Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি

ছিল রোল নম্বর, এখন হলো বেড নম্বর

burn-institute-220725
[publishpress_authors_box]

জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের চারতলায় নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) সামনে উদ্বিগ্ন স্বজনদের ভিড়। আইসিউর প্রধান ফটক বন্ধ; কেবল চিকিৎসক-নার্সসহ স্বেচ্ছাসেবকরা আসা-যাওয়া করছেন।

আইসিইউতে থাকা রোগীদের কিছু প্রয়োজন হলেই ভেতরে থেকে বের হয়ে আসছেন কেউ; দাঁড়াচ্ছেন ভেতরে থাকা রোগীর স্বজনদের কাছে। কেউ এসে বলছেন- ‘বেড নম্বর ১৬’, আবার খানিক বাদেই ডাক পড়ল বেড নম্বর ১৪ এর; ১৯ নম্বরের ডাক পড়তেও শোনা গেল।

এর মধ্যে আইসিইউ থেকে বেরিয়ে একজন স্বেচ্ছাসেবক ‘বেড নম্বর ১৮’ বলে ডাক দিলেই আব্দুল মোসাদ্দের মাকিন নামে একটি শিশুর অভিভাবকরা সচকিত হয়ে উঠলেন। শিশুটির বাবা বলে উঠলেন, “স্কুলে ছিল রোল নম্বর, আর এখানে এসে হয়েছে বেড নম্বর।”

বিমানবাহিনীর প্রশিক্ষণ বিমান বিধ্বস্ত হয়ে অগ্নিদগ্ধ শিশুদের একজন এই মাকিন। বিধ্বস্ত হয়ে ঢাকার দিয়াবাড়ির মাইলস্টোন স্কুল ও কলেজে গত সোমবার দুপুরে পড়েছিল বিমানটি। তাতে বৈমানিকসহ অন্তত ২৯ জন নিহত হয়েছে।

আহতদের মধ্যে ৪৩ জন দেহে আগুনের ক্ষত নিয়ে এখন চিকিৎসাধীন বার্ন ইনস্টিটিউটে। তাদের মধ্যে ১০ জনের অবস্থা গুরুতর। তারাই রয়েছেন আইসিইউতে।

মাকিনের মা সালেহা নাজনীন বিলাপ করছিলেন আইসিইউর সামনে। শরীরের ৬২ ভাগ অংশে আগুনের ক্ষত নিয়ে লড়াই করছে ১৪ বছরের মাকিন। সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র সে।

খুব ছোটবেলায় একবার মোমের আগুনের হলকা লাগতেই মাকিনের কান্নাকাটির কথা মনে পড়ছে সালেহার।

“মোমটা জ্বালানোর পর ও হাত দিছে … ছোটরা যেমন দেয় আরকি, তাতেই ছেলেটা কী করছিল! আর পুরা শরীর পোড়া নিয়ে আমার মাকিন শুয়ে আছে …” বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন তিনি।

“ছেলেটা একদম মা ঘেঁষা। আমি একটু একা মোবাইল ফোনেও কথা বলতে পারতাম না, শরীরের সাথে মিশে থাকত। কাল রাতে আমাকে বলতেছিল- আম্মু আমাকে একটু ধর, হাতে ধর, আমার যন্ত্রণা হচ্ছে, আমি ঘুমাতে পারছি না।”

“আমি তো স্কুলেই ছিলাম। বিমানটা আমার মাথার ওপর দিয়ে গেল। আমার ছেলের গায়ে পড়ার আগে কেন আমার গায়ে পড়লো না?” স্বগতোক্তি করেন সালেহা।

বলতে বলতে ফোনের গ্যালারি বের করেন তিনি। ছেলের ছবি দেখিয়ে বলেন, “কী সুন্দর ছেলে আমার! কিন্তু আজ যে এত জটিল হবে অবস্থা, সে তো আমি বুঝি নাই।”

সালেহাকে বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রেখে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিলেন তার বোন। তাদের এক পাশে দাঁড়িয়েছিলেন মাকিনের বাবা মো. মহসীন, অন্য পাশে মাকিনের বড় ভাই মেহেদি। তিনি মাইলস্টোন কলেজ থেকেই এবারে উচ্চ মাধ্যমিকের পরীক্ষার্থী। তারও মুখ থমথমে।

মহসীন বলেন, “ছেলেটার সাথে কাল রাতে কথা হয়েছিল। বলেছিল- আব্বু আমাকে এখান থেকে নিয়ে যাও। এখন আর কথা বলছে না।”

কখন কীভাবে ছেলের খবর পেলেন- প্রশ্নে তিনি বলেন, “যখন হাসপাতালে নিয়ে আসে, তখনই ফোন দেয় আমাদের। এরপর গাজীপুরের বড়বাড়ি থেকে ছুটে আসি আমরা। সেই থেকে এখানেই আছি।”

আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অন্য শিশুর অভিভাবকদেরও মাকিনের মা-বাবার মতোই দিশেহারা অবস্থা।

‘শিশুদের পাশে থাকতে চাই’

মাইলস্টোন কলেজে বিমান বিধ্বস্ত ও হতাহতের ঘটনায় পুরো দেশ শোকাহত। হতাহতদের মধ্যে শিশুর সংখ্যা বেশি বলে মানুষের মনে রক্তক্ষরণও বেশি।

জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের সামনে সোমবারই শত শত মানুষ ছুটে আসে রক্ত দেওয়ার জন্য। সন্ধ্যার পর হাসপাতাল থেকে ‘আজ আর রক্তের প্রয়োজন নেই’ বলার পর ভিড় কমে।

পরদিন মঙ্গলবার সকালে আবার রক্ত দিতে ভিড় জমায় সাধারণ মানুষ। তার মধ্যে জটলা করে ছিল তৃতীয় লিঙ্গের প্রায় ২০০ জন মানুষ।

কেন এসেছেন জানতে চাইলে একজন বলেন, “আসছি ব্লাড দেয়ার জন্য। কালই আসতে চেয়েছিলাম, পরে সন্ধ্যা থেকেই শুনলাম আজ (সোমবার) আর ব্লাড লাগবে না, কাল (মঙ্গলবার) লাগবে। তাই সকাল হতেই সবাই এক জায়গায় হলাম, এরপর এখানে এলাম।”

মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে এসেছেন তারা। ঢাকার মগবাজার, তেজগাঁও, সাতরাস্তা, বনানী, মহাখালী, কুড়িল, ধানমণ্ডিসহ নানা এলাকা থেকে সাতটি দল এসেছে। সেখানে ঝুমা হিজড়া, বেলুনি হিজড়া, লায়লা হিজড়াসহ প্রতিটি দলে একজন ‘গুরুমা’ রয়েছেন।

আপনারা কি নিজেদের ব্লাড গ্রুপ জানেন- প্রশ্ন করতেই কার্ড তুলে ধরলেন একজন- “নিশ্চয়ই জানি। আর এবার তো নতুন না, যখনই কোথাও এরকম অনেক মানুষের রক্তের দরকার হয়, তখনই সেখানে যাই আমরা। আমরা চেষ্টা করি, সেবামূলক যে কোনও কাজে অংশ নিতে।”

“তবে কি জানেন, রক্ত নেওয়া হয় ঠিকই, কিন্তু এরপর সবাই ভুলে যায়,” আক্ষেপও ঝড়ে তার কণ্ঠে। পরমুহূর্তেই বলেন, “কিন্তু মানুষের বিপদের সময় তো আর আক্ষেপ নিয়ে বসে থাকা যায় না।”

শান্তি হিজড়া ফাউন্ডেশনের সদস্য মীম বলেন, “এই শিশুরাতো আমাদেরই সন্তান, ভাই-বোন। ওদের পাশে দাঁড়াতে চাই।”

“আমাদের তো পরিবার নাই, কিন্তু আপনাদের মতো মন আছে। সেখানে দুঃখ, কষ্ট, আনন্দ, বেদনা আছে,” বলেন সাতরাস্তা থেকে আসা আঁচল হিজড়া।

“কিন্তু অনেক জায়গাতে গিয়েই মানুষের সঙ্গে ভেদাভেদটা টের পাই। রক্ত তো লালই, রক্ত দিতে এসেছি, তখনও কি ভেদাভেদ করবেন?” প্রশ্ন ছুড়ে দেন তিনি।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found