১৯৯১ সালের নির্বাচনে সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৪০টি আসনে জিতেছিল বিএনপি। সবচেয়ে বেশি আসনে জয়ী দল হিসাবে সরকার গঠনের আমন্ত্রণ স্বাভাবিকভাবে তারাই পেয়েছিল। তবে সরকার গঠনে প্রয়োজন ছিল ১৫১ আসন। সে কারণে জামায়াতে ইসলামীর সমর্থন নিতে হয় বিএনপিকে। জামায়াত সেবার পেয়েছিল ১৮টি আসন।
ওই নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছিল ৩০ দশমিক ৮১ শতাংশ ভোট। দ্বিতীয় স্থানে থাকা আওয়ামী লীগ ৮৮ আসন পেলেও ভোট পেয়েছিল ৩০ দশমিক ০৮ শতাংশ। অর্থাৎ আসনের পার্থক্য ৫২ হলেও ভোটের হারের পার্থক্য ১ শতাংশেরও কম।
সেবার নৌকা প্রতীক নিয়ে ভোটে (আওয়ামী লীগের জোটসঙ্গী দলগুলোর প্রার্থী) জয়ীদের আসন সংখ্যা ছিল ১০০, ভোটের হার ছিল বিএনপির চেয়ে বেশি, ৩৪ দশমিক ২৯ শতাংশ।
ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট বা এফপিটিপি সিস্টেমে (প্রদত্ত ভোটের সর্বাধিক ভোট পাবেন যিনি, তিনি নির্বাচিত হবেন) বিএনপি সেবার সরকার গঠন করলেও যদি সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হতো, তাহলে দৃশ্যপট পাল্টে যেতেও পারত। তখন নৌকা প্রতীকে বিজয়ীদের ভোটের হার বেশি হওয়ায় আসন বেড়ে যেত, ফলে আওয়ামী লীগই সরকার গঠনের আমন্ত্রণ আগে পেত। তখন জাতীয় পার্টির (৩৫) সমর্থন পেলে তাদের সরকার গঠনে কোনও সমস্যাই হতো না।
অর্থাৎ একই ভোট, কিন্তু দুই পদ্ধতিতে ফলাফলে আসে ভিন্নতা এবং তা প্রভাব ফেলে সরকারে কে যাবে, তার ওপরও।
বাংলাদেশে শুরু থেকে এফপিটিপি পদ্ধতি চলে এলেও সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে (প্রপোশনাল রিপ্রেজেন্টেশন বা পিআর) নির্বাচনের আলোচনাটি তেমন জোরাল ছিল না। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের প্রেক্ষাপটে গঠিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নানা ক্ষেত্রে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়ার ফলে পিআর এখন বেশ আলোচিত।
‘রাষ্ট্র সংস্কার’র ঘোষণা দিয়ে আসা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কারে যে কমিশন গঠন করেছে, সেই কমিশনের প্রধান বদিউল আলম মজুমদারও সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির পক্ষে নানা সময়ে নিজের অবস্থান জানিয়ে এসেছেন।
সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি কী
এটি এমন একটি নির্বাচনী পদ্ধতি যেখানে ভোটের শতকরা হার অনুযায়ী কোনও দল কতজন প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করতে পারবে, তা নির্ধারিত হয়।
বিশ্বে এখনও ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট বা এফপিটিপি (যেখানে উইনার-টেক-অল) বেশি প্রচলিত হলেও উন্নত বিশ্বে পিআর পদ্ধতিই বেশি প্রচলিত।
১৮৯৯ সালে বেলজিয়াম এই পদ্ধতিটি প্রথম প্রবর্তন করে। এখন বিশ্বের ১০০টির বেশি দেশ কোনও না কোনও প্রকারের পিআর পদ্ধতি অনুসরণ করছে।
ইউরোপের ২১টি দেশে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি ব্যবহার নির্বাচন আয়োজন হয়ে থাকে। যার মধ্যে বেলজিয়াম ছাড়াও রয়েছে অস্ট্রিয়া, সাইপ্রাস, ডেনমার্ক, ফিনল্যান্ড, জার্মানি, গ্রিস, আয়ারল্যান্ড, লুক্সেমবুর্গ, মাল্টা, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পর্তুগাল, স্পেন, সুইডেন ও সুইজারল্যান্ড।
সংখ্যানুপাতিকে ভোট গণনা কীভাবে হয়
প্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচন পদ্ধতি এমন একটি নির্বাচনী ব্যবস্থা, যেখানে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর ভোটের শতাংশ অনুযায়ী তারা কতজন প্রতিনিধি নির্বাচিত করতে পারবে তা নির্ধারিত হয়।
যদি একটি দলের পক্ষে এক-তৃতীয়াংশ ভোটার ভোট দেয়, তবে সেই দলটি প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হবে। অর্থাৎ নির্বাচনে যে দল মোট প্রদত্ত ভোটের যত শতাংশ পাবে, সেই অনুপাতে সংসদে আসন লাভ করবে।
যেমন ৩০০ আসনের মধ্যে ‘ক’ দল মোট প্রদত্ত ভোটের ৫০ শতাংশ ভোট পেলে আসন পাবে ৫০×৩ =১৫০টি, ‘খ’ দল ৪০ শতাংশ ভোট পেলে আসন পাবে ৪০×৩ =১২০টি, ‘গ’ দল ৫ শতাংশ ভোট পেলে আসন পাবে ৫×৩ =১৫টি এবং ‘ঘ’ দলও ৫ শতাংশ ভোট পেলে আসন পাবে ৫×৩ =১৫টি। কোনও একটি দল শূন্য দশমিক ৩৪ শতাংশ ভোট পেলে তার আসন হবে ১টি।
কতভাবে ভোট হতে পারে সংখ্যানুপাতিকে
সংখ্যানুপাতিক নির্বাচন পদ্ধতির বিভিন্ন প্রকার রয়েছে। প্রতিটির নিজস্ব বিশেষত্ব থাকলেও সবগুলো পদ্ধতির সাধারণ ধারণা হলো যে আইনসভা গঠনের সামগ্রিক রূপ ভোটারের মধ্যে ভোটের বণ্টনকে প্রতিফলিত করে, ফলে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতামতের সঠিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করে।
সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি দেশের ওপর নির্ভর করে ভিন্ন হতে পারে এবং বেশ কিছু সাধারণ ধরনের পদ্ধতি রয়েছে।
তালিকাভিত্তিক পিআর পদ্ধতি
তালিকাভিত্তিক পিআর পদ্ধতির সবচেয়ে সাধারণ ধারণা। তালিকা ভিত্তিক বা লিস্ট পদ্ধতিকে আবার দুটি ভাগে ভাগ করা যায়। একটি হচ্ছে ওপেন লিস্ট বা উন্মুক্ত তালিকা। অন্যটি হচ্ছে ক্লোজড লিস্ট বা বন্ধ তালিকা। ওপেন তালিকায় ভোটাররা আগেই প্রার্থীদের নাম জেনে যায়। ক্লোজড লিস্টে ভোটাররা প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার আগে নাম জানতে পারে না। এসব তালিকা দলগুলো নির্বাচন কমিশনে জমা দেয়।
ওপেন লিস্টে ভোটাররা নির্দিষ্ট একটি দল বা প্রার্থী তালিকার সঙ্গে যুক্ত এবং যাদের মোট ভোটের সংখ্যা তাদের দলের বা প্রার্থী তালিকার ভোটের অংশ নির্ধারণ করতে ব্যবহৃত হয়। যদি দলটি তার মোট ভোটের অংশের ভিত্তিতে তিনটি আসন জেতে, তবে সেই দলের তিনজন প্রার্থী, যাদের সর্বাধিক ভোট পেয়েছেন, নির্বাচিত হবেন।
ক্লোজড লিস্টে ভোটাররা একটি দল বা প্রার্থী তালিকার পক্ষে ভোট দেয়। সেই অনুযায়ী তাদের প্রার্থীদের একটি তালিকা প্রকাশ করে। উদাহরণস্বরূপ, যদি দলটি তার মোট ভোটের অংশের ভিত্তিতে তিনটি আসন জেতে, তবে তালিকার প্রথম তিনজন প্রার্থী নির্বাচিত হবেন।
মিশ্র-আনুপাতিক পদ্ধতি
সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে মিশ্র আনুপাতিক পদ্ধতি একটি সংকর পদ্ধতি, যা অনুপাতিক প্রতিনিধিত্বকে সরাসরি ভোটের সঙ্গে মিশ্রিত করে। যেখানে নির্বাচিত গঠনের কিছু সদস্য একক বিজয়ী জেলা থেকে উইনার-টেক-অল পদ্ধতিতে নির্বাচিত হন এবং অন্যরা তালিকা পদ্ধতি ব্যবহার করে অনুপাতিকভাবে নির্বাচিত হন।
একক স্থানান্তরযোগ্য ভোট: এই পদ্ধতিতে ভোটাররা প্রার্থীদের র্যাংক করে এবং ভোট পুনর্বণ্টনের মাধ্যমে প্রার্থীরা নির্বাচিত হন। র্যাংকড চয়েস ভোটিং (প্রতিনিধিত্বমূলক আরসিভি) একক স্থানান্তরযোগ্য ভোট” নামেও পরিচিত।
সংখ্যানুপাতিকে অষ্টম সংসদ নির্বাচনের ফল কেমন হতো
২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসনে জিতে সরকার গঠন করেছিল। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৬২টি আসন।
প্রচলিত পদ্ধতিতে বিএনপি পেয়েছিল ৬৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ আসন। আওয়ামী লীগের আসনের হার ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ।
সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব এবং ২০০৭ সালের স্বল্প মেয়াদী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আকবর আলি খান তার লেখা ‘অবাক বাংলাদেশ, বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি’ বইয়ে লিখেছেন, সেবার ভোটের হার ছিল ৭৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ। প্রদত্ত ভোটের ৪১ দশমিক ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল বিএনপি। আওয়ামী লীগ পেয়েছিল ৪০ দশমিক ২ শতাংশ। জাতীয় পার্টি পেয়েছিল ৭ দশমিক ২২ শতাংশ। জামায়াতে ইসলামী ৪ দশমিক ২৮ শতাংশ ভোট পায়।
এই ভোটের ফলাফল যদি সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি নির্ধারণ হতো, তাহলে বিএনপি পেত ১২৪ আসন। আওয়ামী লীগ পেত ১২০ আসন। অর্থাৎ বিএনপির ৬৯টি আসন কমে গিয়ে আওয়ামী লীগের ৫৮টি আসন বেড়ে যেত।
জাতীয় পার্টির আসন ১৪টি থেকে বেড়ে দাঁড়াত ২১। জামায়াতে ইসলামী ১৭টি আসন পেলেও তাদের আসন কমে দাঁড়াত ১২টিতে।
আকবর আলি খান তার বইয়ে ভিন্ন আরেকটি ফর্মূলা দিয়েছেন, যা দ্বিকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্টের।
সেটি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রচলিত পদ্ধতিতে আওয়ামী লীগ ২০ দশমিক ৬৭ শতাংশ বা ৬২টি আসন পেলেও ৫০ শতাংশ আনুপাতিক হার এবং ৫০ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ফলাফল হলে আওয়ামী লীগ পেত ৩০ দশমিক ৩৪৫ শতাংশ বা ৯১টি আসন।।
অন্যদিকে সেবারের ভোটে প্রচলিত পদ্ধতি অনুসারে বিএনপি পেয়েছিল ৬৪ দশমিক ৩৩ শতাংশ আসন বা ১৯৩ আসন। ৫০ শতাংশ আনুপাতিক হার ও ৫০ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ফলাফল হলে বিএনপি আসন কমে দাঁড়াত ৪২ দশমিক ৬৫ শতাংশ বা ১২৭টি আসন।
সংখ্যানুপাতিকে নবম সংসদ নির্বাচনের ফল কেমন হতো
২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। বিপরীতে তাদের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপি পেয়েছিল ৩০টি আসন। জাতীয় পার্টি ২৭টি আসনে জয়ী হয়। জামায়াতে ইসলামী পায় ২টি আসন।
সেবার ৮৭ দশমিক ১৩ শতাংশ ভোটার ভোট দিয়েছিল। আওয়ামী লীগ ভোট পেয়েছিল ৪৮ দশমিক ৪ শতাংশ। বিএনপি ৩২ দশমিক ৫ শতাংশ, জাতীয় পার্টি ৭ দশমিক ৪ শতাংশ, জামায়াতে ইসলামী ৪ দশমিক ৭০ শতাংশ ভোট পায়।
নবম সংসদ নির্বাচন সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে হলে আওয়ামী লীগের আসন ৮৬টি কমে দাঁড়াত ১৪৪টিতে। অন্যদিকে বিএনপির আসন ৬৬টি বেড়ে হয়ে যেত ৯৬টি। জাতীয় পার্টির আসন ৬টি কমে হতো ২১টি। জামায়াতে ইসলামীর আসন ১২টি বেড়ে হতো ১৪।
আবার মিশ্র সংখ্যানুপাতিক ব্যবস্থায় ভোট হলে (৫০ শতাংশ আনুপাতিক হার ও ৫০ শতাংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে) আওয়ামী লীগের আসন কমে দাঁড়াতো ৬২ দশমিক ৮৪৫ শতাংশ বা ১৮৮টি। বিএনপির আসন বেড়ে দাঁড়াত ২১ দশমিক ৬ শতাংশ বা ৬৪টি। জাতীয় পার্টির আসন কমে হতো ৮টি।
স্বতন্ত্ররা কি ভোট করতে পারবে সংখ্যানুপাতিকে
সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সাধারণত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি পড়তে হয়। সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিগুলো দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাত অনুযায়ী আসন বণ্টনের জন্য তৈরি করা হয়, নির্দিষ্ট প্রার্থীদের জন্য নয়। ভোটাররা সাধারণত একটি দলের জন্য ভোট দেয় এবং আসনগুলো পার্টির তালিকার মধ্যে বণ্টিত হয়।
যেহেতু স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কোনও দলের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং পার্টির তালিকা থেকে সুবিধা পায় না, তাই তাদের জন্য সরাসরি সংখ্যানুপাতিকে অংশগ্রহণ করা সাধারণত কঠিন।
তবে কিছু ভিন্নধর্মী পদ্ধতিতে, যেমন ওপেন-লিস্ট পদ্ধতিতে, ভোটাররা একটি দলের মধ্যেই নির্দিষ্ট প্রার্থীদের ভোট দিতে পারে, যা তাত্ত্বিকভাবে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ দিতে পারে, তবে এটি খুব সাধারণ নয়।
সংখ্যানুপাতিকে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা কীভাবে ভোট করবে- সেই প্রশ্নে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ আব্দুল আলীম সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “এ বিষয়ে আসলে আমাদের আলাপ করতে হবে। সবগুলো বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে।
“কোনও দেশে সারাদেশ মিলিয়ে একটা সংসদীয় আসন। কোথাও মিশ্র ব্যবস্থা রয়েছে। অর্ধেক আসনে ফার্স্ট পাস্ট দ্য পোস্ট সিস্টেম, অর্ধেক আসনে সংখ্যানুপাতিক। আসলে এ বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে হবে। এটা একদিন বা এক মিনিটের সিদ্ধান্ত না।”
সাবেক সিইসি আউয়ালের দৃষ্টিতে সংখ্যানুপাতিক
সিইসির দায়িত্ব ছাড়ার আগে কাজী হাবিবুল আউয়াল গত ১৭ আগস্ট একটি জাতীয় দৈনিকে লেখা কলামে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।
তিনি বলেছেন, এই পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে ব্যক্তি প্রার্থীর পরিবর্তে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে। ৩০০টি আলাদা নির্বাচনী এলাকা থাকবে না। গোটা বাংলাদেশ হবে একক নির্বাচনী এলাকা। নির্বাচনে যে দল মোট প্রদত্ত ভোটের যত শতাংশ পাবে, সেই অনুপাতে সংসদে আসন পাবে।
১৯৭২ সালের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৮ কোটি মানুষ। এমন বিবেচনায় সংসদের আসন সংখ্যা ৩৫০/৪০০-তে বর্ধিত করা যেতে পারে।
হাবিবুল আউয়াল মনে করেন, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে বাংলাদেশে একক দলের সরকার গঠনের সম্ভাবনা কমে যাবে, জোট সরকার হবে।
তিনি লিখেছেন, “কোয়ালিশন সরকার গঠন সম্ভব না হলে তাৎক্ষণিক সংসদ ভেঙে না দিয়ে সর্বোচ্চ সংখ্যক আসনপ্রাপ্ত দলকে অবিলম্বে সরকার গঠনের অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। এতে শূন্যতার তাৎক্ষণিক সংকট পরিহার করা যাবে। সেই দল কোয়ালিশন সরকার গঠন করতে না পারলে ২-৩ বছর পর একই পদ্ধতিতে আবার সাধারণ নির্বাচন আয়োজন করা যেতে পারে।”
সংখ্যানুপাতিকের পক্ষে কী যুক্তি
নির্বাচন পর্যবেক্ষক বদিউল আলম মজুমদার বর্তমান পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা এড়াতেই সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতির পক্ষে বলছেন।
তিনি সম্প্রতি একটি দৈনিক পত্রিকাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “এটার সীমাবদ্ধতা এখন সর্বজনবিদিত। প্রথমত সামান্য ভোটের ব্যবধানেই যে কেউ বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে যায়। এতে ভোটের সামান্যতম পার্থক্য সত্ত্বেও আসনের ক্ষেত্রে বিরাট পার্থক্য হতে পারে।
“আরেকটা সমস্যা হলো, যেহেতু আসনভিত্তিক, সেহেতু দ্বন্দ্ব, হানাহানি, মারামারি, ভোট জালিয়াতির প্রবণতা বেশি হয়। সহিংসতার সম্ভাবনা থাকে ব্যাপক। এই পদ্ধতিতে যারাই একবার নির্বাচিত হন, তাদের অনেকটা চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত হয়ে যায়। তাদের আর সরানো প্রায়ই আর সম্ভবপর হয় না।”
বর্তমান পদ্ধতিতে ভোটে টাকার খেলার সুযোগ থাকার বিষয়টি তুলে ধরে বদিউল আলম বলেন, “যারা ধনী, অর্থকড়ির মালিক, এই পদ্ধতি তাদের জন্য সুবিধাজনক। তারা মনোনয়ন কিনে এবং টাকা-পয়সা খরচ করে নির্বাচন জিততে পারে। এখানে জনপ্রিয়তা অনেক ক্ষেত্রে বিবেচিত হলেও যোগ্যতা গুরুত্ব পায় না।”
কাজী হাবিবুল আউয়াল তার কলামে লিখেছেন, সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতিতে অর্থের ছড়াছড়ি কমানোর পাশাপাশি রাষ্ট্রের অর্থ ব্যয়ও কমে আসবে।
“প্রার্থীর মৃত্যুজনিত কারণে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয় না। নারীর সংরক্ষিত আসনে ভিন্নভাবে নির্বাচন অনুষ্ঠান আবশ্যক হবে না।”
প্রয়াত আকবর আলি খানও তার বইয়ে লিখে গেছেন, “বর্তমান যে পদ্ধতিতে ভোট হচ্ছে, তিন দশকের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যাচ্ছে, বর্তমান পদ্ধতি বাংলাদশের জন্য সঠিক নয়। এর ফলে বাংলাদেশে সংঘর্ষের রাজনীতি ক্রমশ তীব্র হচ্ছে এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ক্রমশ বিপন্ন হচ্ছে।”
তার মতে, আনুপাতিক পদ্ধতিতে ভোটে জাল-জালিয়াতি, সংঘাত-সহিংসতা কমবে।
কোন দল চায়, কোন দল চায় না
সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতৈক্য এখনও হয়নি। কেউ কেউ এর পক্ষে বলছে, আবার কেউ বিপক্ষে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সঙ্গে সংলাপে নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর অদিকাংশই সংখ্যানুপাতিকের পক্ষে সুপারিশ করে।
জাতীয় পার্টির পাশাপাশি জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন, এ বি পার্টি সংখ্যানুপাতিকের পক্ষে। বাম দল
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), গণসংহতি আন্দোলনের পাশাপাশি গণঅধিকার পরিষদও এর পক্ষে।
তবে বিএনপি সংখ্যানুপাতিকের বিষয়ে তাদের অবস্থান না জানালেও দলটির নেতারা প্রচলিত পদ্ধতি রাখার পক্ষে বলছে। ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের প্রকাশ্য সক্রিয়তা না থাকায় এবিষয়ে তাদের অবস্থান জানা যাচ্ছে না।
বর্তমান পদ্ধতি থেকে সরে এসে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি বাংলাদেশে প্রচলন করতে গেলে সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে বলে মনে করেন নির্বাচন সংস্কার কমিটির সদস্য ও ডেমোক্রেসি ইন্টারন্যাশনালের মূখ্য পরিচালক আব্দুল আলীম।
তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “এটা করতে গেলে সংবিধান পরিবর্তন করতে হবে।”
সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি প্রচলনের জন্য সবদলের ঐকমত্যের প্রয়োজন বলেও মনে করেন এই নির্বাচন বিশেষজ্ঞ।
“একা একা যদি সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে যাদের মত গ্রহণ করলেন না, তারা প্রশ্ন তুলবে। তখনই বিতর্কের জন্ম নেবে।”



