ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ সোশাল মিডিয়া বন্ধে নেপাল সরকারের সিদ্ধান্তে ফুঁসে উঠেছে দেশটির জেন জি প্রজন্ম। তাদের বিক্ষোভে পুলিশের বাধা পরিস্থিতি করে তুলেছে সহিংস। তাতে একদিনেই নিহত হয়েছে অন্তত ১৪ জন।
নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুসহ দেশটির প্রধান প্রধান শহরে সোমবার ব্যাপক বিক্ষোভ হয় বলে খবর এসেছে আন্তর্জাতিক সব সংবাদমাধ্যমে।
তার মধ্যে কাঠমান্ডুর নিউ বানেশ্বর এলাকায় কারফিউ ভঙ্গ করে বিক্ষোভে নামা তরুণদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে অন্তত ১৪ জন নিহত হয় বলে কাঠমান্ডু পোস্ট জানিয়েছে।
বিক্ষোভকারীদের ‘জেন জি’ হিসাবে দেখিয়ে সংবাদ পোর্টালটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভ দমনে পুলিশ জলকামান, কাঁদুনে গ্যাস এবং গুলি ব্যবহার করে। বিকাল ৪টা পর্যন্ত নিউ বানেশ্বর এলাকায় পুলিশের গুলিবর্ষণে অন্তত ১৪ জন নিহত হয়েছে।
জাতীয় ট্রমা সেন্টারের চিকিৎসক ডা. দীপেন্দ্র পান্ডে কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, এখানে আনা সাতজন বিক্ষোভকারী মারা গেছে। মাথা ও বুকে গুলির গুরুতর জখম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১০ জন।
বানেশ্বরের এভারেস্ট হাসপাতালের কর্মকর্তা অনিল অধিকারী সেখানে তিনজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন। সেখানে ৫০ জনেরও বেশি চিকিৎসাধীন রয়েছে, তার মধ্যে চারজনের অবস্থা গুরুতর।
সিভিল হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক মোহন চন্দ্র রেগমি ওই হাসপাতালে দুজনের মৃত্যুর কথা জানিয়েছেন। এছাড়া কেএমসি এবং ত্রিভুবন ইউনিভার্সিটি টিচিং হাসপাতালে আরও দুজনের লাশ রয়েছে।
নিহতদের পরিচয় এখনও নিশ্চিত করা যায়নি।
নেপালের কমিউনিস্ট পার্টির (সংযুক্ত মার্কসবাদী-লেনিনবাদী) নেতা কে পি শর্মা ওলি নেতৃত্বাধীন সরকার আমলে এটাই সহিংসতার সবচেয়ে বড় ঘটনা।
মাওবাদী নেতা পুষ্পমহল দহাল প্রচণ্ডের সঙ্গে জোট ভেঙে যাওয়ার পর গত বছরের জুলাইয়ে নেপাল কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধে চতুর্থ বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন ওলি।
কেন এই বিক্ষোভ?
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, সরকারের দুর্নীতি নিয়ে জনঅসন্তোষ ছিল। সোশাল মিডিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর সেই পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছে।
গত বৃহস্পতিবার নেপাল সরকার ফেইসবুক ও ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন সোশাল মিডিয়া অ্যাপ নিষিদ্ধ করে। তার কারণ হিসাবে বলা হয়, এই টেক জায়ান্টগুলো সরকারের যোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধিত হয়নি।

সরকারের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে ২৮ আগস্ট থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে সরকারি দপ্তরে নিবন্ধনের জন্য সময় দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু মেটা (ফেইসবুক, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ), অ্যালফাবেট/গুগল (ইউটিউব), এক্স (সাবেক টুইটার), রেডিট এবং লিঙ্কডইন নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আবেদন জমা দেয়নি।
সরকারের এই নির্দেশনা আসে গত বছর নেপাল সুপ্রিম কোর্টের দেওয়া একটি আদেশের আলোকে। সেই আদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোকে একজন স্থানীয় যোগাযোগ কর্মকর্তা এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য একজন কর্মকর্তা নিয়োগের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
টিকটক, ভাইবার, উইটক, নিম্বাস ও পোপো লাইভ এরই মধ্যে সরকারের কাছে নিবন্ধিত হয়েছে বলে নেপালে সেগুলো সচল রয়েছে। টেলিগ্রাম এবং গ্লোবাল ডায়েরির আবেদন করেছে, তা এখন যাচাইয়ের পর্যায়ে রয়েছে।
বিক্ষোভকারীরা কী চায়?
নেপালে ফেইসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ এবং ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারকারী প্রায় ৩৬ লাখ। এদের মধ্যে অনেকেই ব্যবসার জন্য এই অ্যাপগুলোর ওপর নির্ভরশীল।
যখন এসব প্ল্যাটফর্ম নেপালে বন্ধ হয়ে যায়, তখন ক্ষতিগ্রস্তরা প্রতিবাদ শুরু করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ওপর নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে এই প্রতিবাদ এখন দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে বলে কাঠমান্ডু পোস্টের ভাষ্য।
বিক্ষোভে যোগ দেওয়া ২৪ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইয়ুজন রাজভান্ডারী বলেন, “সোশাল মিডিয়া বন্ধের কারণে আমরা প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়েছি, কিন্তু এখানে জড়ো হওয়ার এটাই একমাত্র কারণ নয়। আমরা নেপালে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির প্রতিবাদ করছি।”

২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ইক্ষামা টুমরোক বলেন, তারা সরকারের ‘স্বৈরাচারী মনোভাবের’ বিরুদ্ধে বিক্ষোভে নেমেছেন।
“আমরা পরিবর্তন দেখতে চাই। অন্যরা হয়ত এটি সহ্য করেছে, কিন্তু আমাদের প্রজন্মকে এর অবসান ঘটাতে হবে।”
সোশাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে একজন বিক্ষোভকারীকে বলতে শোনা যায়, “যখন নেতাদের ছেলে-মেয়েদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আছে, তখন আমাদের ভবিষ্যৎ কোথায়?”
সরকার কী বলছে?
বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে রবিবার সরকারের এক বিবৃতিতে বলা হয়, জনগণের চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার প্রতি সরকার পুরোপুরি শ্রদ্ধাশীল। সরকার জনগণের অবাধ মত প্রকাশের পরিবেশ সুরক্ষিত রাখতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এর আগে নেপাল সরকার টেলিগ্রাম অ্যাপ বন্ধ করে দিয়েছিল এই অভিযোগে যে এটি অনলাইন জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল।
গত বছর নেপাল সরকার টিকটকও নিষিদ্ধ করেছিল। কিন্তু প্ল্যাটফর্মটি নেপালের নিয়ম-কানুন মেনে চলতে সম্মত হলে আগস্ট মাসে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়।

চলমান বিক্ষোভ নিয়ে সরকারের অভিযোগ, নানা ভুয়া আইডি ব্যবহার করে নানা ধরনের অপতথ্য ছড়ানো হচ্ছে।
কাঠমান্ডু প্রশাসনের মুখপাত্র মুক্তিরাম রিজাল জানিয়েছেন, পরিস্থিতি শান্ত করতে কারফিউ জারি করা হয়েছে এবং তা রাত ১০ পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
গুলিতে বিক্ষোভকারী নিহত হওয়ার বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে তিনি বলেন, বিক্ষোভ দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জলকামান, রবার বুলেট ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
তথ্যসূত্র : কাঠমান্ডু পোস্ট, এনডিটিভি, হিন্দুস্থান টাইমস, রয়টার্স



