বাজেটে বরাদ্দের অঙ্কগুলোতে খুব একটা পরিবর্তন কি ধরা পড়ে? একটু খতিয়ে দেখলে যে কারও চোখেই ধরা পড়বে যে খুব একটা-হেরফের নেই। বলা যায়, উনিশ-বিশ।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী সেটাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলেন; বললেন, “আগের বাজেট যেভাবে চলে আসছে, সেখান থেকে সংখ্যার তারতম্য হয়েছে, কিন্তু বাজেটের প্রিন্সিপাল একই রয়ে গেছে।”
অথচ এই সরকার স্বাভাবিক সরকারগুলোর মতো নয়। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন থেকে রক্তাক্ত এক অভ্যুত্থানের পথ পাড়ি দিয়ে গঠিত হয়েছে এই অন্তর্বর্তী সরকার। যে সরকারের কর্ণধাররা নিজেদের ‘অভ্যুত্থানের সরকার’ বলেই পরিচয় দেয়।
সেই সরকারের বাজেটে বৈষম্যবিরোধী কথা থাকার কথা, অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন আহমেদের বাজেট বক্তৃতায় সে কথা আছেও। কিন্তু বৈষম্য নিরসনের কোনও দিক-নির্দেশনা কি আছে?
নেই. বলছেন গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ-সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন। তার ভাষ্যে, “বাজেটের যে দর্শন বৈষম্যবিহীন সমাজের কথা বলা হয়েছে, সেই উদ্দেশ্যটার সাথে বাস্তবের যে পদক্ষেপগুলো নেওয়া হয়েছে, সবক্ষেত্রে সেটা সাযুজ্যপূর্ণ হয়নি।”
ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ-টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেছেন, “এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, রাষ্ট্র সংস্কার বিশেষ করে দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারের মূল উদ্দেশ্যকে রীতিমতো উপেক্ষা করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার।”
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক সময়ে গভর্নর সালেহ উদ্দিন অবসর নেওয়ার পর থেকে প্রায় প্রতিটি বাজেট নিয়ে সাংবাদিকদের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আসছিলেন। তিনি এক সময় যেকথাগুলো বলতেন, বাজেট দিতে গিয়ে তিনি কি নিজের পরামর্শগুলো নিজেই রাখতে পেরেছেন?
বাজেটে নির্বাচনের কথা বলা হয়েছে, দৃশ্যত ভোটের কথা মাথায় রেখেই নির্বাচন কমিশনের জন্য বড় বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু আবার প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতিসহ অর্থনীতির বিভিন্ন সূচকের ক্ষেত্রে দূরান্বয়ী লক্ষ্য ঠিক করেছেন সালেহ উদ্দিন। তাহলে কি এই সরকার আরও বেশি সময়ের কথাও চিন্তা করছে, সেই প্রশ্ন সামনে এসে যায়।

সব মিলিয়ে অস্থিরতা-অনিশ্চয়তার মধ্যেই ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের জন্য ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের সরকারি ফর্দ সোমবার দেশবাসীর সামনে হাজির করলেন সালাহ উদ্দিন আহমেদ।
টানা দেড় দশক ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে তোলার দাবি করে আসছিল, তাদের বাজেটেও ছিল তার উচ্চারণ। কিন্তু গত বছর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে তারা ছিটকে গেছে রাজনীতির সড়ক থেকেই। তারপর বেরিয়ে আসছে ওই সরকারের দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনার চিত্র।
সেই অবস্থায় দাঁড়িয়ে এখন গতি নয়, অর্থনীতির ভিত মজবুত করার ওপরই বেশি জোর দেওয়ার কথা বলেছেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহ উদ্দিন। জিডিপি প্রবৃদ্ধির যে অঙ্ককে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক প্রচারের হাতিয়ার করে তুলেছিল, সেদিকে না তাকিয়ে মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরে মানুষকে স্বস্তি দিয়ে অর্থনীতিকে সুসংহত করার কথা বলেছেন সালেহ উদ্দিন।
সেজন্য বাজেটের আকার সামান্য কমিয়েছেন তিনি, আবার রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যও ধরেছেন বিশাল (৫ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা), অঙ্কটি আওয়ামী লীগ সরকারের মতোই।
বিদায়ী ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯৭ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছিল ৫ লাখ ৫১ হাজার কোটি টাকা; আশানুরূপ আদায় না হওয়ায় পর তা কমিয়ে ৫ লাখ ১৮ হাজার কোটি টাকায় নামিয়ে এনেছে অন্তবর্তী সরকার। জুলাই-মার্চ পর্যন্ত অর্থাৎ নয় মাসে আদায় হয়েছে ৩ লাখ ৯ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা। সিপিডি বলেছে, এবার রাজস্ব ঘাটতি লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।
এমন পরিস্থিতিতে নতুন বাজেটে প্রায় পৌনে ৬ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রাকে উচ্চাভিলাষী বলে মনে করছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও সানেমের (সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান।
তিনি সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “বর্তমানে দেশের যে অবস্থা সর্বত্র অস্থিরতা, ভয়-আতঙ্ক। বিনিয়োগ নেই। এই অবস্থায় রাজস্বের বিশাল এই লক্ষ্য কোনোভাবেই অর্জন করা সম্ভবপর নয়।”
অর্থ উপদেষ্টা তার বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরেছেন ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সাময়িক হিসাবে বিদায়ী অর্থ বছরে ৩ দশমিক ৯৭ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সাড়ে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করেন এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম, এবারের মতোই সংসদের বাইরে ২০০৮ সালে তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অর্থ উপদেষ্টা হিসাবে বাজেট দিয়েছিলেন তিনি।
মির্জ্জা আজিজ সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “অর্থ উপদেষ্টা বলেছেন, প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধির পরিবর্তে অর্থনীতির ভিত মজবুত করার দিকে অধিকতর গুরুত্ব দিয়েছেন বাজেটে। কিন্তু দেশের যে অবস্থা—বিনিয়োগ নেই, সর্বত্র হতাশা-ক্ষোভ অনিশ্চয়তা। জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সংঘর্ষের আশঙ্কাও আছে। এ অবস্থায় সাড়ে ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য ছাড়া আর কিছুই নয়।”
দেশের বর্তমান বাস্তবতাকে বিবেচনায় নিয়ে এই বাজেট দেওয়া হয়নি বলে মনে করেন তিনি। “বাজেটের আকার আরও অনেক ছোট হলেও কোনও সমস্যা ছিল না। বাস্তবায়নের দিকে বেশি মনোযোগ দিলেই যথেষ্ট ছিল,” বলেন তিনি।
অভ্যুত্থান পরবর্তী নৈরাজ্যকর পরিস্থিতির মধ্যে গত বছরের আগস্টে দায়িত্ব নেয় ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি বাগে আনতে বেশ বেগ পেতে হয় তাদের।
তারপর ১০ মাস গড়ালেও স্বস্তিতে নেই বাংলাদেশ। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশেই নানা ক্ষেত্রে চলছে অস্থিরতা। কোনও না কোনও দাবিতে প্রায় প্রতিদিনই চলছে কারও না কারও বিক্ষোভ, প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা ঘেরাওয়ের ঘটনা ঘটছে।
আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে সর্বত্র ভয়-আতঙ্ক বিরাজ করছে। ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগ করছেন না বলে ব্যবসা-বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছে। বিনিয়োগ গত এক দশকে সর্বনিম্ন স্তরে নেমে এসেছে।
জাতীয় নির্বাচন করে হবে- তা নিয়েও অনিশ্চয়তা কাটছে না। এমন অবস্থায় বাজেট দিয়ে সালেহ উদ্দিন বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম লক্ষ্য হলো একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠা করা এবং গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর।”
রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাজেটে পরিবর্তনের আশা করছিলেন সেলিম রায়হান। তবে হতাশ হতে হয়েছে তাকে।
তিনি বলেন, “আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম, এবারের বাজেট বৈষম্যবিরোধী নতুন কিছু হবে। কর্মসংস্থানের জন্য ব্যাপক পদক্ষেপ নেওয়া হবে। কিন্তু সে প্রত্যাশার কিছুই নেই বাজেটে। মোটা দাগে বলা যায়, পুরাতন বাজেট কাঠামোর মধ্যে নতুন কিছু বলার চেষ্টা করা করেছেন অর্থ উপদেষ্টা।
“অতীতের সরকারের ধারাবাহিকতায় বড় বাজেট দিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। এই বাজেট বাস্তবায়ন অসম্ভব। প্রত্যাশা বেশি ছিল; কিন্তু ভিন্ন কিছু, নতুন কিছু নেই এই বাজেটে।”
তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টির লক্ষ্যে ১০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল গঠনের একটি প্রস্তাব রয়েছে বাজেটে। এবিষয়ে বিস্তারিত কিছু নেই বাজেটে।
আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সীমা বাড়িয়ে ৫ লাখ টাকা করার কথা বলেছেন সালেহ উদ্দিন।
তরুণদের দেশের উন্নয়নে সম্পৃক্ততা বাড়াতে ‘তারুণ্যের উৎসব’ উদ্যাপনের জন্য ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখছেন তিনি। কিন্তু এতে কী হবে, তাও স্পষ্ট নয়।
মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের প্রকৃত আয় কমে গেলেও করমুক্ত আয়সীমা বাড়াতে চাননি সালেহ উদ্দিন। তবে এক বছর পর বাড়ানোর হিসাব দিয়ে আশা দেখিয়েছেন তিনি। কিন্তু ততদিন কি অন্তর্বর্তী সরকার থাকবে?
প্রস্তাবিত বাজেট খুশি করতে পারেনি ব্যবসায়ী মহলকেও। ডিসিসিআই বলেছে, এই বাজেট ততটা আশাব্যঞ্জক নয়। সংগঠনের সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেছেন, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, ব্যবসা পরিবেশ উন্নয়ন, সিএমএসএমই এবং ব্যাংকিং খাত সংস্কার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই বাজেটে।
অনেক ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপের অনুপস্থিতির কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেশ চাপের মধ্যে থাকার আশঙ্কার কথাও বলেছেন তিনি।
তাসকীন বলেন, “বাজেটে মূল্যস্ফীতি হ্রাসে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করা হলেও ব্যবসায়িক কার্যক্রম পরিচালন ব্যয় বাড়বে, যা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতির গতিকে মন্থর করবে।”

জাতীয় অর্থনীতিতে যে মন্থর গতি, তার পেছনের কারণ হিসাবে বিশ্ব অর্থনীতিকে দেখিয়েছেন সালেহ উদ্দিন।
সেই সঙ্গে দেশের মধ্যে যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন, সে কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, “মাত্র অল্প কয়েক মাসে কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে দেশকে স্থিতিশীল করার কাজটি প্রায় সম্পন্ন করে আনা সম্ভব হলেও পরিপূর্ণ সাফল্যের দোরগোড়ায় পৌঁছুতে আমাদের এখনও অনেকটা পথ পেরোতে হবে।
“গত এপ্রিল মাসে মার্কিন প্রশাসন কর্তৃক আরোপিত অতিরিক্ত শুল্কের নেতিবাচক প্রভাবও আমাদের অর্থনীতির ওপর পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া, সম্প্রতি যে বাজারভিত্তিক মুদ্রা বিনিময় হার চালু করা হয়েছে, তার কোনও নেতিবাচক প্রভাব আপাতত বাজারের ওপর পড়ার সম্ভাবনা না থাকলেও এ বিষয়ে আমাদের সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হচ্ছে।”
“এ সকল ঝুঁকি মোকাবেলা করে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি বৈষম্যহীন ও টেকসই ভিত্তি নিশ্চিত করা এখন আমাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। আপাতত প্রবৃদ্ধির গতি বৃদ্ধির পরিবর্তে অর্থনীতির ভিত মজবুত করার দিকে আমরা অধিকতর মনোযোগ দিচ্ছি। এ শক্তিশালী ভিতই হবে আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণের সোপান,” বলেন সালেহ উদ্দিন।
সেই ভিত অর্জনে দেশবাসীর সহায়তা চেয়েছেন তিনি।
জাতীয় সংসদ না থাকায় এবারও ২০০৭ ও ২০০৮ সালের মতো ভিন্নভাবে উপস্থাপন হয় বাজেট প্রস্তাব। বেতার ও টিভি ভাষণে তা উপস্থাপন করেন অর্থ উপদেষ্টা।
প্রথা অনুযায়ী, প্রতি বছর জুন মাসের প্রথম সপ্তাহের বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়ে থাকে। কিন্তু এবার দেশের ভিন্ন প্রেক্ষাপটে বাজেট দিল অন্তর্বর্তী সরকার। সে কারণে আগের প্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে হয়েছে। আগামী ৫ থেকে ১৪ জুন পর্যন্ত কোরবানির ঈদের ছুটি বলে বাজেট ২ জুন সোমবার দেওয়া হয়েছে।
এই বাজেট সংসদে পাসের কোনও বিষয়ও নেই। উপদেষ্টা পরিষদ অনুমোদিত এই বাজেট জুন মাসের শেষে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ জারির মধ্য দিয়ে কার্যকর হবে।



