সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অতীতে দেওয়া বিদ্বেষমূলক পোস্টকে ঘিরে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হওয়ায় এই বছর অস্কার পুরস্কার এক নাটকীয় মোড় নিয়েছে।
কার্লা সোফিয়া গ্যাসকন, অস্কারের ইতিহাসে প্রথম ট্রান্সজেন্ডার হিসেবে সেরা অভিনেত্রীর মনোনয়ন পেয়ে ইতিহাস গড়েছেন। কিন্তু তার অতীতের বিতর্কিত মন্তব্য ঘিরে তৈরি হয়েছে সমালোচনার ঝড়।
গত সপ্তাহ পর্যন্ত অভিনেত্রী সোফিয়া গ্যাসকন অস্কার জিতে চূড়ান্ত ইতিহাস গড়ার দৌড়ে অনেকটাই এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু এখন?
দ্য অবজারভারের চলচ্চিত্র সমালোচক ওয়েন্ডি আইড বিবিসিকে বলেন, “আমার মনে হয় একথা বলাই যায় যে কার্লা সোফিয়া গ্যাসকন কিছুই জিতবেন না।”
জ্যাকুইস অডিয়ার্ড পরিচালিত অপেরা-ধর্মী থ্রিলার ‘এমিলিয়া পেরেজ’-এ একজন ট্রান্স মেক্সিকান মাদক ব্যবসায়ী কাম জনহিতৈষীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন গ্যাসকন। ইতিমধ্যে চলচ্চিত্রটি ২০২৫ সালের অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস এর সেরা চলচ্চিত্রের মনোনয়ন পেয়েছে। তবে বেশকিছু বিতর্কও রয়েছে সিনেমাটি নিয়ে।
সমালোচকদের মধ্যে মেক্সিকান চলচ্চিত্রবোদ্ধাদের পাল্লা ভারি। তারা মনে করছেন, মেক্সিকোর পটভূমিতে ফরাসি চিত্রনাট্যকার ও পরিচালক কর্তৃক মেক্সিকান ভাষার সিনেমা নির্মাণ করায় সেটিতে যথেষ্ট খাদ রয়েছে। ‘এমিলিয়া পেরেজ’ সিনেমাটির বেশিরভাগ দৃশ্যায়ন ধারণ করা হয়েছে প্যারিসের কাছে।
তবে সেই সমালোচনা অস্কারে ‘এমিলিয়া পেরেজ’ সিনেমাকে মনোনয়নে পক্ষে ভোটারদের ভোট দানে বিরত রাখতে পারেনি। বরং ১৩টি বিভাগে চলচ্চিত্রটি মনোনয়ন পেয়েছে। কিন্তু তবে অস্কার ভোটারদের চূড়ান্ত বিবেচনার জন্য আরও বড় সমস্যা তৈরি হয়েছে।
এই সপ্তাহের শুরুতে, গ্যাসকন একটি সাক্ষাৎকারে অভিযোগ করেন, ‘আই অ্যাম স্টিল হিয়ার’- এ অভিনয়ের জন্য অস্কারে সেরা অভিনেত্রীর মনোনয়ন পাওয়া আরেক অভিনেত্রী ফার্নান্দা তোরেসের সোশ্যাল মিডিয়া ক্যাম্পেইন টিম তাকে ‘টার্গেট’ করেছে। গ্যাসকনের ভাষায়, ‘(তারা) আমাকে এবং এমিলিয়া পেরেজকে ছিঁড়ে ফেলছে”।

পরে অবশ্য গ্যাসকন নিজের আগের বক্তব্য থেকে সরে এসে দাবি করেন, আসলে সাক্ষাৎকারে তিনি ‘সোশ্যাল মিডিয়ায় বিষাক্ততা এবং হিংস্র ঘৃণাত্মক বক্তব্য’ প্রচারের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। কিন্তু পরের মন্তব্য দিয়ে তিনি খুব বেশি মানুষের মন ভজাতে পারেননি। বরং অস্কারের স্পিরিটের বিরুদ্ধে গিয়ে একজন প্রতিযোগীকে গ্যাসকনের আক্রমণের ব্যাপারটিকে কেউই ভাল চোখে দেখছেন না।
ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক সারাহ হাগি এবং ভ্যারাইটি ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে উঠে আসা অভিনেত্রী গ্যাসকনের পুরনো ‘এক্স’ পোস্ট- এর তুলনায় সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো ছিল তুচ্ছ।
গ্যাসকন ২০২০ এবং ২০২১ সালের মধ্যে ‘এক্স’- এর কিছু পোস্টে বিভিন্ন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর প্রতি অপমানজনক মন্তব্য করেন। যুক্তরাষ্ট্রে পুলিশ কাস্টডিতে নিহত জর্জ ফ্লয়েড, চীনা নাগরিক, মুসলিম নারী এবং ইসলাম ধর্ম ইত্যাদি ছিল ওইসব পোস্টের লক্ষ্যবস্তু।
এর পাশাপাশি ২০২১ সালের অস্কার অনুষ্ঠান নিয়েও একটি পোস্ট ব্যাঙ্গাত্মক পোস্ট করেছিলেন।
২০২১ সালের অস্কারে ‘নোম্যাডল্যান্ড’ চলচ্চিত্রটি সেরা সিনেমার পুরস্কার জিতে নেয়। সেইসময় গ্যাসকন পোস্ট দেন: “… আমি জানতাম না যে আমি আফ্রো-কোরিয়ান উৎসব, ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার বিক্ষোভ বা এইটএম (আন্তর্জাতিক নারী দিবসকে বোঝানোর একটি স্প্যানিশ উপায়) দেখছি কিনা। তাছাড়া, এটি একটি কুৎসিত, কদর্য গালা।”
‘এমিলিয়া পেরেজ’ সিনেমাতে গ্যাসকনের চরিত্রটিও ট্রান্সজেন্ডার। দর্শকদের মধ্যে এই চরিত্রটির জন্য সহানুভূতিশীলতা তৈরি হয়েছিল। সিনেমাটির সূক্ষ্ম চিত্রায়নও অ্যাকাডেমি অ্যাওয়ার্ডস এর ভোটারদের কাছে নতুন আবেদন নিয়ে হাজির হয়েছিল।
এর বিপরীতে গ্যাসকনের বৈষম্যপূর্ণ পোস্টগুলো সত্যি বিস্ময়কর ছিল। দ্য টাইমস এর একজন আর্টস এডিটর এড পটন বলেন, “এমিলিয়া পেরেজের সম্ভাবনা তার (গ্যাসকন) উদার পরিচয়টির সঙ্গে দৃঢ়ভাবে যুক্ত, সেগুলো হারিয়ে গেলে, পুনরুদ্ধার করা কঠিন।”
শুক্রবার, গ্যাসকন এক বিবৃতিতে অবশ্য দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, “যাদের কষ্ট দিয়েছেন তাদের কাছে গভীরভাবে দুঃখিত”।
চলচ্চিত্রবোদ্ধা আইড এর মতে, ক্ষতি যা হওয়ার তা হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “সেরা অভিনেত্রীর জন্য তিনি সবসময়ই হিসেবের বাইরে ছিলেন (তার কাছে)। কিন্তু ‘এমিলিয়া পেরেজ’ সেরা সিনেমার পুরস্কার জিতলে আমি এখন খুব অবাক হব। কিন্তু গত সপ্তাহেও এটি একটি শক্তিশালী প্রতিযোগী মনে হয়েছিল।”
আইড বলেন, “গ্যাসকনের সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের প্রতিধ্বনি কেবল তার অস্কার জেতার সম্ভাবনাকেই ধ্বংস করে দেবে না – অন্যান্য বিভাগে ‘এমিলিয়া পেরেজে’র পুরস্কার জয়ের আশাও ভেঙে যেতে পারে। এ ধরনের চরম কেলেঙ্কারিতে একটি চলচ্চিত্রের সেরা সিনেমা হওয়ার স্বপ্ন ধূলিসাৎ- এর ঘটনা কি এটাই প্রথমবার হবে!”
জার্মান পত্রিকা বার্লিনার জেইতুং- এর চলচ্চিত্র সাংবাদিক প্যাট্রিক হাইডম্যান বলেন, “আমি আসলে মনে করতাম না যে ‘এমিলিয়া পেরেজ’ সেরা সিনেমার পুরস্কার জিতবে। আর এখন তা নিশ্চিত হয়ে গেলাম। সেরা আন্তর্জাতিক বৈশিষ্ট্যের জন্য, এখন ‘আই অ্যাম স্টিল হিয়ার’ প্রিয়। অন্য প্রশ্নটি হলো গ্যাসকনের সহ-অভিনেত্রী জো সালডানার ওপর এর কতটা প্রভাব পড়ে সেটি। সালডানার ১০০ ভাগ সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর পুরস্কার জেতার কথা ছিল। কিন্তু সম্ভবত ইসাবেলা রোসেলিনি এবং আরিয়ানা গ্রান্ডে এখন আবার আশা করতে পারেন।”
সালডানা শুক্রবার রাতে লন্ডনে চলচ্চিত্রের একটি প্রশ্নোত্তর অনুষ্ঠানে তার সহ-অভিনেত্রীর চারপাশে তৈরি হওয়া বিতর্কের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, “এটা আমাকে সত্যিই দুঃখিত করেছে কারণ আমি তার কথার সমর্থন করি না, এবং কোনও গোষ্ঠীর মানুষের প্রতি কোনও নেতিবাচক বক্তব্যের প্রতি আমার কোনও সহনশীলতা নেই। আমি কেবল এই চলচ্চিত্রের অংশ ছিল, আছে, এমন প্রতিটি ব্যক্তির সঙ্গে আমার অভিজ্ঞতার সাক্ষ্য দিতে পারি। তাদের সঙ্গে আমার সহযোগিতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং জাতিগত, সাংস্কৃতিক, লিঙ্গ সমতাভিত্তিক অভিজ্ঞতার মিথস্ক্রিয়া ছিল । এবং এটি (অভিনেত্রী গ্যাসকনের মন্তব্য) আমাকে কেবল দুঃখিত করেছে।”

যা কিছুই ঘটুক না কেন, এই বছরের অস্কার মনোনীতদের নিয়ে পর্দার বাইরের ঘটনা ইতিমধ্যে চলচ্চিত্রগুলোর নিজস্ব গল্পগুলোর ওপরে কালোছায়া ফেলে বিপদ তৈরি করেছে। এই সপ্তাহেই অভিনেত্রী তোরেস প্রায় ২০ বছর আগে একটি ব্রাজিলিয়ান কমেডি স্কেচে ‘ব্ল্যাকফেইস’ বা ‘কালো মুখোশ’ পরার জন্য ক্ষমা চেয়েছেন।
কয়েক সপ্তাহ আগে, ‘দ্য ব্রুটালিস্ট’ সিনেমার নির্মাতারা স্বীকার করেছেন সিনেমায় ব্যবহৃত কিছু স্থাপত্য নির্মাণে এবং অভিনেতাদের হাঙ্গেরিয়ান উচ্চারণে সামঞ্জস্য আনতে তারা এআই ব্যবহার করেছেন। অথচ ‘ব্রুটালিস্ট’ চলচ্চিত্রটি নির্মাতাদের শিল্পের প্রতি শ্রমের কারণে প্রশংসিত হয়। ফলে এখানে এআই- এর ব্যবহার হয়েছে জানার পর দর্শকদের নিজেদের প্রতারিত মনে না করাটাই বরং অস্বাভাবিক। প্রসঙ্গত, ‘এমিলিয়া পেরেজ’ সিনেমাতেও গ্যাসকনের গানের কণ্ঠ উন্নত করতে এআই ব্যবহার করা হয়।
এদিকে, বেশ কয়েকজন মনোনীত অভিনেতা-অভিনেত্রীর বিষয়ে এই আলোচনা এসেছে যে, অস্কারে মনোনয়নে তাদের ক্ষেত্রে ‘বিভাগ জালিয়াতি’ হয়েছে। অর্থাৎ যে বিভাগে মনোনয়ন পেয়েছেন সেই বিভাগে নয়, অন্য বিভাগে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার কথা ছিল। কিছু চলচ্চিত্র বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এমিলিয়া পেরেজ’ এবং ‘উইকডে’-তে অভিনয়ের জন্য যথাক্রমে সালডানা এবং গ্রান্ডেকে সেরা পার্শ্ব অভিনেত্রীর জন্য মনোনীত করার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে। একই প্রশ্ন তোলা হয়েছে ‘আ রিয়েল পেইন’ সিনেমার অভিনেতা কিয়েরান কুলকিনকে নিয়েও। বিশ্লেষকরা বলছেন, সিনেমাগুলোতে এরা পার্শ্ব ভূমিকায় নন, বরং সহ-প্রধান ভূমিকায় অভিনয় করেছেন। ‘আনোরা’ সিনেমার তারকা মিকি ম্যাডিসন এর একটি মন্তব্যও ঝড় তুলেছে। এর আগে তিনি জানান যে, যৌন দৃশ্যের শুটিং করার সময় ‘সেক্স সিন কো-অর্ডিনেটর’ ব্যবহার না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এতে সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। কেননা, শুটিং এর সময়ে সেক্স সিন কোঅর্ডিনেটর এর প্রধান কাজের একটি হচ্ছে যৌনদৃশ্যে অভিনেতা-অভিনেত্রীর জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা, যেন এগুলো দৃশ্যায়নের সময় কোনও যৌন হয়রানি বা অসন্তোষের ঘটনা না ঘটে।
এর কিছুই নতুন নয়। কেবল অভিনয়শৈলী ও ভালো মানের ভিত্তিতে চলচ্চিত্র এবং অভিনয় শিল্পীরা অস্কার জেতেন- এমনটা নয়। বরং পর্দার বাইরের নানা প্রভাবও কাজ করে।
পল নিউম্যান ১৯৮৭ সালে ‘দ্য কালার অব মানি’র জন্য সেরা অভিনেতার অস্কার মূলত তার দর্শকপ্রিয়তার কারণে জিতে নেন। ২০০৮ সালের শেষের দিকে অভিনেতা মিকি রোর্ক একজন সাংবাদিককে ‘সমকামী বিদ্বেষী’ মন্তব্য করেন। যেটির জেরে তিনি ‘দ্য রেসলার’ সিনেমায় দারুণ অভিনয়ের পরও ২০০৯ সালে অস্কার জিততে পারেননি। বরং অভিনেতা শন পেন ‘মিল্ক’ সিনেমায় ‘সমকামী অধিকার কর্মী হার্ভে মিল্কের ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য এটি জিতেছিলেন।
চলচ্চিত্রের প্রযোজক এবং প্রচারণাকারীরা তাদের প্রতিযোগীদের সম্পর্কে কুৎসিত গুজব ছড়াতে সবসময়ই তৎপর ছিলেন। যখন হার্ভে ভাইনস্টাইন মিরাম্যাক্সের প্রধান ছিলেন, তখন তার বিরুদ্ধে পুরস্কারের প্রতিদ্বন্দ্বিদের সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করার অভিযোগ ছিল। এরকম প্রচারণা চালিয়ে তার চলচ্চিত্র ‘শেক্সপিয়ার ইন লাভ’ ১৯৯৯ সালে ‘সেভিং প্রাইভেট রায়ান’-কে টেক্কা দিয়ে অপ্রত্যাশিতভাবে অস্কারে সেরা সিনেমার পুরস্কার জিতে নেয়। এরপরও ব্যতিক্রম তো রয়েছেই। ড্যারেন অ্যারোনফস্কির ‘ব্ল্যাক সোয়ান’-এ নাটালি পোর্টম্যান অভিনয়ের সময়ে নৃত্যের প্রতি যথেষ্ট মনোযোগী ছিলেন না এবং তার ব্যালে শেখানোর নৃত্যশিল্পীকে যথেষ্ট কৃতিত্ব দেননি বলে প্রচার ছিল। তবু তিনি ২০১১ সালে অস্কার জিতেন। তার আগের বছর, দুই সেরা অভিনেত্রীর মনোনীত প্রার্থী, আন্দ্রেয়া রাইজবোরো এবং মিশেল ইয়োর প্রচারণার নিয়মকানুন ভাঙার অভিযোগ উঠেছিল। যদিও তারা নিয়ম ভঙ্গ করেননি। কিন্তু এই বছর, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।
সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের চলচ্চিত্র সাংবাদিক স্টেফানি বানবারি বলেন, “আমি সত্যি বলতে পারি যে আগের কোনো অস্কার দৌড়ে এত জঘন্য নোংরামি দেখিনি।”
তিনি আরও যোগ করেন, “এই বিদ্বেষ ইন্ডাস্ট্রির হতাশাজনক অবস্থাকে প্রতিফলিত করে নাকি আমরা যে সময়ে বাস করছি তার নীচতাকে, তা আমার সত্যিই জানা নেই।”
এ ধরনের সংকট পুরস্কারের প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তাও নিয়ে আসছে। এই ফাঁকে ‘কনক্লেভ’ এবং ‘আ কমপ্লিট আননোন’- সিনেমার ভাগ্য হঠাৎ করেই উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, কারণ সম্ভবত তারা অস্কারের ভোটারদের কাছে নিরাপদ এবং বিতর্কহীন, অন্তত এখন পর্যন্ত।



