Beta
বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬
Beta
বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এক গণহত্যাকারী স্বৈরশাসক যেভাবে জাতীয় বীর হলেন

Tanggal-Lahir-Presiden-Suharto
[publishpress_authors_box]

ছিলেন যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত এক ভয়ংকর একনায়ক। হাতে তার গণহত্যার রক্তের দাগ। দশকের পর দশক ধরে শক্ত হাতে দেশ শাসন করেন। তার শাসনামলেই হয়েছিল দেশটির ইতিহাসে স্মরণীয় এক ভয়াবহ গণহত্যার ঘটনা। ওই একনায়ককে একটা সময় অভিযুক্ত করা হয়েছিল বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করে নিজের পরিবারকে বিলাসিতা ও রাজনৈতিক ক্ষমতার চূড়ায় নিয়ে যাওয়ার।

বলছি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ইন্দোনেশিয়া ও এর সাবেক প্রেসিডেন্ট সুহার্তোর কথা। বিতর্কিত এই নেতার মৃত্যুর অনেক বছর পর গত সোমবার দেশটির সরকার তাকে জাতীয় বীরের মর্যাদা দিয়েছে। আর এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে দেশটির একাধিক মানবাধিকার সংস্থা এবং নির্যাতিতরা ও তাদের পরিবার।

ইতিহাসবিদরা এই সিদ্ধান্তকে একটি দমনমূলক শাসনের ইতিহাস মুছে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছেন। কারণ তাদের মতে, সুহার্তোর শাসন বহু মানুষের প্রাণ নিয়েছিল।

সাবেক প্রেসিডেন্ট সুহার্তোকে এই মর্যাদা দিয়েছেন ইন্দোনেশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট প্রাবোও সুবিয়ান্তো। তিনি মূলত সুহার্তোর জামাতা এবং নিজেও সামরিক বাহিনীর সাবেক জেনারেল হিসেবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বিতর্কিত।

রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী জাতীয় বীর ঘোষণার সময় বলা হয়, “সেন্ট্রাল জাভা প্রদেশের এক বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, স্বাধীনতা সংগ্রামের এক বীর, জেনারেল সুহার্তো স্বাধীনতা-পর্ব থেকেই আলাদা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন।”

তবে সুহার্তোকে নিয়ে বর্তমানে যে বিতর্ক তীব্রভাবে চলছে, তাতে ঘোষণার বর্ণনা অনেকটাই প্রশ্নবিদ্ধ। সুহার্তোর উত্তরাধিকার মোটেও সরল কিছু নয়।

কে ছিলেন সুহার্তো

১৯২১ সালে। ইন্দোনেশিয়া তখনও ডাচ উপনিবেশ, সেই সময়ে জন্ম সুহার্তোর। ১৯৪৯ সালে দেশ স্বাধীনতা পাওয়ার পর তিনি সেনাবাহিনীতে পদোন্নতি পেতে পেতে পাঁচ তারকা জেনারেল হন।

তারপর আসে ১৯৬৫ সালের রক্তক্ষয়ী অধ্যায়। এক ব্যর্থ সামরিক অভ্যুত্থান ও কয়েকজন সেনা জেনারেল হত্যার ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে রক্তপাত শুরু হয়।

সুহার্তো ওই অভ্যুত্থানের দায় চাপান কমিউনিস্টদের ওপর। ক্ষমতাচ্যুত করেন স্বাধীন ইন্দোনেশিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট সুকার্নোকে এবং শুরু করেন তথাকথিত ‘অভিযুক্তদের’ দমন অভিযান।

ফলে গোটা দেশে শুরু হয় এক ভয়াবহ ‘কমিউনিস্টবিরোধী শুদ্ধি অভিযান’। এর নেতৃত্বে ছিল সুহার্তোর শক্তিশালী সেনাবাহিনী। মানবাধিকার সংগঠন ও ইতিহাসবিদদের অনুমান, এই অভিযানে ৫ লাখ থেকে ১০ লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটে।

যুক্তরাষ্ট্র এই ‘কমিউনিস্টবিরোধী গণহত্যা’কে সরাসরি সমর্থন করেছিল। সরবরাহ করেছিল কমিউনিস্ট পার্টির কর্মকর্তাদের নামের তালিকা, সরঞ্জাম ও অর্থ সহায়তা। ২০১৭ সালে গোপন নথি উন্মুক্ত হওয়ার পর এসব তথ্য প্রকাশ পায়।

১৯৬৫ সালের শেষ দিকে যুক্তরাষ্ট্রের জাকার্তা দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো এক গোপন বার্তায় বলা হয়েছিল, “অবিশ্বাস্য এক পরিবর্তন ঘটেছে মাত্র দশ সপ্তাহে।” অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের তথ্যমতে, ওই বার্তায় আরও উল্লেখ করা হয়েছিল প্রায় এক লক্ষ মানুষ নিহত হয়েছে।

অনেক ইতিহাসবিদের মতে, এই দমন অভিযানে যাদের হত্যা করা হয়েছিল, তাদের অধিকাংশই প্রকৃত কমিউনিস্ট ছিলেন না। তারা ছিলেন জাতিগত চীনা, বা বামঘেঁষা সাধারণ নাগরিক।

২০১৬ সালে হেগে একটি আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল রায় দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়া ১৯৬৫ সালের এই গণহত্যায় পরোক্ষভাবে জড়িত ছিল। এই হত্যাকাণ্ডকে ‘মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

৩১ বছর ধরে সুহার্তো ক্ষমতায় ছিলেন। এই সময়ে তিনি রাজনৈতিক বিরোধী ও সমালোচকদের দমন করেন এবং পূর্ব তিমুর, আচেহ, পশ্চিম পাপুয়া ও মালুকু দ্বীপপুঞ্জের মতো অঞ্চলে কঠোরভাবে শাসন জারি রাখেন।

এই অঞ্চলগুলোর কিছুতে অভিযান চালানো হয়েছিল পশ্চিমা মিত্রদের পরোক্ষ সমর্থনে, যারা শীতল যুদ্ধকালে ‘কমিউনিস্ট-বিরোধী নেতাকে’ টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কারণ তখন বিশ্বের দক্ষিণাঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত সমর্থিত প্রক্সি যুদ্ধ চলছিল।

সুহার্তোকে কেউ কেউ প্রশংসা করেন তার নীতির জন্য, যা ইন্দোনেশিয়ার দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও আপাত রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এনেছিল। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাৎ করেন, যা তার পরিবারের বিলাসবহুল জীবনযাপন ও জনগণের ক্ষোভের কারণ হয়ে ওঠে।

অবশেষে ১৯৯৮ সালে এশিয়ার আর্থিক সঙ্কট দেশটিকে গভীর অস্থিরতায় ফেলে দিলে সুহার্তোকে গণবিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ করতে হয়। এটি ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার শেষ দিকের এক ‘জনতার বিপ্লব’, যেখানে এক শীতল যুদ্ধকালীন স্বৈরশাসককে গণতন্ত্রে রূপান্তরিত করা হয়।

পরবর্তীতে তার সন্তানদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা হয়; সর্বকনিষ্ঠ সন্তান দোষী সাব্যস্ত হয়। ২০১৫ সালে দেশটির সুপ্রিম কোর্ট সুহার্তোর পরিবারকে আত্মসাৎ করা কোটি কোটি টাকার সম্পদ ফেরত দিতে আদেশ দেয়।

তবে সুহার্তো নিজে কখনও ভুক্তভোগীদের মুখোমুখি হননি। জীবনের শেষ দিকে অসুস্থতার অজুহাতে তিনি বিচারের মুখ এড়িয়ে যান। ২০০৮ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন এবং আত্মসাৎ সংক্রান্ত অভিযোগকে “অপবাদ ও মানহানি” বলে বর্ণনা করেন।

প্রাবোও কেন তাকে জাতীয় বীর ঘোষণা করলেন

অনেকের কাছেই এই সিদ্ধান্তে বড় প্রশ্ন উঠে এসেছে। কারণ যিনি এই মর্যাদা দিলেন, সেই প্রাবোও সুহার্তোর ঘনিষ্ঠ অনুগামী ও একসময় পরিবারেরই সদস্য ছিলেন।

প্রাবোও ১৯৮৩ সালে সুহার্তোর কন্যাকে বিয়ে করেছিলেন। যদিও ১৯৯৮ সালে সুহার্তো ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তাদের বিচ্ছেদ হয়।

সুহার্তোর শাসনামলে প্রাবোও ছিলেন সেনা কর্মকর্তা এবং পশ্চিম পাপুয়া ও পূর্ব তিমুরে বিতর্কিত সামরিক অভিযানে জড়িত ছিলেন। এসব কারণে তার মানবাধিকার রেকর্ড নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ১৯৯৮ সালের গণবিক্ষোভ চলাকালে তিনি কর্মী অপহরণের অভিযোগে অভিযুক্ত হন।

তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তবে ওই বছরই সেনাবাহিনী থেকে তাকে বরখাস্ত করা হয়। সে বছর ইন্দোনেশিয়া সুহার্তোর একনায়কতন্ত্র থেকে মুক্তি পায়।

২০২৪ সালের নির্বাচনে প্রাবোও প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। সুহার্তোর দল গোলকারও তাকে সমর্থন দেয়। বিজয় ভাষণে তিনি সুহার্তোকে শ্রদ্ধা জানান ও প্রাক্তন স্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান।

তখন মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছিলেন যে তার ক্ষমতায় আসা ইন্দোনেশিয়াকে আবার স্বৈরতন্ত্রের দিকে ফিরিয়ে নিতে পারে।

সুহার্তোর ছোট ছেলে টমি সুহার্তো।

তারপর থেকে প্রাবোও প্রশাসন সেনাবাহিনীর প্রভাব বাড়িয়েছে নাগরিক প্রশাসনের ক্ষেত্রেও, যা নিয়ে নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর তীব্র সমালোচনা রয়েছে। তাদের আশঙ্কা, দেশটি আবার সুহার্তো-যুগের সামরিক আধিপত্যে ফিরে যাচ্ছে।

এছাড়া ইন্দোনেশিয়ায় এখনও সুহার্তো-অনুগামীদের প্রভাব রয়েছে। গত এক দশকে তার রাজনৈতিক উত্তরসূরিরা সুহার্তোর ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। তাকে এক “শক্তিশালী ও স্থিতিশীল নেতা” হিসেবে তুলে ধরছে।

সুহার্তোর জন্মস্থান যোগ্যাকার্তার কাছে কেমুসুক গ্রামে এখনও সর্বত্র তার ছবি দেখা যায়, জাদুঘরের স্মারক থেকে শুরু করে হাস্যোজ্জ্বল মুখের টি-শার্ট পর্যন্ত।

তবুও ইন্দোনেশিয়ায় তার শাসন নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এখনও অনেকটাই নিষিদ্ধ এবং তার উত্তরাধিকার নিয়ে দেশজুড়ে মতভেদ স্পষ্ট।

প্রতিক্রিয়া

সোমবারের অনুষ্ঠানের আগেই কর্মীরা জাকার্তায় বিক্ষোভ করেন। হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিল, “মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী” এবং “সুহার্তো কোনও বীর নয়।”

মানবাধিকার সংগঠনগুলো এই সিদ্ধান্তের নিন্দা জানায়। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল একে ইতিহাস বিকৃতির প্রচেষ্টা বলে উল্লেখ করে এবং প্রাবোওর পারিবারিক সম্পর্কের দিকে ইঙ্গিত করে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ইন্দোনেশিয়া গবেষক আন্দ্রেয়াস হারসোনোও তীব্র সমালোচনা করেন।

তিনি বলেন, “সুহার্তো ও তার নির্যাতনকারী জেনারেলদের বিচারের আওতায় না আনার ব্যর্থতা আজ ইতিহাস বিকৃতি ও ধোয়ামোছার পথ তৈরি করেছে, যা এখন প্রাবোওর শাসনামলে স্পষ্ট। এর ফলে বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর জন্য গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায় নির্ধারণ ও ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।”

এই পদক্ষেপ বিশেষ করে কষ্টদায়ক তাদের জন্য, যারা সুহার্তোর শাসনামলে নির্যাতিত হয়েছেন বা প্রিয়জন হারিয়েছেন।

১৯৭০ থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত ‘কমিউনিস্ট-যোগসাজশের’ অভিযোগে বিনা বিচারে কারাবন্দি ছিলেন বেদজো উন্তুং। তিনি অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, “আমি হতবাক, ক্ষুব্ধ ও সরকারের এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্তে গভীরভাবে হতাশ।” কারাগারে তাকে নির্যাতন করা হয়েছিল, তার পরিবারও বৈষম্যের শিকার হয়।

তিনি আরও বলেন, “এটা অত্যন্ত অন্যায্য। আমরা এখনও সেই কষ্ট নিয়ে বেঁচে আছি।”

অন্যদিকে, সুহার্তোর পরিবারের সদস্যরা এর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

সুহার্তোর কন্যা সিতি হারদিয়ান্তি রুকমানা সোমবারের অনুষ্ঠানের পর সাংবাদিকদের বলেন, “আমাদের নিজেদের কিছু লুকানোর নেই… কিছুই গোপন করা হচ্ছে না। আমরা প্রেসিডেন্টের প্রতি কৃতজ্ঞ যে তিনি আমাদের পিতাকে জাতীয় বীর ঘোষণা করেছেন। হয়তো তিনিও একজন সেনা বলে জানেন, আমার বাবা দেশটির জন্য কী করেছিলেন।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found