যুক্তরাষ্ট্রের পশ্চিম উপকূলের শহর লাস ভেগাস থেকে গাড়ি চালিয়ে পশ্চিম উপকূলের ম্যানহাটনে এসেছিলেন শেন ডেভন টামুরা। পার্ক এভিনিউর রুডিন প্রপার্টিজের বহুতল ভবনে এসে গাড়িটি পার্ক করেন তিনি। এরপর বর্ম পরে বন্দুক হাতে গাড়ি থেকে নেমে আসেন ২৭ বছরের এই যুবক।
ভবনে ঢুকেই কথা নেই, বার্তা নেই একের পর এক গুলি ছুড়তে থাকেন টামুরা। নিচতলায় তিনজনকে গুলি করে মারেন তিনি, যার একজন নিউ ইয়র্ক পুলিশে কর্মরত বাংলাদেশি দিদারুল ইসলাম।
নিচতলায় গুলি চালানোর পর লিফটে ভবনটির ৩৩ তলায় উঠে যান টামুরা; যেখানে রয়েছে রুডিন প্রপার্টিজের অফিস। সেখানে একজনকে গুলি করে মারার পর তিনি আত্মহত্যা করেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। বুকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
সোমবার সন্ধ্যায় ম্যানহাটনের কেন্দ্রস্থলে টামুরা এই কাণ্ড ঘটানোর পর প্রশ্ন উঠছে কী ছিল তার উদ্দেশ্য? তার মানসিক রোগে আক্রান্ত থাকার একটি তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। সেটাই মূল কারণ ছিল কি? তার পকেটে একটি চিঠি পাওয়া গেছে, তা ধরেই এখন চলছে নিউ ইয়র্ক পুলিশের তদন্ত।
লাস ভেগাস থেকে ম্যানহাটন
যুক্তরাষ্ট্রের দ্বীপ রাজ্য হাওয়াইয়ের আদি বাসিন্দা টামুরা পরে মুল ভূখণ্ড ক্যালিফোর্নিয়ায় চলে আসেন। এই রাজ্যের লাস ভেগাস ছিল তার সর্বশেষ আবাস, তা নিশ্চিত হয়েছে পুলিশ। সোমবারের ঘটনার পর লাস ভেগাস মেট্রো পুলিশের বেশ কয়েকটি গাড়িকে টামুরার বসবাসস্থলে ঢুকতে দেখা গেছে।
পুলিশ জানিয়েছে, টামুরা একটি বিএমডব্লিউ গাড়িতে লাস ভেগাস থেকে নিউ ইয়র্কে যাত্রা শুরু করেছিলেন।

নিউ ইয়র্ক সিটি পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ বলেছেন, গাড়িটি ২৬ জুলাই কলোরাডো রাজ্যে ঢোকে, নেব্রাস্কা ও আয়ওয়া হয়ে ২৮ জুলাই সোমবার বিকাল ৪টা ২৪ মিনিটে গাড়িটি নিউ জার্সি হয়ে ঢোকে নিউ ইয়র্ক শহরে।
এর কিছুক্ষণ পর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে ম্যানহাটনের রুডিন প্রপার্টিজের ভবনে আসে টামুরার গাড়িটি। তারপরই চলে তার গুলিবর্ষণ। সন্ধ্যা ৭টা ৫২ মিনিটে তাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়।
টামুরার ভ্রমণ পথে নজর রাখলে দেখা যায়, তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে আড়িআড়িভাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অতিক্রম করেছিলেন। ৭২ ঘণ্টায় তিনি আড়াই হাজার মাইলের বেশি পথ পাড়ি দেন নিউ ইয়র্কে আসতে।
ছিল অস্ত্রের লাইসেন্স
হামলার সময় টামুরার হাতে ছিল একটি এম-৪ কার্বাইন রাইফেল। মুখোমুখি যুদ্ধে এটি বেশ কার্যকর অস্ত্র হিসাবে স্বীকৃত।
টামুরার আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স ছিল। ২০২২ সালের ১৪ জুন তাকে সেটা দিয়েছিল লাস ভেগাস পুলিশ এবং তার মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।

নেভাডা রাজ্যে নিবন্ধিত টামুরার গাড়ির ভেতর থেকে একটি রাইফেল কেস, একটি গুলিভরতি রিভলভার, ম্যাগাজিন, একটি ব্যাকপ্যাকও পেয়েছে পুলিশ। সেই সঙ্গে পাওয়া গেছে কিছু ওষুধ। বোমা বিশেষজ্ঞরা গাড়িটি তল্লাশি করে কোনও বিস্ফোরক পায়নি।
টামুরা এক সময় ব্যক্তিগত তদন্তকারী হিসাবে কাজ করতেন। নেভাডা রাজ্যে প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর হিসাবে কাজ করার একটি লাইসেন্সও ছিল তার, তার মেয়াদ অবশ্য ফুরিয়ে গেছে।
টামুরা লাস ভেগাসে একটি ক্যাসিনোতে কিছু দিন আগেও কাজ করেছিলেন বলে জেনেছে পুলিশ।
ফুটবল প্রীতি
কিশোর বেলা থেকে ফুটবল (আমেরিকান ফুটবল) খেলতেন টামুরা। তিনি লস এঞ্জেলেসে হাই স্কুলে পড়ার সময় বেশ ভালো খেলতেন বলে জানিয়েছেন তার স্কুলের একজন শিক্ষক।
সান্তা ক্লারিটা হাই স্কুলে টামুরার সহপাঠী ক্যালেব ক্লার্ক বলেছেন, টামুরা স্কুলে ছিলেন একজন আমোদপ্রিয় মানুষ।
গ্রানাডা হিলস চার্টারের হয়ে খেলেছিলেন টামুরা। ২০১৫ সালের একটি ভিডিও এখন সামনে এসেছে, যখন টামুরা গ্রানাডা হিলসের হয়ে ফুটবল খেলেছিলেন। ভিডিওতে একটি খেলায় জেতার পর টামুরাকে আবেগপূর্ণ অনুভূতি প্রকাশ করতে দেখা যায়।

গোল্ডেন ভ্যালি স্কুলের হয়েও ফুটবল খেলেছিলেন টামুরা এবং তার খেলোয়াড়ি প্রতিভা নিয়ে নানা প্রশংসাও পাওয়া যাচ্ছে।
টামুরা যে ভবনে গুলিবর্ষণ করেছেন, সেখানে ন্যাশনাল ফুটবল লিগের দপ্তরও রয়েছে।
মানসিক রোগে ফুটবল যোগ!
নিউ ইয়র্ক পুলিশ কমিশনার জেসিকা টিশ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন যে টামুরার মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার ইতিহাসের খোঁজ পেয়েছেন তারা।
পুলিশ কর্মকর্তারা জেনেছেন যে নেভাডায় ২০২২ ও ২০২৪ সালে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় পড়েছিলেন টামুরা।
টামুরা ক্রনিক ট্রমাটিক এনসেফালোপ্যাথি (সিটিই) রোগে আক্রান্ত বলেও ধারণা করা হচ্ছে। এটি মস্তিষ্কের এমন একটি রোগ, যা ক্রীড়াবিদ ও সৈনিকদের মধ্যে দেখা যায়। এটি হলে মেজাজ হারানোসহ আচরণগত নানা পরিবর্তন দেখা যায়।
টামুরার পকেটে তিন পৃষ্ঠার একটি নোট বা চিঠি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তারা। সেখানে সিটিই রোগে আক্রান্ত থাকার কথা তিনি নিজেই লিখেছেন।
চিঠিতে তিনি ফুটবলার হতে না পারা নিয়ে ন্যাশনাল ফুটবল লিগ (এনএফএল) নিয়ে হতাশার কথাও লিখেছেন।
যে ভবনে আক্রমণ চালিয়েছিলেন টামুরা, সেখানে এনএফএলের দপ্তর যেমন ছিল, তেমনি রয়েছে রুডিন প্রপার্টিজের কার্যালয়।
লিফটে সরাসরি ৩৩ তলায় উঠে গিয়েছিলেন টামুরা। ওই তলায় রুডিন প্রপার্টিজের দপ্তর। টামুরা সেখানে উঠে একজনকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন।

নিউ ইয়র্কের সবচেয়ে পুরনো রিয়েল এস্টেট কোম্পানির একটি রুডিন প্রপার্টিজ। এর প্রতিষ্ঠা ১৯২৫ সালে।
রুডিন প্রপার্টিজের সঙ্গে টামুরার কোনও যোগসূত্রের খবর পাওয়া যায়নি। ফলে তিনি কেন তাদের কার্যালয়েই গেলেন, সে বিষয়টি এখনও অস্পষ্ট।
তবে টামুরা ভুল করে এনবিএল কার্যালয়ের বদলে রুডিন প্রপার্টিজের দপ্তরে গিয়েছিলেন বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
নিউ ইয়র্কের মেয়র অ্যাডামস বলেন, টামুরা সম্ভবত ভুল লিফটে উঠে গিয়েছিলেন। ফলে তিনি এনবিএলের বদলে রুডিন প্রপার্টিজে চলে গিয়েছিলেন।
তার ভাষ্যে, ভবনটিতে একাধিক লিফট রয়েছে এবং সব লিফট সব তলায় থামে না। কোন লিফট কোন তলায় থামে, তা না দেখেই টামুরা উঠে গিয়েছিলেন। ফলে তিনি ভুল স্থানে চলে যান।
তবে আসলে কোন সঙ্কট থেকে এভাবে টামুরা মানুষ হত্যায় প্ররোচিত হন, সে বিষয়ে এখনও সন্দেহাতীত কোনও তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না।
পুলিশ কমিশনার টিশ বলেন, “তার উদ্দেশ্য এখনও তদন্তাধীন। আমরা বোঝার চেষ্টা করছি কেন তিনি এই নির্দিষ্ট স্থানটিকে লক্ষ্যবস্তু করেছিলেন।”
তথ্যসূত্র : নিউ ইয়র্ক পোস্ট, ফক্স নিউজ, এনডিটিভি



