Beta
সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬
Beta
সোমবার, ৩ আগস্ট, ২০২৬

বেসরকারি খাতে যাচ্ছে নগদ, প্রধান শেয়ারহোল্ডার হবে প্রযুক্তি কোম্পানি

‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ সামিট ২০২৫’-এ গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ সামিট ২০২৫’-এ গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।
[publishpress_authors_box]

নানা অভিযোগে ডুবতে বসা ডাক অধিদপ্তরের মুঠোফোনে আর্থিক সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান (এমএফএস) নগদকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রতিষ্ঠানটির জন্য বিনিয়োগকারী খুঁজতে এক সপ্তাহের মধ্যে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর আহসান এইচ মনসুর।

বুধবার রাজধানী ঢাকার সোনারগাঁও হোটেলে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব কস্ট অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অ্যাকাউন্ট্যান্টস (আইসিএমএবি) ও মাস্টারকার্ডের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ সামিট ২০২৫’-এ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান।

গভর্নর বলেন, “নগদের মালিকানা আগামী তিন থেকে চার মাসের মধ্যে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে তুলে দেওয়া হবে। এজন্য নতুন বিনিয়োকারী খোঁজা হচ্ছে। কারণ নগদ চালানোর মতো সক্ষমতা পোস্ট অফিসের নেই। নগদে একটি প্রযুক্তি কোম্পানিকে প্রধান শেয়ারহোল্ডার হিসেবে আনতে হবে।”

বিনিয়োগকারী খুঁজতে সপ্তাহখানেকের মধ্যে বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হবে জানিয়ে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে সরকারের উচ্চপর্যায়ে কথা হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিকে আরও সক্ষম ও স্থিতিশীল হিসেবে গড়ে তোলা আমাদের মূল লক্ষ্য।”

আহসান এইচ মনসুর বলেন, “এমএফএস নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের হাতে এখনও কেবল একটি বড় প্রতিষ্ঠানই আছে। এই খাতে আরও কার্যক্রম, প্রতিযোগিতা ও নতুন বিনিয়োগ তৈরি করতে হবে। সেজন্য নগদকে বেসরকারি খাতে দেওয়ার এবং বিনিয়োগ আনার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।”

গভর্নর বলেন, “ইতোমধ্যে নগদে বড় ধরনের সংশোধন আনা হয়েছে। আগের মালিকদের কারণে নানা অনিয়মের যে সমস্যাগুলো ছিল, তা সমাধান করা হয়েছে। প্রায় দেড় কোটি ভুয়া কিংবা অকার্যকর হিসাব বাদ দেওয়া হয়েছে এবং প্রতিষ্ঠানটি পুনর্গঠনের পথে রয়েছে।”

তবে প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের জন্য কৌশলগত বিনিয়োগকারী প্রয়োজন উল্লেখ করে আহসান এইচ মনসুর বলেন, “এখন এমন একটি প্রতিষ্ঠান দরকার, যেমন বিকাশের মতো যারা ধাপে ধাপে, শেয়ার ধরে ধরে নগদে বিনিয়োগ করতে পারবেন।

“আশা করছি, নগদকে যোগ্য প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পুনরুজ্জীবিত করা সম্ভব হবে।”

মোবাইলে আর্থিক সেবাদাতা কোম্পানি হিসেবে ২০১৯ সালের ২৬ মার্চ যাত্রা শুরু করে নগদ। পরে এই এমএফএস কোম্পানিকে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্সও দেওয়া হয়।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় এ কোম্পানিকে নিয়ম ভেঙে অনৈতিক সুবিধা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

শেখ হাসিনার সরকার পতনের আগে গত বছরের জুনে নগদ ব্যাংক পিএলসি নামে চূড়ান্ত লাইসেন্স ইস্যু করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর আগে ২০২৩ সালের আগস্টে নগদ ও কড়ি ডিজিটাল ব্যাংক পিএলসির নামে এলওআই (Letter of Intent) দেওয়া হয়।

পাচারের টাকায় বিদেশে কোম্পানি খুলে এসব ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অভিযোগ সামনে আসে। যে কারণে নগদ ব্যাংক পিএলসির লাইসেন্স স্থগিত করে বাংলাদেশ ব্যাংক। আর কড়ির নামে এখনও লাইসেন্স ইস্যু করা হয়নি।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ২১ অগাস্ট নগদের আগের পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক বসায় বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে উচ্চ আদালত পরে তা অবৈধ ঘোষণা করে। তখন নগদের দায়িত্ব নেয় ডাক অধিদপ্তর।

অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে গত ফেব্রুয়ারি মাসে নগদের বিরুদ্ধে মামলা করে বাংলাদেশ ব্যাংক, যেখানে কোম্পানির সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মোহাম্মদ কামাল ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক তানভীর আহমেদ মিশুকসহ ২৪ জনকে আসামি করা হয়।

মামলায় বলা হয়, গত বছরের ২১ থেকে ২৫ এপ্রিল বাংলাদেশ ব্যাংক নগদের কার্যক্রম পরিদর্শন করে। তাতে বিভিন্ন ব্যাংকের ‘ট্রাস্ট কাম সেটেলমেন্ট’ হিসাবে ইস্যুকৃত ই-মানির বিপরীতে রিয়েল মানির ১০১ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি পাওয়া যায়।

‘নগদ’ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে ৬৪৫ কোটি টাকার ই-মানি ঘাটতিসহ আরও কিছু গুরুতর আর্থিক অনিয়মের তথ্য প্রশাসক দলের নজরে আসে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ব্যাংক মামলাটি করে।

এদিকে ডিজিটাল ব্যাংক প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন করে আবেদনপত্র আহ্বান করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি বছরের ১ থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আবেদন করা যাবে বলে মঙ্গলবার এক বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক খাতে বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ ব্যাংক ডিজিটাল ব্যাংকের অনুমোদন দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এর লক্ষ্য হলো আর্থিক খাতের দক্ষতা বাড়ানো, সেবার পরিসর বিস্তৃত করা আর ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (সিএমএসই) অর্থায়নের সুযোগ সহজ করা।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুযোগ কাজে লাগিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। বিশেষ করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য ঋণপ্রবাহ সহজ করতে ডিজিটাল ব্যাংককে গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট ও ফেইসবুক পেইজেও এ বিষয়ক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

দুই বছর পর আবার আবেদন চাওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান সকাল সন্ধ্যাকে বলেন, “আগেও যারা আবেদন করেছিল, তাদেরকে নতুন করে আবার আবেদন করতে হবে।”

আবেদনকারীদের নির্ধারিত প্রস্তাবপত্রের সঙ্গে পাঁচ লাখ টাকা (অফেরতযোগ্য) ফি জমা দিতে হবে। এ টাকা যেকোনো তফসিলি ব্যাংক থেকে ব্যাংক ড্রাফট বা পে-অর্ডারের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুকূলে দিতে হবে। শর্ত পূরণ না করলে আবেদন বাতিল হবে।

এছাড়া আবেদনপত্র সরাসরি জমা দেওয়ার পাশাপাশি ই-মেইলের মাধ্যমেও সব নথি জমা দিতে হবে। বিস্তারিত নির্দেশনা বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

‘ক্যাশলেস বাংলাদেশ সামিট ২০২৫’ শীর্ষক সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে গভর্নর বলেন, “শিগগিরই বেসরকারি খাতের ক্রেডিট ব্যুরোর জন্য অনুমোদন দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে এ ধরনের পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দেওয়ার বিষয়ে ভাবা হচ্ছে। আগামীতে যাদের ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া হবে, প্রত্যেকের যেন কিউআর কোড থাকে সে ব্যবস্থা করার জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়েছে।”

প্রতি বছর নগদ টাকার চাহিদা ১০ শতাংশ হারে বাড়ছে জানিয়ে গভর্নর বলেন, নগদ টাকা ছাপলে ব্যাংকের খরচও বাড়ে। সেজন্য ‘ক্যাশলেস’ সোসাইটি গড়া জরুরি।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খান, অর্থ সচিব খায়রুজ্জামান মজুমদার, সিটি ব্যাংক পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসরুর আরেফিন।

আরও পড়ুন

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত