গ্রীষ্মের দাবদাহে আরামদায়ক স্যান্ডেল পায়ে গলিয়ে হাঁটা, অথবা বিশেষ অনুষ্ঠানে নজরকাড়া হিল পরে নিজেকে সাজানো—জুতা আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছেন, এই সাধারণ জুতাও শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে? সম্প্রতি জার্মানির এক আদালতে বার্কেনস্টক স্যান্ডেল নিয়ে এক বিতর্ক যেন সেই প্রশ্নকেই উস্কে দিল—জুতো কি শুধুই পোশাক-পরিচ্ছদ, নাকি শিল্পকলার ক্যানভাস?
জার্মানির কোম্পানি বার্কেনস্টক ১৭৭৪ সাল থেকে জুতা তৈরি করে আসছে। তাদের স্যান্ডেলের নকশা নকল করার অভিযোগে সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি তিনটি প্রতিদ্বন্দ্বী কোম্পানির বিরুদ্ধে মামলা করে। বার্কেনস্টকের দাবি ছিল, তাদের স্যান্ডেলগুলো ‘ফলিত শিল্পের কপিরাইট-সুরক্ষিত কাজ’, যা নকল করা যাবে না। জার্মানির আইন অনুযায়ী, ভোক্তা পণ্যের তুলনায় শিল্পকর্ম- এর কপিরাইট বেশি সুরক্ষিত এবং দীর্ঘস্থায়ী মেধা সম্পত্তি সুরক্ষা ভোগ করে।
বৃহস্পতিবার জার্মানির ফেডারেল কোর্ট অব জাস্টিস রায় দেয়- বার্কেনস্টক স্যান্ডেল শুধুই আরামদায়ক পাদুকা, শিল্প নয়।
এই বিতর্ক আমাদের মনে করিয়ে দেয়, শিল্পের সংজ্ঞা কতটা বিস্তৃত এবং আপেক্ষিক। জুতা কি শুধুই ব্যবহারিক পণ্য, নাকি এর নকশা, নির্মাণ এবং শৈল্পিক উপস্থাপনা একে শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত করতে পারে?
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, জুতা কেবল পাদুকা-ই ছিল না বরং সবসময়ই সামাজিক মর্যাদা, সাংস্কৃতিক পরিচয় এবং শৈল্পিক রুচির প্রতীক ছিল। প্রাচীন মিশরীয়দের স্বর্ণখচিত স্যান্ডেল থেকে শুরু করে মধ্যযুগের কারুকার্যময় বুট-এর প্রচলনই এর উদাহরণ।
আধুনিক যুগেও, অনেক ডিজাইনার পাদুকা-কে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন। সালভাতোর ফেরগামো, মানোলো ব্লাহনিক বা ক্রিশ্চিয়ান লুবুটিনের মতো ডিজাইনাররা জুতাকে শিল্পের এক নতুন মাত্রা দিয়েছেন। তাদের তৈরি জুতা শুধু আরামদায়ক নয়, দৃষ্টিনন্দন এবং শৈল্পিক।
আবার, অনেক শিল্পী জুতাকে তাদের শিল্পকর্মের অংশ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ- এ ‘শুজ’ সিরিজের চিত্রকর্মগুলো জুতাকে সাধারণ বস্তু থেকে শিল্পকর্মে রূপান্তরিত করেছে। সমসাময়িক শিল্পীরাও জুতাকে বিভিন্ন শৈল্পিক মাধ্যমে ব্যবহার করে নতুন অর্থ তৈরি করছেন।
তাহলে, পাদুকা শিল্প কি না- এই প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে আমাদের শিল্পের সংজ্ঞার ওপর। যদি আমরা শিল্পকে শুধু চিত্রকর্ম বা ভাস্কর্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রাখি, বরং ব্যবহারিক বস্তুর শৈল্পিক উপস্থাপনাকেও শিল্পের অংশ হিসেবে গণ্য করি, তাহলে পাদুকা অবশ্যই শিল্পের পর্যায়ে উন্নীত হতে পারে।
বার্কেনস্টক বিতর্কের মাধ্যমে আমরা বুঝতে পারি, শিল্প এবং ব্যবহারিক বস্তুর মধ্যে সীমারেখা কতটা অস্পষ্ট। জুতো আমাদের জীবনের একটি সাধারণ অংশ হলেও, এর শৈল্পিক উপস্থাপনা এবং সাংস্কৃতিক তাৎপর্য একে শিল্পের পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে। শিল্প শুধু জাদুঘরে প্রদর্শিত চিত্রকর্ম বা ভাস্কর্য নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতিটি বস্তুর মধ্যে লুকিয়ে থাকা সৌন্দর্য।



