নিসর্গী অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা ১৯৬২ থেকে ১৯৬৫ সালের মধ্যে ঢাকা শহরের গাছপালা নিয়ে লিখেছিলেন ‘শ্যামলী নিসর্গ’। বাংলা একাডেমি থেকে ১৯৮০ সালে প্রথম প্রকাশিত সে বইটি এখনও ঢাকার বৃক্ষচর্চার আকরগ্রন্থ। তিনি শ্যামলী নিসর্গ লিখে রেখে না গেলে সেকালের ঢাকার পথতরুর বৃত্তান্ত আমরা হয়ত জানতে পারতাম না। কিন্তু ঢাকার সেসব পথতরুর এখন কী অবস্থা? আজও কি সেগুলো বেঁচে আছে? দ্বিজেন শর্মার আত্মজ সে বৃক্ষরা এখন ঢাকার কোথায় কীভাবে আছে সে কৌতুহল মেটানো আর একালের পাঠকদের সঙ্গে ঢাকার সেসব গাছপালা ও প্রকৃতির পরিচয় করিয়ে দিতে এই লেখা। কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক মৃত্যুঞ্জয় রায় সরেজমিন অনুসন্ধানে তুলে ধরছেন ঢাকার শ্যামলী নিসর্গের সেকাল একাল। ঢাকার প্রাচীন, দুর্লভ, দুষ্প্রাপ্য ও অনন্য পথতরুর বৃত্তান্ত নিয়ে সকাল সন্ধ্যার পাঠকদের জন্য বাংলা বারো মাসে বারো পর্বের ধারাবাহিকের আজ প্রকাশিত হলো মাঘ পর্ব।
ঢাকা শহরের বৃক্ষ বৃত্তান্ত: পৌষ পর্ব
যতীন্দ্রমোহন রায় রচিত ‘ঢাকার ইতিহাস’ বইটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৩১৯ বঙ্গাব্দে। একশো বছরেরও বেশি সময় আগে ঢাকার ভেষজ বৃক্ষ হিসেবে সে বইয়ে উল্লেখ রয়েছে হরিতকী, আমলকী ও বহেড়া গাছের নাম। এছাড়াও রয়েছে যজ্ঞডুমুর, শোনা, বেল, রক্তচন্দন, শিরিষ, তেজপাতা, ছাতিম, সজিনা ইত্যাদি ভেষজ বৃক্ষের নাম। ঢাকা শহরে বর্তমানে রক্তচন্দনের গাছ নেই, তবে আমলকি, হরিতকী, বহেড়া, শিরিষ, ছাতিম গাছ আছে অনেক। অন্য গাছগুলো কম দেখা যায়। এসব ভেষজ গাছ আমাদের প্রাকৃতিক চিকিৎসা দিতে পারে। শীতের হিম আবেশে কাতর থাকে বৃক্ষাদি, ঢাকা শহরেও তার ব্যতিক্রম নয়। পাতাঝরা গাছগুলোর পাতা ঝরা শুরু হয়। গাছের তলায় জমতে থাকে শিশির, শীর্ণ ডালপালায় মেখে থাকে ভোরের শিশির। আবার রাস্তার ধারের বৃক্ষাদির পাতায় জমতে শুরু করে শুষ্ক দিনের পথের ধুলো। গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকা শহরের গাছগুলোয় রোজ ৪৩৬ টন ধুলো জমে। এতে একদিকে যেমন বায়ুদূষণ বাড়ছে, অন্যদিকে পাতার ওপর ধুলো জমাতে সেসব গাছের খাদ্য তৈরি ব্যহত হয় যা গাছের বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই ঢাকা শহরে শুধু বৃক্ষরোপণ নয়, এসব ধুলোর আস্তরণ সরানোর জন্য নিয়মিতভাবে পানি ছিটানোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।

হরিতকী
কবি কাজী নজরুল ইসলাম তাঁর ছায়ানট কাব্যে ‘অমর-কানন’ কবিতায় হরিতকীকে অমর করে রেখেছেন—
‘‘মোরা নিজ হাতে মাটি কাটি, নিজে ধরি হাল,
সদা খুশি-ভরা বুক হেথা হাসি-ভরা গাল,
মোরা বাতাস করি গো ভেঙে হরিতকি-ডাল
শাখায় শাখায় শাখী, গানের মাতন॥’
হরিতকী মানুষকে অমর করতে পারে না, কিন্তু এর ঔষধিগুণ মানুষকে অনেক রোগ থেকে রক্ষা করতে পারে। রোগ বা দুঃখ হরণ করে বলেই ওর নাম হরিতকী। হরিতকীর ইংরেজি নাম black myrobalan বা chebulic myrobalan। একে উর্দু ও হিন্দিতে বলে হরাদ, তামিল ভাষায় হিরাদা, অসমীয়া ও বাংলায় হরিতকী। হরিতকী এক বিস্ময়কর ঔষধি গাছ। ভেষজ ঔষধ ‘ত্রিফলা’র একটি উপাদান। ত্রিফলার অন্য দুটি ফল হলো বহেড়া ও আমলকি। ত্রিফলা পেটের পীড়ার জন্য খুবই উপকারী। অন্য আর একটি আয়ুর্বেদিক ঔষধ ‘অমৃত-কালাশ’ ও ‘অমৃত-সালসা’র একটি উপাদান হলো হরিতকী। এর ফল, শিকড় ও বাকল আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। প্রাচীন ভারতীয় লেখক ভবপ্রকাশ হরিতকীকে আয়ুর্বেদিক ওষুধের রাজা বা ‘The King of Medicines’ নামে অভিহিত করেছেন। কেননা, আয়ুর্বেদিক ওষুধের বহু গুণাবলী এর মধ্যে রয়েছে। তাঁর মতে, হরিতকীর রসা, বীর্য, বিপাক, গুণ এ সব ধর্মই আছে। নোনা স্বাদ ছাড়া আর ছয়টি স্বাদের সবই হরিতকীতে আছে। অর্থাৎ হরিতকী ফল খাওয়ার সময় তা যেমন কইষ্ট্যা লাগে, তেমনি তিতকো, টক, মিষ্টি, ঝাঁঝালো ইত্যাদি লাগে। ফল চিবানোর পর পানি খেলে মিঠা লাগে।

হরিতকির উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম টার্মিনালিয়া ছেবুলা (Terminalia chebula) ও গোত্র কম্ব্রিটেসী (Combretaceae)। হরিতকী পত্রঝরা বড় আকৃতির বৃক্ষ প্রকৃতির গাছ। গাছ ২০-৩০ মিটার লম্বা হয়। প্রধান কাণ্ডের ব্যাস ১ মিটার পর্যন্ত হতে পারে। পাতা পর্যায়ক্রমে বিপরীতমুখীভাবে সাজানো থাকে। পাত্রা ডিম্বাকার, ৭-৮ সেন্টিমিটার লম্বা ও ৪.৫-১০ সেন্টিমিটার চওড়া,বোঁটা ১-৩ সেন্টিমিটার লম্বা। পাতার অগ্রভাগ সূঁচালো বোঁটার কাছে হৃৎপিণ্ডের মতো খাঁজকাটা। ফুল ছড়ায় ফোটে। ফুলের রঙ সাদা থেকে হলদে সাদা। ফুল সহবাসী ও তীব্র গন্ধযুক্ত। ফল মাকুর মতো দুপ্রান্তে সরু ও পেট মোটা। কাঁচা ফলের রঙ সবুজ, পরে হলদেবাদামি ও ফল শুকিয়ে গাঢ় বাদামি থেকে কালো হয়ে যায়। ফল শক্ত ও পাঁচটি খাঁজযুক্ত। ফল ড্রুপ শ্রেণির। বীজ কাঠের মতো শক্ত।
জানুয়ারি থেকে মার্চ হরিতকী ফল সংগ্রহের সময়। গাছ থেকে দু’একটা ফল পড়া শুরু হলেই বুঝতে হবে ফল পেকেছে। ফলের উপযুক্ত ট্যানিন বা কষ পেতে জানুয়ারির মাঝামাঝি ফল সংগ্রহ করা উচিৎ। জানুয়ারির পর ফল সংগ্রহ করলে ভেষজ গুণ বিচারে সেসব ফলের মান কমে যায়। কাঁচা ফলের রঙ সবুজ, পাকলে হলদে ভাব ধরে। ফল পাড়ার পর কয়েকদিনের মধ্যে শুকিয়ে হলদে হয়, শেষে বাদামি হয়ে যায়। অনেকসময় ফল রোদে শুকিয়ে ছায়ায় মেঝেতে ফেলে রাখা হয়। সেসব ফলে অনেক সময় বিভিন্ন ছত্রাকের আক্রমণ ঘটে ও পচতে শুরু করে। এরূপ পচা ফলে ট্যানিনের পরিমাণ উল্লেখযোগ্য পরিমাণে কমে যায়। পাড়ার পর ফলের রঙ হলদে হলেই তা রোদে শুকাতে হয়। পূর্ণবয়স্ক একটি গাছ থেকে বছরে গড়ে ১০ কেজি ফল পাওয়া যায়।

দু’ভাবে হরিতকীর চারা তৈরি করা যায়— বীজ দ্বারা এবং ডগা ও মূল কাটিং দ্বারা। বীজ দ্বারা চারা তৈরি খুব সহজ নয়। কেননা বীজের বীজত্বক খুব শক্ত হওয়ায় বীজ গজানো কঠিন হয়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে আর এক প্রকার হরিতকীর পরিচয় পাই যার নাম জংলি হরিতকী। জংলি হরিতকীর স্বাদ টক, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম টর্মিনালিয়া সাইট্রিনা যা থেকে আচার তৈরি করা হয়।
নানা গবেষণায় হরিতকীর অনেক ভেষজ গুণের পরিচয় পাওয়া গেছে। এর ফলে ঔষধিগুণ সম্পন্ন বিভিন্ন রাসায়নিক উপাদান বিশেষ করে অ্যানথ্রাকুইনন, ট্যানিন, ছেবুলিক এসিড, রেজিন ও নানা রকমের তেল থাকায় এর ভেষজ মূল্য হয়ে উঠেছে অপরিসীম। ফলের নির্যাসে এন্টি অক্সিডেন্ট থাকায় তা অকালে বুড়িয়ে যাওয়া রোধ করে, হৃৎপিণ্ডের বল বাড়ায় ও ক্যানসার কোষ বৃদ্ধি প্রতিহত করে। এর এন্টিডায়াবেটিক ক্ষমতাও আছে। ওষুধ হিসেবে হরিতকীর ছাল, শিকড় ও ফল ব্যবহৃত হয়। ইদানীং বিভিন্ন আয়ুর্বেদিক ওষুধের দোকানে হরিতকীর গুঁড়ো ও ট্যাবলেট বা বড়ি বিক্রি হচ্ছে। যে কোনও বানিয়াতি দোকানে হরিতকীর শুকনো ফল পাওয়া যায়। ফল ওঠার মৌসুমে বাজারে কাঁচা ফলও বিক্রি হয়। কাঁচা ফল চিনির সিরকা দিয়ে আচার বানিয়ে খাওয়া হয়। কাঁচা ফলের কষ চামড়া, কাপড়, কাগজ ইত্যাদি রঙ করতে ব্যবহার করা হয়।
আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বছরের ছয় ঋতুতে ছয়ভাবে হরিতকী সেবনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এজন্য হরিতকী ঋতুহরিতকী নামেও পরিচিত। বসন্ত ঋতুতে হরিতকী খেতে হবে মধুর সাথে, গ্রীষ্মে খেতে হবে গুড়ের সাথে, বর্ষাকালে খেতে হবে সৈন্ধব লবণের সাথে, শরতে খেতে হবে চিনির সাথে, হেমন্তে খেতে হবে আদার সাথে, শীতে খেতে হবে পিপুলের সাথে। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্যের মতে ঋতুহরিতকী খেলে বল, বীর্য, স্মৃতি ও কান্তি বৃদ্ধি হয়। তবে ১৬ বছরের নিচে বয়সে এটা খাওয়া চলবে না।

হরিতকীর বীজ বাদামের মতো খাওয়া যায়, বীজ থেকে তেল হয়। সেই তেল খাওয়া ও রান্নায় ব্যবহার করা যায়। কচি ফলের খোসা টুকরো করে কেটে সালাদের সাথে খাওয়া যায়। ফল ব্ল্যাক সল্ট তৈরিতে কাজে লাগে। হরিতকীর কাঠ বাদামি থেকে লালচে বাদামি রঙের। কাঠ খুব শক্ত। গাড়ি ও নির্মাণ কাজে এর কাঠ ব্যবহার করা যায়। এর কাঠ দিয়ে আসবাবপত্রও তৈরি করা হয়।
হরিতকীর উৎপত্তি দক্ষিণ এশিয়ায়— ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, পূর্ব থেকে দক্ষিণ পশ্চিমে চীন এবং মালয়েশিয়া ও ভিয়েতনাম হরিতকীর আদিনিবাস। দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার সব দেশেই হরিতকী গাছ জন্মে। ঢাকা শহরে অতীতে কোথায় প্রাচীন হরিতকী গাছ ছিল সে সম্পর্কে কিছু জানা যায় না। তবে অল্পবয়সী কিছু হরিতকী গাছের দেখা মেলে এখন রমনা উদ্যানে মহুয়া চত্বরের কাছাকাছি ও ধানমণ্ডি লেকের ফুটওভার ব্রিজের গোড়ায়। হরিতকী গাছের মতো এমন ছত্রবৎ পত্রপল্লবশোভিত শাখা নোয়ানো ছায়াঘন শক্ত গাছ কেন যে ঢাকা শহরের কোনও রাস্তায় নেই, সেটিই ভেবে পাইনা।

কাঠবাদাম
কাঠবাদামের সাথে পরিচয় সেই তরুণ বয়সে। আশির দশকে খুলনায় আমাদের পাশের বাড়িতে একটা বড় কাঠবাদামের গাছ ছিল। হেমন্তকাল এলেই তার তলায় দেখতাম লাল লাল পাকা ফল পড়তে শুরু করেছে। কিছু ফল বাদুড়ের চিবানো। মাঝে মাঝে সেসব ফল কুড়িয়ে এনে দা দিয়ে দুফালি করে কাটতাম। কাঠের মতো শক্ত খোসা ছাড়িয়ে সেসব বাদামের ভিতর থেকে সাদা শাঁস বের করে চিবিয়ে চিবিয়ে খেতাম। স্বাদ অনেকটা এখনকার দিনের বিদেশি অ্যালমন্ড নাটের মতো, পানসে স্বাদ। শীতকালের প্রথম দিকেও মাঝে মাঝে সেসব বাদাম খাওয়ার সুযোগ হতো।
ফলগুলো বাদামের মতো, আর সে ফলের খোসা কাঠের মতো শক্ত। তাই এর নাম কাঠবাদাম। অন্য নাম দেশি বাদাম। লেখক বিভুতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই কাঠবাদামকে বলেছেন বাদাম ও বুনো বাদাম। তাঁর ‘আরণ্যক’ উপন্যাসে রয়েছে সেই বুনো বাদামের উল্লেখ: ‘‘বড় একটা বুনো বাদাম গাছের ছায়ায় এদের কুটির। বাদামের পাকা পাতা ঝরিয়া পড়িয়া উঠোন প্রায় ছাইয়া রাখিয়াছে।’’

কি অপূর্ব বাদাম গাছের পাতার রঙ বদল, পাতাবদলের দৃশ্য! শীতে লাল রঙ ধরা পাতা পুরো গাছকেই যেন রক্তিম সাজে সাজিয়ে দেয়, পাতার সেই বিদায়ী সাজে বাদামের গাছ শীতের অপেক্ষায় পাতা ঝরিয়ে যেন হালকা হতে চায়। পত্রহীন নগ্ন ডালপালা, ঠায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শীতের কুয়াশায় ভিজে ভিজে দেহের ভেতরে জমিয়ে তোলে এক ধরনের উন্মাদনা— নতুন পাতা ও কুঁড়ি গজানোর প্রচেষ্টা। বসন্ত আসে। শীর্ণ ডালপালা ভরে ওঠে নব নব পত্র পল্লবে, উজ্জ্বল কাঁচা সবুজে আহা কি মোহময় তার রূপ!
কাণ্ড থেকে চারদিকে কি সুবিন্যাসিত ঘুর্ণায়মান ভঙ্গিতে ছাতার মতো ডালপালা ছড়িয়ে বাহু মেলে আছে কাঠবাদাম গাছ। যেন শ্রান্ত কোনও পথিক বা প্রকৃতিপ্রেমিককে অনেকগুলো হাত বাড়িয়ে সে আহ্বান জানাচ্ছে ‘এসো, তরুতলে এসো।’ প্রধান কাণ্ড থেকে চারদিকে আবর্তাকারে প্রসারমান স্তরে স্তরে থাকা ডালপালা ও নিবিড় পত্রপল্লবের ছায়া যে কোনও পথিককে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দেয়।

গাছ দ্রুত বাড়ে ও ছায়াদান করে বলে এখন অনেক বাগানে ও রাস্তার ধারে কাঠবাদামের গাছ লাগানো হচ্ছে। ঢাকা শহরে এই দুই বছরে অনেক রাস্তার ধারে কাঠবাদামের গাছ লাগানো হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে উদ্ভিদ উদ্যানের সামনের বাগানের কোণে একটি বড় কাঠবাদাম গাছ আছে, এ গাছের একটি ছোট বিথীকা আছে শেরে বাংলা নগরে চন্দ্রিমা উদ্যানে। মানিক মিয়া অ্যাভেনিউ, ধানমণ্ডি ও গুলশান লেকের পাড়েও আছে কাঠবাদাম গাছ। রমনা উদ্যানের ভেতর জারুল চত্বরের কাছে একটি কাঠবাদাম বিথী আছে। ঢাকা শহরে কাঠবাদাম গাছ রয়েছে অঢেল।
সম্ভবত, দেশের সবচেয়ে প্রাচীন কাঠবাদাম গাছটি রয়েছে যশোরের কেশবপুরে সাগরদাঁড়িতে। মৃতপ্রায় সে গাছটির বয়স প্রায় তিনশো বছর বলে অনুমান করা হয়। গাছটি কবি মাইকেল মধুসূদনের স্মৃতি বিজড়িত। কেননা, কবি ছোটবেলায় এ গাছের নিচে বসে কবিতা লিখতেন। জায়গাটি ‘কাঠবাদাম ঘাট’ নামে পরিচিত। মাত্র ১২-১৩ বছর বয়সে কবি ১৮৩২ সালে কলকাতায় যান। কলকাতায় গিয়ে কবি খ্রিস্ট ধর্ম গ্রহণ করার পর সাগরদাঁড়ি ফিরে এলে তার পিতা জমিদার রাজনারায়ণ দত্ত কবিকে বাড়ি ঢুকতে দেননি। কবি তার অনুমতির অপেক্ষায় তাবু খাটিয়ে সেই কাঠবাদাম গাছের তলায় চৌদ্দ দিন কাটানোর পর কলকাতায় ফিরে যান। এ কারণে সে ঘাটের আরেক নামা ‘বিদায় ঘাট’। কবির স্মৃতি ধরে রাখতে ১৯৪৪ সালে যশোর জেলা পরিষদ কর্তৃপক্ষ কাঠবাদাম গাছের গোড়া ইট দিয়ে গেঁথে পাকা করে দেয়।

কাঠবাদামের ইংরেজি নাম কান্ট্রি অ্যালমন্ড, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম টার্মিনালিয়া কাটাপ্পা (Terminalia catappa) ও গোত্র কম্ব্রিটেসী। কাঠবাদাম বহুবর্ষী পত্রমোচী স্বভাবের বৃক্ষ, গাছ ৩৫ মিটার পর্যন্ত উঁচু হয়। পাতার আকৃতি অনেকটা কাঁঠাল পাতার মতো হলেও তা কাঁঠাল পাতার চেয়ে অনেক বড়, গোড়ার দিকে ক্রমশ সরু, আগার দিকে ছড়ানো, অগ্রভাগ সূঁচালো নয়, অনেকটা গোলাকার। অক্টোবর-নভেম্বরে পাতা ঝরা শুরু হয়। ঝরার সময় পাতার সবুজ রঙ বদলে যায়। এ সময় পাতায় বিভিন্ন রকমের পিগমেন্ট বা রঞ্জকের উপস্থিতি দেখা যায়, বিশেষ করে ভায়োল্যাক্সানথিন, লিউটিয়েন ও জিয়ায্যান্থিন পিগমেন্টের কারণে পাতার রঙ হলদে ও লাল হয়ে যায়।
বসন্তে কাঠবাদাম গাছে নতুন পাতা গজায়। পাতা গজানোর পরই ফেব্রুয়ারি-মার্চে গাছে ফুল আসে। লম্বা মঞ্জরীতে হালকা সবুজাভ সাদা রঙের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনেক ফুল ফোটে। একই গাছে বিভিন্ন ডালে পুরুষ ও স্ত্রী ফুল আলাদা ফোটে। পতঙ্গ ও বাতাস দ্বারা ফুলের পরাগায়ণ ঘটে। ফল শক্ত, চ্যাপ্টা, চোখের মতো আকৃতি। কাঁচা ফলের রঙ সবুজ, পাকলে প্রথমে হলুদ ও শেষে লাল হয়ে যায়। শরৎকালে ফল পাকে। বীজ থেকে চারা হয়। পথতরু হিসেবে কাঠবাদামের গাছ লাগানো যায়। পার্কে শোভাবর্ধক গাছ ও ছায়াতরু হিসেবে লাগানো যেতে পারে।
স্বর্ণ অশোক
পৌষের দুপুরে রোদটা গড়াগড়ি খাচ্ছে আকাশে, সূর্যটা হেলে পড়েছে পশ্চিমে। সূর্যের আলো স্বর্ণ অশোক গাছের ছাতির মতো ঘন তরুপল্লবের ফাঁক দিয়ে যেন চুইয়ে পড়ছে থোকা ধরা ফুলগুলোর ওপর। ঝাকড়া গাছের ডালপালার উপরে তো বটেই, ডালের কালচে বাকল ফুড়ে বেরিয়ে এসেছে স্বর্ণ অশোকের পুষ্পমঞ্জরী। আহা কি শোভা সেসব ফুলের! যেন ছড়ানো ছিটানো কাঁচা সোনা দিয়ে গড়া কোনও গহনা। আলো পড়ে ফুলগুলো চিকচিক করছে। কিন্তু গাছটা এতো উঁচুতে যে অতো সুন্দর থোকা ধরা ফুলের ছবি তোলাই মুশকিল। শেষে গাছের মাথায় ফোটা ফুলের আশা ছেড়ে ডালের ফুলগুলোরই কাছে ভিড়লাম, ছবি তুললাম ও তার ভুবনমোহিনী রূপে মুগ্ধ হলাম।
স্বর্ণ অশোক গাছের তলাটায় কি প্রশান্তি! মধুপিয়াসী কিছু মৌমাছির আনাগোনা আর কেমন যেন হালকা একটা মিষ্টি গন্ধে বিভোর হয়ে আছে গাছের তলাটা। ফুলের ঘ্রাণ শুঁকে তেমন কোনও সৌরভ পেলাম না বটে, তবে জানা গেল, রাতের বেলায় হালকা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসে ফুলগুলো থেকে। পৌষের দিনে ফুলের ফোটা শুরু, ফুটতে থাকে মাঘমাস জুড়ে। এরপর ফুল থেকে ফলে লালচে ফল। এ দুমাসে স্বর্ণ অশোকের এমন প্রস্ফুরণ শোভা সত্যিই অতুলনীয়। এক শীতের দুপুরে বলধা উদ্যানের সাইকি অংশে এই সৌন্দর্য উপভোগের সুযোগ পেয়েছিলাম। ওখানেই দেখা মিলেছিল স্বর্ণ অশোক, রাজ অশোক আর কাউলি অশোক নামের তিন অশোক গাছের।

স্বর্ণ অশোক একটি বহুবর্ষী বৃক্ষ প্রকৃতির গাছ। গাছ ৭ থেকে ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হয়। গাছের কাণ্ড প্রায় মসৃণ, কালচে। পাতা যৌগিক, একটি ডাটির দুপাশে বিপরীতমুখীভাবে আট জোড়া পাতা সুন্দরভাবে সাজানো থাকে। পাতাগুলো মাটির দিকে নতমুখ করে ঝুলতে থাকে। কচি পাতার রঙ তামাটে লাল, বয়স্ক পাতার রঙ সবুজ। অন্যান্য অশোকের চেয়ে স্বর্ণ অশোকের পাতা কিছুটা বড়। অসংখ্য ফুল থোকা ধরে ফোটে। ফুল ছোট, চার পাঁপড়ির ক্রুশ আকারে ছড়ানো, সোনালী হলুদ, পরিপূর্ণভাবে ফোটা ফুলের কেন্দ্রে লাল ছোট্ট ফোঁটার মতো থাকে। ফুল ফোটার শুরুতে একই থোকায় কুঁড়ি ও ফুল একসাথে থাকে, পরে সব কুঁড়ি ফুটে ফুলগুলো খোপার মতো থোকা তৈরি করে। মৌমাছিরা ফুলের পরাগায়ণ ঘটায়। ফুল থেকে চ্যাপ্টা শিমের মতো ফল হয়। পাকলে ফল আপনা আপনি ফেটে যায় ও ভেতর থেকে কালো শক্ত বীজ মাটিতে ঝরে পড়ে। বীজ থেকে চারা হয়। ডালে গুটি কলম করেও চারা তৈরি করা যায়।
খাসিয়ারা এ ফুলকে বলে ‘তোই সুনাই’। স্বর্ণ অশোক গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম সারাকা থাইপিংগেনসিস (Saraca thaipingensis) ও গোত্র ফ্যাবেসী। এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামেরও একটা রহস্য আছে। মালয়েশিয়ার একটি শহর তাইপিং। সেখানে এ গাছের প্রথম বিবরণ তৈরি করা হয়। তাই সে শহরের নামকে স্মরণীয় করে রাখতে এর প্রজাতিগত নামে যুক্ত করা হয়েছে থাইপিংগেনসিস শব্দটি। ইন্দোনেশিয়ার জাভা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, মিয়ানমার প্রভৃতি দেশে স্বর্ণ অশোক গাছ আছে। এদেশে স্বর্ণ অশোক গাছ খুব একটা চোখে পড়ে না। বিভিন্ন পার্ক ও বড় রাস্তার দুপাশে শোভাবর্ধক পথতরু হিসেবে স্বর্ণ অশোক লাগানো যায়।

বেল
বেলের কথা উঠলেই প্রশ্ন আসে, কোন বেল খাওয়া ভালো— কাঁচা না পাকা? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা চলছে বহুকাল থেকে। সব ফলই পাকলে তার পরিপূর্ণ আস্বাদ ও গুণের পরিচয় পাওয়া যায়। তাহলে বেল নিয়ে এত কথা কেন? বেলও তো পাকলে আমরা তার স্বাদ আস্বাদন করে তৃপ্ত হই। তর্কটা এজন্য যে, আমাদের অনেকেরই বদ্ধমূল ধারণা যে পাকা বেল দেহের জন্য খুব উপকারী। আসলে উল্টো। দেহের জন্য উপকারী কাঁচা বেল, বরং পাকা বেল পেটে দাস্ত ডেকে আনে। বেলের শরবত খেয়ে মন খুশি হতে পারে, পেট নয়। পাকা বেল দীর্ঘদিন খেলে অন্ত্রে সূক্ষ্ম ছিদ্রপথ তৈরি হতে পারে— তবে, কাঁচা বেল সেই ছিদ্রপথ বন্ধ করে দেয়। ভেষজ চিকিৎসায় যে বেলের আসন উঁচুস্থানে রয়েছে সে কেবল কাঁচা বেলের জন্য, পাকা বেলের নয়। বাজারে আয়ুর্বেদিক ওষুধের দোকানে, বানিয়াতি দোকানে বিক্রি হয় কাঁচা বেলের শুঁঠ। বেল থেকে যেসব আয়ুর্বেদিক ওষুধ তৈরি করা হয় তা পাকা বেল থেকে নয়— কাঁচা বেল বা বেলগাছের শিকড় থেকে। বেলগাছের পাতাও ঔষধার্থে ব্যবহার করা হয়। ফলের খোসা কাঠের মতো শক্ত বলে ইংরেজিতে বেলকে বলে উড আপেল। বাংলায় এ ফলটির এত কদর দেখে বিদেশিরাও বেলকে ডাকত ‘বেঙ্গল কুইন্স’ নামে। বাংলা, হিন্দি, উর্দু, মারাঠী ভাষাতেও এর নাম বেল।

বেলের জন্ম ভারতবর্ষে। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রায় ৫০০০ বছর পূর্ব থেকে বেলের চাষ হয়ে আসছে। ভারতের ইস্টার্ন ঘাট ও মধ্যপ্রদেশ বেলের জন্মস্থান বলে ধারণা করা হয়। সেখান থেকে বেল ধীরে ধীরে হিমালয় অঞ্চল ও পশ্চিমে পশ্চিমবঙ্গ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সেখান থেকে এসেছে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশে। মিয়ানমার ও শ্রীলংকায়ও অনেক বেলগাছ দেখা যায়।
বেল গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম অ্যাগেল মারমেলোস (Aegle marmelos) ও গোত্র রুটেসী। বেল গাছ বড় ধরনের বৃক্ষ। উচ্চতায় প্রায় ১০-১৬ মিটার। শীতে সব পাতা ঝরে যায়, বসন্তে নতুন পাতা আসে। পাতা ত্রিপত্র যুক্ত, সবুজ, ডিম্বাকার, পত্রফলকের অগ্রভাগ সূঁচালো। ফুল হালকা সবুজ থেকে সাদা রঙের। বোঁটা ছোট, ৪-৫টি পাঁপড়ি থাকে, পুংকেশর অসংখ্য, গর্ভাশয় বিস্তৃত ও কেন্দ্রস্থল খোলা। ফুলে মিষ্টি গন্ধ আছে। ফল বড়, গোলাকার, শক্ত খোসাবিশিষ্ট। ফলের ভিতরে শাঁস ৮ থেকে ১৫টি কোয়া বা খণ্ডে বিভক্ত থাকে, প্রতিটি ভাগে বা খণ্ডে চটচটে আঠার সাথে অনেক বীজ লেগে থাকে। কাঁচা ফলের রঙ সবুজ, পাকলে হলদে হয়ে যায়। ভিতরের শাঁসের রঙ হয়ে যায় হলুদ বা কমলা। পাকা বেল থেকে সুগন্ধ বের হয়। পাকলে বেল গাছ থেকে ঝরে পড়ে। গাছ যখন ছোট থাকে তখন তাতে অনেক শক্ত ও তীক্ষ্ণ কাঁটা থাকে। গাছ বড় হলে কাঁটা কমে যায়।
ঢাকা শহরে বেল গাছ দুর্লভ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলা ভবনের সামনে সীমানা প্রাচীরের কোলে আছে বেলগাছ, গুলিস্তানের কাছে শহীদ মতিউর পার্কের মধ্যে পুকুর ঘাটের কাছে রয়েছে বড় বেলগাছ। তবে সবচেয়ে সম্মানের সাথে একটি বড় বেলগাছ পাকা বেদীতে সমাসীন রয়েছে রামকৃষ্ণ মিশন মন্দিরের পূবপাশে ও সামনে।
কাজুবাদাম
কাজুবাদাম বিদেশি গাছ হওয়ায় এ দেশে আগে কাজুবাদামের গাছ তেমন একটা দেখা যেত না। তবে পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় কি কারণে জানিনা বিক্ষিপ্তভাবে বেশ কিছু কাজুবাদামের বাগান গড়ে উঠেছে কয়েক দশক আগে। সাংগু নদী বেয়ে বান্দরবানের রুমা উপজেলার হাতিমাথাপাড়া গ্রামে ঢোকার পথেই চোখে পড়ে এরূপ একটি কাজুবাদামের বাগান। পাহাড়ের ঢালে অনেকটা জায়গা জুড়ে গ্রামবাসীরা এই বাগান করেছে। হাতিমাথা মারমা পাড়ার সবাই কৃষিজীবী। জুম চাষ তো আছেই, সেই সাথে আছে ফলের বাগান। ধান, আদা, হলুদ, তামাক, কলা ও কাজুবাদাম ওদের প্রধান ফসল। পাহাড়ের ঢালে ওদের আছে প্রায় দেড়শো একর কাজুবাদামের বাগান। দেখলাম, গাছগুলোতে থোকা ধরে ঝুলছে কাজুবাদামের ফল। যেন আপেল ধরে আছে। চমৎকার সে দৃশ্য। গ্রামের কার্বারি সাচি উ মারমা জানালেন, ‘‘এখানে বত্রিশ পরিবারেরই কাজুবাদামের বাগান আছে। গড়ে পরিবার প্রতি প্রায় ৫ একর করে কাজুবাদামের বাগান আছে। প্রায় ৩০ বছর আগে থেকে এ পাড়ায় কাজুবাদামের চাষ হচ্ছে।’’

এ দেশের পাহাড়ে প্রায় ২ লাখ হেক্টর জমিতে কাজুবাদাম চাষের সুযোগ রয়েছে যা করা হলে বছরে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকার কাজুবাদাম উৎপাদিত হতে পারে। তবে এর জন্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যবস্থা, বাজার সৃষ্টি, উদ্যোক্তা তৈরি, বীজ ও চারা উৎপাদন এবং কৃষকদের সক্ষমতা বাড়ানো দরকার। দেশে কাজুবাদাম চাষের জন্য সরকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে।
সব ফলের বীজ থাকে ফলের ভেতরে, আর কাজুবাদামের বীজ থাকে ফলের বাইরে। কিডনির মতো হালকা বাদামি রঙের একটা বীজ ফলের নিচে ঝুলতে থাকে। এই বীজকেই বলে ‘কেশুনাট’ বা ‘কাজুবাদাম’। ফলকে বলে ‘কেশুআপেল’। বীজ প্রক্রিয়াজাত করে বা ভেজে খাওয়া হয় আর পাকা ফল ফলের মতো খাওয়া যায়, পাকা ফল থেকে রস বের করে জ্বাল দিয়ে তৈরি করা যায় উৎকৃষ্ট মানে ‘কেশুহানি’ বা ‘কাজুমধু’। আফ্রিকায় এই মধু তৈরি করা হয়, এ দেশে তা করা হয় না।

কাজুবাদাম আর আম একই গোত্রের গাছ, গোত্র অ্যানাকার্ডিয়েসী ও উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম অ্যানাকার্ডিয়াম অক্সিডেন্টেল (Anacardium occidentale)। কাজুবাদামের উৎপত্তি দক্ষিণ আমেরিকার উত্তরাঞ্চল। পর্তুগীজ নাবিকেরা ১৫৬০ থেকে ১৫৬৫ সালের মধ্যে ভারতের গোয়ায় কাজুবাদাম নিয়ে আসে। সেখান থেকে ধীরে ধীরে কাজুবাদাম দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকা শহরে কাজুবাদামের গাছ তেমন দেখা যায় না। রমনা উদ্যানে পূব দিকের ‘অরুণোদয়’ তোরণ দিয়ে প্রবেশ করলে ডান দিকে রাস্তার কোলে দুটি কাজুবাদামের গাছ চোখে পড়ে। গাছ দুটিতে ফুল ফুটতে দেখেছি কয়েকবার, কিন্তু ফলের দেখা পাইনি।
পরশপিপুল
পরশপিপুল গাছের পাতার সাথে অশ্বত্থ গাছের পাতার বেশ মিল আছে, শুধু অশ্বত্থ গাছের মতো পাতার অগ্রভাগে লম্বা লেজটা নেই। অশ্বত্থের আর এক নাম পিপুল। হয়তো পাতার এরূপ সাদৃশ্যেও কারণে এ গাছের নাম রাখা হয়েছে ‘পরশপিপুল’। অন্যান্য নামগুলো হলো পোরেম, গোজাসিন্ধু, গাজাসিন্ধি, পরেশ, পরেশ-পিপুল, পাকড়, বন কাপাস, ডাম্বুলা ইত্যাদি। ইংরেজি নাম ‘ইন্ডিয়ান টিউলিপ ট্রি’ বা ‘প্যাসিফিক রোজউড’। উপকূলীয় অঞ্চলে সাধারণত জন্মে।

উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম থেসপেসিয়া পোপুলনিয়া (Thespesia populnea) ও গোত্র মালভেসী। পরশপিপুল একটি চিরসবুজ বৃক্ষ প্রকৃতির উদ্ভিদ। এই গাছ ২০ মিটার পর্যন্ত লম্বা। সারকাঠ গাঢ় বাদামী বা চকলেট রঙের। পাতা পান পাতার আকৃতির বা হৃৎপিণ্ডাকার, ডালের উপরে সর্পিলাকারে ঘনভাবে সজ্জিত থাকে। কচি পাতা সূক্ষ্ম পশমাবৃত, বয়স্ক পাতা পশমহীন। বয়স বাড়ার সাথে সাথে পাতার পশমগুলো ঝরে যায়। পাতার আগা সূঁচালো ও ৭-২৪ সেন্টিমিটার লম্বা। এককভাবে ফুল ফোটে, ফুল ঘন্টাকৃতি, হালকা হলুদ পাঁপড়ি, কেন্দ্রস্থ অংশ বেগুনী। ফুল দেখতে অনেকটা ঢেঁড়শ ফুলের মতো। বাসি ফুল লালচে। পাতার কোল থেকে ফুল ফোটে।
গ্রীষ্মকাল পরশপিপুল ফুল ফোটার সময় হলেও প্রায় সারা বছরই গাছে কিছু না কিছু ফুল ফোটে। ফুলের কুঁড়ি ও কচি ফলে এক ধরনের হলদে দুধের মতো রস থাকে, ধীরে ধীরে তা লাল হয়ে যায়। ডিম্বাশয়েও হলুদ কষ থাকে। ফল ডিম্বাকার বা গোলাকার, ২.৫-৪.৫ সেন্টিমিটার ব্যাস। গাছে থাকা অবস্থায় ফল ফাটে না। ফলের ভিতরে ৩-৪টি বীজ থাকে। বীজগুলো খাটো পশম দ্বারা আবৃত থাকে। বীজ থেকে চারা হয়। গাছ থেকে বীজ পড়ে পানিতে ভাসতে থাকে। এমনকি সাগরের লোনা পানিতেও বীজ এক বছর পর্যন্ত সজীব থাকতে পারে। এ গাছের বংশবৃদ্ধি প্রাকৃতিভাবেই ঘটে।

হাওয়াই দ্বীপে এর কাঠ বাটি তৈরির জন্য জনপ্রিয়। পলিনেশিয়ান সংস্কৃতিতে পরশপিপুল এক পবিত্র গাছ। বট ও ঝাউ গাছের সাথে একেও লাগানো হয় ধর্মীয় উপসনালয়ে। কাঠের ড্রাম ও ঢাক-ঢোলের খোল বানাতে এর কাঠ কাজে লাগে। এ গাছের ভেষজ গুণ আছে। ইন্দোনেশিয়ায় এর কচি পাতা সবজির সাথে রান্না করে খাওয়া হয়। দক্ষিণ ভারতে এর কাঠ দিয়ে ‘থাভিল’ বাদ্যযন্ত্র (ঢোলের মতো) বানানো হয়। উপকূলীয় শুষ্ক বনাঞ্চল পুনর্বনীকরণে পরশপিপুল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে, যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডা ও ব্রাজিলে পরশপিপুল এক আগ্রাসী আগাছা।
নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা তাঁর ‘শ্যামলী নিসর্গ’ বইয়ে ১৯৬৫ সালে ঢাকা শহরে স্টেডিয়ামের কাছে বঙ্গবন্ধু অ্যাভেনিউর যে পরশপিপুল গাছগুলোর উল্লেখ করেছিলেন সেগুলো এখন নেই। গাছগুলো স্বল্পায়ু হওয়ায় সম্ভবত ঢাকায় এসব গাছ রোপণের উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বর্তমানে সুপ্রিম কোর্টের কাছে স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রবেশ পথের ধারে একটি পরশপিপুল গাছের দেখা পাওয়া যায়। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও আছে পরশপিপুল গাছ।
দুর্লভ হিমঝুরি বা আকাশনিম
‘হিমঝুরি’ নামটা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া। তিনি শেষ সপ্তক কাব্যে এ নাম ব্যবহার করেছেন। রবীন্দ্রনাথের কথায়—‘‘শজনে গাছে লাগল ফুলের রেশ,
হিমঝুরির হৈমন্তী পালা হয়েছে নিঃশেষ।’’
প্রকৃতির কি অদ্ভুত খেলা! হিমঝুরির ফুল ফোটা শেষ হতেই শুরু হয় সজিনা ফুল ফোটার পালা। আর তা দেখেছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথও। দুটি ফুলেরই রং সাদা। কিন্তু হিমঝুরির মতো সজিনা ফুলের তীব্র ঘ্রাণ নেই। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কেন এ ফুলের নাম হিমঝুরি রাখলেন? হিম অথৃাৎ ঠাণ্ডার মধ্যে এ ফুল ফোটে, আর ফুলগুলোর লম্বা নলে ঝুলতে থাকা ফুলগুলো যেন ঝুরির মতো দেখায়। তাই এর বাংলা প্রেমময়ী নামটিকে প্রকৃতিরসিকরা গ্রহণ করেছেন। হিমঝুরির আর একটি নাম পাই কবি বিষ্ণু দে’র কবিতায়, সে কবিতায় হিমঝুরির নাম আকাশনিম—
‘‘তাই কৃষ্ণচুড়া, তাই জারুল গোলমোরে
অশোক বান্দরলাঠি পিয়াশাল বিজাশালে
হিজলে সোঁদালে
শিরীষে আকাশনীমে নানা বনস্পতি মহীরুহে
স্বদেশ আত্মার মূর্তি।’’

বিদেশিরা এ গাছকে চেনেন ‘ইন্ডিয়ান কর্ক ট্রি’ বা ‘ট্রি জেসমিন’ নামে। এর ফুল জুঁই-বেলি ফুলের মতো সুগন্ধি বলেই হয়ত একে জেসমিন বলা হয়, গাছটা বৃক্ষ প্রকৃতির, তাই ইংরেজি নাম রাখা হয়েছে ট্রি জেসমিন। এ গাছের উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম মিলিংটোনিয়া হর্টেনসিস (Milingtonia hortensis) ও গোত্র বিগ্নোনিয়েসী। ইংরেজ চিকিৎসক স্যার থমাস মিলিংটনের (১৬২৮-১৭০৩) নামের স্মারক হয়ে রয়েছে এর উদ্ভিদতাত্ত্বিক নামের প্রথম অংশে। কার্ল লিনিয়াসের পুত্র ক্যারোলাস লিনিয়াস দ্য ইয়ংগার (১৭৪১-১৭৮৩) মিলিংটোনিয়া মহাজাতির নামটি রাখেন। প্রজাতিগত নামের শেষাংশ হর্টেনসিস শব্দটির অর্থ উদ্যান-সম্পর্কীয়। ভারতের লক্ষেèৗতে মিলিংটোনিয়ার অ্যাভেনিউ নামে একটি সড়কের নামও রয়েছে। জানিনা হিমঝুরি গাছের সাথে সে সড়কের কোনও সম্বন্ধ আছে কি না।

হিমঝুরি বৃক্ষজাতীয় বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ গাছ, লম্বায় ১৮ থেকে ২৫ মিটার হয়। আশেপাশে ডালপালা প্রায় ৭-১১ মিটার ছড়ায়। গুঁড়ি সোজা, ছালের রং হলদে-সাদা, ঠিক শোলার মতো। গাছের মাথার দিকের ডালপালা কিছুটা ঝোলানো। হিমঝুরি গাছ দ্রুতবর্ধনশীল স্বভাবের, গাছ লাগানোর ৬ থেকে ৮ বছর পর গাছ পরিণত হয় ও ফুল ফোটা শুরু হয়। গাছ প্রায় ৪০ বছর বাঁচে। গাছের কাঠ ভঙ্গুর, ঝড়বাতাসে সহজে ভেঙ্গে পড়ে। ওয়ারীতে বলধা উদ্যানের উল্টোদিকে খ্রিস্টান কবরস্থানের হিমঝুরি গাছটি কয়েক বছর আগে এক কালবৈশাখী ঝরে ভেঙ্গে পড়েছিল, শেষে মরে নিশ্চিহ্ন হয়। কাঠের রং হলদে-সাদা।
শিউলির মতো এর ফুল রাতে ফোটে ও সকালে ঝরে পড়ে। ফুল উগ্র সুমিষ্ট ঘ্রাণযুক্ত। ফুলের বোঁটা থেকে পাঁপড়িগুলো যুক্ত হয়ে প্রায় তিন ইঞ্চি লম্বা হয়, ফুলের মুখের দিকে পাঁপড়িগুলো পাঁচটি খাঁজে বিভক্ত, ফুলের রং সাদা। নভেম্বর-ডিসেম্বরে ফুল ফোটে। ফুল শেষে ফল হয়। ফল পাকে মার্চে। ফল চ্যাপ্টা ও ছোট, দুই ভাগে বিভক্ত, বীজগুলো একটি স্বচ্ছ পাতলা ডানার আবরণে ঢাকা থাকে। পাখিরা এর ফল খায় ও তাদের দ্বারা দূরবর্তী স্থানে হিমঝুরির বিস্তার ঘটে। ফল পাকার পরপরই সেগুলো লাগাতে পারলে চারা হয়। তবে বীজের চেয়ে এর শাখাকলম করেই সাধারণত চারা তৈরি করা হয়।
হিমঝুরির পাতাগুলো দেখতে অনেকটা নিমপাতার মতো। এজন্য এ গাছের আর এক নাম আকাশনিম। এক সময় এ দেশের পল্লী অঞ্চলের লোকেরা এর পাতা দিয়ে তামাকের বিকল্প ও সস্তা সামগ্রী হিসেবে ব্যবহার করত, তা দিয়ে বিড়ি বা সিগারেট বানিয়ে প্রাচীনকালের গ্রামের মানুষেরা ধূমপান করত। তাতে মনে হয়, অতীতে এ গাছ গ্রামের বনেজঙ্গলে পাওয়া যেত। এখন দেখাই যায় না। সাধারণত উদ্যানে হিমঝুরি গাছ লাগানো হয়, ভঙ্গুর স্বভাবের ডালপালা, তাই পথের ধারে লাগানো ঝুঁকিপূর্ণ। হিমঝুরি গাছের মাতৃভূমি মিয়ানমার বা বার্মা। প্রায় দুশো বছর আগে এ গাছ ভারতবর্ষে বা এ অঞ্চলে এসেছে।

ঢাকা শহরে আকাশনিম নিয়ে নিসর্গী দ্বিজেন শর্মা তাঁর ‘শ্যামলী নিসর্গ’ বইয়ে লিখেছেন: ‘‘আকাশনিম ঢাকায় দুষ্প্রাপ্য। বলধা বাগানের গাছটির উড়ুক্কু বীজরা আশপাশের পড়োজমিতে বংশবিস্তার ঘটালেও উন্নয়নের ধকলে কেউ আর টিকে নেই। রমনা পার্ক বা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও তেমন নেই, একটি কার্জন হলে আর দুটো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ভবন লাগোয়া গ্রন্থাগারের সামনে।’’
দ্বিজেন শর্মার উল্লিখিত বলধা উদ্যানের গাছটি এখন আর নেই। কার্জন হলে কোনও হিমঝুরি গাছ নেই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মিহির লাল সাহা জানালেন, মোকারম ভবনের সামনে ওই একটা গাছই এখন টিকে আছে! অবশ্য ধানমন্ডিতে ছায়ানটের প্রবেশ মুখে একটা বড় হিমঝুড়ি গাছের দেখা পেলাম। ছায়ানটের লাইসা আহমেদ লিসা আপা জানালেন, সেটি শান্তি নিকেতন থেকে এনে লাগানো হয়েছিল। তিনিও মোকারম ভবনের সামনে হিমঝুরি গাছটার কথা বললেন। অবশেষে ঢাকা শহরে একটি বয়স্ক হিমঝুরি গাছের দেখা পেলাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসী বিভাগের পাশে মোকারম ভবনের সামনে গেটের মুখে। নিরাপত্তা প্রহরী মো. সালাউদ্দিন আহমেদকে হিমঝুরি গাছটা কোথায় জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘‘এ নামের গাছ ওখানে আছে বলে জানা নেই। পরক্ষণেই বললেন, সাদা সাদা লম্বা লম্বা ফুল ফোটে, খুব সুগন্ধ, রাতে ফুল ফুটে ঝরে গাছের তলা ভরে থাকে— সেই গাছ?’’ সায় দিতেই তিনি গাছটা দেখিয়ে দিলেন। গার্ডরুমের পাশেই লম্বা ঢ্যাঙা সে গাছটি দাঁড়িয়ে রয়েছে।
মাঘ মাস— তাই হিমঝুরির ফুলের দেখা পেলাম না, ফুল ফোটা শেষ হয়ে গেছে পৌষেই। গাছটির দিকে তাকিয়ে মন খারাপ হয়ে গেল, মাত্র একটি বড় ডাল গাছটির মাথায় শোভা পাচ্ছে, অন্য ডালগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। গাছটির তলায় অবশ্য দু চারটি চারার দেখা মিলল। ফার্মেসী বিভাগের অধ্যাপক বন্ধু ড. সীতেশ চন্দ্র বাছাড়কে অনুরোধ করলে সে কয়েকটা চারা তোলার ব্যবস্থা করে দিল। পরিকল্পনা করলাম চারাগুলো লাগিয়ে রমনা উদ্যান ও বলধা উদ্যানের হিমঝুরির শূন্যতা পূরণ করব। ইচ্ছে আছে একটা করে চারা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভিদ উদ্যান ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় উদ্ভিদ উদ্যানে লাগাব। তাতে আশা করি হিমঝুরির বিপন্নতা কিছুটা হলেও ঘুচবে।
সরল প্রকৃতিলগ্ন জীবনেই সুখ
সহজ-সরল প্রকৃতিলগ্ন জীবন যাপনের যে সুখ, সে সুখের আস্বাদ পেয়েছিলেন আমেরিকান লেখক হেনরি ডেভিড থোরু। তাঁর এই বোধের কথাগুলো মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম একদিন পাখিবিশারদ ইনাম আল হক ভাইয়ের বাসায় বসে বইয়ের আড্ডায়। প্রায় প্রতি মাসেই তাঁর বাসায় এ ধরনের আড্ডার আয়োজন করা হয়। তিনি চমৎকারভাবে হেনরি ডেভিড থোরুর ‘ওয়ালডেন’ বইটি নিয়ে কিছু কথা বলছিলেন। ‘ওয়ালডেন’ বইটি ১৮৫৪ সালে প্রকাশিত হয়। এ বইটি থোরুকে পরবর্তীকালে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয়। তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৮১৭ সালে, তিনি যখন বইটি লেখেন তখন তার বয়স মাত্র ২৮ বছর। সে সময়ই তিনি হার্ভার্ড থেকে গ্রাজুয়েট হয়েছেন যা সে সময়ে ছিল অনেক বড় একটা ব্যাপার। সেই অল্প বয়সেই তাঁর লেখায় জীবন ও প্রকৃতি সম্বন্ধে যে গভীর উপলব্ধির কথা সেদিন শুনেছিলাম, তা বিস্ময়কর।
এই বই কেন লিখেছেন সে সম্পর্কে বলতে গিয়ে লেখক বলেছেন, ‘‘যারা অতৃপ্ত, অসুখী ও জীবন বড় কঠিন বলে অভিযোগ করেন আমি তাঁদের জন্য কিছু কথা বলব। আমার কথা তাঁদের জন্য যাঁরা বাহ্যিকভাবে ধনী কিন্তু অন্তরে চরম দরিদ্র। মানুষ প্রতিযোগিতা করে একে অন্যের উপরে উঠতে যেয়ে, অবস্থা ভালো করতে যেয়ে এমন সব কাণ্ড করেছে যে তাতে জীবন ক্রমাগত বয়ে যাচ্ছে কিন্তু সুখের হচ্ছে না। আমি কোনও হতাশার কাহিনী লিখতে যাচ্ছি না। বরং দরোজার কাছে এসে মোরগের মতো হাঁক ছেড়ে বড়াই করে বলছি যদি পৃথিবীর প্রতিবেশির ঘুমটা যদি ভাঙ্গে।’’
জীবনের মানেটা কি? আমি কেন বেঁচে আছি? অথবা আমি কার জন্য, কিসের জন্য বাঁচব? এ প্রশ্নগুলো কখনও কেউ নিজের কাছে করেছেন? যদি করে থাকেন তাহলে কী উত্তর পেয়েছেন? থোরুর কথায়, যারা সম্পদ জমা করেছেন বা তা থেকে কী করে মুক্তি পাবেন তা জানেন না। জানেন না বলেই ওগুলো দিয়ে সোনার বেড়ি বানিয়ে তা গলায় পড়েছেন। এই সোনার বেড়ি বা শিকল থেকে মুক্তির পথ কি? যদি আপনি খোঁজ নিতে পারেন, দেখতে পাবেন পৃথিবীর সেরা ১০০ জন পণ্ডিত ব্যক্তির মধ্যে প্রায় ৯০ জনই বেঁচেছেন স্বেচ্ছায় সবচেয়ে গরিব লোকের চেয়ে কম সম্পদ ভোগ করে। জীবনের তথাকথিত আরাম আয়েস ছাড়াও যে জীবন চলে শুধু তাই নয় বরং ওগুলো উন্নত জীবনের পথে শক্তিশালী প্রতিবন্ধক হয়ে ওঠে। অর্থাৎ সুখী জীবনের সূত্র হলো ন্যূনতম চাহিদার স্তরে নিজেকে নামিয়ে নেওয়া।
থোরু এরূপ জীবন যাপনের জন্য দু’বছর দু’মাস একটা ঘর বেঁধে বনে বাস করে যে উত্তর খুঁজে পেয়েছিলেন, সে বইয়ের এক জায়গায় তিনি তা লিখেছেন: ‘‘I wanted to live deliberately, আমি বনে বাস করছি কেননা আমি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে বাঁচতে চেয়েছি। আমি মুখোমুখি হতে চেয়েছি শুধুমাত্র জীবনের অপরিহার্য সত্যের। ঐ সত্যগুলো যা শেখাতে চায় তা আমি আত্মস্থ করতে চেয়েছি।’’ তিনি অন্তর দিয়ে বুঝেছিলেন, বলেছিলেন, ‘‘Every morning was a cheerful invitation to make my life of equal simplicity, and I may say innocence, with Nature herself ’’। তাঁর অন্য একটি বইয়ে গাছ থেকে মাটিতে শীতের ঝরাপাতা পড়ে থাকতে দেখে তিনি লিখেছেন, ‘‘ঝরাপাতা দেখে বুঝতে পারি কত আদরে আলিঙ্গন করা যায় মৃত্যুকে। জীবন অনন্তকাল ধরে চলবে এই দাম্ভিক বিশ্বাস ধারণ করে যে মানুষ সে কি কোনোদিন এমন পরিপক্ব ও প্রশান্ত বদলে যাবে এমন শেষ শয্যায়?’’ এমনভাবে বাঁচার চেষ্টা করুন যাতে শেষ শয্যায় যাওয়ার আগে আপনার কখনও মনে না হয় যে, আমি তো বাঁচি নাই।
দীর্ঘ বারোটি পর্বে ঢাকা শহরের বৃক্ষরাজি নিয়ে লেখার শেষপ্রান্তে এসে আমার মনের মধ্যেও আজ এমন এক অনুভূতি হচ্ছে। বলতে ইচ্ছে করছে, কুকাজ-সুকাজ যাই-ই করি না কেন তার ফল তো পেতেই হবে। অতীত ও ভবিষ্যত তো এসব কাজেরই প্রতিফলন। অতীতকে মোছা যায় না, ভবিষ্যতকেও নির্মাণ করা যায় না— বর্তমানটাই ধ্রুবসত্য। এক্ষুণি যা করছি, পরক্ষণেই তা অতীত হয়ে যাচ্ছে। আর তার ফলাফল হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ। ঢাকা শহরের যেসব গাছ আমরা হারিয়ে ফেলেছি ও ফেলছি, সেগুলোর কথা ভেবে আজ এক্ষুণি কিছু কাজ করতে হবে, কাল করব বলে ফেলে রাখলে চলবে না। যদি আমার এ লেখায় ঢাকা শহরের একটি বৃক্ষও রক্ষা পায়, একজন মানুষও যদি প্রকৃতি রক্ষায় উদ্বুদ্ধ হয়— তাহলে সেটাই হবে লেখার সার্থকতা।
লেখক: কৃষিবিদ ও প্রকৃতিবিষয়ক লেখক।
ইমেইল: kbdmrityun@gmail.com


