Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

রসিকতার দাম দিতে হলো মন্ত্রিত্ব হারিয়ে

মন্ত্রীত্ব হারানো তাকু ইতো।
মন্ত্রীত্ব হারানো তাকু ইতো।
[publishpress_authors_box]

জাপানের কৃষিমন্ত্রী তাকু ইতো রসিকতা করেই বলেছিলেন, তাকে চাল কিনতে হয় না; তার সমর্থকরাই তার ঘরে বস্তা বস্তা চাল পাঠিয়ে দেয় উপহার হিসেবে।

তাকু ইতো ভেবেছিলেন, তার এই রসিকতা শুনে মানুষ হাসবে। কিন্তু ঘটেছে ঠিক তার উল্টো। জাপানিরা এই রসিকতা শুনে এতটাই ক্ষেপেছে যে, শেষ পর্যন্ত তাদের শান্ত করতে তাকে পদত্যাগ করতে হয়েছে।

বলা হচ্ছে, ইতিহাসে সম্ভবত তিনিই প্রথম ব্যক্তি যিনি রসিকতা করার কারণে মন্ত্রিত্ব হারিয়েছেন। হারাবেন নাই বা কেন?

জাপানিরা কয়েক দশকের মধ্যে এই প্রথম জীবনযাত্রার ব্যয় সঙ্কটে পড়েছে। আর এর প্রভাব পড়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য চালের ওপর।

এশিয়ার এই দেশটিতে গত এক বছরে চালের দাম দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। আমদানি করা চালের সরবরাহও কমেছে অনেক।

তাই এই খাদ্যপণ্য নিয়ে কৌতুক করা কৃষিমন্ত্রী তাকু ইতোর উচিৎ হয়নি। এটা তিনি পরে বুঝতে পেরে ক্ষমাও চেয়েছেন।

কিন্তু তাতে শেষরক্ষা হয়নি। পার্লামেন্টে তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব উত্থাপন করা হবে- বিরোধী দলগুলো এই হুমকি দেওয়ার পরপরই তিনি পদত্যাগ করেন।

তাকু ইতোর মন্ত্রী পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিগেরু ইশিবার সংখ্যালঘু সরকারকে নতুন করে বিপদে ফেলেছে। এমনিতেই জনসমর্থন ধরে রাখতে পারছে না এই সরকার।

জাপানে চাল একটি স্পর্শকাতর বিষয়। অতীতেও দেশটিতে চালের সঙ্কট রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণ হয়েছে।

১৯১৮ সালে সেখানে চালের দাম অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়াকে কেন্দ্র করে দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে, যার ফলে তৎকালীন সরকারের পতন পর্যন্ত হয়।

তাই এতে আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই যে, চালের মূল্যবৃদ্ধি ইশিবার জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে।

জাপানের ইয়োকোহামা শহরের বাসিন্দা ৩১ বছর বয়সী মেমোরি হিগুচি বিবিসিকে বলেন, “রাজনীতিকরা যেহেতু বাজার-সদাই করেন না, তাই তাদের পক্ষে পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়।”

সাত মাস আগে প্রথমবারের মতো মা হন হিগুচি। প্রসব পরবর্তী সময়ে সুস্থতার জন্য পুষ্টিকর খাবার তার জন্য অত্যন্ত জরুরি। তাছাড়া তার মেয়েও কিছুদিন পর শক্ত খাবার খাওয়া শুরু করবে।

তিনি বলেন, “আমি চাই, আমার মেয়ে যেন ভালোভাবে খেতে পারে। এখন যদি চালের দাম বাড়তেই থাকে, তাহলে হয়তো আমাকে আর আমার স্বামীকে ভাত খাওয়ার পরিমাণ কমিয়ে দিতে হবে।”

৭ মাস বয়সী সন্তানের সঙ্গে মেমোরি হিগুচি।

চালের দাম বাড়ল কেন

কোভিড মহামারির পর জাপানে পর্যটকদের সংখ্যা ও মানুষের বাইরে খাওয়ার অভ্যাস বেড়ে যাওয়ায় চালের চাহিদাও বেড়ে যায়। 

জাপানের ইবারাকি ইউনিভার্সিটির কৃষি অর্থনীতিবিদ কুনিয়ো নিশিকাওয়ার মতে, বিষয়টা খুবই সহজ- চাহিদা আর জোগানের হিসাব। কিন্তু এই হিসাবেই ভুল করেছে সরকার।        

১৯৯৫ সাল পর্যন্ত কৃষি সমবায়গুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে কৃষকদের চাল উৎপাদনের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করত জাপান সরকার। সে বছর এই সংক্রান্ত আইন বাতিল করা হয়।

তবে কৃষি মন্ত্রণালয় এখনও চাহিদার পূর্বাভাস প্রকাশ করে, যাতে কৃষকরা অতিরিক্ত চাল উৎপাদন এড়িয়ে চলতে পারেন।

কিন্তু ২০২৩ ও ২০২৪ সালে চালের চাহিদা আর জোগানের হিসাবে জাপানের কৃষি মন্ত্রণালয় ভুল করে বসে বলে জানান অধ্যাপক নিশিকাওয়া।

তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের অনুমান ছিল চালের চাহিদা হবে ৬ দশমিক ৮ মিলিয়ন টন। কিন্তু বাস্তবে চাহিদা ছিল ৭ দশমিক শূন্য ৫ মিলিয়ন টন। অন্যদিকে প্রকৃত উৎপাদন ছিল অনুমানের চেয়ে কম, মাত্র ৬ দশমিক ৬১ মিলিয়ন টন।

এই বিষয়ে জাপানের কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র বিবিসিকে বলেন, “চাল অন্যান্য খাবারের চেয়ে অপেক্ষাকৃত সস্তা। এছাড়া মহামারির পর বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যাও বেড়েছে। এমন আরও নানা কারণে চালের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।”

“আবার অন্য বাস্তবতার দিকেও নজর দেওয়া দরকার। তাপমাত্রা অত্যধিক বেড়ে যাওয়ায় চালের গুণগত মান খারাপ হয়েছে। এর ফলে উৎপাদনও কমেছে,” যোগ করেন তিনি।

জাপানে ৬০ কেজি ওজনের চাল উৎপাদনে ১৮ হাজার ৫০০ ইয়েন বা ১২৫ দশমিক ৭০ ডলার খরচ হয়।

চাল উৎপাদন আর লাভজনক নেই

জাপানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কৃষিকাজ করছেন কসুকে কাসাহারা। ৫৯ বছর বয়সী এই ব্যক্তির মতে, চাষিরা এখন আর আগের মতো ধান ফলিয়ে পর্যাপ্ত আয় করতে পারছে না।        

তিনি হিসাব তুলে ধরে বলেন, ৬০ কেজি ওজনের চাল উৎপাদনে আনুমানিক ১৮ হাজার ৫০০ ইয়েন বা ১২৫ দশমিক ৭০ ডলার খরচ হয়। কিন্তু গত বছর তার এলাকার কৃষক সমবায় সমিতি সেটি ১৯ হাজার ইয়েনে কেনার প্রস্তাব দেয়।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়ও বাড়ছে চালের দাম

চালের দাম দক্ষিণ পূর্ব এশিয়াতেও দ্রুত বাড়ছে, যেখানে বিশ্বব্যাপী মোট চাল উৎপাদনের প্রায় ৩০ শতাংশ হয়।

অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও জলবায়ুজনিত চাপের ফলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেখানে ঘাটতির সৃষ্টি হয়েছে।

তবে জাপানে পরিস্থিতি এতটাই গুরুতর হয়ে উঠেছে যে, দেশটি প্রথমবারের মতো দক্ষিণ কোরিয়া থেকে চাল আমদানি শুরু করেছে, যদিও ভোক্তারা দেশীয় জাতের চালই বেশি পছন্দ করেন।

চাল দিয়ে তৈরি জাপানিদের প্রধান খাদ্য সুশি।

প্রধানমন্ত্রী ইশিবা ইঙ্গিত দিয়েছেন, তার সরকার ওয়াশিংটনের সঙ্গে বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে চাল আমদানি বাড়ানোর বিষয়টিও বিবেচনা করছে।

তবে মেমোরি হিগুচির মতো অনেক ক্রেতাই জানান, তারা জাপানি নয় এমন চাল কেনার পক্ষপাতী নন।

তিনি বলেন, “আমরা বহু দিন ধরে বলছি, স্থানীয় উৎপাদন স্থানীয় ভোগের জন্য।

“জাপানি কৃষকরা যাতে লাভ করতে পারেন এবং ভোক্তারা যেন স্বস্তিতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত পণ্য কিনে খেতে পারেন-এমন একটা পথ অবশ্যই থাকা উচিৎ।”

তথ্যসূত্র : বিবিসি

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found