Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬
Beta
বৃহস্পতিবার, ৪ জুন, ২০২৬

সিনেমা ও সময় যেভাবে বাঁক বদলেছে বলিউডে

bollywood-120125
[publishpress_authors_box]

সময়ের চাকা যত ঘুরেছে বলিউডে ততই বাঁক বদল ঘটে গেছে। এরমধ্যে একের পর এক প্রজন্ম সিনেমার ধারাতে পরিবর্তন এনে দর্শকের রুচি ও চিন্তার ভিন্নতাকে স্পষ্ট করেছে।

আগের বলিউডের সঙ্গে এখনকার বলিউডেরই তুলনা করা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বলিউডের যাত্রা কেউ আটকে দিতে পারেনি। এই ইন্ডাস্ট্রির নির্মাতারা নতুন আঙ্গিকে সিনেমা বানাতে পিছপা হননি। সিনেমাটোগ্রাফি থেকে প্রচারণা খাতেও বলিউড নিজের খোলনলচে পাল্টে ফেলেছে।

১৯৪০ থেকে ৬০ দশকের বলিউড কি স্বর্ণযুগ? না কি ১৯৫০ থেকে ৬০ দশকের বলিউডই সেরা? এই তর্কের মাঝে কেউ দাবি করতে পারেন, ১৯৯০ সালের দশক বা ২০০০ সালের আগের সময়েই বলিউড উত্তুঙ্গে ছিল।

যুগের ধারাবাহিকতায় বলিউডকে তুলে ধরেছে টাইমস অব ইন্ডিয়া।

বলিউডের স্বর্ণযুগের ঐতিহ্য

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝিতে স্বর্ণযুগ ছিল বলিউডে। সেসময় রাজ কাপুর, গুরু দত্ত, সত্যজিত রায় সিনেমার ভাষা নির্মাণ করে চলেছিলেন। শ্রী ৪২০, পিয়াসা সিনেমা ওই সময়ের উদাহরণ। ভারতের স্বাধীনতার পর জনজীবনে সামাজিক ন্যায্যতা, দেশপ্রেম এবং ব্যক্তিগত টানাপোড়েনের ছাপ পড়েছিল সিনেমার পর্দায়।

নায়ক-নায়িকা চরিত্রের আদর্শ, হৃদয়-ছোঁয়া গান এবং গল্প নিয়ে এসব সিনেমা ভারতীয় দর্শকের মনে জায়গা করে নিয়েছিল।

ওই সময়ের সিনেমার বৈশিষ্ট্যে সমাজের বাস্তবচিত্র ফুটে উঠেছিল। সিনেমার গল্পে ধরা পড়েছিল দারিদ্র, দুর্নীতি এবং অসমতার কথা।

এস ডি বর্মন এবং শঙ্কর-জয়কিষণ যুগলের সুর ও কথায় সেসময়কার একেকটি গান কালোত্তীর্ণ হয়ে উঠেছে।

সে কালে সিনেমার নির্মাণে প্রাধান্য পেতো গল্পের গভীরতা , আবেগ এবং নাটকীয় সিনেমাটোগ্রাফি।

অভিনয় গুণে রাজ কাপুর, দিলীপ কুমার, মধুবালা তখন দর্শকের কাছে নমস্য হয়ে উঠেছিল। একই সঙ্গে এই কিংবদন্তি নায়ক-নায়িকাদের সৌন্দর্য তখন থেকে এখনও বিমোহিত করে রেখেছে দর্শককে।

তখন সিনেমায় দেশপ্রেম এবং জাতীয়তাবাদের উপস্থাপন দর্শক ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছিল।

৮০ এবং ৯০ সালের দশকের মুগ্ধতা

বলিউডে নতুন মোড় আসে ১৯৮০ এবং ১৯৯০ সালের দশকে। এই যুগে এসে বলিউডের সিনেমা দেখালো ভারতের আর্থ-সামাজিক জীবনে নতুন বাঁক এসেছে। শহুরে দর্শকের সংখ্যা বাড়তে থাকায় প্রেম, মারপিট এবং ড্রামার মিশেলে মসলাদার সিনেমার জনপ্রিয়তা দেখা দিলো তখন।

অমিতাভ বচ্চনের উত্থান হলো এই সময়ে। নায়কের মাঝে বলিষ্ঠতা চাইছিল তখনকার দর্শক।

রোমান্টিক কমেডি, পারিবারিক গল্প এ সময় বিনোদনের পরিভাষা হয়ে উঠল। তাতে ভারতের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা এবং আধুনিক সমাজ কী চাইছে তা ধরা পড়ে।

অ্যাকশনে ভরপুর সিনেমায় থাকবে প্রেম, ড্রামা, কমেডি – এমন ফর্মুলার সিনেমাই তখন হিট। ১৯৭৫ সালের শোলে এবং ১৯৯১ সালে হাম এই যুগের সেরা উদাহরণ।

এই সময় সিনেমায় শ্রুতিমধুর গানের সঙ্গে মিলিয়ে নাচের কোরিওগ্রাফি হতো। অর্থাৎ নাচের মধ্যেও দর্শকের কাছে গল্প ধরা পড়ত।

মসলাদার সিনেমা হলেও পরিবার ও সম্পর্কের মূল্যবোধ ধরে রাখার কথা উঠে আসত এই যুগের সিনেমাতে।

এই যুগেই সাদাকালো থেকে রঙিন সিনেমার যুগে আসে বলিউড। হিন্দি সিনেমা তখন থেকে আরেক ইতিহাস লেখার জন্য প্রস্তুত হয়।

যদিও এই বাঁক বদলে বলিউড অনেকখানি শিকড় হারা হয়েছিল বলে মনে করেন চিত্রনাট্যকার কমলেশ পান্ডে।

তেজাব, রাঙ দে বাসান্তি, লাওয়ারিশ সিনেমার এই গল্পকার মনে করেন, “১৯৬০ সাল থেকে আজকে পর্যন্ত সিনেমার সাক্ষী হয়ে আমার উপলব্ধি হচ্ছে, সিনেমা থেকে ভারতের গ্রাম হারিয়ে গেছে। ভারতের ইতিহাসও সিনেমা থেকে নেই হয়ে গেছে। এই শূন্যতা দর্শক ও আজকের সিনেমার মধ্যে সম্পর্ক শিথিল করেছে।

”১৯৬৫ সালের পর হিন্দি সিনেমা তার আবেগ হারিয়েছে। যেসব গল্পকার ও পরিচালকরা হৃদয় দিয়ে কাজ করতেন,তারা তো গত হয়েছেন। তাদের বিকল্প এখনও খুঁজে পাওয়া যায়নি। ফলে সিনেমার মান পড়তির দিকে। এখানে গানের ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। আগে তো গান সিনেমার আত্মা ছিল। এখন অবশ্য সিনেমার প্রচারণায় গানের কদর রয়েছে। তাতে মনে হচ্ছে, এখনকার সিনেমা শুধু অর্থ কামানোর জন্যই বানানো হয়। তারকারাও একই দিশায় চলছেন।”

ডিজিটাল বলিউড

আধুনিক যুগে বলিউডও যেন আরও চকচকে হয়ে উঠেছে। নতুন প্রযুক্তি, স্যাটেলাইট টিভি, ইন্টারনেটের কারণে ভারতীয় সিনেমা পৌঁছে গেলো বিশ্বের কাছে। এই সময় নতুন তারকা, পরিচালক এবং নতুন ঘরানার সিনেমার যাত্রা শুরু হলো।

রাজকুমার হিরানি এবং জয়া আখতারের মতো নির্মাতারা বলিউডের চিরচেনা সিনেমাটোগ্রাফি, নাচের মুদ্রা পাল্টে দিলো এবার। লগন, দিল চাহতা হ্যায়, স্বদেশ, কুইন সিনেমাগুলো ব্যক্তি, আধুনিকতা এবং নিজের আত্মবিশ্বাস চাঙ্গা করার কথা বলল।

২০০১ সালের লগন, ২০০৬ সালের রাঙ দে বাসান্তি এবং ২০০৪ সালের স্বদেশ নিয়ে বলিউড এই সময় হাজির করল কাহিনী-নির্ভর সিনেমা।

একই সঙ্গে গল্প বলায় এলো নতুন কৌশল। ২০০১ সালের দিল চাহতা হ্যায় এবং ২০০৯ সালের ওয়েক আপ সিড এই নতুনত্ব নিয়েই হিট হয়েছিল।

এরমধ্যে বলিউডে ঢুকে গেছে স্পেশাল ইফেক্ট। পাশাপাশি বিশ্বে বাজার বেড়েছে এই ইন্ডাস্ট্রির। এই সময় তরুণ-যুবাদের আকৃষ্ট করে এমন গল্প বেছে নেয়া হলো।

নাসরিন মুন্নি কবীর একজন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা এবং লেখক।

বলিউডের নানা যুগ নিয়ে তিনি বলেন, “ভারতীয় দর্শক সবসময়ই সিনেমার সঙ্গে জুড়ে আছে। এমনকি ৭০এর দশকে যুক্তরাজ্যে ১০০টি হলে রবিবারে ভারতীয় সিনেমা দেখানো হতো। ২০০০ সালের দশকে সেখানকার সংবাদমাধ্যমও হিন্দি সিনেমা ও দর্শকের দিকে মনোযোগী হলো। ২০০১-২০০২ সালে অ্যান্ড্রু লিওয়েড ওয়েবারস বম্বে ড্রিমস, দেবদাস কান উৎসবে দেখানো হলো। অস্কারের বিদেশি সিনেমা তালিকায় লগন-এর নাম উঠল।”

”যখন হলে সিনেমা দেখতে পাওয়া যেত না, তখন ভিএইচএস-ডিভিডির দিকে ঝুঁকে গেলো দর্শকরা। ১৯৮০ সালের দশকে, টিভিতে সিনেমা দেখানো হতো। এখন হিন্দি সিনেমা, ওয়েব সিরিজ সবখানেই দেখা যায়। নেটফ্লিক্স, আমাজন হওয়ার ফলে যে কারও জন্য হিন্দি সিনেমা দেখা সহজ হয়ে গেছে।”

”শাহরুখ খান এখন বলিউডের মুখ হয়ে উঠেছেন। তিনি শুধু ভারতীয়দের কাছেই প্রিয়মুখ নন, নানা জাতিগোষ্ঠীর কাছেও জনপ্রিয় তিনি। করণ জোহরের সিনেমা শাহরুখ খানের এই আবেদন গড়ে তুলতে ভূমিকা রেখেছে। এসব সিনেমায় নায়ক চরিত্রে শাহরুখ খান রোমান্টিক, আধুনিক, কিন্তু এরপরও ভারতীয়।”

জেন জি যুগে বলিউড

ডিজিটাল ছোঁয়া লাগতেই বলিউডের চেহারায় আরও চাকচিক্য দেখা গেলো। নেটফ্লিক্স ও আমাজন প্রাইম দর্শকের ধরনের নতুনত্ব এনে দিলো। এরমধ্যে মিলেনিয়ালস এবং জেন জি দর্শক বলিউডকে একটু ঝাঁকি দিয়ে যাচ্ছে। নির্মাতারা এখন প্রতি সিনেমায় নিরীক্ষা করছে এই প্রজন্মের ধরনের সঙ্গে বলিউডকে মানিয়ে নিতে।

২০১০ থেকে ২০২০ সালের দশকে আবারও গল্পের পরিবেশনায় নতুন ধারা নিয়ে কাজ করল বলিউড। এরমধ্যে নায়িকা নির্ভর সিনেমার ধারা দেখা দিয়েছে বলিউডে। ২০১৪ সালের কুইন এবং ২০১৮ সালের রাজি সিনেমা বেশ সাড়া জাগিয়েছিল। আবার শুধুই পরিবার ও বন্ধুদের নিয়ে দেখার জন্য সিনেমার ধারা থেকে বেরিয়ে এসেছে এই সময়ের বলিউড।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ইনফ্লুয়েন্সাররা এখন নির্মাতাদের সঙ্গে সহজেই যোগাযোগের স্তরে চলে এসেছে। এতে করে সিনেমার প্রচার কৌশলে গতি এসেছে বেশ।

সাইন্স ফিকশন সিনেমায় ভিএফএক্স ব্যবহার খুবই বেড়ে গেছে বলিউডে। এখন উন্নত গ্রাফিক্স ডিজাইন, এডিটিং দেখা যাচ্ছে সিনেমায়।

লেখক ও ইতিহাসবিদ শিব বিশ্বনাথান মনে করেন, “সাদাত হোসেন মান্টো যেভাবে দেখেছেন, অনেক বৈষম্য থাকার পরও ভারতকে এক দেখাতে চেয়েছে বলিউড। সুনীল দত্ত ও নার্গিসের সময় থেকে অশোক কুমার পর্যন্ত তাই চলেছে। এরপর বৈষম্যের কথা সামনে আসে। এসব ছিল অমিতাভ বচ্চনের সময় পর্যন্ত। মান্টো থেকে অমিতাভ, এই সময় বলিউড সামাজিক দ্বন্দ্বকে একসঙ্গে পরিবেশনের চেষ্টা করেছে।

”আমার চোখে এখন সিনেমা নয়, রাজনীতিতে বদল চলে এসেছে। সিনেমা রাজনীতি দেখানো হতো আগেও, কিন্তু নরেন্দ্র মোদি ও বিজেপির উত্থানের কারণে সবকিছু অন্যরকম হয়ে গেছে। হুট করে মোদি এবং বিজেপি যেন সিনেমার তারকা হয়ে গেছেন, তারা সিনেমার ধারা নির্ধারণ করে দিচ্ছেন।“

এরপরও নতুন প্রজন্মের উপর বলিউডের প্রভাব একেবারে খালি হয়ে যায়নি। সময়ের সঙ্গে তাল মিলে মানসিক স্বাস্থ্য, সমতা, এলজিবিটিকিউ অধিকার নিয়েও সিনেমার গল্প হচ্ছে।

২০২২ সালের দ্য কাশ্মীর ফাইলস এবং গাঙ্গুবাই কাঠিয়াওয়াড়ি সিনেমা দুটি বলিউডের ইনক্লুসিভ গল্পবলার উদাহরণ।

ভারতের জাতীয় পুরস্কার পাওয়া নির্মাতা মধুর ভান্ডাকার বলেন, “শুধু বলিউড সিনেমা নয়, গোটা ভারতের সিনেমাই এখন নতুন মোড়ে এসে ঠেকেছে। প্রতি পাঁচ বছরে আমরা নতুন একটি যুগ দেখি সিনেমা জগতে। এসময় নতুন বিষয়, নতুন ধারা নিয়ে সিনেমা আসে, যা দর্শকের রুচি বদলের কথা বলতে চায়।

”প্যানডেমিকের সময় ওটিটি প্লাটফর্মে দর্শকরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল। এখানে তারা খুঁজে খুঁজে ভিন্ন স্বাদের সিনেমাও দেখছে। আমার পরিচিত অনেকেই আছেন যারা কখনও দক্ষিণী সিনেমা দেখেননি। অথচ তারা এখন তেলেগু এবং তামিল সিনেমা দেখছেন। আমার মতে মালয়ালাম সিনেমা এখন ভারতের সেরা জায়গায় আছে; এখানে লাগাতার অভিনব ও ব্যতিক্রমী কাজ হচ্ছে।”

”দর্শকরা এখনও ইতালীয়, স্প্যানিশ, কোরিয়ান সিনেমা দেখতে পারছে। ওটিটিতে ডাবিং করা থাকে সিনেমার। ফলে দর্শকের সিনেমার দেখার গণ্ডি এখন অনেক বড়। তামিল সিনেমা মহারাজ যেমন দুর্দান্ত, তেমনি মঞ্জুম্মেল বয়েজ খুবই ভালো সাড়া পেয়েছে। অর্থাৎ দর্শকরা তো সবকিছুই দেখছে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত

No posts found
No posts found