১৭ দিন পর শনিবার পুরোপুরি চালু হয়েছে রাজধানীর আগারগাঁওয়ের জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল। জুলাই আন্দোলনে আহতদের সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সংঘর্ষের জেরে গত ২৮ মে বন্ধ হয়ে যায় দেশের একমাত্র সরকারি বিশেষায়িত এই চক্ষু হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা। শুধু জুলাই আন্দোলনে আহতরাই থেকে যায় হাসপাতালে।
ওই সংঘর্ষ ও আহতদের দাবি-দাওয়া নিয়ে দফায় দফায় স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে বৈঠকের পর গত ৪ জুন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সীমিত পরিসরে সেবা চালু হয়। গত ১২ জুন বৃহস্পতিবার সীমিত পরিসরে চালু হয় বর্হিবিভাগের সেবাও। শনিবার সকালে সেখানকার সেবাও পুরোপুরি চালু হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, শনিবার সকাল থেকে রুটিন মাফিক রোগী ভর্তি, বর্হিবিভাগের টিকিট কেটে সেবাদান শুরু হয়েছে। যেসব রোগীর অস্ত্রোপচারের দরকার, তাদেরকে বেড দেওয়া হয়েছে এবং অস্ত্রোপচার শুরু হবে আগামীকাল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা শনিবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “প্রধান দুইটা গেইটের একটা বন্ধ ছিল আজ। গেইটের সামনে র্যার, পুলিশ, আনসারসহ আমাদের নিজস্ব নিরাপত্তাকর্মীরা ছিলেন। এর পাশের পকেট গেইট দিয়ে রোগীরা ঢুকেছেন।”
জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ডা. জানে আলম সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “সব সেবা চালু হয়েছে; আজ থেকে কোনও সেবা বন্ধ নেই। আমরা চেষ্টা করছি; বাকিটা দেখা যাক।”
তিনি জানান, এ হাসপাতালে ৫৪ জন ছিল জুলাই আন্দোলনে আহত হয়ে। তাদের মধ্যে ৫০ জন ছাড়পত্র না নিয়েই চলে গেছে। তারা যেহেতু হাসপাতালের নিয়ম মেনে ছাড়পত্র নেয়নি তাই তাদের অনুপস্থিত বিবেচনা করা হবে।
“বাকি থাকে চারজন, তাদের মধ্যে তিনজনের ডিসচার্জ রেডি করে রাখা হয়েছে। তারা অন্য সবার মতোই ফলোআপে আসবেন। একজন আছে ছুটি দেওয়ার মতো অবস্থায় নেই। তবে আরেকজন ভর্তি না থেকেই হাসপাতালে রয়েছেন,” বলেন হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক জানে আলম।
নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে এক কর্মকর্তা সকাল সন্ধ্যাকে জানান, শনিবার প্রায় দেড় হাজার মানুষ বর্হিবিভাগের টিকিট কেটে সেবা নিয়েছে। ভর্তিও হয়েছে রোগীরা। যেসব বেড এতদিনে দখলে ছিল সেগুলো ফাঁকা হওয়ায় রোগীদের বেড দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “অনেক রোগী জমে গেছে। আমরা চেষ্টা করছি, সবাইকে চিকিৎসা দেওয়ার। আগামীকাল শুরু হবে অস্ত্রোপচার।
জুলাই আন্দোলনে আহতদের অনেকে শনিবার সকাল থেকে হাসপাতালের বাইরে অবস্থান নিয়েছিল জানিয়ে ওই কর্মকর্তা বলেন, “এজন্য চিকিৎসকসহ অন্যদের ভেতরে একটু নিরাপত্তাহীনতাও কাজ করছে।”
হাসপাতালে চিকিৎসাধীন জুলাই আন্দোলনে আহতদের সঙ্গে গত ২৮ মে চিকিৎসক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। এক পর্যায়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিলেও বন্ধ হয়ে যায় চিকিৎসাসেবা। বেশিরভাগ ভর্তি রোগীই হাসপাতাল ছেড়ে চলে যায়; থাকে শুধু জুলাই আন্দোলনে আহতরা।
দফায় দফায় এই সংঘর্ষ ও আহতদের দাবি-দাওয়া নিয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে বৈঠকের পর গত ৪ জুন হাসপাতালের জরুরি বিভাগে সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়া শুরু হয়। গত ১২ জুন বৃহস্পতিবার সীমিত পরিসরে চালু হয় বর্হিবিভাগের সেবাও।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন চিকিৎসক সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আহতরা সব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জিম্মি করেছিল। বেশিরভাগ কেবিন দখল করে রেখেছিল। তাদের কথাই ছিল বিদেশি চিকিৎসক আনতে হবে অথবা তাদেরকে বিদেশে চিকিৎসা নিতে হবে।
“অথচ পুরো আন্দোলনের সময় থেকে আমরা তাদের চিকিৎসা করেছি আন্তরিকতা নিয়ে, আন্দোলনের সময়ে ছুটি না নিয়ে টানা হাসপাতালে থেকে কাজ করেছেন- এমন চিকিৎসক-নার্স কর্মচারীদের সংখ্যাও কম নয়। অথচ তারা হাসপাতালে কী করছিল সেটা আমাদের কাছে চরম বিস্ময়। জুলাইকে তারা পুঁজি করছিল। নার্সদের হেনস্তা, কর্মচারীদের মারধর; কী করেনি তারা। ভাবতেও অবাক লাগে এখন।”
চক্ষুবিজ্ঞান হাসপাতালের অবস্থা এতোই জটিল হয়ে ওঠে যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তিতে দিয়ে দুঃখ প্রকাশ করে।
গত ৩১ মে মে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানায়, হাসপাতালের চিকিৎসকসহ অন্যরা গত ২৯ মে বৃহস্পতিবার থেকে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। কারণ হাসপাতালের ভেতরে তারা আক্রান্ত হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই এই হাসপাতালের চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চিকিৎসা দিয়ে আসছেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক এই ঘটনার প্রেক্ষিতে সকল সেবাদানকরীরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বিধায় গত ২৯ মে থেকে হাসপাতালে সেবাদান বন্ধ হয়ে যায়। আর এ পরিস্থিতিতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অধিকাংশ রোগী হাসপাতাল ছেড়েছেন, শুধুমাত্র জুলাই যোদ্ধারাই বর্তমানে হাসপাতালে রয়েছেন। আমরা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সেবাবঞ্চিত সকল রোগীদের কাছে দুঃখ প্রকাশ করছি।”
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই কর্মকর্তা সকাল সন্ধ্যাকে আরও বলেন, “ঈদের ছুটি শেষ হওয়ার পর আজ কয়েকজন আহত এসেছিলেন হাসপাতালে। কিন্তু তাদের ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি।”


