“আমরা সব সময় মজলুম। বলার কিছু নেই। বাদী হয়ে কোনও লাভ হয়নি। উল্টো হয়রানির শিকার হয়েছি। অগ্নিকাণ্ডের পর বিভিন্ন ব্যাংক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ৩০ কোটি টাকা দিয়েছিল। আজ দিবে, কাল দিবে করে আর দেয়নি। সেই ৩০ কোটি টাকার ৩০ পয়সাও পাইনি। সরকারও কিছু দেয়নি।”
সকাল সন্ধ্যার কাছে সম্প্রতি এভাবে ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করছিলেন পুরান ঢাকার চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নিহত স্থানীয় মো. জুম্মনের ছেলে মো. আসিফ আহমেদ, যিনি ওই ঘটনায় দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এনে চকবাজার মডেল থানায় মামলাটি করেছিলেন।
পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারির ভয়াবহ ওই অগ্নিকাণ্ডে জুম্মনসহ ৭১ জন নিহত হন, আহত হন অনেকে।
পুলিশের তিন বছরের তদন্তে জানা গেছে, চার তলা ভবন ওয়াহেদ ম্যানশন থেকে সেই আগুনের সূত্রপাত হয়েছিল। পরে তা ছড়িয়ে পড়লে ক্ষতিগ্রস্ত হয় আশপাশের পাঁচটি ভবন। প্রসাধনী সামগ্রীর ওই গুদামে থাকা দাহ্য পদার্থই ভবনটিকে অগ্নিকুণ্ড করে তুলেছিল।
এদিকে মামলার পর প্রায় ছয় বছর পার হতে চললেও শেষ হয়নি বিচার কাজ। কবে নাগাদ বিচার শেষ হতে পারে, তাও বলতে পারছেন না সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা।
বর্তমানে মামলাটি ঢাকার অষ্টম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ শিহাবুল ইসলামের আদালতে বিচারাধীন রয়েছে।
মামলাটি তদন্ত করে প্রায় তিন বছর পর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ওয়াহেদ ম্যানশনের মালিক দুই সহোদর হাসান ওরফে হাসান সুলতান, সোহেল ওরফে শহীদ ওরফে হোসেনসহ আট জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র জমা দেন তদন্ত কর্মকর্তা চকবাজার মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল কাইউম।
২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারি তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর আদেশ দেয় আদালত।
গত ১৩ ফেব্রুয়ারি মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণের দিন ছিল। সেদিন আসিফ উদ্দিন সিয়াম নামে এক ব্যক্তি সাক্ষ্য দেন। আগামী ১৩ এপ্রিল মামলার পরবর্তী তারিখ ধার্য করেছেন আদালত। এখন পর্যন্ত ১৬৭ সাক্ষীর মধ্যে ৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে।
প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ না পাওয়ার অভিযোগ করে মামলার বাদী আসিফ আহমেদ বলেন, “প্রতি বছর এদিন আসলেই মানুষজন খোঁজখবর নেয়। বাকি ৩৬৪ দিন আমরা কেমন আছি, কীভাবে চলছে- কেউ ঘুরেও দেখে না। কীভাবে আমাদের পরিবার চলছে, কারও কোনও মাথাব্যথা নেই। অগ্নিকাণ্ডে আমাদের সবকিছু শেষ হয়ে গেছে।”
তিনি বলেন, “বুয়েট পরীক্ষা নিরীক্ষা শেষে ওয়াহেদ ম্যানশন চালু না করার জন্য বলেছিল। কিন্তু সেই বিল্ডিং তো দাঁড়িয়ে গেছে। সাবেক মেয়র তাপস নিজে অনুমোদন দিয়ে ওই ভবন চালু করেছে। অথচ ৬ বছরেও ন্যায় বিচার পেলাম না। কিছু হলো না।”
তখনকার মেয়র সাঈদ খোকন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে চাকরি দেওয়ার আশ্বাস দিয়েছিলেন উল্লেখ করে আসিফ আহমেদ বলেন, “কত দিন সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত বসে ছিলাম। কাঙ্ক্ষিত চাকরি দিতে পারেননি। দিয়েছেন মাস্টার রোলে চাকরি। অনার্স, মাস্টার্স করা একজন স্টুডেন্ট মাস্টার রোল কাজ করতে পারে?”
“আমাদের ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর ৭৫ শতাংশের সবকিছু শেষ। একমাত্র উপার্জনক্ষমকে হারালে কী আর থাকে? যেমন আমার আব্বা মারা গেছেন। তিনিই ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম। তাকে হারিয়ে কী ক্রাইসিসের মধ্যে ছিলাম- আমরা জানি। তখনকার সংসদ সদস্য হাজী সেলিম ঢাকঢোল পিটিয় সাংবাদিক এনে সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দাঁড় করিয়ে ৫ হাজার টাকা দেন। এই হলো তাদের অবস্থা।”
আসিফ আহমেদ বলেন, “বর্তমান সরকারের প্রতি অনুরোধ, মামলার বিচারটা যেন সুষ্ঠু হয়। কিছুই তো হলো না। না পেলাম বাবাকে, না পেলাম বিচার। তবুও আশায় আছি সুষ্ঠু বিচারের। সরকার যেন আমাদের এই বিষয়টি একটু সহানুভূতির দৃষ্টিতে দেখেন। তা হলে আমরা একটু ভালো থাকতে পারতাম।”
ক্ষতিগ্রস্ত কাউকে কোনও অনুদান দেওয়া হয়নি অভিযোগ করে নিহত ওয়াশি উদ্দিনের বাবা নাসির উদ্দিন সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “বিভিন্ন ব্যাংক ৩০ কোটি টাকা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দিয়েছিল। কিন্তু কেউ পাইনি। সরকারও কিছু দেয়নি। ছয় বছর ধরে মানুষের দ্বারে দ্বারে হতাশা নিয়ে ঘুরেছি।”

মামলা সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) ওমর ফারুক ফারুকী বলেন, “মামলাটার বিচার দ্রুত শেষ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার রাজনৈতিক মামলা নিয়ে ব্যস্ত ছিল। এতে করে এসব মামলার বিচারে তাদের মনোযোগ ছিল না।
“ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় আমরা আন্তরিক। সাক্ষীদের দ্রুত আদালতে হাজিরের মাধ্যমে সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে। আশা করি খুব শিগগরিই বিচার শেষ হবে। ভিকটিমদের পরিবারও ন্যায় বিচার পাবেন।”
সংশ্লিষ্ট আদালতের অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর শহিদুল ইসলাম জানান, এ মামলায় ৪ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমি নতুন জয়েন করেছি। সব নথি দেখতে পারিনি। মামলাটা শেষ করা উচিত। যেহেতু দায়িত্ব পেয়েছি, সঠিকভাবে পালন করব। সাক্ষী হাজির করে মামলার বিচার দ্রুত শেষ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। যেন ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায় বিচার পায়।”
এই মামলায় সব আসামির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন এই প্রসিকিউটর। তিনি জানান, এ মামলায় যেসব ধারায় অভিযোগ করা হয়েছে তাতে সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।
তবে আসামিদের পক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, ওই ঘটনায় আসামিরাই ভুক্তভোগী। আসামিরা নিজেরাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
তাদের একজন আইনজীবী শেখ আবু সাঈদ বলেন, “এই ঘটনায় তারা কীভাবে অভিযুক্ত হয় আমার মাথায় আসে না। এখানে আসামিদের কোনও দোষ নেই। নিছক এটি একটি দুর্ঘটনা মাত্র। রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আরও আন্তরিক হলে মামলাটির বিচার দ্রুত শেষ হবে। বিচার দেরি হওয়ায় আসামিরাই আর্থিক, মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আশা করি, মামলার বিচার শেষ হলে, সব আসামিই ন্যায় বিচার পাবেন।”
মামলায় বলা হয়, ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০ টার দিকে চকবাজার মডেল থানাধীন চুড়িহাট্টা শাহী জামে মসজিদের সামনে রাস্তায় চলাচলরত একটি প্রাইভেটকারের গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়ে পাশের বিদ্যুতের ট্রান্সমিটারে আগুন লাগে। তৎক্ষণাৎ পাশে আরেকটি প্রাইভেটকারে আগুন লাগলে সেই গাড়ির গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়।
এসময় ওয়াহেদ ম্যানশনের সামনে একটি পিকআপ গ্যাস সিলিন্ডার ভর্তি অবস্থায় দাঁড়িয়ে ছিল। ওই পিকআপের সিলিন্ডারগুলো বিস্ফোরিত হয়ে ভবনের নিচতলা ও রাজমহল হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে আগুন লাগে।
আসিফ আহমেদ মামলায় এসব অভিযোগ এনে ওয়াহিদ ম্যানশনের মালিক দুই ভাই হাসান ও হোসেনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় ১০-১২ জনকে আসামি করেন।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, দুই ভাই হাসান ও হোসেন অবৈধ জেনেও আবাসিক ভবনে রাসায়নিকের গুদাম ভাড়া দিয়েছিলেন ‘পার্ল ইন্টারন্যাশনাল’কে। আর ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক-কর্মীরা জান-মালের ক্ষতি হতে পেরে জেনেও দাহ্য পদার্থের মজুত, সংমিশ্রণের কাজ করতেন। তাদের অবহেলার কারণেই এত মানুষের করুণ মৃত্যু ঘটেছে।
অভিযোগপত্রভুক্ত অন্য আসামিরা হলেন- রাসায়নিকের গুদাম পার্ল ইন্টারন্যাশনালের মালিক ইমতিয়াজ আহমেদ, পরিচালক মোজাম্মেল হক, ম্যানেজার মোজাফফর উদ্দিন এবং তিন কর্মী মোহাম্মদ জাওয়াদ আতির, মো. নাবিল ও মোহাম্মদ কাশিফ। তারা সবাই জামিনে রয়েছেন।



