প্রায় এক দশক আগে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে মন্ত্রিত্ব খুইয়ে রাজনীতির মাঠে একাকীই পথ চলছিলেন আব্দুল লতিফ সিদ্দিকী। হঠাৎই ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একটি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হন তিনি। সেখানে একদল হট্টগোল শুরু করলে পুলিশ গিয়ে তাকে তুলে নিয়ে আসে।
বৃহস্পতিবার দুপুরে জাতীয় প্রেস ক্লাব থেকে লতিফ সিদ্দিকীকে তুলে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে। তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
লতিফ সিদ্দিকী আওয়ামী লীগে ছিলেন দীর্ঘদিন ধরে। তার ভাই আব্দুল কাদের সিদ্দিকী আওয়ামী লীগ ছেড়ে কৃষক, শ্রমিক, জনতা লীগ গড়লেও তিনি আওয়ামী লীগেই ছিলেন।
টাঙ্গাইল থেকে ১৯৭০ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন লতিফ সিদ্দিকী। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ এবং ১৯৯৬ সালেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।
২০০৯ সালে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনার সরকারে পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী হয়েছিলেন লতিফ সিদ্দিকী। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর পান পান ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দ্বায়িত্ব।
ওই বছরই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে হজ পালন নিয়ে এক মন্তব্যের জেরে সমালোচনার মুখে পড়লে আওয়ামী লীগ তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে, মন্ত্রিত্ব হারিয়ে পরের বছর সংসদ থেকেও পদত্যাগ করেন তিনি।
এরপর রাজনীতির বাইরেই ছিলেন বেশ কিছুদিন। ২০১৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোটে দাঁড়িয়েও হেরেছিলেন, তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে দেন তিনি।
সাত মাস পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্যপদের অবসান ঘটে।
অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ নেতা, এমপি, মন্ত্রীরা রোষের মুখে পড়লেও লতিফ সিদ্দিকী নিভৃতেই ছিলেন। বৃহস্পতিবার রিপোর্টার্স ইউনিটিতে গিয়ে তিনি প্রতিরোধের মুখে পড়লেন।
কী ছিল অনুষ্ঠান
মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন প্ল্যাটফর্ম ‘মঞ্চ ৭১’ বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একটি আলোচনা সভা আয়োজন করেছিল।
অভ্যুত্থানের পর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতি রোধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান রক্ষার দাবি তুলে এই সংগঠনটি গড়ে ওঠে গণফোরামের নেতা আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বীর প্রতীক এবং সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী জেড আই খান পান্নার উদ্যোগে।
এই সংগঠনটির উদ্যোগে বৃহস্পতিবারের গোলটেবিল বৈঠকের শিরোনাম ছিল- ‘আমাদের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং বাংলাদেশের সংবিধান’। এতে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থাকার কথা ছিল ড. কামাল হোসেনের। লতিফ সিদ্দিকী ছিলেন আলোচক।
সকাল ১০টায় গোলটেবিল আলোচনা শুরুর কথা থাকলেও বেলা ১১টায় আলোচনা সভাটি শুরু হয় রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে।
কামাল হোসেন সভায় আসেননি। তবে লতিফ সিদ্দিকী এসেছিলেন। আরও ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন, সাবেক সচিব আবু আলম শহীদ খান, মঞ্চ ৭১-এর সমন্বয়ক আবদুল্লাহ আল মাহমুদ।
হট্টগোলের শুরু যেভাবে
সভায় প্রথমে বক্তব্য দেন অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন। তিনি বলেন, “আমরা দেখতে পাচ্ছি, দেশের সংবিধানকে ছুড়ে ফেলার পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এর পেছনে রয়েছে জামায়াত–শিবির ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বে তারা মুক্তিযোদ্ধাদের জুতার মালা পরাচ্ছে।”
তার বক্তব্য শেষ হওয়ার পরপরই মিছিল নিয়ে একদল ব্যক্তি মিলনায়তনে ঢুকে পড়েন। তারা ‘জুলাইয়ের হাতিয়ার, গর্জে উঠুক আরেকবার’, ‘লীগ ধর, জেলে ভর’, ‘জুলাইয়ে যোদ্ধারা, এক হও লড়াই করো’ স্লোগান দিতে থাকে। একপর্যায়ে তারা গোলটেবিল আলোচনার ব্যানার ছিঁড়ে আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অবরুদ্ধ করে রাখেন।

অধ্যাপক কার্জন বেরিয়ে যেতে চাইলে তাকে বাধা দেয় বিক্ষুব্ধরা। তাকে সেখানেই বসে থাকতে বলেন তারা। তাদের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি চলতে থাকে। অধ্যাপক. কার্জন হাতে থাকা সংবিধান দেখিয়ে বারবার বলছিলেন, “আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক।”
লতিফ সিদ্দিকী একটি চেয়ারে চুপচাপ বসে ছিলেন। কয়েকজন বিক্ষুব্ধ ব্যক্তি তাকে ঘিরে গালাগালি ও স্লোগান দিতে থাকে।
বিক্ষোভকারীরা কারা
অনুষ্ঠানে আসা বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “আমি এখানে প্রোগ্রামে এসেছি দল মতের হিসাবে নয়, এখানে সব মুক্তিযোদ্ধাদের ডাকা হয়েছে; তাই এসেছি।
“আমরা প্রোগ্রাম শুরু করেছিলাম। লতিফ সিদ্দিকী সাহেব এসেছেন। কামাল হোসেন সাহেব আসেননি। ২০/২৫ জন ছেলে এসে হট্টগোল করে। আমাদের ঘিরে ফেলে।”

বিক্ষোভকারীরা নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসাবে পরিচয় দেন সাংবাদিকদের কাছে।
আল আমিন রাসেল নামের একজন প্রথম আলোকে বলেন, “আমরা জুলাই যোদ্ধা। এখানে পতিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জড়ো হয়ে ষড়যন্ত্র করছে। জুলাই যোদ্ধারা বেঁচে থাকতে এমন কিছু আমরা মেনে নেব না।”
‘জুলাই যোদ্ধাদের’ সঙ্গে পল্টন থানা জামায়াতে ইসলামীর নেতা শামীম হোসাইনও ছিলেন।
তিনি প্রথম আলোকে বলেন, “একটি গোষ্ঠী একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি করে চব্বিশকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। আমরা মনে করি, একাত্তর আমাদের ভিত্তি এবং চব্বিশ আমাদের মুক্তি।
“এখানে যারা জড়ো হয়েছেন, তারা সবাই চব্বিশের খুনের সঙ্গে জড়িত। অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও আছে। আমরা আইন হাতে তুলে না নিয়ে তাঁদের পুলিশে সোপর্দ করেছি।”
পুলিশ কী বলছে
দুপুর সোয়া ১২টার দিকে পুলিশের একটি দল এলে বিক্ষোভকারীরা লতিফ সিদ্দিকী, অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমানসহ অন্তত ১৫ জনকে তাদের হাতে তুলে দেন।
পুলিশের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) মো. আসাদুজ্জামান সেখানে উপস্থিত ছিলেন। দুপুর সোয়া ১২টার পর কয়েকজন পুলিশ সদস্য এসে লতিফ সিদ্দিকীসহ বেশ কয়েকজনকে পুলিশ ভ্যানে নিয়ে যান।
লতিফ সিদ্দিকীকে নিয়ে যাওয়ার সময় শাহবাগ থানার এসআই রাশেদ সাংবাদিকদের বলেন, “এখন তো এখান থেকে তাদের নিয়ে যাওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। আমরা নিয়ে যাচ্ছি। পরে সিনিয়ররা সিদ্ধান্ত নেবেন।”
লতিফ সিদ্দিকী তখন সাংবাদিকদের বলেন, “আমি জানতাম না এখানে সমস্যা হবে। এই অনুষ্ঠানে দাওয়াত পেয়েই এসেছিলাম। আওয়ামী লীগের সঙ্গে আমার কোনও সম্পর্ক নেই।”
পরে শাহবাগ থানার ওসি মনসুর খালিদ বিবিসি বাংলাকে বলেন, লতিফ সিদ্দিকীসহ পাঁচ-ছয়জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডিবি কার্যালয়ে নেওয়া হয়েছে।
ডিএমপির রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) মাসুদ আলম বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “মূলত উনাদের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ডিবি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। এখন সিনিয়রদের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নেব।”
লতিফ সিদ্দিকীকে কি গ্রেপ্তার করা হয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে বেলা পৌনে ১টার দিকে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এন্ড অপারেশনস) এস এন মো. নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, “তার বিরুদ্ধে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।”
তবে লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করার ইঙ্গিত পাওয়া যায় তার কথায়। তিনি বলেন, লতিফ সিদ্দিকীর বিরুদ্ধে কোনও মামলা আছে কি না, তা দেখা হচ্ছে।



