কুমিল্লার মুরাদনগরে এক হিন্দু নারীকে ধর্ষণের অভিযোগে গ্রেপ্তার ফজর আলীর রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে চলছে বিতর্ক।
কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ফজরকে বিএনপি সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা হয়েছে। তার প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপি বলছে, ওই ব্যক্তি যুক্ত ছিলেন আওয়ামী লীগে।
মুরাদনগরের বাসিন্দা অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াও তার এলাকায় এই ঘটনার জন্য আওয়ামী লীগকেই দায়ী করেছেন।
গত বৃহস্পতিবার রাতে মুরাদনগরে ওই নারীকে ঘরে ঢুকে ধর্ষণের অভিযোগে স্থানীয়রা আটক করে। তখনকার একটি ভিডিও ফেইসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষোভ-বিক্ষোভ দেখা দেয়।
প্রোষিতভর্তৃকা ওই নারী (২৫) মামলা করার পর রবিবার কুমিল্লার পুলিশ সুপার এক বিজ্ঞপ্তিতে আসামি ফজর আলীকে (৩৬) গ্রেপ্তারের কথা জানায়। সেই সঙ্গে ভিডিও ফেইসবুকে ছড়ানোর অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয় আরও চারজনকে।
এই ধর্ষণের খবর প্রকাশের পরপরই কালের কণ্ঠসহ কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে ফজর আলীকে স্থানীয় বিএনপির নেতা হিসাবে দেখানো হয়।
সমাজবজ্ঞিানী ও নারী অধিকারকর্মীরা ধর্ষণকে শুধু লৈঙ্গিক আধিপত্যই নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক আধিপত্যের প্রকাশ হিসাবেও দেখেন।
কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে বলা হয়, ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ফজর আলী বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে সুসম্পর্ক তৈরি করে নিজেকে বিএনপি নেতা দাবি করে আসছিলেন।
কালের কণ্ঠ পরে ইন্টারনেট সংস্করণ থেকে প্রতিবেদনটি সরিয়ে নিলেও প্রতিবেশী দেশ ভারতের বিভিন্ন সংবাদপত্রে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকে উদ্ধৃত করে ফজর আলীকে বিএনপি নেতা হিসাবেই তুলে ধরছে।
কলকাতা থেকে প্রকাশিত এপিবি আনন্দ ফজর আলীকে বিএনপি নেতা হিসাবে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ইউটিউবার ও অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্যের একটি স্ট্যাটাসও তুলে ধরেছে।
তাতে বলা হয়েছে, “ফজর আলী আগে আওয়ামী লীগ করত, সেটি নিয়ে কারও মধ্যে দ্বিমত নেই। তবে ৫ আগস্টের পর সে কাদের ইশারায় কাদের ব্যাক আপে এলাকায় আছে, সেটি জানা তো আহামরি কঠিন কিছু না৷ ব্যাকআপ না থাকলে তো সে লীগ হিসেবেই এক প্রকার দৌড়ের উপর থাকত।”
এসব আলোচনার মধ্যে বিএনপির মিডিয়া সেল রবিবার এক ফেইসবুক পোস্ট দিয়েছে, যার শিরোনাম- ‘মুরাদনগরে হিন্দু নারীকে ধর্ষণে অভিযুক্ত আ. লীগ নেতাকে বিএনপি বানিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচার!’
তাতে বলা হয়েছে, ফজর আলী দীর্ঘদিন ধরেই স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তিনি ১১নং রামচন্দ্রপুর দক্ষিণ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যানের ‘বডিগার্ড’ হিসাবেও পরিচিত।
“তবে ঘটনার পরপরই একটি ফেসবুকভিত্তিক মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম ফজর আলীকে বিএনপি নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে বিভ্রান্তিকর প্রচার শুরু হয়। মুরাদনগর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক মহিউদ্দিন অঞ্জন ও সদস্য সচিব মোল্লা মজিবুল হক এক যৌথ বিবৃতিতে তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারা বলেন— আওয়ামী লীগের মিডিয়া উইং বিএনপির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করতে বারবার এমন অপপ্রচার চালিয়ে আসছে।”
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও রবিবার এক সভায় বলেন, “মুরাদনগরে জঘন্য অপকর্ম করেছে আওয়ামী লীগের একজন নেতা। অথচ সেটা আমাদের দলের নামে চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।”
এদিকে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার এক ফেইসবুক পোস্টে বলেছেন, “মুরাদনগরে সকল আওয়ামী সন্ত্রাসীদের যারা আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছেন, পুনর্বাসন এবং ক্ষমতায়নের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের উপর অত্যাচার, নির্যাতন, চাঁদাবাজি, ধর্ষণের উদ্দেশ্যে ছেড়ে দিয়েছেন। আজকের পরিস্থিতির জন্য তারাই দায়ী।
“আজকে আমি লজ্জিত, আমার বলার ভাষা নেই। এলাকার লোকজন দেখা হলেই বলে গণ-অভ্যুত্থানে দেশ মুক্ত হয়েছে কিন্তু মুরাদনগর আরো বড় মাফিয়াদের দখলে গেছে। স্থানীয় প্রশাসন ধর্ষকদের গ্রেপ্তার চেষ্টা চালাচ্ছে। তবে মূল মাফিয়াদের লাগাম টেনে না ধরা গেলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।”
আওয়ামী লীগকে ক্ষমতা থেকে উৎখাতের অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক আসিফের বাড়ি মুরাদনগরের আকুবপুর ইউনিয়নের আকুবপুর গ্রামে।
অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানো আওয়ামী লীগের কার্যক্রম এরই মধ্যে নিষিদ্ধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। ফজর আলীকে নিয়ে দলটির কোনও প্রতিক্রিয়া কোথাও দেখা যায়নি।
পুলিশ ফজর আলীকে গ্রেপ্তারের কথা জানালেও তার রাজনৈতিক পরিচয়ের বিষয়ে কিছু বলেনি।



