Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬
Beta
মঙ্গলবার, ৪ আগস্ট, ২০২৬

সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখিয়ে লতিফ সিদ্দিকীকে পাঠানো হলো কারাগারে

পরে পুলিশ সদস্য এসে লতিফ সিদ্দিকীসহ বেশ কয়েকজনকে পুলিশ ভ্যানে নিয়ে যান। ছবি : হারুন-অর-রশীদ
রিপোর্টার্স ইউনিটিতে হট্টগোলের পর পুলিশ সদস্য এসে লতিফ সিদ্দিকীসহ বেশ কয়েকজনকে পুলিশ ভ্যানে নিয়ে যান। ছবি : হারুন-অর-রশীদ
[publishpress_authors_box]

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে হেনস্থার শিকার আব্দুল লতিফ সিদ্দিকীকে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে পাঠিয়েছে আদালত।

বর্ষীয়ান এই রাজনীতিকের সঙ্গে আরও যে ১৫ জনকে বৃহস্পতিবার পুলিশ তুলে নিয়ে গিয়েছিল, সবাইকেই একই মামলার আসামি করে কারাগারে পাঠানোর আদেশ শুক্রবার দিয়েছে ঢাকার আদালত।

এদিকে মব সন্ত্রাসের শিকার হওয়ার পর লতিফ সিদ্দিকীসহ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে পুলিশি আচরণের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বিভিন্ন সংগঠন। রিপোর্টার্স ইউনিটিও প্রতিবাদ জানিয়েছে তাদের অঙ্গনে এই ধরনের ঘটনার জন্য।

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে বৃহস্পতিবার ‘মঞ্চ ৭১’ নামে মুক্তিযোদ্ধাদের নতুন একটি সংগঠনের গোলটেবিল আলোচনায় গিয়েছিলেন ২০০৯ ও ২০১৪ সালের আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী।

আলোচনা চলার মধ্যে ‘জুলাই যোদ্ধা’ পরিচয় দিয়ে এক দল ব্যক্তি ঢুকে পড়ে সেখানে। তারা আলোচনা সভার ব্যানার ছিঁড়ে ফেলে, গালাগালির সঙ্গে গায়ে হাত দিয়ে ধাক্কাও দেয় লতিফ সিদ্দিকীসহ অন্যদের।

এরপর পুলিশ গিয়ে লতিফ সিদ্দিকীসহ ১৬ জনকে তুলে নিয়ে আসে, তাদের রাখা হয় মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশের কার্যালয়ে।

লতিফ সিদ্দিকীদের গ্রেপ্তার করা হলো কি না, তা নিয়ে রাত পর্যন্ত পুলিশ স্পষ্ট করে কিছু বলছিল না।

এরপর রাতে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মো. শফিকুল ইসলামকে উদ্ধৃত করে বিবিসি বাংলা জানায়, লতিফ সিদ্দিকসহ অন্যদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

তিনি বলেন, “লতিফ সাহেবের বক্তৃতা দেখলাম, যেই ব্যানারে আসছে সেই ব্যানারটা দেখলাম। এছাড়া, তাদের কলাম-বই এসব অ্যানালাইসিস করে দেখলাম, একটা নির্দিষ্ট দিকে যাচ্ছে। তারা যে সমস্ত বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছে, তা রাষ্ট্রের অবস্থানের সাথে কন্ট্রাডিক্টরি।”

শাহবাগ থানায় করা এই মামলায় তাদের গ্রেপ্তার দেখিয়ে কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শাহবাগ থানার এসআই তৌফিক হাসান।

শুক্রবার সকালে ঢাকার মহানগর হাকিম সারাহ্ ফারজানা হকের আদালতে এই আবেদনের শুনানি হয়। অন্য আসামিদের পক্ষে জামিন চাওয়া হলেও লতিফ সিদ্দিকী সেই আবেদন করেননি। শুনানি শেষে সবাইকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন হাকিম সারাহ্ ফারজানা।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন- ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ হাফিজুর রহমান কার্জন, মো. আব্দুল্লাহ আল আমিন, মঞ্জুরুল আলম, কাজী এ টি এম আনিসুর রহমান বুলবুল, গোলাম মোস্তফা, মো. মহিউল ইসলাম বাবু, মো. জাকির হোসেন, মো. তৌছিফুল বারী খাঁন, মো. আমির হোসেন সুমন, মো. আল আমিন, মো. নাজমুল আহসান, সৈয়দ শাহেদ হাসান, মো. শফিকুল ইসলাম দেলোয়ার, দেওয়ান মোহম্মদ আলী ও মো.আব্দুল্লাহীল কাইয়ুম।

প্রায় এক দশক আগে আওয়ামী লীগ থেকে বহিষ্কৃত হয়ে মন্ত্রিত্ব খুইয়ে রাজনীতির মাঠে একাকীই পথ চলছিলেন লতিফ সিদ্দিকী। তিনি আওয়ামী লীগে ছিলেন দীর্ঘকাল।

টাঙ্গাইল থেকে ১৯৭০ সালে প্রথম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন লতিফ সিদ্দিকী। স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ এবং ১৯৯৬ সালেও সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি।

২০০৯ সালে পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পর শেখ হাসিনার সরকারে পাট ও বস্ত্রমন্ত্রী হয়েছিলেন লতিফ সিদ্দিকী। ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর পান পান ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের দ্বায়িত্ব।

ওই বছরই যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে হজ পালন নিয়ে এক মন্তব্যের জেরে সমালোচনার মুখে পড়লে আওয়ামী লীগ তাকে দল থেকে বহিষ্কার করে, মন্ত্রিত্ব হারিয়ে পরের বছর সংসদ থেকেও পদত্যাগ করেন তিনি।

এরপর রাজনীতির বাইরেই ছিলেন বেশ কিছুদিন। ২০১৮ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে ভোটে দাঁড়িয়েও হেরেছিলেন, তবে ২০২৪ সালের নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে হারিয়ে দেন তিনি।

সাত মাস পর ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটলে লতিফ সিদ্দিকীর সংসদ সদস্য পদের অবসান ঘটে।

অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী লীগ নেতা, এমপি, মন্ত্রীরা রোষের মুখে পড়লেও লতিফ সিদ্দিকী নিভৃতেই ছিলেন। বৃহস্পতিবার তিনি প্রতিরোধের মুখে পড়েন।

লতিফ সিদ্দিকীসহ মুক্তিযোদ্ধাদের হেনন্থার প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি। দলটি এক বিবৃতিতে বলেছে, “মুক্তিযুদ্ধবিরোধী একটি চিহ্নিত শক্তি একাত্তর আর চব্বিশকে মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাইছে। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর নানাভাবে আক্রমণ হচ্ছে।”

‘স্বঘোষিত জুলাই যোদ্ধা‘দের মব সন্ত্রাসের নিন্দা জানিয়ে এবিষয়ে ব্যবস্থা না নিয়ে আক্রান্ত মুক্তিযোদ্ধা ও অন্য অংশগ্রহণকারীদের পুলিশ হেফাজতে নেওয়ায় ক্ষোভ জানিয়েছে সিপিবি।

রিপোর্টার্স ইউনিটিতে লতিফ মিদ্দিকীকে ঘিরে বিক্ষোভকারীরা নিজেদের ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসাবে পরিচয় দেন সাংবাদিকদের কাছে।

আল আমিন রাসেল নামের একজন প্রথম আলোকে বলেন, “আমরা জুলাই যোদ্ধা। এখানে পতিত আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা জড়ো হয়ে ষড়যন্ত্র করছে। জুলাই যোদ্ধারা বেঁচে থাকতে এমন কিছু আমরা মেনে নেব না।”

‘জুলাই যোদ্ধাদের’ সঙ্গে থাকা পল্টন থানা জামায়াতে ইসলামীর নেতা শামীম হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, “একটি গোষ্ঠী একাত্তর ও চব্বিশকে মুখোমুখি করে চব্বিশকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করছে। আমরা মনে করি, একাত্তর আমাদের ভিত্তি এবং চব্বিশ আমাদের মুক্তি।

“এখানে যারা জড়ো হয়েছেন, তারা সবাই চব্বিশের খুনের সঙ্গে জড়িত। অনেকের বিরুদ্ধে মামলাও আছে। আমরা আইন হাতে তুলে না নিয়ে তাঁদের পুলিশে সোপর্দ করেছি।”

এদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে কি না- বিবিসি বাংলার প্রশ্নে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, “মামলা হলে তদন্ত করে যার বিরুদ্ধে প্রমাণ পাওয়া যাবে তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এটা তদন্তের ব্যাপার।”

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি-ডিআরইউ এক বিবৃতিতে তাদের মিলনায়তনে ‘মঞ্চ ৭১’ এর অনুষ্ঠানে হামলা এবং তা ঠেকাতে যাওয়া সাংবাদিক নেতাদের নাজেহাল করার ঘটনায় নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে ।

এক বিবৃতিতে ডিআরইউ বলেছে, “প্রতিষ্ঠার পর থেকে ডিআরইউতে দল-মত-পথ নির্বিশেষে সবার কথা বলার সুযোগ ছিল। কখনেও ডিআরইউতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে কারও হস্তক্ষেপ ছিল না। আগামী দিনে কেউ এর ব্যত্যয় ঘটালে ডিআরইউ তা প্রতিহত করবে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।”

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত