ানের ছেলের প্রেমে পড়েন।
হলিউডের বর্ষীয়ান অভিনেত্রী ডেমি মুরকে পেছনে ফেলে এই পুরস্কার জিতে নেওয়ার প্রতিক্রিয়ায় মাইকি ম্যাডিসন বলেন- ‘স্বপ্ন সত্যি হয়েছে’।
জমকালো অস্কার সম্মাননা অনুষ্ঠানের অন্যান্য বিজয়ীদের মধ্যে ছিলেন কিয়েরান কালকিন, অ্যাড্রিয়েন ব্রোডি এবং জো সালদানা। ‘ফ্লো’ সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের পুরস্কার জেতে এবং ‘আই অ্যাম স্টিল হিয়ার’ সেরা আন্তর্জাতিক সিনেমার পুরস্কার পেয়েছে।
২৫ বছর বয়সী ম্যাডিসন তার বক্তব্যে বলেন, “এটা খুবই অবাস্তব লাগছে। আমি লস অ্যাঞ্জেলেসে বড় হয়েছি, কিন্তু হলিউড সবসময় আমার থেকে অনেক দূরে মনে হতো, তাই আজ এই ঘরে দাঁড়িয়ে থাকাটা সত্যিই অবিশ্বাস্য।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমি যৌনকর্মী সম্প্রদায়কে সম্মান জানাতে চাই এবং স্বীকৃতি দিতে চাই। আমি সমর্থন করে যাব এবং একজন মিত্র হিসেবে থাকবো… এই সম্প্রদায়ের যে নারীদের সাথে আমার দেখা করার সৌভাগ্য হয়েছে, যেটি ছিল এই পুরো অবিশ্বাস্য অভিজ্ঞতার অন্যতম সেরা মুহূর্ত।”

সেরা পরিচালকের ট্রফিটি উপস্থাপন করেন কোয়েন্টিন টারান্টিনো, যিনি এর আগে তার চলচ্চিত্র ‘ওয়ান্স আপন আ টাইম ইন হলিউড’ এ ম্যাডিসনকে একটি ছোট ভূমিকায় অভিনয় করিয়েছিলেন।
টারান্টিনোর কাছ থেকে ট্রফি গ্রহণ করে বেকার তাকে বলেন, “আপনি যদি মাইকি ম্যাডিসনকে কাস্ট না করতেন… তাহলে অ্যানোরা তৈরি হতো না।”
বেকার একাডেমি ভোটারদের ‘সত্যিকারের একটি স্বাধীন চলচ্চিত্রকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য’ ধন্যবাদ জানান এবং সেরা পরিচালকের বক্তৃতায় সিনেমা হলগুলোর সমর্থনের কথা উল্লেখ করে কৃতজ্ঞতার কথা জানান।
বেকার বলেন, “আমরা কোথায় সিনেমার প্রেমে পড়েছিলাম? সিনেমা হলে। দর্শকদের সাথে সিনেমা হলে সিনেমা দেখা একটি অভিজ্ঞতা।”
“এবং এমন এক সময়ে যখন বিশ্ব খুব বিভক্ত, সিনেমা হলগুলো আগের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ, এটি একটি সাম্প্রদায়িক অভিজ্ঞতা (নানা মতের মানুষের মিলনস্থল বোঝানো হয়েছে) যা আপনি বাড়িতে পাবেন না।”
“বর্তমানে সিনেমা হলে যাওয়ার কমে আসছে আশঙ্কাজনকভাবে, স্বাধীন মালিকানাধীন সিনেমা হলগুলো সংগ্রাম করছে এবং তাদের সমর্থন করা আমাদের দায়িত্ব।”

তিনি উপসংহারে বলেন, “এটি আমার যুদ্ধ ঘোষণা: চলচ্চিত্র নির্মাতারা, বড় পর্দার জন্য চলচ্চিত্র তৈরি করতে থাকুন। আমি জানি আমি করব। পরিবেশকেরা, দয়া করে আমার চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তিকে প্রথম এবং প্রধান অগ্রাধিকার দিন।”
সেরা পরিচালনা, সেরা সম্পাদনা. সেরা লেখা এবং সেরা প্রযোজনা- একটি চলচ্চিত্রের জন্য এই চার বিভাগে অস্কার জেতা প্রথম ব্যক্তি শন বেকার। ওয়াল্ট ডিজনিও ১৯৫৩ সালে এক রাতে চারটি পুরস্কার জিতেছিলেন। তবে সেটি চারটি ভিন্ন চলচ্চিত্রের জন্য।
‘দ্য ব্রুটালিস্ট’ চলচ্চিত্রের জন্য অ্যাড্রিয়েন ব্রোডি সেরা অভিনেতার পুরস্কার জিতেছেন। এই চলচ্চিত্রে তিনি একজন হাঙ্গেরিয়ান-ইহুদি স্থপতির ভূমিকায় অভিনয় করেছেন, যিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে নতুন জীবন গড়ার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে চলে আসেন।
২০০৩ সালে ‘দ্য পিয়ানিস্ট’ চলচ্চিত্রের জন্য সেরা অভিনেতার বিজয়ী হওয়ার পর থেকে ব্রোডি আর অস্কারের জন্য মনোনীত হননি।
তিনি বলেন, “অভিনয় একটি খুব অনিশ্চিত পেশা। এটি খুব আকর্ষণীয় দেখায়, এবং কিছু মুহূর্তে এটি তাই, কিন্তু এখানে ফিরে আসার সুযোগ পেয়ে আমি যে জিনিসটি অর্জন করেছি তা হলো কিছু দৃষ্টিভঙ্গি।”
‘দ্য ব্রুটালিস্ট’ চলচ্চিত্রটি দুটি পুরস্কারও জিতেছে। আর সেটির পেছনে রয়েছেন দুই ব্রিটিশ নাগরিক। ওয়েলসে বেড়ে ওঠা লোল ক্রলির জন্য ব্রুটালিস্ট জিতে নেয় সেরা সিনেমাটোগ্রাফি এবং সুরকার ড্যানিয়েল ব্লুমবার্গের জন্য সেরা মৌলিক স্কোর এর সম্মাননা।
জো সালদানা স্প্যানিশ ভাষার মিউজিক্যাল ‘এমিলিয়া পেরেজৱ’- এ তার অভিনয়ের জন্য সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরস্কার জিতেছেন। এই সিনেমাটি একজন ড্রাগ লর্ডকে নিয়ে, যিনি লিঙ্গ পরিবর্তন করেন।
অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “এই সম্মান পেয়ে আমি অভিভূত। রিটার (সিনেমায় তার চরিত্র) মতো একজন নারীর নীরব বীরত্ব এবং শক্তিকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য একাডেমিকে ধন্যবাদ।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আমার দাদী ১৯৬১ সালে এই দেশে এসেছিলেন। আমি অভিবাসী বাবা-মা’র গর্বিত সন্তান, এবং আমি ডোমিনিকান বংশোদ্ভূত প্রথম আমেরিকান যিনি একাডেমি পুরস্কার গ্রহণ করছি, এবং আমি জানি আমি শেষ নই।”
‘এমিলিয়া পেরেজ’ চলচ্চিত্রে সালদানার গাওয়া ‘এল মাল’ গানটির মৌলিক গানের পুরস্কারও জিতেছে।
‘সাকসেশন’ তারকা কিয়েরান কালকিন সেরা পার্শ্ব অভিনেতার পুরস্কার জিতেছেন। তিনি ‘আ রিয়েল পেইন’ চলচ্চিত্রে তার অভিনয়ের জন্য এই পুরস্কার জিতেন। সিনেমাটির কাহিনী আবর্তিত হয়েছে দুই চাচাতো ভাইকে নিয়ে, যারা তাদের দাদীর স্মরণে পোল্যান্ড ভ্রমণ করে।
পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমি জানি না আমি কীভাবে এখানে এসেছি, আমি সারাজীবন অভিনয় করে আসছি, এটা আমার কাজের একটি অংশ।”
তিনি চলচ্চিত্রের লেখক এবং পরিচালক জেসি আইজেনবার্গকে ধন্যবাদ জানান।
কালকিন তার “সাকসেশন” সহ-অভিনেতা জেরেমি স্ট্রংকেও শ্রদ্ধা জানান, যিনি একই বিভাগে মনোনীত হয়েছিলেন।
অগ্নি নির্বাপকদের স্বীকৃতি লস অ্যাঞ্জেলেসে দাবানল ধ্বংসযজ্ঞ চালানোর দুই মাস পর অস্কার অনুষ্ঠিত হলো। অনুষ্ঠানের পরে, লস অ্যাঞ্জেলেসের একদল অগ্নিনির্বাপককে তাদের সেবার স্বীকৃতিস্বরূপ মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হয় এবং দর্শকরা তাদেরকে দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানান।
অন্যান্য কিছু পুরস্কার
‘উইকেড’ সিনেমায় প্রোডাকশন এবং কস্টিউম ডিজাইন এর জন্য পল টাজওয়েল সেরার সম্মাননা জিতে নেন। যিনি এই পুরস্কার জেতা প্রথম কৃষাঙ্গ পুরুষ।
তার পুরস্কার গ্রহণ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমি এতে খুব গর্বিত।” তিনি “যুক্তরাজ্যের [যেখানে উইকেড চিত্রায়িত হয়েছিল] সবাইকে তাদের সুন্দর কাজের জন্য ধন্যবাদ জানান, আমি আপনাদের ছাড়া এটা করতে পারতাম না।”

আরেকটি বক্স অফিস ব্লকবাস্টার, ‘ডুন: পার্ট টু’, দুটি পুরস্কার জিতেছে – সেরা সাউন্ড এবং সেরা ভিজ্যুয়াল এফেক্টস।
বাফটা বিজয়ী ‘কনক্লেভ’ মাত্র একটি পুরস্কার জিতেছে – সেরা অভিযোজিত চিত্রনাট্য।
অনুষ্ঠানের অন্যান্য অংশে, মরগান ফ্রিম্যান তার ‘প্রিয় বন্ধু’ জিন হ্যাকম্যানকে শ্রদ্ধা জানান, যাকে স্ত্রী ও কুকুরসহ নিজ বাড়িতে মৃত পাওয়া গিয়েছিল গত সপ্তাহেই।
সেরা মেক-আপ এবং হেয়ারস্টাইলিংয়ের ‘দ্য সাবস্ট্যান্স’, সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্রের পুরস্কার ফ্লো এবং ‘ইন দ্য শ্যাডো অব দ্য সাইপ্রেস’ সেরা অ্যানিমেটেড শর্ট ফিল্মের পুরস্কার জিতেছে।
‘ইন দ্য শ্যাডো অফ দ্য সাইপ্রেস’ এর ইরানি পরিচালক শিরিন সোহানি এবং হোসেইন মোলায়ামি যুক্তরাষ্ট্রের ভিসা পেতে সমস্যার কারণে লস অ্যাঞ্জেলেসে পৌঁছান পুরস্কার বিতরণীর মাত্র তিন ঘণ্টা আগে।
‘আই অ্যাম স্টিল হিয়ার’, সত্য ঘটনা অবলম্বনে নির্মিত সিনেমা। এই সিনেমায় একজন ব্রাজিলিয়ান নারী তার কংগ্রেসম্যান স্বামীর নিখোঁজ হওয়ার তদন্ত করেন। এটি সেরা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের পুরস্কার জিতেছে।
ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান সংঘাত নিয়ে তৈরি ‘নো আদার ল্যান্ড’ সেরা ডকুমেন্টরির পুরস্কার পায়। এটি ফিলিস্তিনি-ইসরায়েলি চলচ্চিত্র নির্মাতাদের একটি যৌথ প্রয়াস।
সহ-পরিচালক ইউভাল আব্রাহাম বলেন, “আমরা, ফিলিস্তিনি এবং ইসরায়েলিরা, এই চলচ্চিত্রটি তৈরি করেছি, কারণ একসঙ্গে আমাদের কণ্ঠস্বর আরও শক্তিশালী হয়।”
অনুষ্ঠানের মঞ্চে, সিনথিয়া এরিভো এবং আরিয়ানা গ্র্যান্ডে ‘উইকেড’ মেডলি গেয়েছিলেন, অন্যদিকে রে, ব্ল্যাকপিঙ্কের লিজা, ডোজা ক্যাট এবং মার্গারেট কোয়ালি সবাই জেমস বন্ডের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর অংশ হিসেবে পারফর্ম করেন।



