উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসায় এক সম্ভাব্য যুগান্তকারী অগ্রগতি এসেছে নতুন একটি ওষুধ থেকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যারা দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ওষুধ খেয়েও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছেন না, তাদের জন্য এটি হতে পারে আশার আলো।
গবেষক দল জানিয়েছেন, অ্যাস্ট্রাজেনেকার তৈরি নতুন ওষুধ ‘বাক্সড্রোস্ট্যাট’ গ্রহণের ফলে রোগীদের রক্তচাপের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। এই ওষুধ এমন এক এনজাইমকে ব্লক করে, যা শরীরে অ্যালডোস্টেরন হরমোন তৈরি করে। অ্যালডোস্টেরন শরীরের লবণের ভারসাম্য ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক ব্রায়ান উইলিয়ামসের নেতৃত্বে পরিচালিত গ্লোবাল বাক্সএইচটিএন ট্রায়ালে ২১৪টি ক্লিনিক থেকে প্রায় ৮০০ রোগী অংশ নিয়েছিলেন। ১২ সপ্তাহের পরীক্ষার পর দেখা যায়, বাক্সড্রোস্ট্যাট গ্রহণকারীদের রক্তচাপ গড়ে ৯ থেকে ১০ এমএমএইচজি (রক্তচাপ পরিমাপের একক) পর্যন্ত কমেছে। গবেষকরা বলছেন, এ হ্রাস হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে যথেষ্ট কার্যকর।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাক্সড্রোস্ট্যাট গ্রহণকারীদের মধ্যে প্রায় চারজনের একজন স্বাভাবিক রক্তচাপে পৌঁছেছেন, যা প্রচলিত চিকিৎসায় খুবই কম দেখা যায়।
অধ্যাপক উইলিয়ামস বলেন, “উচ্চ রক্তচাপ বিশ্বব্যাপী প্রায় ১.৩ বিলিয়ন মানুষকে প্রভাবিত করছে। এটি হৃদরোগ, স্ট্রোক, কিডনি বিকল হওয়া এমনকি ডিমেনশিয়ার ঝুঁকি বাড়ায়। বর্তমান ওষুধগুলো কার্যকর হলেও সব রোগীর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না। সেই জায়গাতেই বাক্সড্রোস্ট্যাট নতুন সম্ভাবনা এনে দিয়েছে।”
তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, অ্যালডোস্টেরন ১৯৫২ সালে আবিষ্কৃত হলেও মাত্র গত এক দশকে গবেষকরা এর প্রকৃত গুরুত্ব উপলব্ধি করেছেন। উচ্চ মাত্রায় এই হরমোন থাকলে অনেক রোগীর রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে যায়। বাক্সড্রোস্ট্যাট এই উৎপাদন প্রক্রিয়াকে সরাসরি থামিয়ে দেয়, ফলে হরমোনের মাত্রা স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে আসে।
“পুরনো ওষুধগুলো অ্যালডোস্টেরনকে ঘুরপথে লক্ষ্য করত। কিন্তু এই ওষুধটি মূল উৎসকে নিয়ন্ত্রণ করে। পুরোপুরি বন্ধ না করে, বরং একটি স্বাস্থ্যবান মানুষের স্বাভাবিক স্তরে নামিয়ে আনে। এটিই এর সবচেয়ে বড় শক্তি,” বলেছেন উইলিয়ামস।
শুধু যুক্তরাজ্যেই বর্তমানে প্রায় ১৪ মিলিয়ন মানুষ উচ্চ রক্তচাপে ভুগছেন। এর মধ্যে প্রায় ১০ মিলিয়ন মানুষ সরাসরি এই নতুন চিকিৎসা থেকে উপকৃত হতে পারেন বলে অনুমান করা হচ্ছে। বৈশ্বিকভাবে উপকারভোগীর সংখ্যা দাঁড়াতে পারে অর্ধেক বিলিয়ন।
উচ্চ রক্তচাপকে প্রায়ই বলা হয় ‘নীরব ঘাতক’। কারণ এটি সাধারণত কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছাড়াই শরীরে ক্ষতি চালিয়ে যায়। চিকিৎসা না করলে এটি হৃদরোগ ও স্ট্রোকের মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে।
অ্যাস্ট্রাজেনেকা জানিয়েছে, তারা চলতি বছরের মধ্যেই বাক্সড্রোস্ট্যাটকে ওষুধ নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের জন্য জমা দেবে। যদি অনুমোদন মেলে, তবে এটি হতে পারে উচ্চ রক্তচাপ চিকিৎসায় গত কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই ওষুধ কেবল রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণেই নয়, রোগীদের ওপর দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ নির্ভরতা কমাতেও সহায়ক হবে।
তথ্যসূত্র : দ্য ইন্ডিপেনডেন্ট



