২৪ ঘণ্টায় ৩৯৯ মিলি মিটার বৃষ্টিপাতে তলিয়েছে ফেনী শহর। ফুলগাজীসহ বিভিন্ন উপজেলায় মাঠ-ঘাট গেছে ডুবে। পাশের জেলা নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের উত্তরাংশেও প্রবল বর্ষণ চলছে।
তাতে এই অঞ্চলে গত বছরের মতো আকস্মিক বন্যার শঙ্কা দেখা দিলেও আবহাওয়া অধিদপ্তর শুনিয়েছে আশার খবর; পূর্বাভাস বলছে, ভারি বর্ষণ আর একদিন পরই ধরে আসতে পারে। তাতে পরিস্থিতির উন্নতি ঘটবে।
আষাঢ়ের শেষ দিকে এসে উপকূলীয় সব জেলায়ই প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে; অতি ভারি না হলেও বাদ যায়নি ঢাকাসহ অন্যান্য অঞ্চলও। দিনভর বৃষ্টিতে জনজীবনে ঘটেছে ছন্দপতন।
মৌসুমী বায়ুর সক্রিয়তার সঙ্গে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট একটি লঘুচাপই এই বর্ষণের মূল কারণ। আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, মৌসুমী বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় রয়েছে।
মৌসুমী বায়ুর অক্ষের বর্ধিতাংশ বিস্তৃত রয়েছে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল থেকে ভারতের আসাম পর্যন্ত। পাশাপাশি গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গ এবং এর সংলগ্ন এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে।
মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে বুধবার সকাল ৬টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশের সর্বোচ্চ পরিমাণ বৃষ্টিপাত হয়েছে ফেনীতে ৩৯৯ মিলি মিটার। এই সময়ে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ নোয়াখালীতে ছিল ২০৮ মিলি মিটার, চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ১৮০ মিলি মিটার, সন্দ্বীপে ১১৫ মিলি মিটার, চাঁদপুরে ১০৩ মিলি মিটার, ভোলায় ১৬৮ মিলি মিটার, বরিশালে ১৬২ মিলি মিটার, পটুয়াখালীতে ২০১ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
ভারি বর্ষণে ফেনী জেলার মুহুরি ও সিলোনিয়া নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে জেলার নিম্নাঞ্চলে আকস্মিক বন্যা দেখা দিয়েছে। ফেনী শহরের বিভিন্ন সড়ক তলিয়ে গেছে টানা বৃষ্টিতে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস বলছে, এমন অতিভারি বৃষ্টিপাত আরও একদিন অব্যাহত থাকতে পারে।
আবহাওয়াবিদ কাজী জেবুন্নেছা সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “বৃষ্টি সারাদেশেই খানিকটা কমে আসবে আগামীকাল (বৃহস্পতিবার) থেকে। সূর্যের দেখাও কোথাও কোথাও পাওয়া যাবে। সারাদেশেই গ্র্যাজুয়েলি বৃষ্টি খানিকটা কমতে শুরু করবে।”
ফেনীর বিষয়ে তিনি বলেন, “গতকালের তুলনায় ফেনীতে আজ কিন্তু বৃষ্টি কম। আজ (বুধবার) সকাল ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছে ২১ মিলিমিটার। গ্র্যাজুয়ালি কমে আসছে, আরও কমবে।”
পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রও জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ফেনীর নদীগুলোর পানি সমতল হ্রাস পেতে পারে। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে বন্যা পরিস্থিতিরও উন্নতি ঘটবে।
গত দুদিন ধরেই ঢাকায় বৃষ্টির কোনও থামাথামি নেই। আকাশ কালো করে কখনও মুষলধারে, কখনও হালকা বৃষ্টি হচ্ছে। গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকায় ৭৭ মিলি মিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে।
টানা বৃষ্টির কারণে ঘর থেকে বেরিয়ে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে পেশাজীবীদের। কিছু কিছু এলাকায় সড়কে জলাবদ্ধতাও দেখা গেছে।
ঢাকার গুলশানের নিকেতনের মুদি দোকানি আজহার হোসেন প্রতিদিন দোকান খোলেন সকাল সাড়ে ৭টার দিকে। সেসময় স্কুলে যাতায়াতের পথে অভিভাবকরা কেনাকাটা সারেন। কিন্তু বুধবার দোকান খুললেও ক্রেতা পাননি তিনি।
আজহার বলেন, “বাচ্চারাও স্কুলে যায়নি, বাবা-মায়েরাও তাই নেই। আর এই ঝুম বৃষ্টিতে নিতান্তই কাজ না থাকলে কেইবা বেরুবে ঘর থেকে?”

বৃষ্টি মাথায় নিয়ে যাদের কাজে বের হতে হয়েছে, তাদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে রিকশা-অটোরিকশার ভাড়া।
“মাথার উপরে বৃষ্টি একদিকে, আরেকদিকে রিকশাচালক, সিএনজিচালকরা ইচ্ছে মতো ভাড়া চাচ্ছে। তারাও বৃষ্টিতেই ভিজছেন সেটা বুঝতে পারছি। কিন্তু তাই বলে ভাড়া সবাই দুই থেকে তিনগুণ বাড়িয়ে বলছে,” বলেছিলেন গুলশান ১ নম্বর সেকশনের দুই নম্বর সড়কে দাঁড়িয়ে থাকা মিনহাজুল আবেদিন।
আগারগাঁও থেকে গুলশানে আসা সংবাদকর্মী জান্নাতুল ফেরদৌসী জানান, তাকে অটোরিকশায় দ্বিগুণ ভাড়া গুণতে হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, আগামী ২৪ ঘণ্টায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও বরিশাল বিভাগের কোথাও কোথাও ভারি থেকে অতি ভারি বর্ষণ হতে পারে।
ভারি বর্ষণের কারণে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনা মহানগরীর কোথাও কোথাও অস্থায়ীভাবে জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। তাতে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধসের আশঙ্কাও রয়েছে।
দক্ষিণ ও মধ্যাঞ্চলে গত দুদিন ধরে বৃষ্টি হলেও উত্তরাঞ্চলে তেমন ছিল না। রাজশাহী, রংপুরের দিকে আগামী ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টি বাড়তে পারে, বলছেন আবহাওয়াবিদ জেবুন্নেছা।
আষাঢ় মাসের শেষ পাঁচ দিন থেমে থেমে বৃষ্টি চললেও তাপমাত্রা শুক্রবার থেকে বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস রয়েছে। মঙ্গলবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল নীলফামারীর ডিমলায়, ৩৪ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল টাঙ্গাইলে, ২২ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস।
সাগরে লঘুচাপ থাকায় সমুদ্রবন্দরগুলোকে তিন নম্বর সতর্কতা সঙ্কেত দেখাতে বলেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।



