আগের মতোই সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করল বাংলাদেশ ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার বিকালে গভর্নর আহসান এইচ মনসুর চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছেন, তাতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত রেখে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা আরও কমিয়ে আনা হয়েছে।
মূল্যস্ফীতি যতদিন ৭ শতাংশের নিচে না নামবে, ততদিন নীতি সুদহার কমবে না বলে জানিয়েছেন গভর্নর। এটি আহসান মনসুরের দ্বিতীয় মুদ্রানীতি।
মূল্যস্ফীতি সহনীয় পর্যায়ে নামিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংক বেশ কিছুদিন ধরে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি নিয়ে এগোচ্ছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত ২০২৪-২৫ অর্থ বছরের দ্বিতীয়ার্ধের (জানুয়ারি-জুন) মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার (পলিসি রেট বা রেপো রেট) ১০ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়।
রেপোর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো এক দিনের জন্য টাকা ধার নেয়। একে বলা হয় ব্যাংকিং খাতের নীতি উপাদান (পলিসি টুলস)। এর সুদহারকে বলা হয় নীতি সুদহার বা রেপো রেট। এর মাধ্যমে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে তারল্য ও বিনিয়োগ নিয়ন্ত্রণ করে।
রেপোর সুদ বাড়লে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ব্যাংকগুলোর তহবিল পাওয়ার খরচ আরও বাড়ে। তাতে ব্যাংক থেকে ব্যবসায়ীদের ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রেও সুদহার বেড়ে যায়।
এই হার অপারিবর্তিত রাখার মানে হলো, বাজারে মুদ্রাপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক আপাতত সুদহারের লাগাম শিথিল করছে না।
রাজধানী ঢাকার মতিঝিলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সম্মেলন কক্ষে সংবাদ সম্মেলনে এই মুদ্রানীতি ঘোষণা করেন গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
নতুন মুদ্রানীতিতে আন্তঃব্যাংক ধার নেওয়ার ক্ষেত্রে নীতি সুদহার স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫০ শতাংশ অপরিবর্তিত থাকছে। আর স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৮ শতাংশই থাকছে। ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে টাকা রাখার ক্ষেত্রে এ সুদহার প্রযোজ্য হয়।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের প্রথম মুদ্রানীতিতে মুদ্রা সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা সামান্য বাড়িয়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ ধরা হয়েছে। গত জুন পর্যন্ত মুদ্রা সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ ছিল। তবে অর্জিত হয়েছে ৭ শতাংশ।
মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে নীতি সুদের এ হার টানা বাড়িয়ে আসছিল কেন্দ্রীয় ব্যাংক। সেই ধারা অব্যাহত রেখে এবারও নিজের ‘আমলের’ দ্বিতীয় মুদ্রানীতি ঘোষণা করলেন আহসান মনসুর।
নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২০ শতাংশ। আগের মুদ্রানীতিতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯ দশমিক ৮০ শতাংশ।
সরকারি খাতে ঋণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২০ দশমিক ৪০ শতাংশ, যা আগের মুদ্রানীতিতে ছিল ১৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। আর গত বছরের ডিসেম্বর শেষে ছিল ১৪ দশমিক ২ শতাংশ।
মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে গিয়ে গভর্নর আহসান মসুর বলেন, “মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমছে। তবে এখনও আমাদের কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় আসেনি। আমাদের লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি ৩ থেকে ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা। মূল্যস্ফীতি কমে গত জুনে ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমেছে। বিনিময় হার স্থিতিশীল থাকা এবং উৎপাদন ভালো হওয়ায় এটা কমছে। চাল ছাড়া সব পণ্যের দর স্থিতিশিল রয়েছে।”
চালের দাম প্রসঙ্গে গভর্নর আরও বলেন, “চালের দাম কেন বাড়ছে, এই মৌসুমে, এটা কিন্তু এক্সপেকটেড না। সরকার ৪ লাখ টন চাল আমদানির প্রক্রিয়ায় আছে। আমিও সরকারকে বলেছি আরও কিছু আমদানি বাড়িয়ে বাজারকে স্থিতিশীল রাখার জন্য। প্রয়োজন হলে ১৪ লাখ টন আমদানি করা হবে।”
তবে চালের দাম বেশি হওয়ায় কৃষকরা উপকৃত হচ্ছেন, তারা খুশি হচ্ছেন– এমন কথাও বলেন আহসান মনসুর।
গভর্নর বলেন, “বর্তমান বাস্তবতায় ৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি খারাপ না। একটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে—প্রবৃদ্ধির জন্য রাজনৈতিক স্থিতিশিলতা একটা বড় বিষয়।”
এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আমানতকারীদের আতঙ্কের কিছু নেই। তাদের সঞ্চয় সম্পূর্ণ নিরাপদ। এবার বড় আকারে সার্জারি করা হবে। সরকার বড় অঙ্কের তহবিল যোগান দেবে। মুনাফাসহ সেই টাকা ফেরত নিতে পারবে সরকার।”
নতুন মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, ডলার বিনিময় হারকে স্থিতিশীল রাখতে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্গঠনে বাজারে হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখবে বাংলাদেশ ব্যাংক।
গভর্নর বলেন, “এক্সপোর্টের কাঁচামাল আমদানি কিন্তু কমেনি। আগামী ২-৩ বছর যদি বেসরকারি বিনিয়োগ নাও হয়, তবুও আমাদের রপ্তানি বাড়বে। কারণ গার্মেন্টসগুলো তাদের ক্যাপাসিটির ম্যাক্সিমাম লেভেলে এখনও পৌঁছায়নি। বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাজ নয়। লোনেবল ফান্ড বেশি হলেই বিনিয়োগ বাড়বে।”
ব্যালেন্স অব পেমেন্টে উদ্বৃত্ত থাকার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ব্যাংক খাত থেকে ডলার কেনার কারণে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা বাজারে ঢুকেছে। ফলে পুঁজিবাজারও ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
“ডিপোজিট যদি না বাড়ে, তাহলে প্রাইভেট সেক্টরে ক্রেডিট গ্রোথ হবে কীভাবে? নেট ফরেন অ্যাসেট বাড়তে শুরু করেছে। এটা বাড়ার সঙ্গেসঙ্গে বাজারে টাকার লিকুইডিটিও বাড়বে।”
গভর্নর বলেন, “বাজারে যথেষ্ট ডলার থাকার কারণে ৫০ কোটি ডলার কিনেছি, বাজার স্থিতিশীল রাখতে আগামীতে আরও কেনা হবে।”
তিনি বলেন, “মূল্যস্ফীতি কমে এলে এবং বাজার স্থিতিশীল রাখতে পারলে প্রবৃদ্ধি বাড়বে। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী বছর প্রবৃদ্ধি হবে ৫ থেকে ৬ শতাংশ।”
বাংলাদেশ ব্যাংককর্মীদের পোশাকবিধি নিয়ে ঘটে যাওয়া বিষয়টি বিব্রতকর ছিল মন্তব্য করে আহসান মনসুর বলেন, “যা কিছু হয়েছে আমার অনুপস্থিতিতে হয়েছে। আমার নজরে আসার পর আমি সেটি স্থগিত করেছি।”
বিদেশিরা পোশাকবিধি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন, সাংবাদিকরা এ নিয়ে জানতে চাইলে গভর্নর বলেন, “পোশাকের বিষয়টি অভ্যন্তরীণ প্রাথমিক আলোচনার বিষয় ছিল। এ নিয়ে বিদেশিদের নাক গলানোর দরকার নেই।”
আহসান মনসুর বলেন, “মূল্যস্ফীতি ও ব্যাংকিং খাত স্থিতিশীল রাখা, বাংলাদেশ ব্যাংকের দুটি প্রধান কাজ। আমরা সেটাই করছি।”
পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করার কাজ চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, “এরপর আরও পাঁচটি ব্যাংককে করা হবে। এভাবে ১৫ ব্যাংককে একীভূত করে সরকার বেশি বিনিয়োগ করে বেশি মুনাফা নিয়েই ফিরবে।
গভর্নর বলেন, “বিশ্ববাজারে অস্থিরতা, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক, বৈদেশিক চাহিদা হ্রাস ও রপ্তানি আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কার কারণে আমরা এখনও রক্ষণাত্মক অবস্থানে আছি। মে মাস থেকে পুরোপুরি বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু করা হয়েছে, যা রিজার্ভ স্থিতিশীলতা রাখতে সহায়ক হয়েছে।
“নতুন মুদ্রানীতিতে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্বচ্ছতা আনতে প্রতিদিন দুবার রেফারেন্স রেট প্রকাশের সিদ্ধান্তও কার্যকর রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে বাজারে হস্তক্ষেপ করে মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করবে বাংলাদেশ ব্যাংক।”
জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের মুদ্রানীতিতে বলা হয়, বিশ্বব্যাপী বাণিজ্য উত্তেজনা, শুল্ক বৃদ্ধি এবং মন্দার সম্ভাবনার কারণে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে রপ্তানিতে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। অপরদিকে দেশের অভ্যন্তরে আগামী নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ধীর বিনিয়োগ প্রবৃদ্ধি ও উচ্চ খেলাপি ঋণ অর্থনীতিতে বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
খেলাপি ঋণের হার কমাতে ব্যাংকিং খাতে শিগগিরই ঝুঁকিনির্ভর তদারকি ব্যবস্থা চালু করা হবে, যার বাস্তবায়ন শুরু হবে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে। এছাড়া অডিটেড কোয়ালিটি রিভিউয়ের ভিত্তিতে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সবশেষ ফেব্রুয়ারিতে ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি ৭ থেকে ৮ শতাংশের মধ্যে আটকে রাখার আশ্বাস দিয়েছিল। আর ২০২৪ সালের জুন-ডিসেম্বরের মুদ্রানীতিতে মূল্যস্ফীতির ৬ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখার লক্ষ্য ধরা হয়েছিল, যদিও জানুয়ারিতে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ ছিল।
গত জুনে দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশে নেমে আসার তথ্য দিয়েছে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো-বিবিএস, যা ৩৫ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থ বছরের বাজেটে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ৫ শতাংশে আটকে রাখতে চেয়েছে সরকার।



