চট্টগ্রামে নির্বাচনী জনসংযোগের সময় নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
বুধবার বিকালে নগরের চান্দগাঁও চালিতাতলী খন্দকারপাড়া এলাকায় এই ঘটনায় আহত এরশাদ উল্লাহসহ অন্তত চারজনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তাদের মধ্যে সারোয়ার হোসেন বাবলা (৪৩) নামে একজন মারা গেছেন। গুলিবিদ্ধ বিএনপির প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ আশঙ্কামুক্ত বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
এরশাদ উল্লাহ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ (চান্দগাঁও-বোয়ালখালী) আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী। তার জনসংযোগের সময় গুলিবর্ষণের এই ঘটনা ‘দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির সেই অপতৎপরতার নির্মম বহিঃপ্রকাশ’ বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সহিংস এই হামলার ঘটনায় কঠোর নিন্দা জানিয়েছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। দ্রুত ঘটনা তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
পুলিশ জানিয়েছে, সারোয়ারের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, অস্ত্র, হত্যাসহ ১৫টি মামলা রয়েছে। তাকে ‘টার্গেট’ করেই বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে গুলি করা হয় বলে ধারণা চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজের। তিনি জানিয়েছেন, ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারে পুলিশ কাজ শুরু করেছে।
প্রথম আলো জানিয়েছে, এরশাদ উল্লাহ বর্তমানে চট্টগ্রাম নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নগর যুবদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ শাহেদ বলেছেন, এরশাদ উল্লাহ আশঙ্কামুক্ত রয়েছেন বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। তার পেটে ছররা গুলি লাগে।
গত ৩ নভেম্বর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আসন্ন সংসদ নির্বাচনে দলটির প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করেন। সেখানে চট্টগ্রাম-৮ আসন থেকে এরশাদ উল্লাহর নাম ঘোষণা করা হয়।
বুধবার বিকালে নগরের চালিতাতলী এলাকায় চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহর সঙ্গে প্রচারে অংশ নেন সারোয়ার। সেখানে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যান তিনি।
বিএনপি বলছে, সারোয়ার তাদের কেউ নন। গণসংযোগে শত শত লোক অংশ নেন।
এর আগে গত ৩০ মার্চ নগরের বাকলিয়া অ্যাকসেস রোড এলাকায় একটি প্রাইভেট কারে গুলি চালিয়ে সারোয়ারকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। ওই সময় প্রাইভেট কারে থাকা দুজন ঘটনাস্থলে মারা যান। সেদিন ভাগ্যক্রমে বেঁচে যান সারোয়ার।
পরে এই মামলায় গ্রেপ্তার আসামিরা জবানবন্দিতেও পুলিশকে জানান, এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ‘সন্ত্রাসী’ সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদের নির্দেশে সারোয়ারকে গুলি করা হয়।
সারোয়ার এক মাস আগে বিয়ে করেন। তার বিয়েতে বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহসহ বেশ কয়েকজন নেতা উপস্থিত ছিলেন। গত বছরের ৫ আগস্টের পর কারাগার থেকে জামিনে বেরিয়ে বিএনপির বিভিন্ন সমাবেশে যোগ দিতে দেখা যায় সারোয়ারকে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এই ঘটনার সঙ্গে বিএনপির কোনও সম্পর্ক নেই। বিএনপির প্রার্থী গণসংযোগ করার সময় সেখানে শত শত লোক অংশ নেন। সারোয়ার সেখানে অংশ নিলে সন্ত্রাসী দুটি দলের মধ্যে পূর্ববিরোধের জেরে তাকে গুলি করা হয়।
বিডিনিউজ জানিয়েছে, বুধবার বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন চালিতাতলী পূর্ব মসজিদের কাছে জনসংযোগের সময় গুলির ঘটনায় মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক এরশাদ উল্লাহসহ পাঁচজন গুলিবিদ্ধ হন।
তাদের অনন্যা আবাসিক এলাকায় এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে সারোয়ারের মৃত্যু হয় বলে চট্টগ্রাম নগর পুলিশের উপ-কমিশনার (উত্তর) আমীরুল ইসলাম জানান।
নিহত সারোয়ার পুলিশের তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী, ইদানিং তিনি নিজেকে বিএনপি কর্মী দাবি করতেন। আর গুলিবিদ্ধ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ইরফানুল হক শান্ত ৩ নম্বর ওয়ার্ড স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক। গুলিবিদ্ধ আমিনুল হক ও মর্তুজা হকও বিএনপির রাজনীতিতে জড়িত।

চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত এক নেতা বিডিনিউজকে বলেন, আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া এরশাদ উল্লাহ চালিতাতলী পূর্ব মসজিদে মাগরিবের নামাজ পড়ে জনসংযোগ শুরু করেন।
“তখন তার সঙ্গে থাকা সারোয়ার বাবলাকে লক্ষ্য করে গুলি করা হয়। এসময় পাশে থাকা এরশাদ উল্লাহ এবং অন্যরা গুলিবিদ্ধ হন।”
এরশাদ উল্লাহর ওপর গুলি ‘সেই অপতৎপরতার’ প্রকাশ : ফখরুল
চট্টগ্রামের বায়েজীদে বিএনপির মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগের সময় গুলিবর্ষণের ঘটনা ‘দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টির সেই অপতৎপরতার নির্মম বহিঃপ্রকাশ’ বলে মনে করছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
বুধবার রাতে এক বিবৃতিতে বিএনপি মহাসচিব এমন মন্তব্য করে চট্টগ্রাম-৮ আসনে দলীয় প্রার্থীর ওপর হামলাকারীদের অবিলম্বে গেপ্তার ও বিচার দাবি করেছেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘‘ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী স্বৈরাচারী শাসকগোষ্ঠীর পতনের পর দুষ্কৃতিকারীরা আবারও দেশে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টিসহ নৈরাজ্যের মাধ্যমে ফায়দা হাসিলের অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। দুষ্কৃতিকারীদের নির্মম হামলায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রাপ্ত এরশাদ উল্লাহসহ আরও একাধিক ব্যক্তি গুলিবিদ্ধের ঘটনা সেই অপতৎপরতারই নির্মম বহিঃপ্রকাশ।”
বিকাল সাড়ে ৫টার দিকে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন চালিতাতলী পূর্ব মসজিদের কাছে তারা গুলিবিদ্ধ হন।
এই হামলার নিন্দা জানিয়ে বিএনপি মহাসচিব বলেন, “বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এবং আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করতেই এ ধরনের ঘটনা ঘটানো হয়েছে। তাই এসব দুষ্কৃতিকারীদের কঠোর হস্তে দমনের বিকল্প নেই।
“গণতন্ত্র ও মানুষের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠাসহ দেশের মানুষের জানমাল রক্ষায় দল, মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নইলে ওঁত পেতে থাকা দুষ্কৃতিকারীরা মাথাচাড়া দিয়ে দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন করতে মরিয়া হয়ে উঠবে।”
এরশাদ উল্লাহসহ যারা গুলিবিদ্ধ হয়ে আহত হয়েছেন তাদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন মির্জা ফখরুল।
সারোয়ারকে ‘টার্গেট’ করে হামলা, বলছেন সিএমপি কমিশনার
চট্টগ্রাম-৮ আসনের বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগের সময় গুলির ঘটনাকে পরিকল্পিত মনে করছে পুলিশ।
আলোচিত এই ঘটনায় সারোয়ার হোসেন বাবলা নামের যে ব্যক্তি মারা গেছেন তাকে ‘টার্গেট’ করেই বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহর জনসংযোগে গুলি করা হয়েছে বলে ধারণা করছেন সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ।
বুধবার রাতে এভার কেয়ার হাসপাতালে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, “প্রাথমিক অনুমানে যেটা মনে হচ্ছে, এরশাদ সাহেব তাদের টার্গেটে ছিলেন না। টার্গেট ছিল সারোয়ার বাবলা, তিনি মারা গেছেন।”
সিএমপি কমিশনার হাসিব আজিজ বলছেন, “এ ঘটনা কারা ঘটাতে পারে আমাদের প্রাথমিক অনুমান আছে। এটা মামলা হবে, তদন্ত হবে। প্রাথমিকভাবে কিছু অনুমান করেছি। কারা করেছে ঘটনাটা। তাৎক্ষণিকভাবে যেটা বলব, এরশাদ উল্লাহ টার্গেট ছিলেন না। সারোয়ার বাবলা টার্গেট ছিলেন। কারণ আমরা যেটা শুনলাম, গুলি করে তার মৃত্যু নিশ্চিত করা হয়েছে।”
সিএমপি কমিশনার বলেন, এটা সারোয়ার বাবলার এলাকা ছিল। বাইরে থেকে এসে হামলা করেছে। এরশাদ উল্লাহ এখানে এসেছেন, নামাজ পড়েছিলেন। সারোয়ারের বিরুদ্ধেও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ আছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের নিন্দা, দ্রুত তদন্তের নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার
বাসস জানিয়েছে, চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী প্রচারণা অনুষ্ঠানে সহিংস হামলার ঘটনায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কঠোর নিন্দা জানিয়েছে।
বুধবার রাতে এক বিবৃতিতে সরকার জানিয়েছে, সিএমপির প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, এরশাদ উল্লাহ এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন না। একটি বিচ্ছিন্ন গুলিতে তিনি আহত হয়েছেন। সরকার তার দ্রুত আরোগ্য কামনা করছে এবং ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সরকার এই অপরাধমূলক ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী সব প্রার্থী ও নাগরিকের নিরাপত্তা এবং অধিকার সুরক্ষায় অটল প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করছে।
বিবৃতিতে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রধান উপদেষ্টা নিরাপত্তা বাহিনীকে নির্দেশ দিয়েছেন, হামলাকারীদের শনাক্ত ও আটক করতে যেন কোনও ধরনের শিথিলতা না থাকে এবং দ্রুত তাদের আইনের আওতায় আনা হয়।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনে সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কোনও স্থান নেই। হামলাকারীদের গ্রেপ্তারে সিএমপি ইতোমধ্যে অভিযান শুরু করেছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সব রাজনৈতিক দল ও তাদের সমর্থকদের শান্ত থাকতে এবং সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়ে বলেছে, আগামী ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন শান্তিপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়সঙ্গত পরিবেশে সম্পন্ন করতে সহায়তা করতে হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সরকার নিজ দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ থেকে সারাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।



